Skip to main content

করুণ সত্যের বিরুদ্ধে সাহসী উচ্চারণ



‘বৃষ্টিকথা বরাকের গল্প সংকলন’ গ্রন্থে এই শিরোনামে একটি গল্প আছে। উত্তরপূর্বের গল্পবিশ্বে আদিমা মজুমদার এক সার্থক গল্পকার। গল্প তো নয় - যেন অনিয়ম, অনাচার, অত্যাচার, ধর্মীয় ও সামাজিক গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এক নিরন্তর সংগ্রাম কথা। তো যে কথাটি হচ্ছিল, সেই গল্পটিকেও অন্তর্ভুক্ত করে এবং সেই গল্পের শিরোনামকেই গ্রন্থনাম হিসেবে নিয়ে সদ্য প্রকাশিত হয়েছে আদিমার চতুর্থ গল্প সংকলন - ‘রুম নম্বর ১১৪’। তাঁর সার্বিক ষষ্ঠ গ্রন্থ। হয়তো গল্পকারের কোনও নস্টালজিয়া থেকে এই গ্রন্থনাম। নচেৎ অন্য গল্পের নামানুসারে ‘পাখিদের ওড়ার গল্প’ কিংবা ‘উইপোকার ঘরবাড়ি’ও হতে পারত, বা অন্য কোনও শিরোনাম। 
মোট উনিশটি গল্প সন্নিবিষ্ট হয়েছে আলোচ্য এই গ্রন্থটিতে। শুভঙ্কর চন্দের ভূমিকায় আমরা পেয়ে যাই গ্রন্থের অভ্যন্তরে থাকা গল্পসমূহের অনেকটাই পরিচয় - ‘... কোনো সহায়তা প্রত্যাশায় উত্তোলিত হাত বা রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনের আহ্বান বরাবরই আদিমার বন্ধু-হাত খুঁজে পায়। তাঁর নিজের ঘরে-বাইরের এইসব জলকাদা ঘেঁটেই এই বইতে, নার্স প্রশিক্ষণার্থী এবং পেশাদার নার্সের জীবন-মরণোত্তর দেহদান, অ্যালঝাইমার্, লিভ-ইন, লেসবিয়ান সম্পর্ক, সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা, ফেলে আসা গ্রাম জীবন ফিরে পাওয়ার ব্যাকুলতা... এইসব তো বটেই, আরো বিভিন্ন বিষয়ের গল্প বলেছেন তিনি। এক কথায় জীবনের যত রৌদ্রছায়ায় তিনি হেঁটে গেছেন, সেগুলোর প্রতিটির সাথেই তাঁর নাড়ির টান। ...... নিজের চারপাশ থেকে নিজেকে মনে মনে মুক্ত করে নিয়ে, সেই চারপাশটার কাছে পুনরায় ফিরে আসাই সাহিত্যিকের কাছে চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। আদিমা সেই প্রত্যাহ্বানের মোকাবিলাতে কয়েক দশক হল উত্তীর্ণদের প্রখর তালিকায় তো বটেই, বিশেষত তাঁর জীবন প্রবাহিত হয়েছে যে মুসলমান ঘরগেরস্থালিতে, তার নারী কাহিনিকার হিসেবে তিনি তন্নিষ্ঠ ও অদ্বিতীয়...।’
এবং একেবারেই উপরিউক্ত ভাষ্যের সাথে সঙ্গতি রেখে এবারেও আদিমার গল্প এগিয়েছে এক বিশেষ ধারায়, নতুন ভাবনাচিন্তার খোলাখুলি সমর্থনে, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদের অস্ত্র হাতে নিয়ে। গল্পের ভিতর লুকিয়ে থাকা এক একটি উক্তি যেন শানিত তরবারির কোপ, করুণ সত্যের বিরুদ্ধে সাহসী উচ্চারণ। ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে প্রকাশ করেছেন খোলাখুলি প্রতিবাদ, সেখানে নিজের ধর্মকেও ছাড় দেননি গল্পকার। গল্পগুলোর ভেতর লুকিয়ে থাকা সেইসব উদ্ধৃতি পাঠকের বোধের উপর প্রভাব ফেলে নিশ্চিত। কিছু উল্লেখ করা যেতেই পারে - ‘সুখ মানেই তো দুঃখের সাথে লড়াই করা’, ‘বিয়ে - পিতৃতন্ত্রের ধারক বাহক’, ‘বিবাহ একটা দাস প্রথা। ম্যারেজ ইজ অ্যা লিগ্যালাইজড প্রস্টিটিউশন... যৌন বিনোদন অত্যন্ত গভীর, দারুণ আনন্দদায়ক বিনোদন। অন্য সব বিনোদনের সাথে যৌন বিনোদনও সমাজের উৎপাদন কাঠামোকে সচল রাখার জন্য প্রয়োজন’, ‘বরাকের তীরে ভাষা শুধু শখ নয়, যুদ্ধের আরেক নাম’, ‘অন্ধবিশ্বাস জনিত কুসংস্কার সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে... আমাদের সমাজের অনেক মানুষ এখনও তাবিজ কবজে বিশ্বাস রাখে। শিক্ষিত আর অশিক্ষিত সব একাকার’, ‘বাঙালিরা যেখানে জড়ো হয় গল্পের আসর জমে ওঠে। রসিক বাঙালি। শুধু ভোট দিয়ে যোগ্য প্রার্থী বির্বাচন করতে পারে না। এই যা দোষ’, ‘দোওয়ার সময় হাউ হাউ করে মা কাঁদতেন। শালার আল্লাহও মায়ের সাথে না-ইনসাফি করল’, ‘মসজিদের মোল্লাদের সাথে বড় দুর্ব্যবহার করেন গ্রামের মানুষ। শান্তি নেই তাদের। বলি, এত কঠিন আরবি পড় কেন রে, অন্য দেশের ভাষা। নিজের ভাষা বাংলায় ম্যাট্রিক পাশ করলে তো সিকিউরিটি করতে পারতে’, ‘পুরুষের আধিপত্যবাদ যদি না থাকত তবে সংসার নামক চিত্রটা অন্যরকম হতো’ ইত্যাদি।
এইসব ধারাবাহিক আঘাতের পাশাপাশি আবার কিছু পরস্পরবিরোধী মন্তব্য, কিছু রাজনৈতিক বিরোধিতা, কিছু কল্পকথাও যে আসেনি তা নয়। এসেছে কিছু অপ্রাসঙ্গিক বাক্য কিংবা প্যারাগ্রাফ। যেমন প্রথম গল্পের প্রথম প্যারাটিকেই গল্পের বিষয়বস্তুর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয় না।  
এতটুকুর পর আলাদা করে আর প্রতিটি গল্পের উল্লেখ আর আবশ্যক বলে বোধ হয় না। প্রতিটি গল্পেই গল্পকার পাঠককে দেখাতে চেয়েছেন এক উত্তরণের স্বপ্ন। তবে স্বপ্নে যেমন বাস্তব থাকে তেমনি হয়তো অজান্তেই ঢুকে পড়ে কিছু কল্পনাও। কিছু গল্প যেন অন্যতর পঠনসুখের আবেশ ছড়ায় পাঠে, ভাবতে শেখায় নতুন করে। যেমন - অ্যালঝাইমার্স, আশ্রয়, রুম নম্বর ১১৪, জনতা কার্ফু, পাখিদের ওড়ার গল্প, উইপোকার ঘরবাড়ি, নিকাহ ইত্যাদি। 
গল্পের বিষয়বস্তুই শেষ কথা নয় এই কথাটি আদিমার মতো গল্পকার ভালো করেই জানেন। এর আগেও চমৎকার বুনোট আর ভাষার কারুকার্য সম্বলিত একাধিক গল্প পেয়ে এসেছেন পাঠকরা। এবারের সংকলন কিন্তু কিছুটা হলেও সরে এসেছে সেই ধারা থেকে। আলোচ্য গ্রন্থে বিষয়ের উপর অধিক মনোনিবেশ করতে গিয়ে এইসব নান্দনিকতার দিকটি হয়তো গল্পকারের অজান্তেই থেকে গেছে অবহেলিত। এমনকি দু’একটি গল্পে সংলাপের ভাষাও হঠাৎ করেই বদলে গেছে। বিপরীতে দু’একটি গল্পে ফিরেও এসেছে সেইসব নান্দনিকতা ও মাধুর্যের একটুখানি ছোঁয়া। 
সব মিলিয়ে এক আদিমা-সুলভ সংকলন আলোচ্য গ্রন্থটি। ছাপার মান, কাগজ মাঝারি মানের। বানানের শুদ্ধতা প্রায় পুরোপুরি রক্ষিত হলেও থেকে গেছে কিছু মুদ্রণ প্রমাদ। পেপারব্যাক সংকলনটিতে সিপ্রা দত্তচৌধুরীর প্রচ্ছদ কিছুটা প্রাসঙ্গিক হলেও ছবির আধিক্য অনুভূত হয়েছে। কথা বিকল্প পরিবার, শিলচর থেকে প্রকাশিত ৯১ পৃষ্ঠার এই ব্যতিক্রমী গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘কথাপ্রান্তিক বিজয়া করকে’। ব্যতিক্রমী এজন্যই কারণ অন্যরা যেখানে লিখতেন - ‘... তারপর বরাক নদী দিয়ে বয়ে গেছে কত জল...’, সেখানে আদিমা লেখেন - ‘... তারপর রাঙ্গিরখাল দিয়ে কতশত নোংরা প্লাস্টিক বয়ে যায়...’ জাতীয় চমকপ্রদ বাক্য। এখানেই আদিমা ব্যতিক্রমী, এখানেই সংকলনটির সাফল্য। 
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী। 
মূল্য - ১০০ টাকা
যোগাযোগ - ৭০০২৭২৩৪৯৬

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...

মহানিষ্ক্ৰমণ

প্রায় চল্লিশ বছর আগে গ্রামের সেই মায়াময় বাড়িটি ছেড়ে আসতে বেজায় কষ্ট পেয়েছিলেন মা ও বাবা। স্পষ্ট মনে আছে অর্ঘ্যর, এক অব্যক্ত অসহায় বেদনার ছাপ ছিল তাঁদের চোখেমুখে। চোখের কোণে টলটল করছিল অশ্রু হয়ে জমে থাকা যাবতীয় সুখ দুঃখের ইতিকথা। জীবনে চলার পথে গড়ে নিতে হয় অনেক কিছু, আবার ছেড়েও যেতে হয় একদিন। এই কঠোর বাস্তব সেদিন প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করতে পেরেছিল অর্ঘ্যও। সিক্ত হয়ে উঠছিল তার চোখও। জন্ম থেকে এখানেই যে তার বেড়ে ওঠা। খেলাধুলা, পড়াশোনা সব তো এখানেই। দাদাদের বাইরে চলে যাওয়ার পর বারান্দাসংলগ্ন বাঁশের বেড়াযুক্ত কোঠাটিও একদিন তার একান্ত ব্যক্তিগত কক্ষ হয়ে উঠেছিল। শেষ কৈশোরে এই কোঠাতে বসেই তার শরীরচর্চা আর দেহজুড়ে বেড়ে-ওঠা লক্ষণের অবাক পর্যবেক্ষণ। আবার এখানে বসেই নিমগ্ন পড়াশোনার ফসল ম্যাট্রিকে এক চোখধাঁধানো ফলাফল। এরপর একদিন পড়াশোনার পাট চুকিয়ে উচ্চ পদে চাকরি পেয়ে দাদাদের মতোই বাইরে বেরিয়ে যায় অর্ঘ্য, স্বাভাবিক নিয়মে। ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে যায় দিদিরও। সন্তানরা যখন বড় হয়ে বাইরে চলে যায় ততদিনে বয়সের ভারে ন্যুব্জ বাবা মায়ের পক্ষে আর ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বহু জল্পনা কল্পনার শেষে ত...