Skip to main content

তথ্যে, নান্দনিকতায়, বিনম্র স্মৃতিচারণে উজ্জ্বল ‘আলোহাওয়া ১৮তম সংখ্যা’


একটি পত্রিকা যদি সমাজের দর্পণ হয় তাহলে একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হল সমকালিক সাহিত্যের দর্পণ। এই ভাবধারাকে আক্ষরিক অর্থেই প্রাঞ্জল সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক’ পত্রিকা ‘আলোহাওয়া’র ১৮তম সংখ্যা - ২৪তম বর্ষ, বইমেলা, পৌষ ১৪৩১ - ডিসেম্বর ২০২৪ সংখ্যা। নানারকম বাধ্যবাধকতায় পাঠকের দরবারে পৌঁছোতে যদিও মাসতিনেক বিলম্ব হয়েছে তবু বলা যায় এমন নান্দনিক একটি সংখ্যা দেরিতে হলেও আখেরে ‘সবুরে মেওয়া ফলে’ পাঠকের। কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘অপরাজিত বিজিৎকুমার ভট্টাচার্য স্মরণ সংখ্যা’ হিসেবে। প্রয়াত বিজিৎকুমার ভট্টাচার্য এ অঞ্চলের সাহিত্যক্ষেত্রে যে অবদান রেখে গেছেন তা চিরস্মরণীয়। বলতে গেলে ‘সাহিত্য’ শব্দটির স্বরূপ উদ্ঘাটন করেছেন তিনি অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও নিবেদনের মাধ্যমে। তাঁর দেখানো পথে একদিকে যেমন ঋদ্ধ হয়েছে সাহিত্যের ভাণ্ডার অন্যদিকে পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে এসেছেন একাধিক কৃতী কবি, সাহিত্যিক।
চূড়ান্ত দক্ষতায় পত্রিকাটিকে বৈভব প্রদান করেছেন সম্পাদক তাঁর সবটুকু প্রচেষ্টা উজাড় করে দিয়ে। সম্পাদকীয়তে পত্রিকা বিষয়ক এমনই কিছু তথ্যপূর্ণ ও আবেগিক বয়ান লিপিবদ্ধ হয়েছে - ‘…২৪ বছরে পদার্পণ করল সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ‘আলোহাওয়া’ পত্রিকা। মূলত এই উপত্যকার সৃজনশীল কর্মকাণ্ড তুলে ধরা। ধলেশ্বরী কাটাখাল বরাক জিরি চিরি লঙ্গাই কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের মাটি ও মানুষের কথা এবং এখানের রূপে রসে গন্ধে ভরা সাংস্কৃতিক সকল ধারার উপাদান তুলে ধরার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি…।’

‘আরেকটা কবিতা যদি আসে
সে আশায়
আরো একদিন বাঁচা এই বয়সে।
বয়স তো হয়েছে অনেক,
মানুষের কোন কাজে লাগি না তো আর
আরেকটা কবিতার ক্ষণ, অপেক্ষা এখন।’ (রচনার তারিখ - ০১.০৯.২০১২)
এভাবেই লেখালেখির শুভারম্ভ হয়েছে বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যের দুটি অপ্রকাশিত কবিতা দিয়ে। সঙ্গে সম্পদ হিসেবে রয়েছে তাঁর হাতে লেখা পাণ্ডুলিপির ছবিও। সাহিত্যকে, কবিতাকে ভালোবেসে প্রয়াত কবির দুটি অমূল্য, অসাধারণ কবিতা। এক ব্যতিক্রমী প্রয়াস নি:সন্দেহে। পত্রিকা জুড়ে মোট সতেরোটি নিবন্ধ/প্রতিবেদন/স্মৃতিচারণের ফাঁকে দুই ভাগে রয়েছে ৩০ জন কবির কবিতা। এছাড়া রয়েছে এই পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যের ৯টি কবিতা এবং শেষে রয়েছে ‘বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যের সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি’ যা অবধারিতভাবেই পাঠক, সাহিত্যসাধক ও গবেষকদের কাছে রয়ে যাবে এক সম্পদ হিসেবে।
গদ্যপর্বে বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যের সান্নিধ্যে আসা যে একাধিক গুণী কবি-লেখকরা বিভিন্ন প্রসঙ্গের অবতারণা করে নির্মোহ স্মৃতিচারণ করেছেন তাঁরা হলেন ঔপন্যাসিক আদিত্য সেন, লেখক মোহাজির হুসেইন চৌধুরী, কবি তথা গবেষণাধর্মী পত্রিকা ‘প্রবাহ’-এর সম্পাদক আশিসরঞ্জন নাথ, আলোচ্য পত্রিকার সম্পাদক জিতেন্দ্র নাথ, কবি লেখক মৃন্ময় রায়, কল্লোল চৌধুরী, সৌম্যকান্তি ভট্টাচার্য, বাপ্পি নীহার, সুদীপ্তা নাথ প্রমুখ। তাঁরা সকলেই বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে যোগাযোগের মধ্যে এসেছেন বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যের সঙ্গে। স্বভাবতই বহু তথ্য ও আন্তরিক বিষয়সমূহ উঠে এসেছে এই স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে। অনেক নামি কবি লেখকরা তাঁদের লেখায় জীবন্ত করে তুলেছেন ‘সাহিত্য’ নামের বিখ্যাত ও মূল্যবান পত্রিকার সম্পাদক তথা কবি, সাহিত্যিক এবং মানুষ বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যকে। অকপট সত্যের নির্ভীক উচ্চারণে বর্তমানের ধ্বস্ত সাহিত্যবোধ ও রাজনীতিসর্বস্ব ভাবধারার স্বরূপ উদঘাটন করে এ প্রসঙ্গে বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যের মূল্যবোধ ও প্রাসঙ্গিকতার এক নির্মোহ যৌক্তিকতা ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক সঞ্জীব দেবলস্কর। কবি দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য, যিনি বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যের ছায়াসঙ্গী হিসেবে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছিলেন এবং আজও আছেন ‘সাহিত্য’ পত্রিকার সঙ্গে তিনি স্মৃতিচারণের পাশাপাশি এই পত্রিকাটির অআকখ লিপিবদ্ধ করেছেন স্বভাবসিদ্ধ শৈলীতে যা ভবিষ্যতে এক মূল্যবান তথ্যভাণ্ডারের কাজ করবে অধ্যয়নের ক্ষেত্রটিতে। কবিপত্নী তথা ‘সাহিত্য’ পত্রিকার বর্তমান সম্পাদক শিখা ভট্টাচার্যের বিস্তৃত প্রতিবেদনে নিজস্ব প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির পাশাপাশি আন্তরিকতায় উঠে এসেছে মানুষ বিজিৎকুমার, তাঁর সাহিত্যচর্চা, জীবনচর্চার কথা। বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যের সাহিত্যবিষয়ক কর্মকাণ্ডের এক তথ্যপূর্ণ প্রতিবেদন লিপিবদ্ধ করেছেন কবি, লেখক আশুতোষ দাস। বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যের কবিতার সংক্ষিপ্ত অথচ নান্দনিক বিশ্লেষণ করেছেন সুব্রত পুরকায়স্থ। একই ধারায় দেবদত্ত চক্রবর্তী লিখেছেন কবি বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যকে নিয়ে। পিঙ্কু চন্দ ও রাজেশ শর্মার লেখায় রয়েছে বিজিৎকুমার ভট্টাচার্যের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতার বয়ান।
নানা বিষয়ে একগুচ্ছ সুচয়িত, সুললিত কবিতা যাঁরা লিখেছেন সেই প্রতিষ্ঠিত প্রবীণ থেকে সম্ভাবনাময় নবীন কবিরা হলেন - পীযূষ রাউত, অতীন দাস, তপোধীর ভট্টাচার্য, রসরাজ নাথ, তীর্থঙ্কর দাশ পুরকায়স্থ, চিত্রা লাহিড়ী, কার্তিক নাথ, দিলীপকান্তি লস্কর, ভক্ত সিং, শিবাশিস চট্টোপাধ্যায়, প্রদীপ মজুমদার, জিতেন্দ্র নাথ, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, বিজয় ঘোষ, অমিতাভ সেনগুপ্ত, নিবারণ নাথ, সৌম্যস্বপন চক্রবর্তী, চন্দ্রিমা দত্ত, মানিক চক্রবর্তী, শতদল আচার্য, স্নিগ্ধা নাথ, চিরশ্রী দেবনাথ, মৃদুলা ভট্টাচার্য, লক্ষ্মী নাথ, হাসনা আরা শেলী, আশু চৌধুরী, কিরন দেবী, বিশাল কর্মকার, শ্রীতনু চৌধুরী ও হ্যাপি নাথ।
সার্বিক গভীর গরজ ও নান্দনিকতার ছাপ পত্রিকার বিষয় নির্বাচনে ও প্রতিটি সুচয়িত চয়নে। ৭২ পৃষ্ঠার পত্রিকায় কাগজের মান, ছাপা, অক্ষরবিন্যাস সবই যথাযথ। বানানের শুদ্ধতা উল্লেখনীয় যদিও কিছু থেকেই যায় ফাঁক গলে। এ অনিবার্য। প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে আশু চৌধুরী। প্রচ্ছদচিত্রের স্পষ্টতা অধিক হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। সব মিলিয়ে উপত্যকা কিংবা উত্তরপূর্বে ভাবীকালের সাহিত্যচর্চায় এক উল্লেখযোগ্য তথ্যভাণ্ডার তথা এক নিমগ্ন সাহিত্যযোদ্ধার প্রতি বিনম্র স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে অবশ্যপাঠ্য রূপে পরিগণিত হতে পেরেছে আলোচ্য সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
প্রকাশক - সুদীপ্তা নাথ
মূল্য - ১২৫ টাকা, যোগাযোগ - ৯৩৬৫১৬০৭৩৩

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

মহানিষ্ক্ৰমণ

প্রায় চল্লিশ বছর আগে গ্রামের সেই মায়াময় বাড়িটি ছেড়ে আসতে বেজায় কষ্ট পেয়েছিলেন মা ও বাবা। স্পষ্ট মনে আছে অর্ঘ্যর, এক অব্যক্ত অসহায় বেদনার ছাপ ছিল তাঁদের চোখেমুখে। চোখের কোণে টলটল করছিল অশ্রু হয়ে জমে থাকা যাবতীয় সুখ দুঃখের ইতিকথা। জীবনে চলার পথে গড়ে নিতে হয় অনেক কিছু, আবার ছেড়েও যেতে হয় একদিন। এই কঠোর বাস্তব সেদিন প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করতে পেরেছিল অর্ঘ্যও। সিক্ত হয়ে উঠছিল তার চোখও। জন্ম থেকে এখানেই যে তার বেড়ে ওঠা। খেলাধুলা, পড়াশোনা সব তো এখানেই। দাদাদের বাইরে চলে যাওয়ার পর বারান্দাসংলগ্ন বাঁশের বেড়াযুক্ত কোঠাটিও একদিন তার একান্ত ব্যক্তিগত কক্ষ হয়ে উঠেছিল। শেষ কৈশোরে এই কোঠাতে বসেই তার শরীরচর্চা আর দেহজুড়ে বেড়ে-ওঠা লক্ষণের অবাক পর্যবেক্ষণ। আবার এখানে বসেই নিমগ্ন পড়াশোনার ফসল ম্যাট্রিকে এক চোখধাঁধানো ফলাফল। এরপর একদিন পড়াশোনার পাট চুকিয়ে উচ্চ পদে চাকরি পেয়ে দাদাদের মতোই বাইরে বেরিয়ে যায় অর্ঘ্য, স্বাভাবিক নিয়মে। ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে যায় দিদিরও। সন্তানরা যখন বড় হয়ে বাইরে চলে যায় ততদিনে বয়সের ভারে ন্যুব্জ বাবা মায়ের পক্ষে আর ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বহু জল্পনা কল্পনার শেষে ত...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...