Skip to main content

বিষয় ভাবনার আধারে কাব্যগ্রন্থ - ‘ঈশান বাংলা’


কবি, লেখকের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ প্রথম প্রেমের মতোই এর আকর্ষণ, দোলাচল হৃদমাঝারে প্রথম সন্তান লাভের মতোই টগবগে উত্তেজনা প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তির শঙ্কা, সম্ভাবনা সব মিলিয়ে এক দুরন্ত পরিঘটনা
ঈশান বাংলাকবি বিপ্লব গোস্বামীর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ গ্রাম বরাকের প্রত্যন্ত জনপদে বসে নিরলস কাব্যসাধনায় রত এই কবি আজ উপত্যকায় এক পরিচিত নাম ৬৪ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থের মোট ৫৬ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে সমসংখ্যক কবিতা। একটির বাইরে সব ক’টি কবিতা ছন্দে লিখা। অন্ত্যমিল ছন্দ। বলাই বাহুল্য কবিদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অমন হয়। আসলে ছন্দই তো মানুষের মনকে কবিতার প্রতি আকর্ষিত করে। তাই কবিতা মানেই ছন্দ - এমন একটা প্রাথমিক ধারণা গড়ে ওঠে সুপ্ত মননে।
বিপ্লবের কবিতায় কাব্য সুষমা কিংবা কাব্যময়তার চেয়ে বিষয় বৈচিত্র্যের পাল্লা ভারী। কল্পনাকে ছাপিয়ে গেছে বাস্তবের জীবনযাত্রা। তাই বর্ষবরণ থেকে শুরু করে উৎসবাদি, মহান ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি, পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলির প্রতিক্রিয়া এসব অনুষঙ্গই প্রকট হয়েছে স্বাভাবিক কারণেই। মাতৃভাষা, মাতৃভূমির প্রতি কবির দুর্নিবার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বাঙময় হয়ে উঠেছে বহু কবিতায়। ‘জন্ম আমার ঈশান বাংলা মাঝে / শান্তি সৌম্য সাম্য যেখানে বিরাজে।’ (কবিতা - ঈশান বাংলা)। এমনই কিছু পঙ্‌ক্তি উল্লেখনীয় - ‘জাগো ঈশান বাংলা জাগো / জাগো বীর শহিদের ভূমি। / জাগো বরাক বঙ্গ জাগো / জাগো বাংলার নির্বাসিতা শ্রীভূমি।’ (কবিতা - জাগো ঈশান বাংলা)। বহু কবিতায় কবি তাঁর সমাজসচেতনতার পরিচয় দিয়ে দেশ ও সমাজের প্রতি তাঁর কর্তব্য, দায়বদ্ধতা পরিস্ফুট করেছেন। উল্লেখ্য - ‘একই মুদ্রার ওপার এপার / সব দলেরই এক নীতি, / স্বার্থের লোভে সব নেতাই / বদলে ফেলে নিজের স্থিতি।’ (কবিতা - এসো নির্বাচন)। কিংবা - ‘ধনের লক্ষ্মী তুষ্ট করতে / পূজার আয়োজন, / আসল লক্ষ্মীর পূজা দিতে / নেই তো কোনোজন / ... বিয়ের লক্ষ্মী কালো হলে / চায় মোটা পণ, / গর্ভে যদি লক্ষ্মী আসে / ভ্রুণ করে নিধন।’ (কবিতা - বিচিত্র সমাজ)।
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই সমাজ বিষয়ক, বাস্তব ভিত্তিক অনুভবের প্রতিফলনে লিখা। স্বভাবতই আধুনিক কবিতার ধাঁচ গড়ে ওঠেনি এখানে। এ বিষয়ে গ্রন্থের ভূমিকাকার কবি ও সম্পাদক নারায়ণ মোদক লিখছেন - ‘একটি কথা বলতেই হয়, কবিতার নির্মাণ-বিনির্মাণ তার ভাষাশৈলী, তারপর অলংকারগুলো যথাযথ স্থানে উপস্থাপন করতে আরো বেশি করে আধুনিক কবিতা পড়তে হবে।’... 
আত্মকথন বিবর্জিত এই গ্রন্থের প্রকাশক প্রদীপ গোস্বামী, অক্ষর, শব্দের যথাযথ বিন্যাসে করিমগঞ্জের স্কলার পাবলিকেশনস। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘বাসন্তী গোস্বামীর শ্রীচরণ কমলে’। সব মিলিয়ে যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক কবি বিপ্লবের এই প্রথম প্রয়াস।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

মূল্য - ৪০ টাকা, যোগাযোগ - ৯১০১৮১৫২৯৬। 

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...

মহানিষ্ক্ৰমণ

প্রায় চল্লিশ বছর আগে গ্রামের সেই মায়াময় বাড়িটি ছেড়ে আসতে বেজায় কষ্ট পেয়েছিলেন মা ও বাবা। স্পষ্ট মনে আছে অর্ঘ্যর, এক অব্যক্ত অসহায় বেদনার ছাপ ছিল তাঁদের চোখেমুখে। চোখের কোণে টলটল করছিল অশ্রু হয়ে জমে থাকা যাবতীয় সুখ দুঃখের ইতিকথা। জীবনে চলার পথে গড়ে নিতে হয় অনেক কিছু, আবার ছেড়েও যেতে হয় একদিন। এই কঠোর বাস্তব সেদিন প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করতে পেরেছিল অর্ঘ্যও। সিক্ত হয়ে উঠছিল তার চোখও। জন্ম থেকে এখানেই যে তার বেড়ে ওঠা। খেলাধুলা, পড়াশোনা সব তো এখানেই। দাদাদের বাইরে চলে যাওয়ার পর বারান্দাসংলগ্ন বাঁশের বেড়াযুক্ত কোঠাটিও একদিন তার একান্ত ব্যক্তিগত কক্ষ হয়ে উঠেছিল। শেষ কৈশোরে এই কোঠাতে বসেই তার শরীরচর্চা আর দেহজুড়ে বেড়ে-ওঠা লক্ষণের অবাক পর্যবেক্ষণ। আবার এখানে বসেই নিমগ্ন পড়াশোনার ফসল ম্যাট্রিকে এক চোখধাঁধানো ফলাফল। এরপর একদিন পড়াশোনার পাট চুকিয়ে উচ্চ পদে চাকরি পেয়ে দাদাদের মতোই বাইরে বেরিয়ে যায় অর্ঘ্য, স্বাভাবিক নিয়মে। ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে যায় দিদিরও। সন্তানরা যখন বড় হয়ে বাইরে চলে যায় ততদিনে বয়সের ভারে ন্যুব্জ বাবা মায়ের পক্ষে আর ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বহু জল্পনা কল্পনার শেষে ত...