Skip to main content

গৌরবগাথার সমৃদ্ধ আয়োজন ‘বিয়ান’


সিলেট বা শ্রীহট্ট, কবিগুরুর লেখনীতেসুন্দরী শ্রীভূমি সেই সিলেট অঞ্চলের ভাষা, আঞ্চলিক বাংলা ভাষা সিলেটি উত্তরসূরীদের মুখে মুখে আজও প্রবহমান উত্তরসূরীদেরই এক সম্মিলিত মঞ্চ সর্বভারতীয় শ্রীহট্ট সম্মিলনী ফেডারেশন সম্প্রতিসিলেটি সম্মেলন, গুয়াহাটিআয়োজিত চতুর্থ শ্রীহট্ট উৎসব উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে একটি স্মরণিকা - ‘বিয়ান বিয়ান অর্থে সকাল
শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, ভক্তি আন্দোলন, বিজ্ঞান ইত্যাদি সর্ববিষয়ে শ্রীহট্টের অবদান সর্বকালীন এবং সর্বজনস্বীকৃত সংগীত জগতের কৃতি শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরীর স্মৃতিতে উৎসর্গিত এই স্মারকগ্রন্থের প্রচ্ছদে তাই নির্মলেন্দুর প্রতিকৃতির পাশাপাশি রয়েছে একতারা ও ঢোল প্রতিটি পৃষ্ঠার উপরে অঙ্কিত আছে শ্রীচৈতন্যের ছবি। ৯৮ পৃষ্ঠার স্মারক গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট হয়েছে শ্রীহট্ট সম্বন্ধীয় একাধিক রচনা যা এক গর্বিত অতীতের সাক্ষ্য বহন করে প্রথমেই রয়েছে এবারের সম্মেলনে সম্মানিত কয়েকজন কৃতি সিলেটির পরিচয় এঁদের মধ্যে আছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী ড. কালীপ্রদীপ চৌধুরী, শিক্ষাবিদ ও পক্ষী বিশেষজ্ঞ প্রফেসর পরিমল ভট্টাচার্য, বিশিষ্ট চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হর্ষ ভট্টাচার্য এবং বিশিষ্ট অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সুজিতকুমার নন্দী পুরকায়স্থ রয়েছে মেঘালয়ের পূর্বতন শিক্ষামন্ত্রী মানস চৌধুরীর পরিচিতিও যিনি ছিলেন এই সম্মেলনে আমন্ত্রিত বিশিষ্ট অতিথি
লেখক মদনগোপাল গোস্বামীর সম্পাদকীয়তে সংক্ষেপে ধরা আছে সিলেট ও সিলেটিদের বিশিষ্টতার খতিয়ান আছে সম্মেলনের সভাপতি জ্যোতির্ময় পুরকায়স্থের সংক্ষিপ্ত ‘নিবেদন’ও। ভেতরে একের পর এক প্রবন্ধ, নিবন্ধে ফুটে উঠেছে সুন্দরী শ্রীভূমির সার্বিক বিশিষ্টতা ও গৌরবগাথার পরিচয়প্রতিটি রচনা তত্ত্ব ও তথ্যে সমৃদ্ধ। পরিসরের অভাবে বিস্তৃত বর্ণনা সম্ভবপর নয়, একমাত্র স্মরণিকা পঠনেই এর গভীরতা উপলব্ধি সম্ভব। সম্পাদক ও সম্পাদকীয় সমিতি এই কাজটি চূড়ান্ত দক্ষতার সঙ্গে করে দেখিয়েছেন এ কথা অনস্বীকার্য। প্রায় প্রতিটি দিক তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন বৈচিত্র ও স্বাতন্ত্র্যে
প্রথমেই রয়েছে অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব তথা সিলেটের গৌরব সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর অগ্রজ তথা বিশিষ্ট প্রশাসক ও সাহিত্যিক সৈয়দ মুর্তাজা আলীর ‘শ্রীহট্টের নামতত্ত্ব’ প্রবন্ধটি। এরপর রয়েছে কৃষ্ণকুমার পালচৌধুরীর ‘সিলেট, সিলেটিত্ব ও সিলেটের অহংকার’, ডা. সুন্দরীমোহন দাসের কালজয়ী মূল ‘সিলেটি রামায়ণ’, শিবপ্রসন্ন লাহিড়ীর ‘সিলেটি উপভাষার শ্রেণিবিভাগ’, অমিতাভ চৌধুরীর ‘নির্বাসিতা তুমি’, ফণীন্দ্রনাথ দত্তের সিলেটি কথ্যভাষায় একাঙ্ক নাটক ‘মোক্তারি মাইর’-এর কিয়দংশ, বরাক উপত্যকার কথ্য সিলেটিতে রচিত প্রয়াত কবি আনন্দলাল নাথ-এর ‘গাঙ্গর ঘাট এবং অন্যান্য কবিতা’ (এখানে সন্নিবিষ্ট হয়েছে মোট ১৩ টি কবিতা), হীরেন্দ্রকুমার গুপ্তের ‘সিলেটি মহাভারত’, নন্দলাল শর্মার ‘সিলেটের গানে বৈশাখ মাস’। সাহিত্যিক তথা রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ ঊষারঞ্জন ভট্টাচার্য তাঁর নান্দনিক লিখনশৈলীতে স্মৃতিচারণ করেছেন ‘চৌহাট্টার সিংহবাড়ি’কে কেন্দ্র করে তাঁর সাম্প্রতিক বাংলাদেশ ভ্রমণের স্মৃতিবিহ্বল বৃত্তান্ত তাঁর ‘সিংহবাড়ির কাব্যকথা’ নিবন্ধটিতে। বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও গবেষক অমলেন্দু ভট্টাচার্য লিখেছেন - ‘বরাক-সুরমা উপত্যকার অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য - নৌকাপূজা’। এরপর রয়েছে বিধুভূষণ ভট্টাচার্যের ‘সিলটি মহাভারত’-এর মূল কাব্য, ড. সূর্যসেন দেব-এর ‘ডিঠান - সমাজচিত্রের আলোকে’, নিশুতি মজুমদারের ‘সিলেটি প্রবাদ নিয়ে যৎকিঞ্চিৎ’, বিভূতিভূষণ ভট্টাচার্যের (গৌতম ভট্টাচার্য) ছয়টি রসাশ্রিত গদ্য ‘গৌতমীর গল্প’, তরুণ চন্দ্র কলিতার আবেগময় রচনা ‘সিলটি কলিতা’, শ্রীসঞ্জয় গুপ্তের ‘দুটি তারিখ এবং একটি গৌরবগাথা’, নারায়ণী ভট্টাচার্যের ‘শ্রীভূমি’, রামময় ভট্টাচার্যের ‘আত্মার পূজা’ শিরোনামে সিলেটিতে লেখা তিনটি আলাদা আলাদা সিরিয়াস অণুগল্প এবং একটি কবিতা - ‘মূর্খ পণ্ডিত চণ্ডীদাস’, গীতেশ দাসের ‘বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে যুগপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দের উক্তি ও অমোঘ বাণী’, সুমিত্রা দেব-এর ‘শাহ আব্দুল করিম, মধুমিতা দত্তের ‘মুন্সিবাড়ি’, জয়ন্ত চৌধুরীর ‘আমার সিলেটিগিরি’, ড. সুনন্দা নন্দী পুরকায়স্থের ‘ঠাকুমার ঝুলি থেকে’, সঞ্চিতা ভাদুড়ি ভট্টাচার্যের ‘বিস্ময়ের পূর্বঘাট’, বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর গ্রন্থ সমালোচনা - ‘মহাভারত কথার প্যাচ আমির্তির লাখান - বিধুভূষণ ভট্টাচার্যের সিলটি মহাভারত’ এবং ড. প্রমথ রায়ের ‘সুস্বাস্থ্য’।
শেষ পর্যায়ে আছে কিছু সংগৃহীত লেখা - ‘বিয়ের গান’ ও ‘সিলেটের প্রবাদ বাক্য’। আছে সিলেটি নাগরী লিপির বর্ণমালার ছবি। পাঠশেষে এক নস্টালজিক অনুভূতি এসে ছেয়ে যায় মন ও মনন। সিলেটের গৌরবগাথার এক বিশাল আয়োজন এই স্মারক গ্রন্থ বর্তমান পাঠকের কাছে একাধারে গবেষণার বিষয় এবং যুগপৎ বিস্ময়ের আধার। 
বেশ কিছু মুদ্রণ বিভ্রাটের বাইরে এক স্বচ্ছ, স্পষ্ট ছাপা তথা বিষয় বৈচিত্রে ও বৈভবে সমৃদ্ধ স্মরণিকা। প্রচ্ছদ ও নামলিপি উদয়ন বিশ্বাস। প্রকাশক সিলেটি সম্মেলন গুয়াহাটির পক্ষে শ্রী গীতেশ দাস।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

মূল্য - অনুল্লেখিত
যোগাযোগ - ৮৭২০৯৫৩০৯৪ 

Comments

Popular posts from this blog

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাংলা গল্প : বিষয়ে বিশ্লেষণে

একক কিংবা যৌথ সম্পাদনায় বিগত কয়েক বছরে উত্তরপূর্বের বাংলা লেখালেখি বিষয়ক একাধিক গ্রন্থ সম্পাদনা করে এই সাহিত্যবিশ্বকে পাঠকের দরবারে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার এক প্রচেষ্টা করে যাচ্ছেন নিবেদিতপ্রাণ তরুণ লেখক ও সম্পাদক নিত্যানন্দ দাস । হালে এপ্রিল ২০২৪ - এ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সম্পাদনা গ্রন্থ ‘ উত্তর - পূর্বাঞ্চলের বাংলা গল্প : বিষয়ে বিশ্লেষণে ’ ( প্রথম খণ্ড ) । প্রকাশক - একুশ শতক , কলকাতা । আলোচ্য গ্রন্থটিতে দুই ছত্রে মোট ২৮ জন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিকের ২৮টি প্রবন্ধ রয়েছে । উপযুক্ত বিষয় ও আলোচকদের নির্বাচন বড় সহজ কথা নয় । এর জন্য প্রাথমিক শর্তই হচ্ছে নিজস্ব জ্ঞানার্জন । কালাবধি এই অঞ্চল থেকে প্রকাশিত উৎকৃষ্ট সাহিত্যকৃতির সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল না হলে তা সম্ভব নয় মোটেও । নিত্যানন্দ নিজেকে নিমগ্ন রেখেছেন গভীর অধ্যয়ন ও আত্মপ্রত্যয়কে সম্বল করে তা বলার অপেক্ষা রাখে না । আলোচ্য গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন প্রতিষ্ঠিত কথাকার রণবীর পুরকায়স্থ । বস্তুত সাত পৃষ্ঠা জোড়া এই ভূমিকা এক পূর্ণাঙ্গ আলোচনা । ভূমিকা পাঠের পর আর আলাদা করে আলোচনার কিছু থাকে না । প্রতিটি নিবন্ধ নিয়ে পরিসরের অভাবে সংক্ষিপ্ত হলেও ...

প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'স্বপ্নতরী'

  স্বপ্নতরী                         বিদ্যুৎ চক্রবর্তী   গ্রন্থ বিপণী প্রকাশনা  বাবা - স্বর্গীয় সুধীর চন্দ্র চক্রবর্তী মা - শ্রীমতী বীণাপাণি চক্রবর্তী               জনম দিয়েছ মোরে এ ভব ধরায় গড়েছ সযতনে শিক্ষায় দীক্ষায় জীবনে কখনো কোথা পাইনি দ্বন্দ্ব দেখিনি হারাতে পূত - আদর্শ ছন্দ বিন্দু বিন্দু করি গড়ি পদ্য সংকলন তোমাদেরই চরণে করি সমর্পণ প্রথম ভাগ ( কবিতা )   স্বপ্নতরী ১ স্বপ্ন - তরী   নিটোল , নিষ্পাপ কচিপাতার মর্মর আর কাঁচা - রোদের আবোল - তাবোল পরিধিস্থ নতুন আমি ।   আনকোরা নতুন ঝরনাবারি নিয়ে এখন নদীর জলও নতুন বয়ে যায় , তাই শেওলা জমে না ।   দুঃখ আমার রয়ে গেছে এবার আসবে স্বপ্ন - তরী চেনা পথ , অচেনা ঠিকানা ।         ২ পাখমারা   সেই উথাল - পাথাল পাখশাট আজও আনে আরণ্যক অনুভূতি । একটু একটু হেঁটে গিয়ে বয়সের ফল্গুধারায় জগৎ নদীর দু ’ পার ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস - সময়ের কাঠগড়াতে আমি বন...

কবির মজলিশ-গাথা

তুষারকান্তি সাহা   জন্ম ১৯৫৭ সাল৷ বাবা প্ৰয়াত নিৰ্মলকান্তি সাহা ও মা অমলা সাহার দ্বিতীয় সন্তান   তুষারকান্তির ৮ বছর বয়সে ছড়া রচনার মাধ্যমে সাহিত্য ভুবনে প্ৰবেশ৷ ‘ ছায়াতরু ’ সাহিত্য পত্ৰিকায় সম্পাদনার হাতেখড়ি হয় কলেজ জীবনে অধ্যয়নকালীন সময়েই৷ পরবৰ্তী জীবনে শিক্ষকতা থেকে সাংবাদিকতা ও লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে গ্ৰহণ করেন৷ প্ৰথম ছড়া প্ৰকাশ পায় সাতের দশকে ‘ শুকতারা ’ য়৷ এরপর ‘ দৈনিক যুগশঙ্খ ’ পত্ৰিকার ‘ সবুজের আসর ’, দৈনিক সময়প্ৰবাহ ও অন্যান্য একাধিক কাগজে চলতে থাকে লেখালেখি৷ নিম্ন অসমের সাপটগ্ৰামে জন্ম হলেও বৰ্তমানে গুয়াহাটির স্থায়ী বাসিন্দা তুষারকান্তির এ যাবৎ প্ৰকাশিত গ্ৰন্থের সংখ্যা ছয়টি৷ এগুলো হচ্ছে নগ্ননিৰ্জন পৃথিবী (দ্বৈত কাব্যগ্ৰন্থ) , ভবঘুরের অ্যালবাম (ব্যক্তিগত গদ্য) , একদা বেত্ৰবতীর তীরে (কাব্যগ্ৰন্থ) , প্ৰেমের গদ্যপদ্য (গল্প সংকলন) , জীবনের আশেপাশে (উপন্যাস) এবং শিশু-কিশোরদের জন্য গল্প সংকলন ‘ গাবুদার কীৰ্তি ’ ৷ এছাড়াও বিভিন্ন পত্ৰপত্ৰিকায় প্ৰকাশিত হয়েছে শিশু কিশোরদের উপযোগী অসংখ্য অগ্ৰন্থিত গল্প৷ রবীন্দ্ৰনাথের বিখ্যাত ছড়া , কবিতা ও একাধিক ছোটগল্প অবলম্বনে লিখেছেন ...