Skip to main content

ভালোবাসা মূর্ত হয়ে ওঠে নিজেরই অজান্তে



“আমার মন বলে চাই চাই গো, যারে নাহি পাই গো” - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
আবার -
আন্তর্জাতিক বেস্ট সেলার ‘Bending the Universe’-এর লেখক Justin Wetch লিখছেন - “Sometimes it feels like even if
Every inch of my skin was touching yours
I still wouldn’t be close enough to you.”
চাওয়া পাওয়ার এই লুকোচুরিই হয়তো প্রেমের সবচাইতে প্রথম ও প্রধান উপাদান। আর প্রেমের পরিভাষা সম্ভবতঃ কবিতায়ই ধরা হয়েছে সবচাইতে প্রাঞ্জল করে। প্রেমের কবিতা তাই বিশ্বজনীন। কবিতার আলেয়ার মতো বুনোটে প্রেম হয়ে ওঠে আরোও নিগূঢ়, আরোও একান্ত। বাঙ্ময় নৈশব্দে এসে ধরা দেয় অন্তরের অন্দরমহলে।
দেবলীনা সেনগুপ্তের সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেম, তুমি’ সেই অনন্ত প্রেমের অনিঃশেষ যাত্রাপথে নির্দ্বিধায় এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন। ২০১৪ সালে ‘আলোকবর্ণা’ এবং ২০১৬ সালে ‘চন্দ্রাহত’ - এই দু’টি কাব্যগ্রন্থের পর মোট চল্লিশটি কবিতা নিয়ে ‘প্রেম, তুমি’ হলো কবির তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। কবি সঞ্জয় চক্রবর্তী ভূমিকাতে লিখছেন - “দেবলীনা সেনগুপ্ত যে ভূমিতে বাস করেন, তারই কাদামাটিজলের মতো নরম, স্নিগ্ধ, শান্ত, মনভোলানো এক আবেগময় পৃথিবী ওনার কবিতা। সহজ উচ্চারণ, জটিলতাহীন - অথচ সরল নয়। প্রগাঢ় বোধ জাগ্রত প্রকৃতির অবাধ সৌন্দর্য এবং রহস্যময়তার ভেতর। নাগরিক সপ্রতিভ থেকে দূরে এক দেশ রয়েছে কবির, এখানে স্বপ্নেরা ওড়াউড়ি করে। কোথাও কোন চিৎকার নেই, হাহাকার নেই, জোর গলার। আছে নিভৃত উচ্চারণ, এক মরমী বাক্যরীতি এবং এভাবেই নির্মিত কবিতাসকল যা দগ্ধ দ্বিপ্রহরে শীতল বাতাস বয়ে নিয়ে আসে। - - - - -  ‘প্রেম, তুমি’ এক একাকী মগ্ন ভ্রমণ, যেখানে সুন্দর কখনো বিষাদমথিত হয়, কখনো সে অনুচ্চারিত হর্ষের কাছে চুপ করে বসে। এবং, কবি চাইছেন - প্রেম, কল্পতরু হও / যাব জন্মান্তরে।”
মোট ৬০ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন তাঁর ‘প্রিয় বান্ধবী রিমি ধরকে - যে কবিতার মতোই নিস্পাপ, সুন্দর ও পবিত্র’। প্রেম সম্বন্ধে কবির ধ্যান ও ধারণার একটি স্পষ্ট আভাস এখানেই পাওয়া যায়। এবং সেই ধারণারই প্রতিফলন ঘটেছে প্রতিটি কবিতায়। তাই তো কবিতা আর প্রেম মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় তাঁর লেখনীতে। দেবলীনার কবিতার প্রেম ‘বাতিঘর ও সমুদ্র জলের প্রেম, ধানগন্ধের সঙ্গে উৎসবের আখ্যানের প্রেম, উঠোনের সঙ্গে বৃষ্টির প্রেম, প্রকৃতির সঙ্গে মানবের প্রেম, যাপনের প্রেম।‘ নিজের কথায় কবি লিখেন - “একটি কবিতা লিখি, মনে হয় স্নানঘর থেকে স্নান সেরে এলাম। নিবিড় অবগাহন। মন-অতলে। আরেকটি কবিতা লিখি, মনে হয় বাগানে ফুল তুলে এলামআরেকটি লিখি - মনে হয় যা কিছু আমার অতৃপ্তি ও অপমান - সব আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। মুছে যাচ্ছে পুরোনো ব্যথার দাগ।”
বস্তুতঃ এই গ্রন্থটির প্রতিটি কবিতার অধ্যয়নে যেন শুষে নেওয়া যায় সব কবির আত্মস্থ ‘মনের কথা’টি। যথাযথ শব্দের প্রয়োগে, অনুপ্রাসে এক একটি কবিতা হয়ে ওঠেছে পঠন সুখের আকর। প্রথম দু”টি কবিতাই পাঠকের মন-জানালায় খুলে দেয় অনুভূতির ক্যানভাস। হারিয়ে যেতেই হয় কবিতার পথ ধরে অনন্ত পথের পরিব্রাজনে।
“স্বর্গের সিঁড়ি বড় পিছল
আমি বরং দেবদারু হব
সহজ বিভঙ্গে।” - - - -
(কবিতা - দেবদারু)
কিংবা - “সমুদ্রের লোনা গন্ধ মেখে
একা দাঁড়িয়ে থাকে বাতিঘর
অকম্পিত শিখায়।
নীলাভ ঢেউয়ের প্রেমে,
একলা ভেসেছে যে জলযান
অচেনা নাবিক তার
দারুচিনি দ্বীপের খোঁজে
ছুঁয়ে যায় বন্দর, উপকূলধারে।“ - - -
(কবিতা - বাতিঘর)
এভাবেই ধীরে ধীরে নিঃশব্দ পঠনে অথচ নিবিড় মনসঞ্জাত বোধে এগিয়ে যায় একের পর এক কবিতা। ভালোবাসা কখনো মূর্ত হয়ে ওঠে নিজেরই অজান্তে। সেই আপ্তবাক্য - প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে - তারই পথ ধরে কবিতায় উঠে আসে মানবিক বোধ -
নীলাঞ্জন, পাতার মতো চোখ মেলে
একবার দেখো পৃথিবীকে
কত সবুজ জমিয়েছে সে
আমাদের ভুলে যাওয়া ভালোবাসা
ভালোবেসে, অকাতর করুণ মায়ায়
কত যুগ আছে জেগে সে।
এইবার হাত ধর
এইবার কাছে এসো, তবে
খুঁড়ে দেখি খুঁজে দেখি হৃদয়ের মূল
এখনো কি বৃষ্টিপাত ?
এখনো কি প্রেম নির্ভুল ?”
(কবিতা - অব্যক্ত)
এভাবেই গ্রন্থের নির্যাসটুকু কবি ধরে রেখেছেন স্বচ্ছন্দ অথচ শক্ত মুঠিতে। দেবলীনার কবিতা কখনো খেই হারায় না। কবিতার অবয়বে অঙ্কিত হয় সহজ, সুন্দর ভঙ্গি। ছন্দহীনতায়ও কোথাও নেই ছন্দপতন। এটাই তো কবিতার মূল চাহিদা। এবং সেই চাহিদা, সেই আহ্বানকে কবি তাঁর সাবলীল কথনে সাজিয়ে গুছিয়ে আদায় করে নিয়েছেন পাঠকের ভ্রামরী ঔৎসুক্য।
প্রেম ভালোবাসার মোড়কে নিজেকে গুটিয়ে রেখে বাস্তব থেকেও শত হস্ত দূরে থাকেননি কবি দেবলীনা। কবি হিসেবে সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাও ধরে রেখেছেন কবিতার সহজ রসায়নে (ভ্যাকসিন, লিগ্যাসি, মা, দেশ, মধ্যবিত্ত, সোয়েটার ইত্যাদি)। দেশপ্রেম, মাতৃপ্রেম, প্রকৃতি প্রেম, মানব প্রেম - সব এক মলাটে একত্রবাসের উপযোগী করে সৃষ্ট এই কবিতা সংকলন তার বুনোটে, তার আহ্বানে, তার আকুলতায় নির্দ্বিধায় বেঁচেবর্তে থাকবে পাঠক হৃদয়ে।  
প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদ। সৌজন্যে অনিমেষ মাহাতো। প্রকাশক - তীর্থঙ্কর দাস, নীহারিকা পাবলিশার্স, আগরতলা। শেষ প্রচ্ছদের ভেতরে রয়েছে কবির জাগতিক আত্মপরিচয়।
‘প্রেম, তুমি’
মূল্য - ১৪০ টাকা
যোগাযোগ - ৬০০৩৩৫৫২৩৫ 
- - - - - - - - - - - - - -

Comments

Popular posts from this blog

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...