Skip to main content

উপত্যকার ক্রীড়াবিষয়ক এক সংগ্রহযোগ্য দলিল - ‘সাক্ষাতে কথা’


গল্প, কবিতার প্রাচুর্যে গ্রন্থ প্রকাশের জগতে অন্যান্য প্রকাশ অনেকটাই স্তিমিত হয়ে থাকে সচরাচর। মাঝে মাঝে কিছু উপন্যাস এবং কিছু প্রবন্ধ আদির সংকলন প্রকাশিত হওয়ার সংবাদ পাওয়া গেলেও সাক্ষাৎকার সংকলন বস্তুতই এক বিরল ঘটনা আজকের সাহিত্য পরিমণ্ডলে, বিশেষ করে এই উত্তরপূর্বের সাহিত্য জগতে। সেই অর্থে বিষয়ভিত্তিক ‘সাক্ষাতে কথা’ সংকলন গ্রন্থটি প্রকৃতার্থেই এক ব্যতিক্রমী প্রয়াস।
বহু দিনের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ সাংবাদিক (ক্রীড়া সাংবাদিক) দ্বিজেন্দ্রলাল দাস ও ক্রীড়াবিদ তথা ক্রীড়া সংগঠক উত্তম চৌধুরী সংকলিত, সম্পাদিত ও গৃহীত সাক্ষাৎকার সংগ্রহ গ্রন্থটি স্বভাবতই খেলাধুলা ও সাহিত্য জগতে এক বিশেষ স্থান অধিকার করতে সক্ষম হয়েছে। খেলাধুলা এমন একটি বিষয় যা প্রত্যেকের জীবনেই একটি নির্দিষ্ট বয়সে এক অমোঘ ভালোবাসার আকর হয়ে আসে। কালের আবর্তে সেই জগৎ থেকে অধিকাংশ মানুষই সরে এলে বা সরে আসতে বাধ্য হলেও সেই ভালোবাসার কিছুটা হলেও রেশ থেকে যায় মননে, মগজে। তাই খেলাধুলাবিষয়ক লেখালেখি থেকে একেবারেই মুখ ফিরিয়ে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না কারোরই। আর সেই খেলাধুলাবিষয়ক লেখালেখির প্রেক্ষাপট যদি হয় বিস্তৃত এবং চেনা পরিবেশ তাহলে সোনায় সোহাগা। আলোচ্য গ্রন্থটির ক্ষেত্রেও তেমনই বলা যায় প্রত্যয় রেখেই, অন্তত এই ঈশান বাংলার পাঠকবৃন্দের কথা মাথায় রেখে।
পেপারব্যাকে ২১০ পৃষ্ঠার গ্রন্থটির প্রচ্ছদও সেই হিসেবেই মানানসই হয়ে বাড়িয়ে দেয় পৃষ্ঠা উলটে যাওয়ার স্পৃহা। প্রথমেই চোখ আটকে যায় গ্রন্থ প্রকাশের গোড়ার কথায়। ‘নেপথ্য ভাষণ’ শিরোনামে যা বিস্তৃত করে লিখেছেন দ্বিজেন্দ্রলাল দাস। জানা যায় একই গ্রন্থনামে ৩৭ জন ক্রীড়াবিদের জীবনকথা নিয়ে গ্রন্থটির প্রথম ও ২৮ জনকে নিয়ে দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হয়েছিল ক্রমে ২০১৯ ও ২০২১ সালে। আলোচ্য গ্রন্থে আরও ৩৫ জন ক্রীড়াবিদের কর্মকাণ্ড যোগ করে সন্নিবিষ্ট হল মোট ১০০টি লেখা। নেপথ্য ভাষণে দ্বিজেন্দ্রলাল লিখছেন - ‘...বইটি সাক্ষাৎকার ভিত্তিক। যেসব কথা এখানে উত্থাপন করা হয়েছে তা সবই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিংবা তাঁদের পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া। বই প্রকাশের উদ্দেশ্য একটাই এই জেলার (অবিভক্ত কাছাড়) খেলাধুলার প্রসঙ্গ এলে যাঁদের নাম উত্থাপন করতেই হয় তাঁদের লাইফ স্কেচ ও চিন্তাভাবনা একত্রে সমাজের সামনে তুলে ধরা...।’ গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট হয়েছে বিশিষ্ট সাংবাদিক উত্তমকুমার সাহার একটি সংক্ষিপ্ত ভূমিকাও যেখানে তিনি লিখছেন - ‘...দ্বিজেন্দ্রলাল দাস ও উত্তম চৌধুরী (শম্ভু) বরাক উপত্যকার ক্রীড়ামহলে দুই উল্লেখযোগ্য নাম। তাঁদের লিখনশৈলীর দরুন অনেকদিন পর সাক্ষাৎকারগুলি পড়লেও অপ্রাসঙ্গিক বলে একটিবারের জন্যও মনে হয় না। ...নতুন লেখাগুলি তো বটেই, পাতা উলটে পুরনো লেখাগুলি পড়তেও পাঠকরা আকৃষ্ট হবেন।’
বরাকের খেলাধুলা জগতের সঙ্গে যাঁদের নিয়মিত যোগাযোগ নেই তাঁরা এই গ্রন্থটি অধ্যয়নের মাধ্যমে এক অজানা জগতের সঙ্গে পরিচিত হবেন নিশ্চিত। এই অঞ্চলে যে এত স্বনামধন্য ক্রীড়াবিদ, সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় তথা ক্রীড়াশিক্ষক ও নিঃস্বার্থ ক্রীড়া সংগঠক ছিলেন বা আছেন তা অনেকেরই যে অজানা তা নিশ্চিত এবং সেসবেরই এক নির্মোহ খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে। সরাসরি প্রশ্নোত্তরের ধাঁচে যে লেখাগুলি লিপিবদ্ধ হয়েছে তা নয়। সাক্ষাৎকার গ্রহণের পর তা তথ্যাদির সন্নিবেশে নিবন্ধ আকারেই লেখা হয়েছে অধিকাংশ অধ্যায়ে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নির্ধারিত ক্রীড়াসমূহে এই অঞ্চলের সার্বিক প্রতিনিধিত্ব বিষয়ে আছে অনেক অজানা তথ্য। বস্তুত কী নেই এখানে ? সন্নিবিষ্ট হয়েছে ফুটবল, ক্রিকেট, টেবিল টেনিস, শুটিং, বডি বল্ডিং, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, যোগ ব্যায়াম, হকি, ফেন্সিং, অ্যাথলেটিকস, সাঁতার ইত্যাদি খেলায় উপত্যকার খেলোয়াড়দের কৃতিত্বের পাশাপাশি তাঁদের পাওয়া না পাওয়া নিয়ে আন্তরিক প্রতিবেদন। রয়েছে একগুচ্ছ ক্রীড়া সংগঠন ও সংগঠকের কথা যাঁদের কথা না এলে অসম্পূর্ণই থেকে যেত এই বিষয়ভিত্তিক সংকলন। কত আত্মত্যাগ, কত নিবেদনের কথা যে এসেছে এক একটি অধ্যায়ে তা এতদিন হয়তো অজানাই ছিল সমক্ষে।
এ জাতীয় গ্রন্থের লেখালেখি বিষয়ে সাহিত্যগুণ বিচার্য নয় যদিও উভয় সংকলকই চেষ্টা করেছেন অধ্যায়গুলিকে যতটা সম্ভব পাঠকবান্ধব করতে। সাহিত্যবিষয়ক বহু গ্রন্থের বিপরীতে আলোচ্য গ্রন্থে বানান ভুল খুঁজতে গেলে আতসকাচের প্রয়োজন হবে। যতিচিহ্নের কিছু অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের বাইরে আর যা দ্রষ্টব্য বলে প্রতিভাত হয়েছে তা হল শেষের দিকের কিছু অধ্যায় অনেকটাই সংক্ষিপ্ত হয়েছে। খানিকটা বিস্তৃত হতে পারত হয়তো।
ছাপার সমতা বজায় না থাকলেও বর্ণ সংস্থাপন যথাযথ হয়েছে। নান্দনিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে ড. গণেশ নন্দী। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে নীরেন্দ্রনাথ দাস, কল্যাণ চৌধুরী ও নীলিমা চৌধুরীর প্রতি। সব মিলিয়ে বরাকের খেলাধুলা নিয়ে এক সার্বিক সচিত্র প্রতিবেদন এই ‘সাক্ষাতে কথা’ যা ভবিষ্যতের জন্য এক দলিল হয়ে রইবে নিঃসন্দেহে।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

প্রকাশক - বাণী কর্মকার
মূল্য - ১৫০ টাকা

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...