Skip to main content

মানবিক মূল্যবোধের সুবিন্যস্ত গল্প সংকলন - ‘বাড়িয়ে দাও তোমার হাত’


উত্তর পূর্বের গল্পবিশ্বে পরিতোষ তালুকদার এক বহু পরিচিত নাম। তাঁর দু’টি গল্পগ্রন্থ সর্বশেষ প্রকাশিত হয়েছে একই সাথে। আগস্ট ২০১৮ তে। এর পর কোনও এক অজানা কারণে থেমে রয়েছে নিয়মিত গল্পগ্রন্থ প্রকাশের পালা। সেই দু’টি গ্রন্থের মধ্যে একটি ‘বাড়িয়ে দাও তোমার হাত’। সমকালীন পরিমণ্ডলে সম্পর্কের জটিল রসায়নের যুগে পারস্পরিক ধ্যান ধারণা, সৌহার্দ, সহযোগিতার বিচিত্র উপস্থাপনা এই গ্রন্থটি।
পরিতোষের গল্পের ধাঁচ খুবই সরল সোজা যেখানে নেই কোনও অতিকথন। ঘটনা পরম্পরার বাইরে কোনও বর্ণনা খুঁজলে পাওয়া যাবে না তাঁর গল্পে। প্রকৃতির বর্ণনা হোক কিংবা অপ্রয়োজনীয় শাখা প্রশাখার বিস্তারের মাধ্যমে বহিরঙ্গকে অন্তরঙ্গে জুড়ে দেওয়ার নেই কোনও অবাঞ্ছনীয় প্রচেষ্টা। অথচ গল্পের প্রতিটি ঘটনারাজির ঠিক যতটা দরকার ততটাই কিন্তু রয়ে থাকে প্রাসঙ্গিক হয়ে। মজবুত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত গল্পগুলোতে কোথাও খামতি নেই অনুষঙ্গের। এখানেই তাঁর গল্পের বিশেষত্ব।
আলোচ্য গ্রন্থটিতে রয়েছে মোট ৯ টি গল্প। প্রতিটি গল্পই উত্তর পূর্ব - বিশেষ করে গুয়াহাটি শহরের প্রেক্ষাপটে লিখা। নিত্যদিনের বাঞ্ছিত-অবাঞ্ছিত ঘটনাসমূহের ভিতরের কথা এক একটি গল্প। সাধারণ্যে যা নিতান্তই একটি ভুলে যাওয়ার মতো ঘটনা সেখানেই গল্পকারের অন্তর্বিশ্লেষণ। মানবিক মূল্যবোধ, মানবীয় আচার আচরণের গভীর পর্যবেক্ষণজনিত প্রকাশ। ‘পূর্বাভাষ’ শিরোনামে গল্পকার লিখছেন - ... ‘কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছে না। সহনশীলতা কমে আসছে। ... পারস্পরিক সম্পর্ক বা সামাজিক সম্বন্ধ সম্পর্কহীন হয়ে চলেছে। ... মানুষ মানুষের জন্য এ কথা আজ বড়ো বেমানান লাগে। তবু মানুষ স্বপ্ন দেখে। হাত বাড়িয়ে ধরতে চায় অন্য এক জীবনকে...।’ সেই আবহে ফুটপাথ থেকে ফ্ল্যাট কালচারের অন্তর্নিহিত বোধবুদ্ধির সবাক, সচিত্র স্ন্যাপশট এ গ্রন্থের এক একটি গল্প।
প্রথম গল্প - মাথার ওপরে ছাদ। ভালোবাসার সম্পর্ক ও জাগতিক সম্পর্কের তুলনাত্মক এক চমৎকার বিশ্লেষণ। ভালোবাসা শব্দটির অন্তর্নিহিত যাথার্থ্যও পরিস্ফুট হয়েছে সাবলীল ধারায়। গল্প এগোয় নিরবচ্ছিন্ন ভাবে। তবে গল্পের প্রেক্ষাপট যেখানে গুয়াহাটি শহরের আজারা, বিমানবন্দর পথ সেখানে শেষ পর্বে ‘আপনি তো উজান বাজার থাকেন’ সংলাপটি রহস্যাবৃত হয়ে রইল।
দ্বিতীয় গল্প - মায়ের দেখা। এক অসহায় পিতা ও পারিবারিক সংস্কারচ্যুত কন্যার বিষাদমণ্ডিত কাহিনি। কন্যার প্রতি পিতৃহৃদয়ের আকুলতাকে কেন্দ্র করে কাহিনির এক চমকপ্রদ বিন্যাস। ধাপে ধাপে জমে ওঠে গল্প - অসাধারণ বুনোটে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শেষটায় কন্যার দেখা পেলেন পিতা হরিসাধন - কিন্তু কেমন ছিল সেই প্রেক্ষাপট, সেই কন্যা ?
পরের গল্প - তাতল সৈকত বারি বিন্দু সম। অবদমিত সন্তানসুখের এক ব্যতিক্রমী বাখান। ‘আমার পরান যাহা চায়’ গল্পটিতে ফুটে উঠেছে প্রাত্যহিক সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়ার প্রতিচ্ছবি।
‘হাসপাতাল’ গল্পটি নিদারুণ এক কঠোর বাস্তবের কাহিনি। ... ‘সরকারি হাসপাতালে ঘুঘুর বাসা বেঁধেছে। সব কিছুতেই কমিশন চাই’। এক দিকে সরকারি হাসপাতালের ভেতরকার এক কদর্য রূপ আর অন্য দিকে পিতা পুত্রের মানবিক মূল্যবোধ জনিত সম্পর্কের টানাপোড়েনের এক মর্মান্তিক উপস্থাপনা। উন্মোচিত হয় গভীর আত্মীয়তার সন্ধান। এই গল্পে বেশ কিছু বানান ভুল রয়ে গেছে। এছাড়াও এক জায়গায় সুবীর-এর জায়গায় সনাতন নামটি এসে পড়ায় সাময়িক ব্যাঘাত জন্মায় সরল পঠনে।
এর পরের গল্প - যাপন চিত্র। আজকের স্বামী স্ত্রীর পারস্পরিক ভাবনার জগতের এক নিটোল রসসিক্ত গল্প। ... ‘পুরুষ মানুষ সুন্দরী দেখলেই গলে যায় চট করে। যেন মিছরির দানা। জলে দেবার সঙ্গে সঙ্গে নিজ-অস্তিত্বের সংকট। বয়স্ক পুরুষরা একটু হ্যাংলা প্রকৃতির হয়। নিজের বউ ছাড়া অন্য যে কোনো শাড়ি জড়ানো শরীর দেখলেই ছুক-ছুক করে’। রূপকে, ভাষা-চাতুর্যে এক জমজমাট গল্প।
‘পায়ের তলার জমি’ গল্পটি আজকের বাস্তব পরিস্থিতি এবং শহুরে জীবন ধারণের এক করুণ সংগ্রামের কাহিনি। যেখানে শিক্ষিত বেকার যুবকরা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এক টুকরো জমি খুঁজে পায় না সেখানে চাতুর্যের সাহায্যে কেউ কেউ শক্ত জমির খোঁজও পেয়ে যায়। গল্পটিতে কিছু অসমিয়া ভাষার স্থানীয় শব্দ - যেমন দলং, পদুলি ইত্যাদি এসে জায়গা করে নিয়েছে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে।
আদর্শের মৃত্যু নেই - তা সে যতই প্রতিবন্ধকতা আসুক। এমনই এক সিদ্ধান্তের মূল্যায়নের গল্প ‘মৃত্যু নেই ধরণীর’। শেষ গল্প ‘ভুখ’। পাঠশেষে পাঠকের অধিক গল্প পাঠের ভুখ চনমনিয়ে ওঠে। গল্পে সমাজের দুই বিপরীত বাসিন্দা - অসহায় গরিব ও ধনীদের মানসিকতার অসাধারণ চুলচেরা বিশ্লেষণ। যেখানে জীবন যাপনই বড় কথা সেখানে মৃত্যুরও কোনো দাম নেই। এ গল্পের বেশ কিছু বানান ই-কার ও ঈ-কার জনিত দোষে দুষ্ট। 
শহরের নিত্য নৈমিত্তিক ব্যস্ততা, যানজটের বাইরে বেরিয়ে খণ্ডিত জীবনের যাপন কথা, আশা নিরাশার অন্দরে লুক্কায়িত আপাত অদৃশ্য সব চিন্তাধারাকে এভাবে দৃশ্যমান করে তোলার মধ্যে গল্পকার পরিতোষ দেখিয়েছেন অনবদ্য দক্ষতা - যা বরাবরই তাঁর লেখায় ফুটে ওঠে গল্পের অবয়বে মূর্ত হয়ে। এ গ্রন্থটিও তার ব্যতিক্রম নয়। মগ্ন পাঠকের কাছে তাঁর গল্পের গ্রহণযোগ্যতা ষোলো আনা। সরল অথচ যথোচিত শব্দের ব্যবহারে, রূপক ও ব্যঞ্জনার সময়োচিত সংস্থাপনে এক একটি আবহ যেন হয়ে উঠেছে জ্বলজ্যান্ত, যথোচিত - 
‘...... তপতী গম্ভীর হয়ে তাকায় মনোময়ের দিকে। সমুদ্রের ঢেউ-এর মতো তার দৃষ্টি ওঠানামা করছে। নীল জল, সাদা ফেনা। আকাশ জলে ডুবে যাচ্ছে। আকাশটা সাদা। সমুদ্রের জল কালো। সমুদ্রের জলে আকাশের প্রতিরূপ। অন্ধকার মুছে আলোর আভাষ। ভাবনাগুলো ফেনার মতো সমুদ্রের ঢেউয়ে খেলা করে। কিন্তু কোনো হিসাব মেলে না। বারে বারে ভুল হয়ে যায়। কে যে অন্তরালে থেকে এমন বিঘ্ন ঘটাচ্ছে বোঝা দায়।’ (গল্প - যাপন চিত্র)।    
বিকাশ প্রকাশন, পাণ্ডু থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি লেখক উৎসর্গ করেছেন তাঁর ‘প্রিয় কবি শ্রী বিকাশ সরকারকে’। প্রচ্ছদ শিল্পীর নাম অনুল্লেখিত। মুদ্রক আলপনা গ্রাফিক্স, লিপি শ্রী দীপক ভদ্র। অক্ষর, শব্দ ও বাক্য বিন্যাস যথাযথ হলেও অক্ষরের ফন্ট সাইজ খানিক বড় হলে ভালো হতো। পেপারব্যাকের দুই মলাটের মধ্যেকার ৮৪ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থের শেষ প্রচ্ছদে আছে গল্পকারের অতি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। সব মিলিয়ে এক সুখপাঠ্য গল্পগ্রন্থ। পাঠ শেষে মনে হয় আরোও কয়েকটি গল্প সন্নিবিষ্ট হতেই পারত।

- বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

 

‘বাড়িয়ে দাও তোমার হাত’
পরিতোষ তালুকদার
মূল্য - ১০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৩৬৫৮২৮৫২২

Comments

  1. 2021 সালে আমার পাচটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আলোর পথিক, আধারের অতিথি, চুরির শব্দ মাখা হাত উপন্যাস। অঞ্জলি লাহিড়ীর ওপর লেখা প্রবন্ধ ও চারধাম যাত্রা প্রবন্ধ।

    ReplyDelete
  2. আপনার এই সাফল্যের ধারা অব্যাহত থাকুক। শুভেচ্ছা রইল।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাংলা গল্প : বিষয়ে বিশ্লেষণে

একক কিংবা যৌথ সম্পাদনায় বিগত কয়েক বছরে উত্তরপূর্বের বাংলা লেখালেখি বিষয়ক একাধিক গ্রন্থ সম্পাদনা করে এই সাহিত্যবিশ্বকে পাঠকের দরবারে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার এক প্রচেষ্টা করে যাচ্ছেন নিবেদিতপ্রাণ তরুণ লেখক ও সম্পাদক নিত্যানন্দ দাস । হালে এপ্রিল ২০২৪ - এ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সম্পাদনা গ্রন্থ ‘ উত্তর - পূর্বাঞ্চলের বাংলা গল্প : বিষয়ে বিশ্লেষণে ’ ( প্রথম খণ্ড ) । প্রকাশক - একুশ শতক , কলকাতা । আলোচ্য গ্রন্থটিতে দুই ছত্রে মোট ২৮ জন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিকের ২৮টি প্রবন্ধ রয়েছে । উপযুক্ত বিষয় ও আলোচকদের নির্বাচন বড় সহজ কথা নয় । এর জন্য প্রাথমিক শর্তই হচ্ছে নিজস্ব জ্ঞানার্জন । কালাবধি এই অঞ্চল থেকে প্রকাশিত উৎকৃষ্ট সাহিত্যকৃতির সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল না হলে তা সম্ভব নয় মোটেও । নিত্যানন্দ নিজেকে নিমগ্ন রেখেছেন গভীর অধ্যয়ন ও আত্মপ্রত্যয়কে সম্বল করে তা বলার অপেক্ষা রাখে না । আলোচ্য গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন প্রতিষ্ঠিত কথাকার রণবীর পুরকায়স্থ । বস্তুত সাত পৃষ্ঠা জোড়া এই ভূমিকা এক পূর্ণাঙ্গ আলোচনা । ভূমিকা পাঠের পর আর আলাদা করে আলোচনার কিছু থাকে না । প্রতিটি নিবন্ধ নিয়ে পরিসরের অভাবে সংক্ষিপ্ত হলেও ...

প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'স্বপ্নতরী'

  স্বপ্নতরী                         বিদ্যুৎ চক্রবর্তী   গ্রন্থ বিপণী প্রকাশনা  বাবা - স্বর্গীয় সুধীর চন্দ্র চক্রবর্তী মা - শ্রীমতী বীণাপাণি চক্রবর্তী               জনম দিয়েছ মোরে এ ভব ধরায় গড়েছ সযতনে শিক্ষায় দীক্ষায় জীবনে কখনো কোথা পাইনি দ্বন্দ্ব দেখিনি হারাতে পূত - আদর্শ ছন্দ বিন্দু বিন্দু করি গড়ি পদ্য সংকলন তোমাদেরই চরণে করি সমর্পণ প্রথম ভাগ ( কবিতা )   স্বপ্নতরী ১ স্বপ্ন - তরী   নিটোল , নিষ্পাপ কচিপাতার মর্মর আর কাঁচা - রোদের আবোল - তাবোল পরিধিস্থ নতুন আমি ।   আনকোরা নতুন ঝরনাবারি নিয়ে এখন নদীর জলও নতুন বয়ে যায় , তাই শেওলা জমে না ।   দুঃখ আমার রয়ে গেছে এবার আসবে স্বপ্ন - তরী চেনা পথ , অচেনা ঠিকানা ।         ২ পাখমারা   সেই উথাল - পাথাল পাখশাট আজও আনে আরণ্যক অনুভূতি । একটু একটু হেঁটে গিয়ে বয়সের ফল্গুধারায় জগৎ নদীর দু ’ পার ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস - সময়ের কাঠগড়াতে আমি বন...

কবির মজলিশ-গাথা

তুষারকান্তি সাহা   জন্ম ১৯৫৭ সাল৷ বাবা প্ৰয়াত নিৰ্মলকান্তি সাহা ও মা অমলা সাহার দ্বিতীয় সন্তান   তুষারকান্তির ৮ বছর বয়সে ছড়া রচনার মাধ্যমে সাহিত্য ভুবনে প্ৰবেশ৷ ‘ ছায়াতরু ’ সাহিত্য পত্ৰিকায় সম্পাদনার হাতেখড়ি হয় কলেজ জীবনে অধ্যয়নকালীন সময়েই৷ পরবৰ্তী জীবনে শিক্ষকতা থেকে সাংবাদিকতা ও লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে গ্ৰহণ করেন৷ প্ৰথম ছড়া প্ৰকাশ পায় সাতের দশকে ‘ শুকতারা ’ য়৷ এরপর ‘ দৈনিক যুগশঙ্খ ’ পত্ৰিকার ‘ সবুজের আসর ’, দৈনিক সময়প্ৰবাহ ও অন্যান্য একাধিক কাগজে চলতে থাকে লেখালেখি৷ নিম্ন অসমের সাপটগ্ৰামে জন্ম হলেও বৰ্তমানে গুয়াহাটির স্থায়ী বাসিন্দা তুষারকান্তির এ যাবৎ প্ৰকাশিত গ্ৰন্থের সংখ্যা ছয়টি৷ এগুলো হচ্ছে নগ্ননিৰ্জন পৃথিবী (দ্বৈত কাব্যগ্ৰন্থ) , ভবঘুরের অ্যালবাম (ব্যক্তিগত গদ্য) , একদা বেত্ৰবতীর তীরে (কাব্যগ্ৰন্থ) , প্ৰেমের গদ্যপদ্য (গল্প সংকলন) , জীবনের আশেপাশে (উপন্যাস) এবং শিশু-কিশোরদের জন্য গল্প সংকলন ‘ গাবুদার কীৰ্তি ’ ৷ এছাড়াও বিভিন্ন পত্ৰপত্ৰিকায় প্ৰকাশিত হয়েছে শিশু কিশোরদের উপযোগী অসংখ্য অগ্ৰন্থিত গল্প৷ রবীন্দ্ৰনাথের বিখ্যাত ছড়া , কবিতা ও একাধিক ছোটগল্প অবলম্বনে লিখেছেন ...