Skip to main content

সপ্তদশ বর্ষে - গরজে, উৎকর্ষে ‘মানবী’


ঘন কালো প্রচ্ছদের মধ্যিখানে একটি হ্রদ কিংবা বিলের জলে পড়ন্ত সূর্যের আবছা আঁধার। প্রেক্ষাপট সম্ভবত বরাকভূমের গর্ব শনবিল। কারণ জলে হিজলজাতীয় গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশিষ্টতার প্রতীক হয়ে। ভেতরের পাতা ওলটালে কবিতায়, নিবন্ধে পার্শ্ববর্তী রাজ্য মণিপুরের অমানবিক ঘটনার বিস্তৃত প্রতিবেদন। ভাবনার আবর্তে নিমজ্জিত হতে বাধ্য পাঠক মন। এক কালো অধ্যায়, অথচ এই মণিপুরেই আছে এমনি এক গর্বের জলাশয়। মহাদেশের সর্ববৃহৎ স্বচ্ছ জলের হ্রদ - লোতাক। আজ গোটা দেশে এবং সমাজে মণিপুর এক অস্বচ্ছতা তথা কলঙ্কগাথার নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতীকী এবং প্রাসঙ্গিক হিসেবে তাই অভিহিত করা যায় বিশ্বজ্যোতি ভট্টাচার্যের ছিমছাম প্রচ্ছদ।  
এমনই এক অমানবিকতা, অশান্তি, অব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি শিলচর থেকে প্রকাশিত হল ‘মানবী’ পত্রিকার সপ্তদশ বর্ষ, তৃতীয়-চতুর্থ যুগ্ম সংখ্যা। জুলাই - ডিসেম্বর ২০২৩। আজকাল এভাবেই যুগ্ম সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে মানবী। শেষ কবে ত্রৈমাসিক একক সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে জানা নেই। এবারের সংখ্যার সম্পাদনার চারজনের গোটা সম্পাদনামণ্ডলী। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৭২।
সম্পাদকীয়তে বরাবরের মতোই আছে কিছু চমৎকার কথন - ‘আমাদের মানবীর সপ্তদশ বর্ষ শেষ হতে চলেছে। শরীর-কলের তোড়ে বয়েসও বেড়ে চলেছে আমাদের। কিন্তু মন তো সেই ঔষধি নয়নতারা ফুল। তবুও যদি আবার কবে কোথাও থেমে যেতে হয়...।’ খেদ প্রকাশ করা হয়েছে চারপাশে সংঘটিত অমানবিক ক্রিয়াকলাপের - ‘নিখিল বিশ্বের কলুষ পটভূমিতে অহরহ বিপন্ন হয়ে চলেছে মানবতা। চারপাশে বড় কান্না, বড় অমানবিক জঞ্জাল, রাশি রাশি সময়ের মৃত স্তূপ...। হায় অমানবায়ন......’। ইচ্ছেরা সোচ্চার হয়েছে - ... মণিপুর শান্ত হোক, চাবুক পড়ুক দাঙ্গায়, মার্শাল হোক যাবতীয় মাদক ঘরানার, ব্যানার ছেঁড়ার নোংরা রাজনীতি বন্ধ হোক...... ইত্যাদি।
বরাকভূমির এবং অতি অবশ্যই সার্বিক সাহিত্য-বিশ্বের সদ্যপ্রয়াত কবি তথে খ্যাতনামা ছোট পত্রিকা ‘সাহিত্য’র সম্পাদক বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যের স্মৃতির প্রতি সচিত্র শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়ে শুরু হয়েছে ভেতরের পাতা। কবিতার বিভাগে রয়েছে সব সুনির্বাচিত কবিতা। স্বর্ণালী বিশ্বাস ভট্টাচার্যের কবিতা ‘অলক্ষ্মী’, সঞ্জিতা দাস (লস্কর)-এর কবিতা ‘অমৃতেই থাকো’ এবং চন্দ্রিমা দত্তের কবিতা ‘দুঃসময়’ বিশেষভাবে রেখাপাত করে পাঠকমনে। এছাড়াও রয়েছে কবিতার অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত নবীন থেকে প্রবীণ কবি নীলাদ্রি ভট্টাচার্য, জ্যোতির্ময় রায়, শুভব্রত দত্ত, শতদল আচার্য, ফাল্গুনী চক্রবর্তী, মৃদুলা ভট্টাচার্য, নীহার রঞ্জন দাস, অনিরুদ্ধ পোদ্দার ও রাজীব ঘোষের কবিতা। সঞ্জিতা ও চন্দ্রিমার রয়েছে মোট তিনটি করে কবিতা। তমালশেখর দে’র কবিতা কোলাজ ‘এরপর থেকে অসহায়ের মতো’ এক কথায় অনবদ্য। বিষয়ে, গ্রন্থনায়, প্রাসঙ্গিকতায় নিশ্চিতই এক ব্যতিক্রমী সংযোজন।
সদ্যপ্রয়াত জনপ্রিয় কবি সুশান্ত ভট্টাচার্যের স্মৃতিচারণায় গদ্যে-পদ্যে, আবেগে-পরিতাপে কলম ধরেছেন সম্পাদকচতুষ্টয় দোলনচাঁপা দাসপাল, শর্মিলা দত্ত, চন্দ্রিমা দত্ত ও শেলী দাসচৌধুরী। সুজিৎ দাসের নিবন্ধ ‘বিতর বিতর প্রেম’ সাম্প্রতিক ঘটনারাজির আবহে যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। গল্প বিভাগে রয়েছে বর্ণশ্রী বকসীর অণুগল্প ‘ডোরবেল’। সংলাপ নির্ভর গল্প ‘কথোপকথন’-এ গল্পকার ঝুমুর পাণ্ডে ফুটিয়ে তুলেছেন গরিবির চূড়ান্ত সীমায় থাকা লোকজনের নিত্যদিনের বুভুক্ষা ও টানাপোড়েন। মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম-এর গল্প ‘বন্ধনহীন গ্রন্থি’ বিষয় বৈচিত্র্যে, আঙ্গিকে ব্যতিক্রমী নিঃসন্দেহে। এর পরেই রয়েছে তিনটি অসাধারণ গল্প। প্রথমেই আসছে মঞ্জরী হীরামণি রায়ের ‘বিরান পরানি পর্ণী’ (কিছুটা জটিল শিরোনাম অবশ্যই)। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এই গল্পের শেষটায় রয়েছে অসাধারণ একটি মোচড়, যা গল্পকে দাঁড় করিয়ে দেয় এক অসাধারণ উচ্চতায়। দেবরাজ শুভ-র গল্প ‘কথা না রাখার খেলা’ বিষয়ে যতটা না আকর্ষণীয় তার চাইতেও বেশি গল্পের বুনোট ও চলনের আকর্ষণ। প্রচলিত বাস্তবকে গল্পের মোড়কে নৈপুণ্যের সঙ্গে উপস্থাপনে একশো ভাগ সফল গল্পকার। শেষ গল্প দোলনচাঁপা দাসপালের ‘চারাগাছ’। সোজাসাপটা শব্দের চমৎকার রসায়নে সমৃদ্ধ এই গল্পে একাধারে যেমন ফুটে উঠেছে বাস্তবের কিছু অন্তর্নিহিত সত্য তেমনি ফুটে উঠেছে নান্দনিকতার কদর। বিষয়কে আবর্ত করে অনুষঙ্গ এসেছে যথার্থ রূপে, সরল কথনে (উদাহরণ ই-রিকশাকে স্থানীয় ভাষায় বলা মতো ‘টুকটুক’-এর ব্যবহার)। বহু দিন মনে রাখার মতো চারাগাছ থেকে মহিরুহ হয়ে ওঠার প্রত্যয় সম্বলিত একটি গল্প।
সংখ্যাটির সমাপ্তি হয়েছে ‘নিবিড় পাঠ’ শীর্ষক বিভাগ-শিরোনামে গল্পকার শর্মিলা দত্তের সদ্য প্রকাশিত গল্প সংকলন ‘উইন্ডোসিট’-এর একটি নিখুঁত ও বিস্তৃত আলোচনার মাধ্যমে। আলোচক মঞ্জরী হীরামণি রায়ের ‘মেধা ও মননের অপূর্ব মেলবন্ধন - উইন্ডোসিট’। সব মিলিয়ে যথেষ্ট সুচিন্তিত এবং নান্দনিকতাসমৃদ্ধ এবারের সংখ্যা মানবী। কিছু বানান ভুল, বিশেষ করে ‘কথা না রাখার খেলা’ গল্পে এবং স্বল্প সংখ্যক ছাপার ভুলের বাইরে বর্ণ সংস্থাপন, অক্ষর বিন্যাস, স্বচ্ছ ও স্পষ্ট ছাপাই, সার্বিক অলংকরণ ইত্যাদি সব বিষয়েই সম্পাদকমণ্ডলীর তীক্ষ্ণ নজরদারি ও গরজ প্রত্যক্ষ করা গেছে অপরাপর সংখ্যার মতোই।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

মূল্য - ৮০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪০১৩৭৭০৩০ 

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

বিষয়-মানসে প্রকাশিত ‘স্বরিত’ - সপ্তদশ সংখ্যা

কোনও দ্বিধা কিংবা ভয়কে অবলীলায় উড়িয়ে দিয়ে জলকে জল , মাটিকে মাটি কিংবা দেশকে দেশ ( দ্বেষ , দ্যাশ কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্র নয় ) বলতে পারেন যে ক ’ জন , তাঁদের মধ্যে অন্যতম কবি , লেখক , সম্পাদক নারায়ণ মোদক । বরাক উপত্যকার শ্রীভূমি থেকে ২১ মার্চ বিশ্ব কবিতা দিবসে প্রকাশিত হয়েছে বার্ষিক পত্রিকা ‘ স্বরিত ’- এর সপ্তদশ সংখ্যা । দ্বৈত সম্পাদনায় নারায়ণ মোদক ও গৌতম চৌধুরী। এবারের বিষয় ছিল প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অব্যবস্থা , অত্যাচার , সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নিপীড়ন ইত্যাদি নিয়ে প্রতিবেদন ও সহমর্মিতা ইত্যাদি । স্বভাবতই এর প্রতিবাদ হওয়া উচিত । এই নির্ভীক , বলিষ্ঠ পদক্ষেপের উদ্যোগ কতটা সফল হয়েছে , কতটা সহমর্মিতা বর্ষিত হল , কতটা প্রতিবাদ স্বরিত হল তার এক নির্মোহ বিশ্লেষণ সংখ্যাটির আলোচনার এক অমোঘ অনুষঙ্গ ।   ভূমিকার আধারে ‘এ সংখ্যার বিষয়ে আলোকপাত’ করতে গিয়ে অন্যতম সম্পাদক নারায়ণ মোদক লিখছেন - ‘… আমাদের সমাজে একদল নিজেকে মানবতাবাদী সাজিয়ে নিরাপদ দূরত্বে বসে সমাজ এবং সরকারের সব রকম সুবিধা ভোগ করে বিজ্ঞতার সাথে বলতে থাকেন সারা বিশ্বের যেখানেই সংখ্যালঘু আছে সেখানেই তারা অত্যাচারিত। আমাদ...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...