শেষ থেকে শুরু হোক আলোচনা। গ্রন্থের শেষ প্রচ্ছদে কবি জাহানারা
মজুমদারের বিস্তৃত পরিচিতির পাশাপাশি আছে আলোচ্য গ্রন্থ নিয়েও কিছু কথা - ‘কবি জাহানারার কবিতায়
সমাজের নিপীড়িত মানুষের হাহাকার মনকে নাড়া দেয়। মানুষের দুঃখ, কষ্ট, জরা, মৃত্যু কবিকে ব্যথিত করে। নারী পুরুষের বৈষম্যকে তুলে ধরে এক
মানবিক পৃথিবীর প্রত্যাশা করেন কবি। মানুষের প্রতি অদম্য ভালোবাসা তাঁকে
বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে ঘটে যাওয়া অন্যায়ে গর্জে উঠতে নাড়া দেয়। কবিতার মাধ্যমে তিনি বরাবরই এইসব তুলে
ধরার চেষ্টা করেন…।’
প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হৃদপিণ্ডের ব্যথা’র পর সদ্য প্রকাশিত হল কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘আহত
ঝিনুক’। প্রথম
থেকে দ্বিতীয়তে পৌঁছাতে গিয়ে কবি এক চুলও সরে আসেননি তাঁর বক্তব্য থেকে। একই ধারায় তাঁর একের পর এক কবিতায়
ঝরে পড়েছে অন্যায়, অবিচার, বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা, শ্লেষ, প্রতিবাদ। পাশাপাশি প্রত্যাশার শিখরে অবস্থান
করেন কবি। এক
সুস্থ সুন্দর পৃথিবীর প্রত্যাশা, এক প্রেমবিজড়িত সৌহার্দময় পৃথিবীর প্রত্যাশা। ৯৮ পৃষ্ঠার এই কাব্যগ্রন্থে রয়েছে
মোট ৯২টি এক পৃষ্ঠার কবিতা। অধিকাংশ কবিতায়ই ধরা আছে অবিস্মরণীয়
কিছু পঙ্ক্তি, মায়াময়, কাব্যময় কিছু শব্দের
নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। গ্রন্থনাম থেকে শুরু করে গোটা বইয়ে
ছড়িয়ে রয়েছে দুঃখ ব্যথা কষ্টের অনুভব। তবু আছে কিছু নির্বিকার সুখ, আছে ‘ভূতল কাঁপানো’ প্রতিবাদ। উপরিউক্ত বিষয়ের বাইরেও কবিতায় নতুনভাবে
এসেছে - ভাষা শহিদ, হারানো সম্পর্ক, কাঁটাতার,
কোভিডকালের দহনব্যথা, সমকাল ও সময়ের খতিয়ান। প্রতিটি কবিতায় তাই একদিকে কবি যখন
লেখেন ক্ষয়ে যাওয়া সমাজের ব্যথাবিহ্বল চিত্র, পাশাপাশি কবি শব্দের অঙ্কনে এঁকে দেন সুস্থতার
প্রত্যাশা, জীবনের জয়গান -
জীবনকে দেখেছিলাম একদিন -
তেজোদৃপ্ত সূর্যে ঘেরা উর্বর মাটিতে
চোখের ভিতর মাঠ বন বৃষ্টিমগ্ন নদী, সবই তো ছিল …
সাবালক চোখে তাকিয়ে দেখি -
আমার জীবন ভারতবর্ষের ললাটের মতো শুধু
দ্বন্দ্বের দ্বিধা,
তবুও বলব কবিতার মতো জীবন হোক জীবন্ত। (কবিতা - জীবন হোক জীবন্ত)
সত্য আর মিথ্যার দোটানা থেকে বেরিয়ে
এক স্বচ্ছ সুন্দর জীবনের জন্য ইচ্ছেরা দানা বাঁধে কবিমনে, হৃদয়ের অন্ধকার দূর
করতে স্বচ্ছ জলের অন্বেষণে সচেষ্ট থাকেন কবি -
মাঝে মাঝে মনে হয়, অন্য সব সত্য থেকে
সরে
অন্ধকারে ভিজে যাই -
প্রাণ আছে, মন আছে, স্পন্দন আছে
তবুও শূন্যতা ঘিরে ফেলে।
অন্ধকার থেকে হৃদয়কে দায় বিমুক্ত করার মতো
স্বচ্ছ জল পাই কোথায় ? … (কবিতা - মেখে নেবো আলো)
‘সকল সাহিত্যপ্রেমীদের’
উদ্দেশে উৎসর্গ করা এই সংকলনে এমন একটিও কবিতা নেই যা পাঠককে পাঠবিমুখ
করতে পারে। কবিতার
কাব্যিকতা আঠারো আনা না হলেও ষোলোআনা ধরা আছে নিশ্চিত। এটা বজায় রেখেই কবির কবিতা-সংসার। কিছু কবিতা পাঠকমননে ব্যতিক্রমী ভাবের
উদ্রেক করে। যেমন - বৃদ্ধাশ্রম,
মানবতার দহন, স্বপ্নে একদিন, বন্ধ চোখে, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, লিখতে
ভালোবাসি, জীবন যখন সন্ধ্যা, সংক্রমণ,
স্বপ্নের ছোঁয়া, কত রক্ত চাই, মাটির মানুষ, শ্রাবণের ধারা, সূর্যাস্তকাল,
বর্ষাকাল ইত্যাদি।
একাধিক কবিতার অসংখ্য পঙ্ক্তিই হতে পারত ট্যাগলাইন। কিছু পঙ্ক্তির উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না হয়তো -
‘ভোরের স্মৃতি উঁকি
দেয় বিবর্ণ অস্তাচলের ক্যানভাসে’, ‘নদীর এপার আর ওপারে বয়ে চলেছে
ইহকাল আর পরকাল’, ‘কোথাও কি যেতে হবে ঘাস, মাটি, নীলমেঘ অথবা নক্ষত্রের খোঁজে’, ‘ঘরে বাইরে দিন রাত বুদবুদ করে কবিতার নদী’, ‘কাঁকর পথে
শুধু ছোপ ছোপ পদিচিহ্ন রেখে ঘরে ফেরে অসংখ্য মানুষের ভিড়’, ‘পৃথিবীকে
দেখতে গিয়ে দেখি, শরীরের ভাঁজ থেকে আসছে মাংস পোড়া গন্ধ আর মর্গের
টেবিলে একা আমিটা পড়ে’ ইত্যাদি। এমন বহু চরণ কবিতার বুকে এঁকে দেয়
সৃষ্টিসুখের নির্ভেজাল উল্লাস।
কাঁটাতার শিরোনামে রয়েছে দুটি ভিন্ন কবিতা। একটিতে শিরোনাম কিছু অন্যও হতে পারত। তাছাড়া দুয়েক লাইন পুনরুচ্চারিত হয়েছে একাধিক কবিতায়। এসেছে পূর্ববর্তী প্রকাশিত গ্রন্থ থেকেও দুয়েকটি কবিতা। এর বাইরে প্রায় নির্ভুল বানান ও ছাপার মান ঋদ্ধ করেছে সংকলনটিকে। বর্ণ, অক্ষর বিন্যাস যথাযথ। ক্যামেরায় তোলা সবুজের ছবিসম্বলিত প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে কবিকন্যা অলিভিয়া মজুমদার। প্রকাশক - অক্ষর প্রকাশন, কলকাতা। সব মিলিয়ে আহত মানবিকতার মধ্যে প্রত্যাশার স্ফুরণ ঘটানো কবিতার এক সমকালিক সংকলন - ‘আহত ঝিনুক’। কবির উচ্চারণে -
‘… পৃথিবীর গভীর গভীরতর
অসুখ এখন,
মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।’
চোখের ভিতর মাঠ বন বৃষ্টিমগ্ন নদী, সবই তো ছিল …
অন্ধকার থেকে হৃদয়কে দায় বিমুক্ত করার মতো
স্বচ্ছ জল পাই কোথায় ? … (কবিতা - মেখে নেবো আলো)
একাধিক কবিতার অসংখ্য পঙ্ক্তিই হতে পারত ট্যাগলাইন। কিছু পঙ্ক্তির উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না হয়তো -
কাঁটাতার শিরোনামে রয়েছে দুটি ভিন্ন কবিতা। একটিতে শিরোনাম কিছু অন্যও হতে পারত। তাছাড়া দুয়েক লাইন পুনরুচ্চারিত হয়েছে একাধিক কবিতায়। এসেছে পূর্ববর্তী প্রকাশিত গ্রন্থ থেকেও দুয়েকটি কবিতা। এর বাইরে প্রায় নির্ভুল বানান ও ছাপার মান ঋদ্ধ করেছে সংকলনটিকে। বর্ণ, অক্ষর বিন্যাস যথাযথ। ক্যামেরায় তোলা সবুজের ছবিসম্বলিত প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে কবিকন্যা অলিভিয়া মজুমদার। প্রকাশক - অক্ষর প্রকাশন, কলকাতা। সব মিলিয়ে আহত মানবিকতার মধ্যে প্রত্যাশার স্ফুরণ ঘটানো কবিতার এক সমকালিক সংকলন - ‘আহত ঝিনুক’। কবির উচ্চারণে -
মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।’
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
মূল্য - ১৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৮৬৩৮৮৮৫১৯০
Comments
Post a Comment