Skip to main content

নবতম আঙ্গিকের কাব্য সংকলন - ‘আনন্দ জ্যোৎস্না মেখে’


২০১৯ থেকে ২০২২। পাঠক লক্ষ করে দেখুন এই বিশেষ সময়কাল। শতাব্দীর ভয়ংকরতম কাল। করোনা অতিমারির প্রকোপে কম্পমান এ বিশ্ব। সাধারণ মানুষের যখন নাভিশ্বাস ওঠে জীবনরক্ষার তাগিদে, তখনকঠোর বাস্তব দুনিয়ার বাসিন্দা হয়েও একজন কবি কিন্তু বাস করেন এক স্বতন্ত্র জগতে - যে জগতে বাস্তবের দাপাদাপি নেই, আছে কল্পনা ও মোহাবেশ, আছে এক পরাবাস্তব সৃষ্টিময়তার অনুচ্চারিত আনন্দ উৎসব।
এই দুর্বিষহ যাপনকালে কবি জিতেন্দ্র নাথ তাঁর ভাবনাসমূহকে কবিতার অবয়বে মূর্ত করে তুলেহিলেন সচেতনে, সযতনে। শুধুই অতিমারি করোনা নয়, সার্বিক ভাবনার প্রকাশে স্বল্প কথায় সময়কে, আদর্শকে, নিজস্ব জীবনযাপনকে ধরে রেখেছিলেন যেসব কবিতার মাধ্যমে তারই কিছু নির্বাচিত কবিতার সংকলন ‘আনন্দ জ্যোৎস্না মেখে’। সে সময় তো আনন্দও ছিল না, জ্যোৎস্নার লালিত্য উপভোগের মন-মানসিকতাও ছিল না। তবে এ কেমন গ্রন্থনাম ? এখানেই স্বতন্ত্র এক কবি-জীবন। কবিমন খুঁজে পায় হরিষে বিষাদ, বিষাদে হর্ষ।
সেইসব হর্ষ-বিষাদ, মনের দুয়ার খুলে ভাবনাকে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াসে কবি জিতেন্দ্র নাথের ৭০ পৃষ্ঠার এই পঞ্চম কাব্যগ্রন্থে সন্নিবিষ্ট হয়েছে ৫৮ টি কবিতা। রচনা তারিখ ও স্থানের উল্লেখ রয়েছে প্রতিটি কবিতার নীচে। ঘরে, বাইরে, লক ডাউনের শিথিল সময়ে স্টেশনে, দোকানে বসে লেখা সেইসব কবিতায় অবধারিত ভাবেই এসেছে কোভিড। পাশাপাশি এসেছে শহিদ তর্পণ, ভাষাপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম, স্মৃতির পরাকাষ্ঠা, আত্মনিবেদন এবং নান্দনিক উৎকর্ষে কবির আরাধ্য পিতা জয়ন্তকুমার নাথ এবং গুরুসম কবি বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যের প্রতি কৃতজ্ঞ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন। ছোটো ছোটো কথায় স্বল্পকায়া কবিতাসমূহ কবির নবতম আবিষ্কার। স্বল্প কথায় ছড়িয়ে দিয়েছেন বক্তব্য। কবি জিতেন্দ্রর এই ধাঁচের সঙ্গে পাঠক পরিচিত নন। চাঁদ ও জ্যোৎস্না-আলো বারবার এসেছে কবিতার অনুষঙ্গ হয়ে - নতজানু হয়েছি তোমার কাছে চিরকাল / সমর্পণ করেছি দু’হাত তুলে / শর্তহীন ভালোবাসা / অফুরন্ত আলো তোমার ভেতরে বিচ্ছুরিত হয় / এই আলো গায়ে মেখে আমি উজ্জীবিত হই। (কবিতা - নতজানু)। কিছু কবিতা মোহময় ভাবনার প্রকাশকে করে তোলে মহিমান্বিত। যেমন - করোনা-পৃথিবী, একাকী থাকো, প্রিয় ঘাসফুল, জোড়া শালিক, আকাশ পর্যন্ত ইত্যাদি। তবু যাঁরা কবির আগের সংকলনগুলি পড়েছেন তাঁদের কাছে এই গ্রন্থের কবিতাগুলি হয়তো সমমানসম্পন্ন মনে নাও হতে পারে কিন্তু এখানেও আমরা পেয়ে থাকি একের পর এক মোহময়, ভাবনাসঞ্জাত মনোরম বহু পঙ্‌ক্তি। 
ছাপা, বাঁধাই, অক্ষর বিন্যাস যথাযথ হলেও ‘পান্থজন, শিলচর’ কর্তৃক প্রকাশিত এই গ্রন্থটির অক্ষর আকার খুবই ছোটো হয়ে গেছে অযথা, যা সরল পঠনের অন্তরায়। রাজদীপ পুরীর অপরূপ প্রচ্ছদ এক সম্পদ। ব্যতিক্রমী আঙ্গিকে গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে মোট চোদ্দোজন ব্যক্তিকে। সব মিলিয়ে এক ভিন্নতর পঠনসুখের কাব্যগ্রন্থ ‘আনন্দ জ্যোৎস্না মেখে’।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

মূল্য - ১৫০ টাকা, যোগাযোগ - ৯৩৬৫১৬০৭৩৩ 

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...