Skip to main content

সমকালীন গল্পবিশ্বে অন্যতম উৎকৃষ্ট সংকলন - ‘খোলা হাওয়া’


এটা বহু কাল ধরেই চলে আসছে প্রচারের আলোয় এক লেখক গোষ্ঠী একে অপরের জিন্দাবাদের মাধ্যমে লেখালেখির জগতে ভাস্বর হয়ে উঠছেন অপর দিকে সেইসব লেখালেখির চেয়ে বহুগুণ উৎকৃষ্ট রচনা সত্ত্বেও অনেকেই থেকে যাচ্ছেন পর্দার আড়ালে এক শ্রেণির নিষ্পৃহ পাঠকও এর জন্য বহুলাংশে দায়ী পড়লাম, উপভোগ করলাম আর বই বন্ধ করে তাকে রেখে দিলাম চিরতরে কী কবিতা, কী গল্প-উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ সব ক্ষেত্রেই একাধারে এই নিষ্পৃহতা এবং বিপ্রতীপে এই স্বজনপোষণ তা না হলে বরাক উপত্যকা থেকে সদ্য প্রকাশিত অরুণকুমার সেন-এর গল্প সংকলনখোলা হাওয়াকেন উঠে এল না প্রচারের আলোয় ? কেন তথাকথিত বৌদ্ধিক মহলে তা হয়ে উঠল না আলোচনার বিষয়বস্তু ? গোষ্ঠীবদ্ধ লেখক নন বলেই কি ?
খোলা হাওয়াগ্রন্থটি যাঁরা পড়েননি তাঁরা নিশ্চিতই রয়ে গেলেন লেখালেখির হাল হকিকত থেকে দূরে, হারালেন গল্পপাঠের নিরালা সুখ ২৬৪ পৃষ্ঠার বোর্ড বাঁধাই এই সংকলনটিতে রয়েছে লেখকের বিচিত্র স্বাদের মোট ২৪টি গল্প। এক একটি গল্পে যেন উন্মোচিত হয়েছে পরিবর্তিত সময়ের বাস্তব প্রেক্ষিত। যেন সাদা আলোয় লুকিয়ে থাকা কালোর অন্তর্নিহিত উপস্থিতি। সেই বৈপরীত্যকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে উপস্থাপন করেছেন গল্পকার - পাঠকের দরবারে। গ্রন্থের শেষ মলাটে থাকা লেখক পরিচিতি থেকে জানা যায় যে গল্পকার একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। অর্থাৎ শিক্ষা জগতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিসেই সূত্রেই সম্ভবত অধিকাংশ গল্পই শিক্ষা জগৎ সম্পর্কিত। স্বভাবতই এই জগতের অন্দরে প্রবেশ করেছেন লেখক এবং সেই সূত্রেই তুলে এনেছেন বহু অজানা তথ্য ও তত্ত্বকে। গল্পের মোড়কে পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছেন সেইসব কাহিনি। কঠিন শব্দের মেদবর্জিত লেখায় আগাগোড়া খেই ধরে রেখেছেন গল্পের। লেখার ধরণ সরল হলেও প্রতিটি শব্দ এবং বাক্য যেন মোক্ষম হয়ে উঠেছে। পরিমিতিবোধ যথাযথ রক্ষা করা হয়েছে। বাহুল্য বর্জিত অথচ সাহিত্যগুণসমন্বিত এক একটি গল্প তাই পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠবে নিশ্চিত।
প্রথম গল্পেই বলা যেতে পারে বাজিমাত। ‘আলোময়ী মা’ গল্পে পারস্পরিক সম্পর্কহীন আধুনিকতার গালে যেন এক মোক্ষম চপেটাঘাত। বিপরীতে সত্য সনাতনের এক উদ্‌ভাসিত মহিমা। এক এক করে এগোলে, ভালো ছাত্র ও তথাকথিত মন্দ ছাত্রের এক চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তব বিশ্লেষণের গল্প ‘অন্য শিক্ষা’। চমৎকার শৈলীযুক্ত লেখা পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। সুখানুভবের এক রম্য গল্প ‘এটা কিনলে ওটা ফ্রি’। ব্যতিক্রমী প্লটের গল্প ‘অর্ধাঙ্গিনী’ এগিয়েছে তরতরিয়ে। পাঠ-বিরতি অসম্ভব। রহস্যগন্ধী গোছানো গল্প ‘মানুষভূত’। বাস্তব প্রেক্ষিতের গল্প ‘স্যরি মাহাত্ম্য’। ‘অপরাধ’ গল্পে লেখক তুলে এনেছেন মূল্যবোধহীন রাজনীতি ও বশংবদ প্রশাসনিক অনৈতিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গল্প ‘গণতন্ত্র জিন্দাবাদ’ এক বাস্তব প্রহসন। ব্যতিক্রমী ভাবনার অনবদ্য ফসল গল্প ‘নাগমাস্টার’। বুনোটে সংলাপে গ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প। রম্যরসে সম্পৃক্ত অনবদ্য একটি গল্প ‘গড্ডলিকা প্রবাহ’। আদর্শের সঙ্গে সমঝোতা করা না করার এক ব্যতিক্রমী গল্প ‘আদর্শ’। পোক্ত বুনোট। লেখকের গল্প ভাবনায় যেসব অনবদ্য, ব্যতিক্রমী প্লট উঠে এসেছে তার মধ্যে অন্যতম গল্প ‘টেরর থেরাপি’। গল্প এগিয়েছে সরেস ছন্দে। অভাবনীয় বিষয়ের উপর অন্যতম শ্রেষ্ঠ তথা সুখপাঠ্য গল্প ‘বন্যার অন্য গল্প’। ভাবনার অন্য স্তরে নিয়ে যায় পাঠককে। রাজনীতির ফোঁপরা স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে ‘গণতন্ত্রের ঠ্যালা’ গল্পে। সিদ্ধান্তে অবিচল থাকার অনবদ্য একটি গল্প ‘চোর’। তথাকথিত মতলবি বুদ্ধিজীবীদের লেখক একহাত নিলেন ‘বুদ্ধিজীবী দর্শন’ গল্পে। নির্মল হাস্যরসের উপাদানযুক্ত গল্প। শহরের ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলির অন্দরে থাকা অবিদ্যার ঝুলি খুলে দেওয়া হয়েছে ‘বিদ্যাবাজার’ গল্পে। এক নির্মম বাস্তবের সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে দেওয়া হয়েছে পাঠকের। অন্যতম শ্রেষ্ট গল্প নিঃসন্দেহে। ভিন্নতর আবহে বাস্তব ও ভালোবাসার গল্প ‘বরাকের বালুচরে’। উন্মোচিত হয়েছে মুখোশের আড়ালের মুখ। আসল নকলের গ্যাঁড়াকলে এক নির্মল হাস্যরসের গল্প ‘ভাড়াটে শিক্ষক’। নিটোল প্রেমের সার্থক ছোটগল্প ‘প্রাক্তনী’। অন্যতম সেরা। এর পরেই রয়েছে আরও একটি নির্ভেজাল কৌতুকরসের গল্প ‘বাবু’।
‘...জন্মভূমির চেয়ে বড় তীর্থ আর নেই। যে মাটিতে জন্ম হয়েছে, যে মাটিতে জন্মদায়ী মা-বাবার শরীর মিশে আছে, সে মাটির চেয়ে পবিত্র মাটি, পবিত্র স্থান কি আর আছে এই ধরাধামে ?’ - দেশের সীমা পেরিয়ে জন্মভূমির টানে পাড়ি দেওয়া এক বৃদ্ধের গল্প ‘জন্মভূমি’। একদিকে জন্মমাটির মাহাত্ম্য, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনবদ্য গল্প - ‘জন্মভূমি’। রাজনীতির ছলচাতুরীর এক প্রহসনমূলক গল্প - ‘অনুষ্ঠান বাতিলের অনুষ্ঠান’। শেষ গল্প ‘দলবদল’। সিদ্ধান্তহীন রাজনীতির এক নির্লজ্জ চিত্রের উন্মোচন।
সব মিলিয়ে যেন বাস্তবটাকে ধরে রেখেছেন গল্পকার দুই মলাটের মধ্যে। যে হাওয়া বইছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তাকেই বিষয় বৈচিত্রে তুলে এনেছেন পাঠকের কাছে। তাই তো ‘খোলা হাওয়া’। প্রতিটি গল্পই দেশ, প্রসাদ, নবকল্লোল সহ বরাকের নানা নামিদামি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত, যার উল্লেখ রয়েছে গল্পের শেষে। অক্ষর আকার (ফন্ট) বড় হওয়ায় পঠনবান্ধব হয়েছে গ্রন্থটি। স্পষ্ট ছাপা। অক্ষর ও শব্দ বিন্যাস যথাযথ। ‘ভাড়াটে পাঠক’ কিংবা ‘কত গমে কত আটা’ জাতীয় নির্মল ব্যঞ্জনায় পরিস্ফুট হয়েছে সাহিত্যরস। বানান অনুসৃত হয়েছে আধুনিক নিয়মে। এ নিয়ে সচেতন লেখকের গল্প ‘আদর্শ’তে আছে কিছু সংলাপও। তবু ফাঁক গলে রয়ে যায় কিছু। এ অনিবার্য। কয়েকটি ছাপার ত্রুটিও থেকেই যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তৎসম শব্দের ব্যবহার হয়তো এড়ানো যেত। তবে এসব কিছুই গৌণ হয়ে ধরা দিয়েছে বিষয় ভাবনা, সাহিত্যগুণ ও গল্পের চলনের বিশালতার বিপ্রতীপে। গ্রন্থটি লেখক উৎসর্গ করেছেন ব্যতিক্রমী আঙ্গিকে থিয়েটার ওয়ার্কশপ বদরপুর, সাংস্কৃতিক মঞ্চ বদরপুর ঘাট ও বরাক উপত্যকা বঙ্গসাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন (বদরপুর আঞ্চলিক সমিতি)কে।
সব মিলিয়ে উত্তরপূর্ব তথা বরাক ও অসমের গল্পবিশ্বের কালধারায় এক অন্যতম উৎকৃষ্ট নিবেদন ‘খোলা হাওয়া’। এ কথা বলা যেতেই পারে প্রত্যয়ের সঙ্গে।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

প্রকাশক - নতুন দিগন্ত প্রকাশনী, শিলচর
মূল্য - ৩০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫১৭৯০৭২ 

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...