Skip to main content

গল্পে উন্মোচিত পরিচিত প্রান্তিকতা ‘প্রান্তজন কথা’


এটি তাঁর অষ্টম গ্রন্থ। গল্পকার মিথিলেশ ভট্টাচার্য। অবিভক্ত বাংলার, বিশেষ করে বর্তমান ঈশান বাংলার একমেবাদ্বিতীয়ম সফল ও ধারাবাহিক উৎকর্ষের গল্পকার মিথিলেশ। ৮০ পৃষ্ঠার আলোচ্য গ্রন্থ ‘প্রান্তজন কথা’য় সন্নিবিষ্ট হয়েছে মোট দশটি গল্প। সমাজে খেটে খাওয়া শ্রেণির নিখাদ গরিব মানুষজনদের নিয়ে লেখা টানাপোড়েন আর কষ্টকর জীবন নির্বাহের গল্প। তথাকথিত এলিট কিংবা মধ্যবিত্তরাই যেখানে সমাজের অধিকাংশ ভাগীদার সেখানে এই সব প্রান্তিক মানুষ বা প্রান্তজনদের কথা ক’জনের আর ভাবার সময় কিংবা অবকাশ আছে ? এদের নিয়েই দশটি গল্প, যার রচনাকাল বিগত চল্লিশ বছর আগে থেকে শুরু করে ২০২২ অবধি। ‘বই সম্পর্কে কিছু কথা’ শিরোনামে ভূমিকায় গল্পকার লিখছেন - ‘... গল্পের চরিত্রেরা তৃণমূল স্তরের। ... লেখাজোকার শুরুতেই ওদের ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ জীবনধারা আমাকে এক গভীর আকর্ষণে টানত... অনেক গল্প লিখেছি এবং এখনও লিখছি ওই সর্বহারা মানুষ-মানুষীদের জীবন জীবিকা নিয়ে। ... এই সংকলনে যেসব মানুষ-মানুষীদের নিয়ে গল্প লিখেছি ওদের সকলের সঙ্গে আমার শুধু ওঠাবসাই ছিল না, ওদের কেউ আমার ছোটভাই, তো কেউ আমার ভাইফোঁটা দেওয়া বোন, আবার কেউ আমার রূপগুণমুগ্ধ প্রেমিকাও হয়ে উঠেছিল...।’
স্বভাবতই সেইসব প্রান্তজনদের নিয়েই গড়ে উঠেছে একের পর এক গল্প। কেমন তারা ? একটু আভাস দেওয়া যাক - ‘শালিক-চড়ুয়ের মতো পলকা পা ফেলে পথের গাদা গাদা ধুলাবালির উপর হাঁটছিল নকুল বা নকলা। কালোকুলো বেঁটে একহারা চেহারা। বয়স আন্দাজ চল্লিশের নিচে। গায়ে হাফহাতা রং চটে যাওয়া নীল শার্ট। পরনে ঢলঢল আধময়লা সাদা ব্যাগি প্যান্ট...।’ (গল্প - নকুল বা নকলা বৃত্তান্ত), ‘জামালের বাচ্চাগুলো আগাছার মতো বাড়ছে। বছর বছর বাচ্চা বিয়োয় জামালেরা। দারিদ্রের অতলে ডুবে থাকে। দুবেলা দুমুঠোর জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি ওদের, বড্ড কাঙালপনা। রোগে-শোকে ওষুধ পায় না, পথ্য জোটে না...।’ (গল্প - দ্বৈতসংগীত)। পথে ঘাটে আকছার দেখা পাওয়া চরিত্র এরা। শুরুর পর্যায়ে আপাত পঠনে পাঠকের মনে হতে পারে যে এখানে আর গল্প কোথায়, এ তো ‘দিন আনি দিন খাই’দের নিত্যদিনের কড়চা কিন্তু একবার পড়া শুরু হলে গল্প শেষ না করে বই রেখে উঠতে পারবেন না পাঠক। এমনই তার বাঁধন, বুনোট আর বাস্তবের ভেতর লুকিয়ে থাকা অনাস্বাদিত গল্পসমূহ।
প্রথম গল্প ‘কৈলাসচরিত’ একটি বড়গল্প। গরিবের পেটের দায় আর জৈবিক চাহিদার ককটেল জীবনচর্চার গল্প। এসেছে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন সামাজিক ও অসামাজিক কার্যকলাপের চিত্র। চিত্রকল্পে অসাধারণ নৈপুণ্যে পরিবেশিত হয়েছে কিছু কথা - বিত্তবানদের অনৈতিক কার্যকলাপ, জঙ্গি তৎপরতার স্বরূপ আর অন্তর্নিহিত জৈবিক যাপনের পরিমিত উল্লেখ - যা সব কিছুই এসেছে গল্পেরই খাতিরে, চূড়ান্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে। এক পূর্ণবৃত্তান্তের গল্প।
দ্বিতীয় গল্প ‘দ্বৈতসংগীত’। দুস্থ, হাভাতেদের রাজরোগে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে থাকার বিড়ম্বনার মর্মস্পর্শী গল্প। ‘লুটের ভাগ’ গল্পে একই সাথে লেখক উন্মোচিত করেছেন মানুষের নৈতিকতার স্খলন, অপরাধপ্রবণতা ও স্বার্থপর জীবনযাপনের বাস্তব চিত্র। চতুর্থ গল্প ‘উপর নিচ’ সেইসব নিরন্তর ভাতশিকারিদের গল্প - ‘... ওদের চিরসঙ্গী তো গরিবি, অভাব অনটন। খিদে-তৃষ্ণা নিবারণ ভিন্ন অন্য কিছু বিষয়ে ওদের আগ্রহ-কৌতূহল আছে বলে বোধ হয় না। থাকবেই বা কেমন করে। ওরা নিরন্তর যুদ্ধ করছে ভাতের জন্যে, পেটপুরে খেতে পাচ্ছে না, উদোম শরীরে কাপড় জুটছে না, অসুখ-বিসুখে ওষুধ পাচ্ছে না, মৃত্যুর হিমশীতল ঘেরাটোপে ওদের অসীম দারিদ্রলাঞ্ছিত জীবন সর্বদা বন্দি।’ - দারিদ্রের এক অসামান্য বর্ণনা। পরবর্তী গল্প ‘ফোয়ারা’। এখানে এক ভিন্নতর লিখনশৈলী প্রত্যক্ষ করা যায়। আপাত অর্থে এক চলমান ঘটনাপ্রবাহের চমৎকার বর্ণনার মধ্যে অনুচ্চারিত হয়ে সমান্তরালভাবে এগোয় এক অন্যতর কাহিনি, এক ভিন্নতর বোধ, বেদনাবোধ। এক দিন মজুরের অন্তর-কথা ‘নকুল বা নকলা বৃত্তান্ত’। ‘বিরজু বাউরির দিনকাল’ গল্পে প্রত্যক্ষ করা যায় গরিবির এক ভয়ানক রূপ। অনটন এমন এক বালাই যা জন্মদাতার অন্তরে সন্তানকে বিক্রি করে দেওয়ার মতো ভাবনারও জন্ম দেয়। এই গল্প এবং ভিন্ন আবহে পরবর্তী গল্প ‘এক টাকার গল্প’ এমনই এক নিদারুণ বয়ানের গল্প, জীবনকে টেনে নিয়ে যাওয়ার গল্প।
কাজের মেয়ে জ্যোৎস্নার দ্বৈত জীবনযাপনের এক নিখুঁত বুনোটসমৃদ্ধ গল্প ‘জোছনা কেমন ফুটেছে’। এক পঠনে অবশ্য-পাঠ্য এক গল্প। শেষ গল্প - ‘জীবন চক্র’। সরকারি সুযোগ সুবিধা প্রাপ্ত গরিবদের উপর রক্তচোষা মধ্যভোগী মানুষের সুযোগসন্ধানী চরিত্রের স্বরূপ উদঘাটন হয়েছে এই গল্পে। গল্পের চলন এতটাই পোক্ত যে পাঠকের আর সরে আসার সুযোগ নেই শেষ অবধি না পৌঁছে।
বস্তুত এখানেই মিথিলেশের গল্পের সবচাইতে বেশি দক্ষতা। সাধারণ পথচলতি মানুষের, সাধারণ পাঠকের চিন্তাসূত্রকে অনুধাবন করে কাঙ্ক্ষিত শব্দ ও স্বকীয় ভাষার উপস্থাপনায় গল্পসমূহকে তিনি সরাসরি পৌঁছে দেন পাঠকের হৃদমহলে। তার উপর রয়েছে এক নিজস্ব বয়ান-শৈলী যার মাধ্যমে তিনি পাঠকপ্রিয় এক সার্থক গল্পকার। আভরণের আতিশয্যবিহীন আটপৌরে চরিত্র আর নিত্যদিনের সংলাপসমৃদ্ধ তাঁর গল্প তাই পাঠক সমাজে বহু দশক থেকেই সমভাবে সমাদৃত।
ব্যতিক্রম নয় আলোচ্য গ্রন্থটিও। আগরতলার সৈকত প্রকাশন থেকে প্রকাশিত গ্রন্থটির প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে তপস্বিনী দে। লেখক গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন ‘অগণিত শ্রমজীবী মানুষের করকমলে’। ছাপা, বাঁধাই, অক্ষর বিন্যাস আদি যথাযথ। আধুনিক বানান অনুসৃত হয়েছে যথার্থ রূপে, কিছু আঞ্চলিক শব্দও গল্পকার প্রয়োগ করেছেন পরিমিত রূপে, কাহিনিরই প্রয়োজনে। অক্ষর-আকার অর্থাৎ ফন্ট সাইজ আরোও একটু বড় হলে অধিকতর পঠনবান্ধব হয়ে উঠত নিঃসন্দেহে। এবং আরোও কিছু গল্প থাকলে......।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

মূল্য - ২০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৮৫৯৯৫১২৩৩ 

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...