Skip to main content

এক দিন মানসী ‘মানস’-এ

তিনিও তো রাজাই আর রাজাকে নিজে থেকে প্রকাশ্যে আসতে হয় না রাজাকে রাজমহলেই মানায় ভালো তাই হলো, রাজার দেখা আর পাওয়া গেল না একে সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য বলব বুঝে উঠতে পারছি না
২০২১ ইংরেজির মহাসপ্তমী পুজোর দিন কী করা যায় কী করা যায় ভাবতে ভাবতে শেষ পর্যন্ত বহুদিন ধরে সুপ্ত মানসে লুকিয়ে থাকা মানস ভ্রমণ’-এ বেরিয়ে পড়ারই সিদ্ধান্ত হলো পুজোর ঘোরাঘুরি তো আজকাল এমনিতেই ফ্যাকাসে হয়ে গেছে করোনার প্রকোপে তাছাড়া বছরের পর বছর একই রুটিন যেন আজকাল কেমন থোড় বড়ি খাড়া খাড়া বড়ি থোড়লাগে আর বাচ্চারা তো লং ড্রাইভের নামে এক পায়ে খাড়া সুতরাং সকাল নটা নাগাদ দুটি গাড়ি করে বেরিয়ে পড়া গেল মানস অভয়ারণ্যের পথে শুনেছি সেখানে নাকি বনের রাজার রাজত্ব তাই প্রথম থেকেই ভেতরে একটা চাপা উত্তেজনা পথে চাংসারি আর রঙ্গিয়ার মাঝে এক সুরম্যধাবায় প্রাতঃরাশ সারা হলো ঝলসানো রোদে এ সি রুমের ভাড়া সহ এক প্লেট ছোলা ভাটোরা ৯০ টাকা প্লেট করোনার ছায়ায় এ কিছুই নয়, কিন্তু আদতে সুরম্যই বটে গাড়ি ভাড়া থেকে শুরু করে খাওয়া দাওয়ায় করোনার প্রকোপ লাগাম ছাড়া সাধারণ মানুষের শখ আহ্লাদ ছেড়ে দেওয়ার দিন এসে গেছে সব দিকে নজর দেওয়ার মতো সময় বোধ করি সরকারের নেই
এবার আর রাস্তায় থামাথামি নেই নলবাড়ি পেরিয়ে পাঠশালা থেকে ডানে মোড় নিয়ে সোজা মানস গুয়াহাটি থেকে মানস ১৩৫ কিলোমিটার, থামাথামি মিলে ঘন্টা চারেকের সফর পাঠশালা অবধি ফোর লেন মহাসড়ক গাড়ির কাটা একশো ছুঁতে পারে অনায়াসে শুধু অজস্র স্পীড ব্রেকারের জ্বালায় ব্রেক কষতে হয় ঘন ঘন এই যা বিপত্তি পাঠশালা থেকে মানস - এই রাস্তাটি জরাজীর্ণ না হলেও উপযুক্ত সারাইয়ের অভাবে কষ্টকর পথ চলা অভয়ারণ্যের এক কিলোমিটার আগেই সাফারি পয়েন্ট পৌঁছে গেলাম ঠিক দুপুর একটায় এবার কিছু সিদ্ধান্ত নিত হবে আপনাকে জীপ সাফারি করে দেখবেন অভয়ারণ্য নাকি নিজের গাড়ি করে নিজের গাড়িতে গেলে কিছু বাধ্য বাধকতা আছে সব রাস্তায় যেতে পারবেন না সোজাসুজি যাবেন শেষ অবধি এবং একই রাস্তায় ফিরে আসা দুর্গম, গা ছমছম রাস্তায় প্রবেশ নিষেধ সাফারি হলে সবটুকু উপভোগ করতে পারবেন কিন্তু চোখ কপালে উঠবেন যখন দেখবেন এখানেও করোনার প্রকোপ একটি জীপে ৫ জনের বেশি যাওয়া যাবে না এবং একটি জীপে প্রবেশ মুল্য সহ সব মিলিয়ে তিন হাজার টাকারও বেশি পড়বে সাথে এসকর্ট (বন্দুকধারী, যদিও বনের রাজার সামনে পড়লে চাচা, আপন প্রাণ বাঁচানা হয়ে যায়) নিলে আরোও তিনশো টাকা সাধারণ লোকের ধরাছোঁয়ার বাইরে এখানেও সরকারের হস্তক্ষেপ খুবই জরুরী
এত দূর এসেছি, অথচ পুরোটা উপভোগ না করে ফিরে যাব, এ হয় না সুতরাং খোলা জীপের সাফারিতেই ঢুকে পড়লাম অভয়ারণ্যে গেটেই বাঘের মূর্তি টাইগার পার্ক বুক ধুকপুক শুরু এ যেন ইচ্ছে করে বাঘের ঘরে প্রবেশ মনের মধ্যে কত কথা, কত স্মৃতির পাহাড় যদি আসে, কোনদিক থেকে আসবে ? পাশ থেকে ঝাঁপাবে না গাছের উপর থেকে - ডিসকভারি চ্যানেলের মতো ? মারা পড়লে সরকার থেকে কিছু পাবে তো জীবিতরা ? নিশ্চয়ই পাবে কারণ অফিস থেকে টাকা পয়সা দিয়ে টিকিট কেটেই তো বেরিয়েছি সাফারিতে ভেতরে প্রবেশ এর পথে কথায় কথায় ড্রাইভার কাম গাইড জানালো যেহেতু আমরা এসকর্ট নিইনি তাই সরকারের দায় নেই আমাদের উপর আর এখানে নাকি মোট ৪৮টি বাঘ আছে শুনে তো আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হবার উপক্রম মনে হচ্ছিল ফিরেই আসি নাকি ?
কিন্তু ওদিকে যে ভালো লাগার শুরু হয়ে গেছে নিজেরই অজান্তে সে খেয়ালই করিনি আর পিছনে নয় এগিয়ে যাওয়া শুধু কপালে যা আছে হবে ভেতরে ভেতরে সুপ্ত ইচ্ছের জন্ম নিচ্ছে - দূর থেকে একটু যদি দেখা পাই প্রথমেই আমাদের গাড়ি দুটি কিছু হালকা গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে এগিয়ে গেল এর পর অনেক দূর পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে শুধু ঘন শন জাতীয় তৃণের অস্তিত্ব এক মানুষ উঁচু গাছগুলি মাঝে মাঝে নিজের ভারে নিজেই ধরাশায়ী হয়ে আছে অনেকটা ফলনশীল ধানের গোছার মতো জানতে পারলাম এ ঘাসগুলো নাকি হাতীর খুব প্রিয় কথায় কথায় এও জানলাম এখানে বাঘের বাইরেও হাতী, গণ্ডার, বাঁদর, ভালুক সবই আছে অর্থাৎ এক সমৃদ্ধ জঙ্গল মহল বটে জীপ চলছে আপন ছন্দে, কাঁচা রাস্তায় রাস্তা পিচ করানো হয় না গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে নাহলে জীবজন্তুর আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার এমনকি জীবনহানিরও সম্ভাবনা থাকে এ হতে পারে না এখানে তাঁদের জীবন আমার আপনার চেয়ে দামী তাঁরাই এখানের ভূমিপুত্র, আমরা নেহাতই বহিরাগত আগন্তুক, ক্ষণিকের অতিথি
একটা সময় ঘন শনের এলাকা পেরিয়ে উঁচু গাছগাছালির এলাকাতে প্রবেশ করার মুহূর্তেই হঠাৎ করে গাড়ি থেমে গেল ড্রাইভার খুব নিচু স্বরে সামনে দেখিয়ে বললো - ‘হাতি আমরা সচকিত হয়ে উঠলাম সামনের রাস্তার একেবারে গা ঘেঁষে দুটি বড় হাতি এবং সাথে একটি বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে ওদিক থেকে ফিরে আসার কয়েকটি গাড়িও দেখতে পাচ্ছি দাঁড়িয়ে আছে হাতির দল আপন খেয়ালে বাচ্চার যত্নে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে আর দুচার কদম আগে পিছে ডাইনে বাঁয়ে হাঁটাহাঁটি করছে সরে যাওয়ার নাম নেই কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে জানি না ড্রাইভার বললো বাচ্চা সরে গেলেই বড়রাও সরে যাবে সত্যি, মিনিট দশেক এভাবে থাকার পর বাচ্চা হাতিটি ধীরে ধীরে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে পড়তেই বড়রাও চলে গেলেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচে জীপ আবার চলতে শুরু করলো উৎকণ্ঠার মুহূর্তটি কাটিয়ে আমরাও স্বাভাবিক শ্বাস প্রশ্বাস নিতে শুরু করলাম পথে কয়েকটি ময়ূরও দেখলাম আপন খেয়ালে চলে ফিরে খুটে খুটে দানা সংগ্রহে ব্যস্ত ছবি তোলা হলো সবার খানিক বাদেই শুরু হলো গগনচুম্বী বৃক্ষের সারি জঙ্গল এখানে ততটা গভীর নয় যদিও আমরা ইতিমধ্যে অনেকটাই সচেতন হয়ে পড়েছি বুঝতে পারছি ছটি ইন্দ্রিয়ই সজাগ রাখতে হবে এখানে এবার এক অদ্ভুত আওয়াজ এলো কানে তীব্র আওয়াজ যেন পুজোর ঘন্টা বাজার মতো এ এক বিশেষ ধরণের পোকা সচরাচর শোনা ঝিঁঝিঁ পোকার চাইতে কয়েকশোগুণ বেশি তীব্র এদের শব্দ এবং একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে ফিরে ফিরে এলো সেই আওয়াজ মনে হলো এরা বোধহয় অরণ্যের প্রহরী অনেকটা মোবাইল টাওয়ারের নেটওয়ার্কের মতো একটির আওতা শেষ হলেই আরেকটির আওতা শুরু পাশে অসংখ্য টগর আর নাম না জানা ফুলের গাছ কানের পর চোখের কাজও শুরু হলো একটা সময় এ সোজা রাস্তা গিয়ে যেখানে শুরু হলো সে জায়গাটির নাম মথনবাড়ি ড্রাইভার এখানে গাড়ি ঘুরিয়ে বললো সামনে একটু এগিয়ে যান পায়ে হেঁটে, নদী পাবেন নদীর ওপারটি ভূটানএ আরেক রোমাঞ্চ অর্থাৎ আমরা আন্তর্জাতিক সীমান্তে পৌঁছে গেছি
সবাই মিলে এগিয়ে গেলাম প্রায় তিনশো মিটার খানেক দূরে এখানে বন বিভাগের অফিস এবং কোয়ার্টার আছে যদিও মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই চারদিকে সুউচ্চ সব গাছগাছালি হলুদ রঙের কিছু প্রজাপতি এবং ডাঁশ পিপড়ের পয়োভার এখানে বুঝলাম এরাও এ মহলের গর্বিত প্রজা হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই সামনে বিশাল নদী দেখে জুড়িয়ে গেল চোখ নদীভর্তি জল নাকি জলভর্তি নদী ? এত সুন্দর, স্বচ্ছ জলে শেষ বেলাতে পশ্চিম দিগন্তের রবিকিরণ যেন নদীর সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তুলেছে বহুগুণ আমার আবার এক বাতিক আছে আজীবন লালিত নদী দেখলে আমি হারিয়ে যাই এক লহমায় নদীর জলে হাত পা না ছোঁয়ানো অবধি শান্তি পাই না মনে সন্তর্পণে তাই নেমে গেলাম নিচে কুলুকুলু নয়, নদী এখানে খরস্রোতা সাগরের ঢেউ এর মতো ছোট ছোট ঢেউ আছড়ে পড়ছে পাড়ে পায়ের জুতো খুলে, প্যান্টটাকে যতটুকু সম্ভব গুটিয়ে ছোট বড় পাথরের ফাঁক গলে নেমে পড়লাম জলে এত ঠাণ্ডা জল ভাবতেও পারিনি তীব্র গরমে নাজেহাল অবস্থা যেন নিমেষে দূর হয়ে গেল প্রাণ ভরে হাতে পায়ে মুখে মাথায় গণ্ডুষ গণ্ডুষ জল বুলিয়ে শান্ত হলো দেহ মন আমাকে দেখে এগিয়ে এলো মেয়েও সেও আমারই মতো জলপাগল দুজনে হাত ধরাধরি করে ছবি উঠলাম নদী মায়ের সাথে ওপারে তাকিয়ে দেখা গেলো কিছু ভূটানি লোক নদীর দিক থেকে ফিরে যাচ্ছে নিজেদের এলাকায়
এবার ফেরত যাত্রা খানিকটা পথ এসেই জীপ মোড় নিল বাঁদিকে অন্য রাস্তায় আগেই শুনেছি এ রাস্তা নাকি সুগভীর অরণ্যমণ্ডিত সত্যিই তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা গভীর বনানীতে প্রবেশ করলাম একের পর এক নাম না জানা অসংখ্য সব গাছগাছালি কিছু পরিচিতরাও আছেন সসম্মানে গামারি, শিমূলের পাশাপাশি চালতে, টগর, সীতা আর মাঝে মাঝেই ঘন শন, কাশ, বেরেঙ্গার সহাবস্থান তবে নাম না জানা গুল্ম থেকে বৃক্ষেরই অবস্থান বেশি এ যেন বিভুতিভূষণের সেই আরণ্যক যা আমাকে পাগল করে দিয়েছিল প্রথম পঠনে দিনেই যেখানে এত গভীর নীরবতা সেখানে রাতের আঁধারে কী হতে পারে পরিবেশ - ভেবেই গা ছমছম করছিল মাঝে মাঝেই গভীর অরণ্য থেকে ভেসে আসে বিচিত্র সব শব্দ কিছু পশু পাখির হয়তো বা, কিছু অরণ্যের একেবারেই নিজস্ব কিছু রঙ বেরঙের পাখি উড়ে যায় এদিক ওদিক এগোচ্ছি আর তাকাচ্ছি জঙ্গলের ভিতরে যতটা দেখা যায় সুপ্ত ইচ্ছে যদি তেনাদের দেখা মেলে এগোতে এগোতে অনেকটাই পথ পেরিয়ে এসেছি, এমন সময় আবার সামনে আরেকটি হাতির দল দেখে থমকে পড়ে জীপ আবার প্রতীক্ষার পালা এবারেও প্রায় মিনিট দশেক মাঝে মাঝে বাচ্চাটিকে আগলে রেখে তাকাতে থাকে আমাদের গাড়িটির দিকে আর প্রাণ আমাদের আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হয়ে ওঠে যদি আক্রমণ করে তাহলে এতগুলো বাচ্চা আর মেয়েলোকদের রক্ষা করবো কী করে ভেবে শেষ পর্যন্ত তেনারাও ঢুকে গেলেন গভীর বনানীতে এগোতে থাকলো গাড়ি আমরা নিজেদের মধ্যে খোশ গল্পে মগ্ন হঠাৎ করে এক তীব্র গন্ধ এলো নাকে মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল এ তো চিড়িয়াখানার সেই পরিচিত গন্ধ কথাটা বলতেই লুফে নিল সঙ্গে থাকা আরোও কয়েকজন ড্রাইভারও দেখলাম বাড়িয়ে দিল গাড়ির গতি বুঝতে বাকি রইল না ধারে কাছে কোথাও লুকিয়েছিলেন বনসম্রাট চোরা আনন্দ আর ভীতির সহাবস্থান কেমন হয় জীবনে প্রথমবারের মতো তা অনুভূত হলো
এরপর অনেকটা পথ পেরিয়ে আসতেই চোখে পড়লো একপাল মিথুনের আপন খেয়ালে বনানীসংলগ্ন ঘাস খেয়ে পেটপূজা সারছে এক মনে ইতিমধ্যে আমাদের পথও প্রায় শেষ হয়ে আসছে মনও ভরে উঠেছে প্রায় ষোলোআনা নাকে এলো অতীব এক সুগন্ধ বুনোফুলের এমন মনমাতানো গন্ধের কথা এতদিন শুধু গল্প উপন্যাসেই পড়েছি আজ মন প্রাণ ভরে উঠলো সেই অত্যাশ্চর্য আকুল গন্ধে কেমন যেন এক মন আনচান বিহ্বলতা সে বলে বা লিখে বুঝানোর নয়
ইতিমধ্যে পেটে শুরু হয়েছে ইঁদুর দৌড় আমরাও ততক্ষণে পৌঁছে গেছি পিক আপ পয়েণ্টে গাড়ি থেকে নেমেই হোটেলে সরাসরি ঢুকে পড়লাম ডাল ভাত আর সঙ্গে নদীর তাজা সুস্বাদু বরিয়লা মাছ ভাজা অমৃত যেন, আহা বাচ্চারা মুরগির মাংসও খেলো এলাকাটি বড়োল্যাণ্ডে পড়ে বলে জানা গেল বড়ো ভাষী দোকান মালকিন যদিও আমাদের সঙ্গে বাংলাতেই কথা বলছিলেন মৃদু ও মিষ্টভাষী মহিলা ইতিমধ্যে আঁধারও ঘনিয়ে আসছে তাই আর দেরি না করে ফেরত যাত্রায় উঠে পড়া গেলো নিজেদের গাড়িতে
বহুদিনের লালিত স্বপ্ন পুরণের ছবি গেঁথে রইল মনের অন্দরমহলে সযত্নে সাথে জঙ্গল মহলের দেখা ও না দেখা অধিবাসীদের কথা - হাতি, বাঘ, ময়ূর, প্রজাপতি, পিঁপড়ে, মিথুন, পাখি আর সাথে মনমাতানো বনানী, ফুল আর টইটম্বুর পাহাড়ি নদীর নিভৃত তবু গর্বিত বয়ে চলা

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...

মহানিষ্ক্ৰমণ

প্রায় চল্লিশ বছর আগে গ্রামের সেই মায়াময় বাড়িটি ছেড়ে আসতে বেজায় কষ্ট পেয়েছিলেন মা ও বাবা। স্পষ্ট মনে আছে অর্ঘ্যর, এক অব্যক্ত অসহায় বেদনার ছাপ ছিল তাঁদের চোখেমুখে। চোখের কোণে টলটল করছিল অশ্রু হয়ে জমে থাকা যাবতীয় সুখ দুঃখের ইতিকথা। জীবনে চলার পথে গড়ে নিতে হয় অনেক কিছু, আবার ছেড়েও যেতে হয় একদিন। এই কঠোর বাস্তব সেদিন প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করতে পেরেছিল অর্ঘ্যও। সিক্ত হয়ে উঠছিল তার চোখও। জন্ম থেকে এখানেই যে তার বেড়ে ওঠা। খেলাধুলা, পড়াশোনা সব তো এখানেই। দাদাদের বাইরে চলে যাওয়ার পর বারান্দাসংলগ্ন বাঁশের বেড়াযুক্ত কোঠাটিও একদিন তার একান্ত ব্যক্তিগত কক্ষ হয়ে উঠেছিল। শেষ কৈশোরে এই কোঠাতে বসেই তার শরীরচর্চা আর দেহজুড়ে বেড়ে-ওঠা লক্ষণের অবাক পর্যবেক্ষণ। আবার এখানে বসেই নিমগ্ন পড়াশোনার ফসল ম্যাট্রিকে এক চোখধাঁধানো ফলাফল। এরপর একদিন পড়াশোনার পাট চুকিয়ে উচ্চ পদে চাকরি পেয়ে দাদাদের মতোই বাইরে বেরিয়ে যায় অর্ঘ্য, স্বাভাবিক নিয়মে। ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে যায় দিদিরও। সন্তানরা যখন বড় হয়ে বাইরে চলে যায় ততদিনে বয়সের ভারে ন্যুব্জ বাবা মায়ের পক্ষে আর ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বহু জল্পনা কল্পনার শেষে ত...