Skip to main content

মননশীলতা ও নান্দনিকতার যুগলবন্দি উৎসব সংখ্যা - ‘মজলিশ সংলাপ’


১৫১ পৃষ্ঠার উৎসব সংখ্যায় যেন উৎকর্ষ আর বিষয় বৈচিত্রেবড় ধুম লেগেছে হৃদিকমলে….’ মলাট ওলটালেই সত্যিকারের উৎসব কোনটা ছেড়ে কোনটা পড়ি ধরনের টানাপোড়েন ছেড়ে পড়িমরি করে পড়তে বসাই বুদ্ধিমানের কাজ পোড় খাওয়া সম্পাদক তথা কবি, সাহিত্যিক তুষারকান্তি সাহা সম্পাদিত মজলিশসংলাপপত্রিকার উৎসব সংখ্যা ২০২৩, সার্বিক ১৫৫ তম সংখ্যা
গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ মায় নভেলেট পর্যন্ত ঠাঁই পেয়েছে সংখ্যাটিতে এবংএ বলে আমায় পড়, ও বলে আমায়’ টাইপের সব লেখা প্রথমেই প্রথামতো দুটি পৃষ্ঠাতে সূচিপত্র ও টাইটেল ভার্সো পেজের নিরবচ্ছিন্ন মিশ্রণসূচিপত্র পড়তে পড়তেই পাঠক একটা সময় পৌঁছে যাবেন বইচিত্রেসাকুল্যে বারো লাইনের সম্পাদকীয়তে উৎসবের আমেজ ফুটিয়ে পাঠককে সরাসরি প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে বিষয় সম্ভারে। দুটি শারদীয় নিবন্ধ দিয়ে শ্রী গণেশ হয়েছে লেখালেখি বা পড়াপড়ির। মীনাক্ষি চক্রবর্তী লিখছেন - ‘দুর্গাপূজার লৌকিক অনুষঙ্গ’। শাস্ত্রীয়, পৌরাণিক, লৌকিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গে দুর্গা ও দুর্গাপূজার প্রচলন ও বিবর্তন নিয়ে তত্ত্ব ও তথ্যভিত্তিক নিবন্ধ। মধুমিতা দত্ত তাঁর সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে ব্যতিক্রমী ভাবে তুলে ধরেছেন পাপমোচনের উৎসব - ‘ত্রিপুরার ঐতিহাসিক খারচিপূজা’র প্রাসঙ্গিক দিকসমূহ। পার্শ্ববর্তী রাজ্য ত্রিপুরার বাইরের পাঠকদের কাছে অজানাকে জানার এক সুযোগ।
রয়েছে পর পর দুটি বিশেষ নিবন্ধ। অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়ের ‘করুণাময়ী রানি রাসমণি’ এক কথায় এক পরিপাটি এবং পূর্ণাঙ্গ বৃত্তান্ত সম্বলিত নিবন্ধ। প্রাথমিক ভাবে রানি রাসমণিকে পুরোপুরি জানার সুযোগ করে দেয় এই নিবন্ধ। বাসুদেব মণ্ডলের ‘গল্পের ধী-বলয় ও বিনয় মজুমদারের স্ব-জ্ঞা’ নিবন্ধটি কবি বিনয় মজুমদারের গল্পবিশ্ব নিয়ে এক অনুসন্ধানমূলক আলোচনা। ভাষার উৎকর্ষে এক উৎকৃষ্ট রচনা। প্রসারিত হয়নি সম্ভবত পরিসরের স্বল্পতায়। অন্যথা অধিক পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়ে উঠত এই নিবন্ধ।
সংখ্যাটিতে রয়েছে মোট নয়টি গল্প। দীপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের অসাধারণ গল্প ‘কস্তুরী-গন্ধ’। ভাষায়, বুনোটে, উপমা-রূপকে এক সুখপাঠ্য, সুনিয়ন্ত্রিত মুগ্ধতার প্রলেপসমৃদ্ধ গল্প। সজল পালের ‘কত দূরে আকাশ...’ এক ব্যতিক্রমী বাস্তবের আখ্যান। সাবলীল বুনোট মাঝে মাঝেই বাধাগ্রস্ত হয়েছে বেশ কিছু ছাপার বিভ্রাটে। গল্পে উল্লিখিত ‘ডাইনি’, ‘বেস্বামী’ আদি শব্দ ধন্দের সৃষ্টি করেছে। অনুপমা পালের ‘তানপুরা’ চেনা প্লট। তবু বুনোট ও বিষয় এতটাই ভালো যে শেষটায় সিক্ত হয় চোখ। তবে বিবাহিত জীবনের পঞ্চাশ বছর ‘প্রৌঢ়ত্ব’ হতে পারে না সম্ভবতশান্তনু গঙ্গারিডির গল্প ‘মনের কুয়াশা কেটে যাবে’। ভিন্ন ধাঁচের ক্যামোফ্লেজ প্লট। নিখুঁত বাঁধন। পূর্বিতা পুরকায়স্থের ‘অস্তিত্ব’ ডিটেনশন ক্যাম্পের দুঃখব্যথার এক মর্মস্পর্শী প্রতিবেদন। ভাষা ও বুনোটে সমৃদ্ধ। ‘যোজনগন্ধা’ - লেখক অভিজিৎ মিত্র। ভাষার চাকচিক্যে একটুকরো ভালোবাসার গল্প। মাম্পি গুপ্ত লিখেছেন গল্প ‘গ্রহণ’। এক করুণ, নিষ্ঠুর বাস্তবের গল্প। কিছু ইঙ্গিত, কিছু সত্য বয়ান। শেখ আব্দুল মান্নানের গল্প ‘অবক্ষয়’ এক সামাজিক প্রেক্ষাপটের উপর লেখা সুলিখিত গল্প। নিপীড়িত মানুষের উপর নেমে আসা অঞ্চলভিত্তিক ভেদাভেদের কথা। অলৌকিকত্বের মোড়কে এক পরাবাস্তবের গল্প হিমাশিস ভট্টাচার্যের ‘অলীক গন্ধ’।
সঞ্জয় গুপ্তের ‘নিবন্ধ’ ‘পুজোর সেকাল-একাল’ গুয়াহাটি ও অসমের দুর্গাপূজার প্রেক্ষাপটে এক সংক্ষিপ্ত অথচ তথ্যভিত্তিক রচনা। পরিতোষ তালুকদারের নভেলেট ‘মেঘালির বৃত্তান্ত’ এক সার্বিক উৎকর্ষের গদ্য। প্রেম, ভালোবাসা, সমকালীন জীবন ও মানবিক দোলাচলের উপর এক সুলিখিত ঘটনাপ্রবাহ। আধুনিক জীবনের মোহময় আখ্যান।
দফায় দফায় একের পর এক চমৎকার কবিতার আয়োজন সংখ্যাটিকে প্রদান করেছে এক ভিন্নতর সৌকর্য। কলম ধরেছেন একালের সব প্রতিষ্ঠিত নবীন ও প্রবীণ কবিরা। কবিতার বারান্দায় বিষয় বৈচিত্রে উপস্থিত হয়েছেন কবি মন্দিরা ঘোষ (দুটি কবিতা), বিদ্যুৎ চক্রবর্তী (গুচ্ছ কবিতা), শান্তনু গুড়িয়া, অজিত বাইরি, মণিকা বিশ্বাস, সোমনাথ পাণ্ডা, শান্তনু সরকার, নারায়ণ মোদক, জাহানারা মজুমদার, চিরঞ্জীব হালদার, বিশ্বজিত নাগ, তপন মহন্ত, দীপঙ্কর দেব বড়াল, বিপুল চক্রবর্তী (তিনটি কবিতা), চন্দ্রিমা দত্ত, সোমা মজুমদার, লীনা নাথ, রবিশঙ্কর ভট্টাচার্য, শৈলেন সাহা (দীর্ঘ কবিতা), ছন্দা দাম, বাউলা সঞ্জয়, প্রণব আচার্য (কার্তিকা নায়ারের ইংরেজি কবিতার অনুবাদ), বিমলেন্দু চক্রবর্তী (দুটি কবিতা), অভীককুমার দে (তিনটি কবিতা, তার মধ্যে একটি দু’লাইনের), সুশান্ত ভট্টাচার্য (কবির আকস্মিক প্রয়াণের পর প্রথম প্রকাশিত কবিতা, যা তিনি দেখে যেতে পারেননি), শর্মি দে, বাপ্পি নীহার, সুব্রত চৌধুরী (গুচ্ছ কবিতা), আরণ্যক বসু (দীর্ঘ কবিতা), শতদল আচার্য, অমৃত মাইতি, জয়িতা চক্রবর্তী, শ্যামা ভট্টাচার্য, অতনু ভট্টাচার্য, জয়শ্রী ভট্টাচার্য, অভিষেক সেন, সূর্য নন্দী, দেবাশিস ভট্টাচার্য, মমতা চক্রবর্তী (দুটি কবিতা), সত্যজিৎ চৌধুরী (দুটি অনূদিত অসমিয়া কবিতা), সুপ্রভাত সরকার, দোলনচাঁপা দাসপাল, বর্ণশ্রী বকসী, জিতেন্দ্র নাথ (দুটি কবিতা), তুষারকান্তি সাহা ও সুশান্তমোহন চট্টোপাধ্যায়।
একদিকে যেমন নিরেট শুদ্ধ বানান অন্যদিকে স্পষ্ট ছাপা, অক্ষর, শব্দ ও পঙ্‌ক্তি বিন্যাস সংখ্যাটির মর্যাদা বাড়িয়েছে অনেকখানি। যেমন বাড়িয়েছে বাসুদেব মণ্ডলের অসামান্য প্রচ্ছদ। সব মিলিয়ে এক পূর্ণ দৈর্ঘ্যের নান্দনিক পত্রিকা - উৎসবের, সাহিত্যের, মননশীলতার।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

পরিবেশনায় - মজলিশ বইঘর
মূল্য - ২০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৮৬৪০৬৬৯৯৪ 

Comments

  1. শ্রীময় আলোচনা পড়ে মুগ্ধ হলাম

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাংলা গল্প : বিষয়ে বিশ্লেষণে

একক কিংবা যৌথ সম্পাদনায় বিগত কয়েক বছরে উত্তরপূর্বের বাংলা লেখালেখি বিষয়ক একাধিক গ্রন্থ সম্পাদনা করে এই সাহিত্যবিশ্বকে পাঠকের দরবারে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার এক প্রচেষ্টা করে যাচ্ছেন নিবেদিতপ্রাণ তরুণ লেখক ও সম্পাদক নিত্যানন্দ দাস । হালে এপ্রিল ২০২৪ - এ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সম্পাদনা গ্রন্থ ‘ উত্তর - পূর্বাঞ্চলের বাংলা গল্প : বিষয়ে বিশ্লেষণে ’ ( প্রথম খণ্ড ) । প্রকাশক - একুশ শতক , কলকাতা । আলোচ্য গ্রন্থটিতে দুই ছত্রে মোট ২৮ জন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিকের ২৮টি প্রবন্ধ রয়েছে । উপযুক্ত বিষয় ও আলোচকদের নির্বাচন বড় সহজ কথা নয় । এর জন্য প্রাথমিক শর্তই হচ্ছে নিজস্ব জ্ঞানার্জন । কালাবধি এই অঞ্চল থেকে প্রকাশিত উৎকৃষ্ট সাহিত্যকৃতির সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল না হলে তা সম্ভব নয় মোটেও । নিত্যানন্দ নিজেকে নিমগ্ন রেখেছেন গভীর অধ্যয়ন ও আত্মপ্রত্যয়কে সম্বল করে তা বলার অপেক্ষা রাখে না । আলোচ্য গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন প্রতিষ্ঠিত কথাকার রণবীর পুরকায়স্থ । বস্তুত সাত পৃষ্ঠা জোড়া এই ভূমিকা এক পূর্ণাঙ্গ আলোচনা । ভূমিকা পাঠের পর আর আলাদা করে আলোচনার কিছু থাকে না । প্রতিটি নিবন্ধ নিয়ে পরিসরের অভাবে সংক্ষিপ্ত হলেও ...

প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'স্বপ্নতরী'

  স্বপ্নতরী                         বিদ্যুৎ চক্রবর্তী   গ্রন্থ বিপণী প্রকাশনা  বাবা - স্বর্গীয় সুধীর চন্দ্র চক্রবর্তী মা - শ্রীমতী বীণাপাণি চক্রবর্তী               জনম দিয়েছ মোরে এ ভব ধরায় গড়েছ সযতনে শিক্ষায় দীক্ষায় জীবনে কখনো কোথা পাইনি দ্বন্দ্ব দেখিনি হারাতে পূত - আদর্শ ছন্দ বিন্দু বিন্দু করি গড়ি পদ্য সংকলন তোমাদেরই চরণে করি সমর্পণ প্রথম ভাগ ( কবিতা )   স্বপ্নতরী ১ স্বপ্ন - তরী   নিটোল , নিষ্পাপ কচিপাতার মর্মর আর কাঁচা - রোদের আবোল - তাবোল পরিধিস্থ নতুন আমি ।   আনকোরা নতুন ঝরনাবারি নিয়ে এখন নদীর জলও নতুন বয়ে যায় , তাই শেওলা জমে না ।   দুঃখ আমার রয়ে গেছে এবার আসবে স্বপ্ন - তরী চেনা পথ , অচেনা ঠিকানা ।         ২ পাখমারা   সেই উথাল - পাথাল পাখশাট আজও আনে আরণ্যক অনুভূতি । একটু একটু হেঁটে গিয়ে বয়সের ফল্গুধারায় জগৎ নদীর দু ’ পার ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস - সময়ের কাঠগড়াতে আমি বন...

কবির মজলিশ-গাথা

তুষারকান্তি সাহা   জন্ম ১৯৫৭ সাল৷ বাবা প্ৰয়াত নিৰ্মলকান্তি সাহা ও মা অমলা সাহার দ্বিতীয় সন্তান   তুষারকান্তির ৮ বছর বয়সে ছড়া রচনার মাধ্যমে সাহিত্য ভুবনে প্ৰবেশ৷ ‘ ছায়াতরু ’ সাহিত্য পত্ৰিকায় সম্পাদনার হাতেখড়ি হয় কলেজ জীবনে অধ্যয়নকালীন সময়েই৷ পরবৰ্তী জীবনে শিক্ষকতা থেকে সাংবাদিকতা ও লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে গ্ৰহণ করেন৷ প্ৰথম ছড়া প্ৰকাশ পায় সাতের দশকে ‘ শুকতারা ’ য়৷ এরপর ‘ দৈনিক যুগশঙ্খ ’ পত্ৰিকার ‘ সবুজের আসর ’, দৈনিক সময়প্ৰবাহ ও অন্যান্য একাধিক কাগজে চলতে থাকে লেখালেখি৷ নিম্ন অসমের সাপটগ্ৰামে জন্ম হলেও বৰ্তমানে গুয়াহাটির স্থায়ী বাসিন্দা তুষারকান্তির এ যাবৎ প্ৰকাশিত গ্ৰন্থের সংখ্যা ছয়টি৷ এগুলো হচ্ছে নগ্ননিৰ্জন পৃথিবী (দ্বৈত কাব্যগ্ৰন্থ) , ভবঘুরের অ্যালবাম (ব্যক্তিগত গদ্য) , একদা বেত্ৰবতীর তীরে (কাব্যগ্ৰন্থ) , প্ৰেমের গদ্যপদ্য (গল্প সংকলন) , জীবনের আশেপাশে (উপন্যাস) এবং শিশু-কিশোরদের জন্য গল্প সংকলন ‘ গাবুদার কীৰ্তি ’ ৷ এছাড়াও বিভিন্ন পত্ৰপত্ৰিকায় প্ৰকাশিত হয়েছে শিশু কিশোরদের উপযোগী অসংখ্য অগ্ৰন্থিত গল্প৷ রবীন্দ্ৰনাথের বিখ্যাত ছড়া , কবিতা ও একাধিক ছোটগল্প অবলম্বনে লিখেছেন ...