Skip to main content

সার্বিক পূর্ণতার কাব্যগ্রন্থ - ‘জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়’


মলাট থেকে ভেতরের শেষ পৃষ্ঠা অবধি আদ্যোপান্ত একটি নান্দনিকতা, একটি গভীর প্রজ্ঞাসঞ্জাত বোধের বহিঃপ্রকাশ যেন ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র কবি মাণিক চক্রবর্তীর প্রথম কাব্যগ্রন্থজীর্ণ পাতা ঝরার বেলায় যদিও এর পর প্রকাশিত হয়েছে কবির আরও কবিতার বই তবু আলোচ্য বইটি আলোচনায় এসে যায় অবধারিতভাবে তার কাব্যগুণ, কাব্যিক ভাবধারার সুবাদে ব্লার্ব থেকে ভূমিকা এবং প্রতিটি কবিতায় যেন মূর্ত হয়ে উঠেছে এক নিখাদ, নিটোল কবিতা-বিশ্ব।  
এক এক করে এগোলে প্রথম ব্লার্বে রয়েছে আকাদেমি পুরস্কার প্রাপ্ত কবি, অনুবাদক ভক্ত সিংহ বর্ণিত পরিচিতি - ‘কবিতা সাহিত্যের আদিমতম একটি শাখা। যখন পৃথিবীর মানুষের অক্ষরজ্ঞান ছিল না, তখনও মানুষের মনে কবিতা ছিল। এই কবিতা নিয়ে মানুষের মনে আগ্রহের শেষ নেই। বলা হয় সকল মানুষের হৃদয়েই একটি কবি-সত্তা বাস করে মানুষ তার মনের ভিতরের কোন চিন্তা-ভাবনা, আবেগ, অনুভূতিকে যখন শিল্পীত রূপে প্রকাশ করে, তখনই তা হয়ে উঠে একটি কবিতা। ...এই কাব্যগ্রন্থে সন্নিবিষ্ট কবিতাগুলোতে যেমন রয়েছে কবির জীবনবোধের অভিব্যক্তি, তেমনি অনেক কবিতায় উঠে এসেছে সময় ও সমাজের চিত্র। জীবনের নানা অনুভূতিকে কল্পনার রসে জারিয়ে নিয়ে তিনি প্রকাশ করেছেন কবিতা রূপে...।’ আসলেই সেই শিল্পীত রুপের প্রকাশ।
গ্রন্থে ‘কবি ও কবিতা’ শীর্ষক একটি ভূমিকা রয়েছে যাকে অনায়াসে শিরোনামভিত্তিক একটি উৎকৃষ্ট নিবন্ধ বলা চলে। বিভিন্ন শ্লোক, কবিতা ইত্যাদির সমন্বয়ে কবি ও কবিতার এক অভাবিত চিত্র যেন নিপুণ শৈলীতে লিপিবদ্ধ করেছেন গ্রন্থকার। ভেতরে একই শিরোনামে রয়েছে একটি কবিতাও।
৮৮ পৃষ্ঠার গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট হয়েছে মোট ৭৪টি কবিতা। প্রতিটি কবিতাই সার্বিক কাব্যগুণ সমন্বিত। একের থেকে অন্যটিকে আলাদা করে বেছে নেওয়ার কোনো জো নেই। ভাবে, বিষয়ে, বৈচিত্রে প্রতিটি কবিতাই স্বকীয়। এসেছে প্রকৃতি, জীবনবোধ, নদী, বরাকভূমি, স্মৃতিকথা, স্বাধীনতা, বরাক, ব্রহ্মপুত্র, কামাখ্যা, একাদশ শহিদ, উনিশ-একুশ, ভাষা, নাগরিকত্ব, নির্ভয়া, কবিতা ইত্যাদি। শব্দেরা যেন স্বতঃস্ফুর্তভাবেই চলে এসেছে পঙ্‌ক্তিমালার মধ্যে। কিছু উল্লেখ নিতান্তই প্রাসঙ্গিক -
...নির্জন অপেক্ষাগার, অর্ধেক শরীর
তার ডুবে আছে জলে।
নিঃশঙ্ক নিদ্রায় অনন্ত শয্যায় শুয়ে
রাখাল বালক। জানে সে,
সবুজের সংকীর্ণ রেখা ধরে মহিষেরা তার
ফিরে যাবে জলজ বাথানে একদিন
না হয় একদিন।
 
সন্ধ্যা নামে চিপর-সাঙ্গনে। বিষ্ণুপ্রিয়া গ্রামে
মৃদু মৃদঙ্গের তালে তালে বাতাস কথা কয়,
বিরহী সুরে,
রাধাকৃষ্ণ লীলার।
একা চাঁদ বুকে ধরে জেগে থাকে চরাচরে
অনন্ত সায়র।
(কবিতা - চিত্রপট-বক্রিহাওর)।
লক্ষণীয় শব্দসাযুজ্য, শব্দসুষমা। হাওরের চিত্রপট এমনি করে পুরো কবিতা জুড়ে উদ্‌ভাসিত হয়েছে কব্যিকতার যথার্থ মিলনে। কবিগুরুকে নিয়ে লিখেছেন কবিতা -
...বৃক্ষের কাছে নাকি চাইতে হয় না ছায়া।
আপন স্বভাবে
প্রসারিত করে সে নিজেকে
দিগন্তে দিগন্তে,
বিলিয়ে দেয় ছায়া শীতলতা।
তবুও পিপাসার্ত হৃদয় পাশে পেতে চায়
তোমাকে, জীবনের আলোকসারথি রূপে,...
সজীব বৃক্ষ তুমি - রবীন্দ্রনাথ।
তোমাকে যে আমাদের
বড় প্রয়োজন।
(কবিতা - সজীব বৃক্ষ তুমি - রবীন্দ্রনাথ)।
‘প্রিয় স্বদেশ’ কবিতায় এসেছে ভয়ানক সাতচল্লিশের ভয়াবহ আবহ -
...সাতচল্লিশের কাকভোরে পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন
তিনি, রক্তাক্ত স্বদেশ -
কাটাছেঁড়া, ভয় আর শঙ্কার মেঘে ঢাকা
মায়ের ক্লিষ্ট মুখ, তারপর -
নেকড়ে তাড়ানো মেষের মতো দিশাহীন
সীমান্ত পারাপার...।
আছে কিছু দিনশেষের কবিতা, বিসর্জনের গান, কিছু শ্রদ্ধাঞ্জলি কবিতা। এতসব কিছু মিলেই প্রথম কাব্যগ্রন্থ। ফলত বিষয়ভিত্তিক হয়ে ওঠেনি। অন্যথা প্রতিটি বিষয়ের উপরই একাধিক কবিতাযুক্ত এক একটি গ্রন্থ হয়তো দাঁড়াত শক্ত, পোক্ত ভিতের উপর - অন্তত কবির লেখনী এমন প্রত্যয় জাগিয়ে তোলে নির্দ্বিধায়।
ছাপা, বাঁধাই, অক্ষর, শব্দ ও পঙ্‌ক্তি বিন্যাস যথাযথ। কয়েকটির বাইরে আধুনিক বানান অনুসৃত হয়েছে গ্রন্থ জুড়ে। প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে কবি নিজেই। দ্বিতীয় ব্লার্বে প্রকাশকের তরফে আছে কবি-পরিচিতি যার ফন্ট এতই ছোট যে পাঠোদ্ধারে কুঁচকে যাবে চোখ। এসব ‘সামান্য’কে পাশ কাটিয়ে সার্বিক এক ‘অসামান্য’ কবিতার সন্নিবেশ আলোচ্য কাব্যগ্রন্থ। শেষ কথা রহস্যাবৃত - প্রথম কাব্যগ্রন্থ কী করে ‘জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়’ হয় ? তাহলে কি ধরে নিতে হবে সেই আপ্তবাক্যই শেষ কথা - বিরহেই প্রেমের স্বার্থকতা, দুঃখ বেদনাতেই পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে সাহিত্য ?

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

প্রকাশক - সপ্তাশ্ব, হাইলাকান্দি
মূল্য - ১০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৯৫৪৫৫২৯৭৬ 

Comments

Popular posts from this blog

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাংলা গল্প : বিষয়ে বিশ্লেষণে

একক কিংবা যৌথ সম্পাদনায় বিগত কয়েক বছরে উত্তরপূর্বের বাংলা লেখালেখি বিষয়ক একাধিক গ্রন্থ সম্পাদনা করে এই সাহিত্যবিশ্বকে পাঠকের দরবারে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার এক প্রচেষ্টা করে যাচ্ছেন নিবেদিতপ্রাণ তরুণ লেখক ও সম্পাদক নিত্যানন্দ দাস । হালে এপ্রিল ২০২৪ - এ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সম্পাদনা গ্রন্থ ‘ উত্তর - পূর্বাঞ্চলের বাংলা গল্প : বিষয়ে বিশ্লেষণে ’ ( প্রথম খণ্ড ) । প্রকাশক - একুশ শতক , কলকাতা । আলোচ্য গ্রন্থটিতে দুই ছত্রে মোট ২৮ জন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিকের ২৮টি প্রবন্ধ রয়েছে । উপযুক্ত বিষয় ও আলোচকদের নির্বাচন বড় সহজ কথা নয় । এর জন্য প্রাথমিক শর্তই হচ্ছে নিজস্ব জ্ঞানার্জন । কালাবধি এই অঞ্চল থেকে প্রকাশিত উৎকৃষ্ট সাহিত্যকৃতির সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল না হলে তা সম্ভব নয় মোটেও । নিত্যানন্দ নিজেকে নিমগ্ন রেখেছেন গভীর অধ্যয়ন ও আত্মপ্রত্যয়কে সম্বল করে তা বলার অপেক্ষা রাখে না । আলোচ্য গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন প্রতিষ্ঠিত কথাকার রণবীর পুরকায়স্থ । বস্তুত সাত পৃষ্ঠা জোড়া এই ভূমিকা এক পূর্ণাঙ্গ আলোচনা । ভূমিকা পাঠের পর আর আলাদা করে আলোচনার কিছু থাকে না । প্রতিটি নিবন্ধ নিয়ে পরিসরের অভাবে সংক্ষিপ্ত হলেও ...

প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'স্বপ্নতরী'

  স্বপ্নতরী                         বিদ্যুৎ চক্রবর্তী   গ্রন্থ বিপণী প্রকাশনা  বাবা - স্বর্গীয় সুধীর চন্দ্র চক্রবর্তী মা - শ্রীমতী বীণাপাণি চক্রবর্তী               জনম দিয়েছ মোরে এ ভব ধরায় গড়েছ সযতনে শিক্ষায় দীক্ষায় জীবনে কখনো কোথা পাইনি দ্বন্দ্ব দেখিনি হারাতে পূত - আদর্শ ছন্দ বিন্দু বিন্দু করি গড়ি পদ্য সংকলন তোমাদেরই চরণে করি সমর্পণ প্রথম ভাগ ( কবিতা )   স্বপ্নতরী ১ স্বপ্ন - তরী   নিটোল , নিষ্পাপ কচিপাতার মর্মর আর কাঁচা - রোদের আবোল - তাবোল পরিধিস্থ নতুন আমি ।   আনকোরা নতুন ঝরনাবারি নিয়ে এখন নদীর জলও নতুন বয়ে যায় , তাই শেওলা জমে না ।   দুঃখ আমার রয়ে গেছে এবার আসবে স্বপ্ন - তরী চেনা পথ , অচেনা ঠিকানা ।         ২ পাখমারা   সেই উথাল - পাথাল পাখশাট আজও আনে আরণ্যক অনুভূতি । একটু একটু হেঁটে গিয়ে বয়সের ফল্গুধারায় জগৎ নদীর দু ’ পার ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস - সময়ের কাঠগড়াতে আমি বন...

কবির মজলিশ-গাথা

তুষারকান্তি সাহা   জন্ম ১৯৫৭ সাল৷ বাবা প্ৰয়াত নিৰ্মলকান্তি সাহা ও মা অমলা সাহার দ্বিতীয় সন্তান   তুষারকান্তির ৮ বছর বয়সে ছড়া রচনার মাধ্যমে সাহিত্য ভুবনে প্ৰবেশ৷ ‘ ছায়াতরু ’ সাহিত্য পত্ৰিকায় সম্পাদনার হাতেখড়ি হয় কলেজ জীবনে অধ্যয়নকালীন সময়েই৷ পরবৰ্তী জীবনে শিক্ষকতা থেকে সাংবাদিকতা ও লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে গ্ৰহণ করেন৷ প্ৰথম ছড়া প্ৰকাশ পায় সাতের দশকে ‘ শুকতারা ’ য়৷ এরপর ‘ দৈনিক যুগশঙ্খ ’ পত্ৰিকার ‘ সবুজের আসর ’, দৈনিক সময়প্ৰবাহ ও অন্যান্য একাধিক কাগজে চলতে থাকে লেখালেখি৷ নিম্ন অসমের সাপটগ্ৰামে জন্ম হলেও বৰ্তমানে গুয়াহাটির স্থায়ী বাসিন্দা তুষারকান্তির এ যাবৎ প্ৰকাশিত গ্ৰন্থের সংখ্যা ছয়টি৷ এগুলো হচ্ছে নগ্ননিৰ্জন পৃথিবী (দ্বৈত কাব্যগ্ৰন্থ) , ভবঘুরের অ্যালবাম (ব্যক্তিগত গদ্য) , একদা বেত্ৰবতীর তীরে (কাব্যগ্ৰন্থ) , প্ৰেমের গদ্যপদ্য (গল্প সংকলন) , জীবনের আশেপাশে (উপন্যাস) এবং শিশু-কিশোরদের জন্য গল্প সংকলন ‘ গাবুদার কীৰ্তি ’ ৷ এছাড়াও বিভিন্ন পত্ৰপত্ৰিকায় প্ৰকাশিত হয়েছে শিশু কিশোরদের উপযোগী অসংখ্য অগ্ৰন্থিত গল্প৷ রবীন্দ্ৰনাথের বিখ্যাত ছড়া , কবিতা ও একাধিক ছোটগল্প অবলম্বনে লিখেছেন ...