Skip to main content

স্মরণে শ্রদ্ধায় প্রয়াত কবি বিজিৎকুমার ভট্টাচার্য ‘সাহিত্য’ - ১৬১ তম সংখ্যা


বরাক কিংবা উত্তরপূর্বের ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে যে কজন কবি, সাহিত্যিক হয়ে উঠতে পেরেছিলেন সীমাহীন সাহিত্যবিশ্বের ভাস্বর নাগরিক তাঁদের অন্যতম কবি বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যের পরলোক গমনে তাঁর স্বভূমে অবধারিত ভাবেই সৃষ্টি হয়েছিল এক গভীর শূন্যতা শূন্যতা শুধু সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রেই নয়, শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল তাঁর আপন সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ সাহিত্য পত্রিকাসাহিত্যর ভবিষ্যৎ নিয়েও কবিরাও মানুষ এবং মানুষ মরণশীল এই সূত্রে তাঁর মৃত্যুকে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মেনে নিতে সবাই বাধ্য যদিও এই সাহিত্য ভুবন থেকে হারিয়ে যাবেসাহিত্যনামের একটি অভিজাত তথা সমৃদ্ধ পত্রিকা এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যাচ্ছিল না হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় যখন নিমগ্ন পাঠকবৃন্দ অপেক্ষার প্রহর গুনছেন তখনই যাবতীয় দুশ্চিন্তাকে দূর করে প্রকাশিত হল পত্রিকার ১৬১ তম সংখ্যা
সাহিত্যপত্রিকার এই যাত্রাকে যাঁরা বিরামবিহীন করে তুললেন তাঁরা হলেন এই সংখ্যার সম্পাদক কবিপত্নী শিখা ভট্টাচার্য যিনি বহুদিন ধরেই নিজেকে জড়িত রেখেছিলেন এই কর্মযজ্ঞে যখন কবি, সম্পাদক বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যকে অসুস্থতার কবলে পড়ে সুচিকিৎসার জন্য প্রায়শই পাড়ি দিতে হয়েছিল বাইরে সহযোগী সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন কবি, লেখক দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য সম্পাদকীয়তে সব কথাই আছে। আছে পত্রিকার ঋদ্ধ অতীত, কীভাবে সম্পাদক এই পত্রিকাকে করে তুলেছিলেন এক স্বতন্ত্র ধারার সাহিত্যপত্র, কীভাবে দূর করেছিলেন পরনির্ভরতা। আছে ভবিষ্যতের কর্মপন্থা এবং প্রত্যয়ের কথাও - ‘সম্পাদকীয় পৃষ্ঠা ব্যক্তিগত শোকজ্ঞাপনের ক্ষেত্র নয়। এখন ‘সাহিত্য’ সংক্রান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কার্তিক সংখ্যা ‘সাহিত্য’ স্বাভাবিক কারণেই সময়ে প্রকাশ করা যায়নি। লেখকেরা সহায়তা করায় ‘সাহিত্য ১৬১’ (বিজিৎকুমার ভট্টাচার্য স্মরণ সংখ্যা} অগ্রহায়ণের মধ্যে প্রকাশ করতে পারলাম।
‘সাহিত্য’ আরও কিছু পথ চলার অঙ্গীকার করছে। তবে এবার থেকে হয়তো চারটি নয়, বছরে দুটি বা তিনটি সংখ্যা প্রকাশের পরিকল্পনা আমরা গ্রহণ করতে চলেছি। বরাবরের মতো লেখক, পাঠক, গ্রাহক সকলের সহযোগিতা চাইছি’।
এবারের পুরো সংখ্যাটিই একের পর এক স্মৃতিচারণে এতটাই অনবদ্য হয়ে উঠেছে যে ভবিষ্যতে এই সংখ্যাটি এক সংগ্রহযোগ্য দলিল হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। গদ্যে, পদ্যে সব নিয়মিত লেখক ও কবিদের রচনায় সমৃদ্ধ হয়েছে সংখ্যাটি। প্রথমেই ‘শ্রদ্ধায় স্মরণে’ বিভাগে প্রয়াত কবি ও ‘সাহিত্য’কে নিয়ে কলম ধরেছেন মনোতোষ চক্রবর্তী, দেবাশিস তরফদার, অমিতাভ দেব চৌধুরী, প্রাণজি বসাক, সুবীর ভট্টাচার্য, অরিজিৎ চৌধুরী, বদরুজ্জামান চৌধুরী, অনন্যা ভট্টাচার্য, কাশ্যপজ্যোতি ভট্টাচার্য, স্বর্ণালী বিশ্বাস ভট্টাচার্য, আদিত্য সেন, সুনন্দা ভট্টাচার্য, শোভেন সান্যাল, দিলীপকান্তি লস্কর, বীরেশ ঘটক, কৃষ্ণা মিশ্র ভট্টাচার্য, শঙ্কু চক্রবর্তী, অনীতা দাস টেণ্ডন এবং সোমাভা বিশ্বাস। কিছু সংক্ষিপ্ত, ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাঞ্জলির বাইরে অধিকাংশ রচনাই তত্ত্ব ও তথ্যে ভরপুর, আবেগিক স্মৃতিচারণ যা গবেষণাযোগ্য দলিল হয়ে থাকবে ভবিষ্যতের জন্য।
সংখ্যাটিকে এক আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেল কবি বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যের নির্বাচিত কবিতাগুচ্ছ। নির্বাচিত ছত্রিশটি কবিতায় ধরা আছে কবির কবিতার নির্যাস যা আবারও পাঠককে নিয়ে যায় স্মৃতির সরণি পেরিয়ে কাব্যিক মুগ্ধতার জগতে। যাঁদের কবিতায় শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদিত হয়েছে প্রয়াত কবির প্রতি তাঁরা হলেন প্রতিমা ভট্টাচার্য, দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য্, দিলীপকান্তি লস্কর, সুব্রতকুমার রায়, অরণি বসু, সোমনাথ ভট্টাচার্য, ভক্ত সিং, দেবদত্ত চক্রবর্তী, রফি আহমেদ মজুমদার, মোহাজির হুসেইন চৌধুরী, আশিস নাথ, নীহাররঞ্জন দেবনাথ ও জিতেন্দ্র নাথ।
সংখ্যাটিতে রয়েছে নিয়মিত ধারাবাহিক উপন্যাস বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যের ‘রূপসীবাংলার কাহিনী (২য় খণ্ড)’-এর পূর্বপ্রকাশিত খণ্ডের পরবর্তী অংশ। রয়েছে নিয়মিত বিভাগ ‘প্রাপ্তি স্বীকার’ও। তবে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে এ সংখ্যায় বিস্তৃত ভাবে সন্নিবিষ্ট হয়েছে ‘বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যের জীবনপঞ্জি’ যা আবারও বলা যায় - ভবিষ্যতের এক আবশ্যিক দলিল। তাঁর কবিতার থেকে কিছু পঙক্তি বড়ই প্রাসঙ্গিক হিসেবে ধরা দেয় এই আবহে -
জানি যে কোনো মুহূর্তে ঝুপ করে অন্ধকার নামবে
আমি তাই শেষ আলোটুকু নতুনের জন্য রেখে দিলাম। ...... (কবিতা - শেষ আলো)।
 
আমি জানি তোমরা সবাই তুলিছ অঙ্গুলি
কবির লেখায় তত্ত্ব চাইছ, চাইছ গূঢ় কথা,
আমার আজ কেমন এলোমেলো,
শুনছি আর দেখছি, পায়ের নীচে অসীম চোরাবালি
রং মেলাচ্ছেন বিনোদবিহারী গো
সুর বাজাচ্ছেন খান আমজাদ আলি। (কবিতা - যেতে যেতে)।
আমার মতোই আমি যাব
একা যাবার বেলা
কেউ বলে না চলো গোঁসাই
আমরা হাত ধরে বৃন্দাবনের পথে হারিয়ে যাই।
 
একা যাবার বেলা
দেখা হলেই বলে -
ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন,
কর্মে থাকুন, বন্ধু ও বান্ধবে থাকুন,
আর কী চাই ?
নতুন গোঁসাই... (কবিতা - যাব, আমার মতোই যাব)।
 
প্রতিষ্ঠাপক সম্পাদকের উত্তরসূরির হাত ধরে প্রকাশিতব্য পত্রিকার আভিজাত্য কিংবা কৌলিন্য নিয়ে পাঠক মনের দ্বিধা কিংবা সংশয়ের নিরসন হয়েছে এই সংখ্যাটির প্রকাশের মাধ্যমে। নবগঠিত সম্পাদকমণ্ডলী কোথাও এতটুকু বিচ্যুতি কিংবা বিকৃতি তো দূরের কথা তাঁদের দায়িত্ব, গরজ ও যত্নের সুস্পষ্ট ছাপ রাখতে একশো ভাগ সফল হয়েছেন পত্রিকার পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়। প্রয়াত সম্পাদকের কৈশোরের একটি স্কেচ এবং একটি কবিতার পাণ্ডুলিপির ছবি বিশেষত্ব প্রদর্শন করেছে সংখ্যাটিতে।
১৫৬ পৃষ্ঠার সংখ্যাটিতে দুটি পৃষ্ঠার বাইরে ছাপার মান স্পষ্ট, বানানের শুদ্ধতা অপরিবর্তিত বর্ণ সংস্থাপন ও অক্ষর বিন্যাস যথাযথ। কাগজের মান প্রচলিত। যথারীতি বিজ্ঞাপনবিহীন পত্রিকায় রয়েছে ‘সাহিত্য প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশিত বইপত্রের হদিশ। সবশেষে আবারও উল্লেখ করতে হয় সংখ্যাটি আদ্যোপান্ত এক সংগ্রহযোগ্য দলিল। কবি জিতেন্দ্র নাথের শেষ কবিতার শেষ ক’টি লাইন ধরে নাহয় সব শেষে একটুকু নির্যাস নেওয়া যাক প্রয়াত কবি-সম্পাদকের সান্নিধ্যের, তাঁর কবিতা যাপনের, তাঁর জীবনসুধার -
 
এই দুঃখের আবহে মজেছি আমরা
নিমগ্ন কবিতা পাঠে
 
তারপর তুমি চলে গেলে পাতার ভুবনে
রেখে গেলে স্মৃতিচিহ্ন ঘরে ছাদে এখানে ওখানে
আমি এই স্মৃতিছায়াটুকু ধরে রাখি
 
এই চলে যাওয়ার পরও
উষ্ণতার ছাপ ছিল ঘর গৃহস্থালি জুড়ে
রেশটা থাকল আমার শরীর ঘিরে
 
কতোদিন তোমাকে দেখিনি
তারপর দেখেছি সর্বাঙ্গ।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

 

মূল্য - ৭০ টাকা
যোগাযোগ - ০৩৮৪৪২২২৪৫০

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...