Skip to main content

এক সংগ্রামী সাহিত্য জীবন কথা 'মুখোমুখি বিকাশ সরকার'



জন ব্যক্তিকে চিনতে, জানতে, তাঁর গুণের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে এবং জনসমক্ষে তাঁর পরিচিতি তুলে ধরতে সর্বাপেক্ষা উত্তম পন্থা হল সাক্ষাৎকার। এতে একদিকে যেমন তাঁর ব্যক্তিসত্তা থেকে শুরু করে জীবনজোড়া কাজকর্মের বিস্তৃত খতিয়ান তুলে ধরা যায় তেমনি পাঠক-দর্শকদের সামনে উন্মোচিত হয় তাঁর অন্তরাত্মার বিশেষত্ব।

এমনই একটি কাজ করেছেন উত্তরপূর্বের অন্যতম নিরলস একজন সম্পাদক, কবি, লেখক ও প্রকাশক গোবিন্দ ধর। ত্রিপুরার স্রোত প্রকাশনার কর্ণধার গোবিন্দ নিজেরই প্রকাশনা থেকে প্রকাশ করেছেন এই আপন সাহিত্যবিশ্বের অন্যতম বহুচর্চিত, বহুনন্দিত এবং ব্যতিক্রমী ঘরানার কবি ও সাহিত্যিক বিকাশ সরকারের সাক্ষাৎকার সংগ্রহ বিষয়ক গ্রন্থ - ‘মুখোমুখী বিকাশ সরকার’। এখানে নিজের করা প্রশ্নের বাইরেও রয়েছে ইতিপূর্বে বিভিন্ন ব্যক্তিদের দ্বারা গৃহীত সাক্ষাৎকার থেকেও উঠে আসা কিছু প্রশ্নোত্তর। হার্ডবোর্ড বাঁধাইয়ের মধ্যে ১১১ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটিকে সাক্ষাৎকারদাতার এক অঘোষিত আত্মজীবনী বললেও হয়তো অত্যুক্তি হবে না। 

কবি বিকাশ সরকার এক মহাযুদ্ধের ঘোড়া। কীভাবে একজন মানুষ গরিবির তলানি সীমা থেকে শুধু নিজেকে বাঁচানোই নয়, উৎকর্ষে গড়ে তুলতে পারেন তাঁর জীবন - তারই এক রূপকথা যেন এই সাক্ষাৎকার পর্বটি। ‘কেন বিকাশ সরকার’ শীর্ষক ভূমিকায় গোবিন্দ ধর লিখছেন - ‘বংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এই মুহূর্তে ভাষা ও বিষয়ের দিক থেকে যে দু’চারজন কবি আলাদা করে নজর কেড়েছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিকাশ সরকার। ...এখন বাংলা কবিতার দিকনির্দেশ করছেন যাঁরা তাঁদেরপই একজন আমাদের মধ্যেই আছেন। কলকাতা থেকে এত দূরে থেকেও তিনি যেভাবে মূলস্রোতেরই একজন হয়ে উঠতে পেরেছেন তা অত্যন্ত ঈর্ষণীয়। কেননা সবাই জানেন এর জন্য কতটা লড়তে হয়...।’ এবার চোখ রাখা যাক সেই রূপকথায়। 

বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে কবি বিকাশ সরকার একাধিকবার উল্লেখ করেছেন তাঁর শৈশব, কৈশোরের সেইসব বিড়ম্বিত যাপনকথা - ‘সেভাবে দেখতে গেলে আমার কিন্তু শৈশব-কৈশোর বলতে কিছুই নেই...। ওই যে লিখেছি ‘আমি কোনোদিন ফুটবল খেলিনি, কেননা গার্হস্থ্যের কাছে জমা আছে আমার রুগ্ন দুই পা’। এটা কবিতা লিখব বলেই লেখা নয়। আমার ওটাই ছোটবেলা। আমার সমবয়সি বন্ধুরা যখন খেলত, আড্ডা মারত, তখন আমাকে ভাতশিকারে বেরুতে হতো। জঙ্গলে, পাহাড়ে, করাতকলে, ছাপাখানায় আমাকে দুটো মুঠোভরা ভাতের সন্ধান করতে হতো।’ তাই হয়তো কবির প্রিয় শব্দ ‘ভাতশিকার’। তাঁর দিনমজুর বাবা যেদিন ধার করা কুড়ি টাকা হারিয়ে ফেলেছিলেন সেদিন কবির ঘরে হাজির হয়েছিল মৃত্যুর নিস্তব্ধতা। অথচ এই অবস্থার মধ্যে থেকেও কবিকে নিরন্তর দিশা দেখিয়ে গেছেন তাঁর বাবা। তাই বিকাশ লিখেন - ‘আমি যা কিছু লিখি তার আধখানা লিখে দেন বাবা’। এটাই তাঁর সেরা পঙ্‌ক্তি। বলেন - আমার মধ্যে আমার বাবা অর্ধেক বেঁচে আছেন। আসলে আমি যা কিছু লিখেছি তা যেন বাবাই শুরু করে দেন; আমি শুধু তার শেষটুকু লিখি। মাকে নিয়েও আছে বহু কথা, বহু কবিতা। এক পর্যায়ে তাঁর স্ত্রী কন্যা নিয়েও কবি তাঁর স্বাচ্ছন্দ্যের কথা উল্লেখ করেছেন নির্মোহ বয়ানে। নিজের লেখালেখি নিয়ে বিশদ অনুভবের কথা, প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির কথা, অনুযোগ, অভিযোগ, শ্লেষ, পছন্দ-অপছন্দের কথা যেভাবে উচ্চারিত হল তার থেকে কিছু উদ্ধৃতির উল্লেখেই সারতে হবে দায়, কারণ বিস্তৃতির পরিসর সীমিত। 

‘ওই যে সাহিত্য অকাদেমি লেখক-কবিদের ডেকে ডেকে চেন্নাই-মুম্বাই-কিলকাতায় নানান অনুষ্ঠানে নিয়ে যায়, বড় বড় সাহিত্য আসর বসে শহরে; কই, আমাকে তো কেউ কখনও ডাকে না। তাহলে কি বলতে হবে পঙ্‌ক্তিভোজনের যোগ্যতা আমার নেই ?... গুয়াহাটিতে কবিতাযাপনের কথা বলেছেন, কিন্তু এটা হল আমার কুকুরযাপন। ... রাস্তার কুকুর যেমন করে লড়াই করে অবহেলা অসম্মান সম্বল করে বেঁচে থাকে আমাকেও সেভাবেই বাঁচতে হয়েছে। তবে হ্যাঁ, গুয়াহাটিকে আমি ভালোবাসি। এই শহরটা আমাকে লড়তে শিখিয়েছে, বাঁচতে শিখিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হল এই যে এই শহর আমাকে দিয়েছে আমার আদরের মেয়েকে। আমার মেয়েই আমার শ্রেষ্ঠ কবিতা।’

তীব্র জীবন যুদ্ধের পাশাপাশি এই অবহেলা কবিকে করে তুলেছে আরোও শক্তপোক্ত। অজান্তে শ্মশান থেকে কুড়িয়ে আনা লেপ-কম্বল বাজার থেকে কিনে দিনযাপন করা কবি সাহিত্য রচনা করেছেন একাগ্রচিত্তে। গুয়াহাটির তৎকালীন অধ্যাপকদের কবি একহাত নিয়েছেন এখানে যদিও কিছু ব্যক্তির প্রতি করেছেন কৃতিজ্ঞতা প্রকাশ। হাংরি আন্দোলন নিয়ে আছে মহু কথা। তাঁকে এই আন্দোলনের শেষ যোদ্ধা হিসেবে অভিহিত করা হলেও এই আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন কবি সিদ্ধান্তগত কারণে। দেশি বিদেশি সাহিত্যের নিমগ্ন পাঠক তথা অনুবাদক বিকাশ একের পর এক রচনায় তার উল্লেখ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, বিনয় মজুমদার, অমর মিত্র,  হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সমরেশ বসু, সমরেশ মজুমদার, নলিনী বেরা সহ বহু গুণী কবি লেখকদের প্রতি প্রকাশ করেছেন আন্তরিক শ্রদ্ধা। কথা ও কবিতায় স্মরণ করেছেন তাঁর মৃত বন্ধুদের কথা - বার বার। নিজের লেখা নাটক, গল্প ও উপন্যাস, কবিতা নিয়ে বলেছেন ভালোলাগার কথা। ‘কণিষ্কের মাথা’, ‘অনন্তছুতোর’, ‘লক্ষ্মীর পাঁচালি’, ‘বিকাশঝোরা’, ‘হ্যালুসিনেশন সিরিজ’, ‘অস্ত্র’, ‘লেন্দু রায়ের জিজীবিষা’ আদি প্রতিটি গ্রন্থ ও রচনা নিয়ে সোচ্চারে জানিয়েছেন তাঁর অনুভব, এইসব বইয়ের চরিত্রদের কথা ও অন্তর্নিহিত বহু কথা। উত্তরপূর্বের কবি সাহিত্যিক তথা লিটল ম্যাগাজিন নিয়েও রয়েছে বহু কথা। কবি বলছেন - ‘বাংলা সাহিত্যে বর্তমানে কবিতাই সবচেয়ে শক্তিশালী শাখা...। বেনোজল বড্ড বেশি। যেসব কবিতা নিয়ে লোকজন খুব হাতে তালি দিচ্ছে সেগুলো নয়, প্রকৃত কবিতা লেখা হচ্ছে একদম প্রত্যন্তে’। 

সব মিলিয়ে এক চিত্তাকর্ষক জীবনকথা। ছাপার ক্ষেত্রে সংখ্যায় কম হলেও কিছু শব্দ আসেনি, কিছু প্যারাগ্রাফ একাধিকবার এসেছে। ফন্ট একটু বড় হলে ভালো হতো। এর বাইরে দেবাশিস সাহার আঁকা বিকাশ-প্রতিকৃতিযুক্ত প্রচ্ছদ মনোগ্রাহী হয়েছে। এমন একটি সংকলনের জন্য সাক্ষাৎকার গ্রহীতা, সংগ্রাহক তথা সম্পাদক গোবিন্দ ধর ও স্রোত প্রকাশনা নিশ্চিতই ধন্যবাদার্হ। 

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী 

মূল্য - ২০০ টাকাযো

গাযোগ - ৯৪৩৬১৬৭২৩১

Comments

Popular posts from this blog

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাংলা গল্প : বিষয়ে বিশ্লেষণে

একক কিংবা যৌথ সম্পাদনায় বিগত কয়েক বছরে উত্তরপূর্বের বাংলা লেখালেখি বিষয়ক একাধিক গ্রন্থ সম্পাদনা করে এই সাহিত্যবিশ্বকে পাঠকের দরবারে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার এক প্রচেষ্টা করে যাচ্ছেন নিবেদিতপ্রাণ তরুণ লেখক ও সম্পাদক নিত্যানন্দ দাস । হালে এপ্রিল ২০২৪ - এ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সম্পাদনা গ্রন্থ ‘ উত্তর - পূর্বাঞ্চলের বাংলা গল্প : বিষয়ে বিশ্লেষণে ’ ( প্রথম খণ্ড ) । প্রকাশক - একুশ শতক , কলকাতা । আলোচ্য গ্রন্থটিতে দুই ছত্রে মোট ২৮ জন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিকের ২৮টি প্রবন্ধ রয়েছে । উপযুক্ত বিষয় ও আলোচকদের নির্বাচন বড় সহজ কথা নয় । এর জন্য প্রাথমিক শর্তই হচ্ছে নিজস্ব জ্ঞানার্জন । কালাবধি এই অঞ্চল থেকে প্রকাশিত উৎকৃষ্ট সাহিত্যকৃতির সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল না হলে তা সম্ভব নয় মোটেও । নিত্যানন্দ নিজেকে নিমগ্ন রেখেছেন গভীর অধ্যয়ন ও আত্মপ্রত্যয়কে সম্বল করে তা বলার অপেক্ষা রাখে না । আলোচ্য গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন প্রতিষ্ঠিত কথাকার রণবীর পুরকায়স্থ । বস্তুত সাত পৃষ্ঠা জোড়া এই ভূমিকা এক পূর্ণাঙ্গ আলোচনা । ভূমিকা পাঠের পর আর আলাদা করে আলোচনার কিছু থাকে না । প্রতিটি নিবন্ধ নিয়ে পরিসরের অভাবে সংক্ষিপ্ত হলেও ...

প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'স্বপ্নতরী'

  স্বপ্নতরী                         বিদ্যুৎ চক্রবর্তী   গ্রন্থ বিপণী প্রকাশনা  বাবা - স্বর্গীয় সুধীর চন্দ্র চক্রবর্তী মা - শ্রীমতী বীণাপাণি চক্রবর্তী               জনম দিয়েছ মোরে এ ভব ধরায় গড়েছ সযতনে শিক্ষায় দীক্ষায় জীবনে কখনো কোথা পাইনি দ্বন্দ্ব দেখিনি হারাতে পূত - আদর্শ ছন্দ বিন্দু বিন্দু করি গড়ি পদ্য সংকলন তোমাদেরই চরণে করি সমর্পণ প্রথম ভাগ ( কবিতা )   স্বপ্নতরী ১ স্বপ্ন - তরী   নিটোল , নিষ্পাপ কচিপাতার মর্মর আর কাঁচা - রোদের আবোল - তাবোল পরিধিস্থ নতুন আমি ।   আনকোরা নতুন ঝরনাবারি নিয়ে এখন নদীর জলও নতুন বয়ে যায় , তাই শেওলা জমে না ।   দুঃখ আমার রয়ে গেছে এবার আসবে স্বপ্ন - তরী চেনা পথ , অচেনা ঠিকানা ।         ২ পাখমারা   সেই উথাল - পাথাল পাখশাট আজও আনে আরণ্যক অনুভূতি । একটু একটু হেঁটে গিয়ে বয়সের ফল্গুধারায় জগৎ নদীর দু ’ পার ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস - সময়ের কাঠগড়াতে আমি বন...

কবির মজলিশ-গাথা

তুষারকান্তি সাহা   জন্ম ১৯৫৭ সাল৷ বাবা প্ৰয়াত নিৰ্মলকান্তি সাহা ও মা অমলা সাহার দ্বিতীয় সন্তান   তুষারকান্তির ৮ বছর বয়সে ছড়া রচনার মাধ্যমে সাহিত্য ভুবনে প্ৰবেশ৷ ‘ ছায়াতরু ’ সাহিত্য পত্ৰিকায় সম্পাদনার হাতেখড়ি হয় কলেজ জীবনে অধ্যয়নকালীন সময়েই৷ পরবৰ্তী জীবনে শিক্ষকতা থেকে সাংবাদিকতা ও লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে গ্ৰহণ করেন৷ প্ৰথম ছড়া প্ৰকাশ পায় সাতের দশকে ‘ শুকতারা ’ য়৷ এরপর ‘ দৈনিক যুগশঙ্খ ’ পত্ৰিকার ‘ সবুজের আসর ’, দৈনিক সময়প্ৰবাহ ও অন্যান্য একাধিক কাগজে চলতে থাকে লেখালেখি৷ নিম্ন অসমের সাপটগ্ৰামে জন্ম হলেও বৰ্তমানে গুয়াহাটির স্থায়ী বাসিন্দা তুষারকান্তির এ যাবৎ প্ৰকাশিত গ্ৰন্থের সংখ্যা ছয়টি৷ এগুলো হচ্ছে নগ্ননিৰ্জন পৃথিবী (দ্বৈত কাব্যগ্ৰন্থ) , ভবঘুরের অ্যালবাম (ব্যক্তিগত গদ্য) , একদা বেত্ৰবতীর তীরে (কাব্যগ্ৰন্থ) , প্ৰেমের গদ্যপদ্য (গল্প সংকলন) , জীবনের আশেপাশে (উপন্যাস) এবং শিশু-কিশোরদের জন্য গল্প সংকলন ‘ গাবুদার কীৰ্তি ’ ৷ এছাড়াও বিভিন্ন পত্ৰপত্ৰিকায় প্ৰকাশিত হয়েছে শিশু কিশোরদের উপযোগী অসংখ্য অগ্ৰন্থিত গল্প৷ রবীন্দ্ৰনাথের বিখ্যাত ছড়া , কবিতা ও একাধিক ছোটগল্প অবলম্বনে লিখেছেন ...