Skip to main content

বই নিয়ে হইচই


হালখাতা উৎসবের দিন গত হয়েছে কবেই বইয়ের ব্যাবসা যাদের, তাদের বাইরে অন্য দোকানদারের সঙ্গে বইয়ের কোনও সম্পর্ক নেই তবে প্রথমোক্তদের সম্পর্কও শুধু বই বিকিকিনির মধ্যেই সীমিত ব্যতিক্রমীদের বাদ দিলে পাতা উলটে দেখার প্রয়োজনীয়তা কিংবা ইচ্ছে কোনটাই নেই বই না হলেও গোটা বছরের জন্য এদের বরাদ্দ আছে এক হালখাতা আজকাল তার যে কোনও দিন শুরু হয় পথ চলা, আবার শেষ পাতায় এসে পৌঁছোয় যে কোনও দিনপয়লা বৈশাখের সেখানে কোনও তাৎপর্য নেই আজকাল। ঘরের অন্দরমহলের কথা ধরলে অ্যাভারেজ ব্যবসায়ী গৃহকর্তার যেখানে এই হাল, গৃহকর্ত্রীদের তখন সারা দিনের সঙ্গী টিভি ও মোবাইল সেখানে হাজারো বিনোদের ঢালাও বন্দোবস্ত এই হাল সবার।
বইয়ের ব্যবসায়ীদের তবে কার সঙ্গে ব্যাবসা ? এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে তার উত্তর মিলবে এপাড়া ওপাড়ার বইয়ের দোকানে গেলে। বই বলতে সেখানে মূলত পাঠ্যপুস্তক। ঠেলার নাম বাবাজি। তবে সেখানেও অনলাইন ক্লাস, অনলাইন গ্রুপ ডিসকাশন জাতীয় বইবিহীন শিক্ষাপদ্ধতির প্রবর্তন হয়েছে এবং রমরমিয়ে চলছেও তবু আজও, তেতো হলেও ছাত্রছাত্রীদের গিলতেই হয় কিছু বই। অ আ ক খ থেকে শুরু করে স্নাতকোত্তর স্তরের শ্রেনিবদ্ধ বই, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, ম্যাথসের বই, ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিক্যালের বই, নির্বাচিত ভাষা সাহিত্যের বই এবং আরোও হাজার বিষয়ের ঢাউস সব বইয়ের তাই বিকিকিনি হয়। এর বাইরে কিছু সাময়িকী, মাসিক পত্রপত্রিকা। এই হল বইবাজার।
অথচ সেই কবেকার কথা। তখন বইয়ের দোকানগুলোকে বলা হতো লাইব্রেরি এখন বুক স্টল এখানেই একটা অনর্নিহিত ফারাক বোঝা যায় পাঠক এই দুটি শব্দের অর্থ খুঁজে দেখুন প্রথমটিতেপাঠাগারঅর্থটিও পাবেন দ্বিতীয়টি নিছক বই কেনাবেচার স্থান তাই কেউ আর এখন দোকানের নামেলাইব্রেরিলেখে না কে পাঠ করবে ? কেন করবে ? সময় কোথায় ? ঘরে বাইরে কাজ আর কাজ, ছোটাছুটি, বাকিটুকু বিশ্রাম আর অনলাইন বিনোদন অথচ একটা সময় ছিল যখন দেখা যেত ঠাম্মা, দিদা, দাদুদেরও রাত জেগে বাংলা বই পড়া। আমাদের স্মৃতিতে সেই চিত্র আজও ভাস্বর। বঙ্কিম থেকে শরৎ, রবীন্দ্র থেকে জীবনানন্দ। আহা সে কী আনন্দ। বই-ঠেকগুলোতে সগর্বে বিরাজিত বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ থেকে শুরু করে আশাপূর্ণা, মৈত্রেয়ী, দুই সমরেশ পর্যন্ত তুলনামূলক বিচারে যাচ্ছি না এখন অনলাইনেও বই পড়া যায় তবে সে পথ কজন মাড়ান সে নিয়ে সন্দেহ আছে চটুল, অর্থহীন, মন মগজ বিগড়ে দেওয়া প্রলোভনমার্কা বিনোদনের মায়াজাল কাটিয়ে বই পড়ার মজা কেউ আর এখন উপলব্ধি করতে পারেন না
এই অনলাইন বিনোদনের মাধ্যমে আমাদের চিন্তাশক্তির কতটুকু উন্নতি হচ্ছে তা বলা যাচ্ছে না তবে এখানে তুলনামূলক বিচারে দেখা যাচ্ছে বই পড়া এগিয়ে রয়েছে অনেকটাই অনলাইন বিনোদনে একদিকে যেমন চোখের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে তখন মস্তিষ্কের উপরও পড়ছে নিগেটিভ চাপ অথচ বিজ্ঞান বলছে বই পড়ায় চিন্তাশক্তির বৃদ্ধি হয় এবং কোনও নিগেটিভিটি এখানে গড়ে ওঠে না এমনকি উচ্চ রক্তচাপের রোগীকে বই পড়তে পরামর্শ দেওয়া হয় রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য ফারাকটা এখানেই
উপরে নামগুলো লিখতে গিয়ে সমরেশেই যে আটকে গেলাম তা কেন ? দেখা যাচ্ছে মোটামুটি এর পর থেকেই বই পড়ার ট্রেন্ড কমতে কমতে আজ এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে আজকের দিনে বাংলা সাহিত্যের নামি লেখক কবিদের নামই অনেকে জানেন না জুতসই একটা পুরস্কার (আকাদেমি বা জ্ঞানপীঠ জাতীয়) না পাওয়া অবধি উচ্চ মানের কবি সাহিত্যিকদের নাম এক অতি সীমিত পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারছে অবস্থা এতটাই করুণ যে পুরস্কার অপ্রাপ্ত উঁচু মানের কবি সাহিত্যিকদেরও এখন ফেসবুক জাতীয় সামাজিক মাধ্যমে এসে নিজেদের বইয়ের বিজ্ঞাপন করতে হচ্ছে এটা চিন্তার বিষয় জনসংখ্যা বাড়ছে, কবি লেখকদের সংখ্যাও বাড়ছে কিন্তু পাঠক কমছে এক সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র এই চিত্র ভাবাচ্ছে সবাইকে সাধারণ পাঠক, গ্রন্থ প্রণেতা, সরকার এবং গ্রন্থ বিক্রেতাদের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ এসেছে
বিশ্ব সংস্থাগুলিও এমন চিন্তায় চিন্তিত ফলত এই ক্রাইসিস থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে কিছু চিন্তাধারা, কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তিগত তরফে তারই একটি হচ্ছে ইউনেস্কো দ্বারা বিশ্ব বই দিবসের ঘোষণা ও উদ্যাপন ২৩ এপ্রিল দিনটি আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতো হলেও, রাষ্ট্রপুঞ্জের ক্যালেন্ডারে এই তারিখটি নথিবদ্ধ রয়েছে বিশ্ব বই দিবসহিসেবে। প্রতিবছর ‘বিশ্ব গ্রন্থ দিবস ও স্বত্ব দিবস’ হিসাবেই পালিত হয় ২৩ এপ্রিল। কবে থেকে এবং কেন বেছে নেওয়া হয়েছিল এই বিশেষ দিনটিকে ? একটু পর্যবেক্ষণ করা যাক।
পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় ৪০০ বছর। ১৬১৬ সাল। এই তারিখেই প্রয়াত হয়েছিলেন কিংবদন্তি স্প্যানিশ কবি মিগুয়েল দে সার্ভান্তেজ। আধুনিক স্প্যানিশ সাহিত্যের হাতেখড়ি হয় সার্ভান্তেজের হাত ধরেই। এমনকি আজও সবচেয়ে জনপ্রিয় স্প্যানিশ লেখকদের তালিকায় প্রথম সারিতেই রয়েছেন সার্ভান্তেজ। কিংবদন্তি এই কবির মৃত্যু দিবসকে স্মরণীয় করে রাখতে, আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে, ১৯২৩ সালের ২৩ এপ্রিল দিনটিকে গ্রন্থ দিবসহিসাবে উদযাপন করেন তাঁরই ভাবশিষ্য তথা আরেক জনপ্রিয় স্প্যানিশ কথাকার ভিসেন্ট ক্লাভেল আন্দ্রেজ। তখন অবশ্য গ্রন্থ দিবসের এই উদ্‌যাপন শুধুমাত্র সীমিত ছিল স্পেনের বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যপ্রেমী মহলেই। আন্তর্জাতিক স্তরে তো দূরের কথা, তৎকালীন সময়ে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও দেওয়া হয়নি এই বিশেষ দিনটিকে। তার জন্য অপেক্ষা করতে হয় আরও সাত দশক। ১৯৯৫ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের শাখা সংগঠন ইউনেস্কো’-র বৈঠকে ঠিক হয় বছরের একটি বিশেষ দিন পালিত হবে আন্তর্জাতিক গ্রন্থ দিবস উপলক্ষে। সার্ভান্তেজের স্মরণে ২৩ এপ্রিল দিনটিকে বই দিবস হিসাবে বেছে নেওয়া হোক, বৈঠকে আবেদন জানিয়েছিল স্পেন। শেষ পর্যন্ত এই তারিখটিকেই গ্রন্থ দিবসের স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো। কারণ শুধু সার্ভান্তেজ নয়, ২৩ এপ্রিল কিংবদন্তি ইংরেজ নাট্যকার ও কবি উইলিয়াম শেক্সপিয়ারেরও মৃত্যুদিন। পাশাপাশি এপ্রিলের ২৩ তারিখেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন ইনকা ডে লা ভেগা, মরিস ড্রাওন, ম্যানুয়েল মেইয়া সহ একাধিক খ্যাতনামা সাহিত্যিক।
আজকাল মানুষের ভিড়ে, জীবনচর্চা ও জীবনযাপনের কঠিনতম সময়ে মানবিক চিন্তাচর্চা, মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে যেতে বসেছে। সবাই যেন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ছুটে চলেছে এক ভোগসর্বস্ব জীবনচর্চার পথে। হারিয়ে যাওয়ার পথে মানবিকতা। পরার্থপরতার সুখ আজ ভোকাট্টা হওয়ার পথে। অথচ একদিন ছিল যখন মানুষ নিজের জন্য যতটা বাঁচত, ততটাই বাঁচত পরের জন্য। পরের ভালোতে নিজেও আনন্দিত হতো। সেইসব ‘ভালো’কে বিশেষ মর্যাদা দিতে এক একটি দিনকে বিশেষ হিসেবে নিয়ে সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে এরকম নানা ‘দিবস’। তাই তো মা দিবস, বাবা দিবস, কন্যা দিবস, জল দিবস - মায় পৃথিবী দিবস। একটি দিন তাই ধার্য হল বইয়ের জন্যও - বইকে জনমুখী, পাঠকমুখী করে তোলার লক্ষ্যে।            
বইবিমুখতার থেকে পরিত্রাণ পেতে সরকারি ও ব্যক্তিগত স্তরে আজকাল আকছার আয়োজিত হচ্ছে বইমেলা। শহর থেকে গ্রামে গ্রন্থ বিক্রেতারা ছুটছেন বই নিয়ে, বসছেন বিপণি সাজিয়ে। বড় বড় শহরে আয়োজিত এইসব বইমেলায় ভিড়ও পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর পিছনেও এক ট্র্যাজিক চিত্র। দেখা যায় বইয়ের চেয়ে খাবার জিনিসের স্টলে বেশি ভিড়। হাতে গোনা কিছু নামি প্রকাশক-বিক্রেতার বাইরে স্টলগুলি পড়ে থাকে ক্রেতাবিহীন। অথচ বইয়ের ভেতরে না ঢুকলে কী করে বোঝা যাবে কোন বইয়ের অন্দরে লুকিয়ে রয়েছে কী বিস্ময়, পাঠকবান্ধব চরিত্র আর বিষয় ? শুধুই কি পুরোনো লেখক কবি আর বেস্ট সেলার নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকবে সময় ?
বইমেলায় ভিড় তো বাড়ছে। কিন্তু গোড়ায় গলদ। প্রথম দিকে বইক্রেতার সংখ্যা নগণ্য থাকায় বাধ্য হয়েই উদ্যোক্তা ও সরকারের পক্ষ থেকে বইমেলাতে অন্যান্য সামগ্রী, বিশেষ করে খাবার সামগ্রীর স্টল খোলার অনুমতি প্রদান করেন। এবার মেলায় ভিড় তো বাড়ল কিন্তু ভিড় সত্ত্বেও উদ্দেশ্য সাধিত হচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে। আজ -
বইমেলা লোকারণ্য, মহা ধুমধাম
লোকজন দেখে শুধু বইয়ের দাম
বই ভাবে আমি সেরা, প্রকাশক - আমি
বিক্রেতা ভাবে - আমি, হাসে বইপ্রেমী।
অগত্যা উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে চিন্তা করা হল ভিন্নতর পথ। সেই সূত্রে বইমেলায় প্রকাশকদের তরফ থেকে ছাড়ের ব্যবস্থার বাইরেও বই কেনাকাটার কুপনের উপর সরকারি স্তরে শুরু হয়েছে সেরা ক্রেতাদের বিশেষ পুরস্কার সহ সম্মানিত করার ব্যবস্থা।
এই যেখানে চিত্র সেখানে আশার আলো কি একেবারেই নেই ? আছে। জনসংখ্যার বৃদ্ধির সঙ্গে অনুপাত মিলিয়ে বইক্রেতা, বইপ্রেমীদের সংখ্যাও বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে প্রতিটি বইমেলাতেই আগের বছর অপেক্ষা বেশি বিক্রি হচ্ছে বই। কেনাকাটা বাড়ছে, আর্থিক লেনদেনও বাড়ছে। আগে প্রতিটি বাড়িতে বই-ঠেক দেখা যেত বৈঠকখানায়। মাঝে অন্তর্ধান হয়েছিল সেই চিত্রের। আজকাল অধিকাংশ বাড়ির ড্রয়িংরুমের শোকেসে অন্যান্য সামগ্রীর পাশে আবার ফিরে এসেছে বই। এবং অবাক হতে হয় যে এইসব বইয়ের মধ্যে হাল আমলের বই যেমন রয়েছে তেমনি আগেকার দিনে পঠিত বইও রয়েছে কিছু সংখ্যায়। আছে ইংরেজি, হিন্দি ভাষার সেইসব ঢাউস পাঠ্যপুস্তক এবং গীতা, রামায়ন, মহাভারত, রামকৃষ্ণ কথামৃতও। আছে, তবু সেসব কতটা পঠিত তা জানার কোনো উপায় নেই এবং সন্দেহ থেকে যায় স্বভাবতই। একদিকে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার প্রসার এবং অন্যদিকে আন্তর্জালসমৃদ্ধ ইলেকট্রনিক মাধ্যমের উপস্থিতি বই পড়ার সিস্টেমটাকেই বলা যায় পঙ্গু করে দিয়েছে। তবু উৎসবে, পার্বণে বলা যায় জোর করেই, ব্যঙ্গবিদ্রুপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেই বই উপহার দেওয়ার চল শুরু হয়েছে ফের।
এইসব ক্রান্তিকারীদের আমাদের স্যালুট করতে হয়। তাঁরা প্রণম্য। জোর করে হলেও বই নেড়েচেড়ে দেখার, নতুন বইয়ের মনমাতানো গন্ধ ফের একবার শুঁকে দেখার এবং বই পড়ার সেই ক্রেজ আবার ফিরিয়ে আনার জন্য। বই পড়লে একাধারে যেমন জ্ঞান, চিন্তাশক্তি, রোগমুক্তির সম্ভাবনা বাড়বে তেমনি বাড়বে স্ট্যাটাস। বই পড়ারও যে ক্ষমতা থাকা চাই। শিক্ষা থাকা চাই। আজকের দেখনদারির দিনে সেও কম প্রাপ্তি নয় কি ?

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

 
(তথ্যসূত্র - অন্তর্জাল)

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...

মহানিষ্ক্ৰমণ

প্রায় চল্লিশ বছর আগে গ্রামের সেই মায়াময় বাড়িটি ছেড়ে আসতে বেজায় কষ্ট পেয়েছিলেন মা ও বাবা। স্পষ্ট মনে আছে অর্ঘ্যর, এক অব্যক্ত অসহায় বেদনার ছাপ ছিল তাঁদের চোখেমুখে। চোখের কোণে টলটল করছিল অশ্রু হয়ে জমে থাকা যাবতীয় সুখ দুঃখের ইতিকথা। জীবনে চলার পথে গড়ে নিতে হয় অনেক কিছু, আবার ছেড়েও যেতে হয় একদিন। এই কঠোর বাস্তব সেদিন প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করতে পেরেছিল অর্ঘ্যও। সিক্ত হয়ে উঠছিল তার চোখও। জন্ম থেকে এখানেই যে তার বেড়ে ওঠা। খেলাধুলা, পড়াশোনা সব তো এখানেই। দাদাদের বাইরে চলে যাওয়ার পর বারান্দাসংলগ্ন বাঁশের বেড়াযুক্ত কোঠাটিও একদিন তার একান্ত ব্যক্তিগত কক্ষ হয়ে উঠেছিল। শেষ কৈশোরে এই কোঠাতে বসেই তার শরীরচর্চা আর দেহজুড়ে বেড়ে-ওঠা লক্ষণের অবাক পর্যবেক্ষণ। আবার এখানে বসেই নিমগ্ন পড়াশোনার ফসল ম্যাট্রিকে এক চোখধাঁধানো ফলাফল। এরপর একদিন পড়াশোনার পাট চুকিয়ে উচ্চ পদে চাকরি পেয়ে দাদাদের মতোই বাইরে বেরিয়ে যায় অর্ঘ্য, স্বাভাবিক নিয়মে। ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে যায় দিদিরও। সন্তানরা যখন বড় হয়ে বাইরে চলে যায় ততদিনে বয়সের ভারে ন্যুব্জ বাবা মায়ের পক্ষে আর ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বহু জল্পনা কল্পনার শেষে ত...