Skip to main content

প্রয়াত মিথিলেশ : স্তব্ধ গল্পভুবন


মৃত্যু জীবনেরই এক অনিবার্য পরিণতি। বস্তুত মৃত্যুই জীবনকে করে তোলে সম্পূর্ণ। এই আপ্তবাক্য স্মরণে রেখেও কিছু মৃত্যু সহজে মেনে নেওয়া যায় না। আশির দোরগোড়ায় পৌঁছে ও সাহিত্য সৃষ্টি এবং সাহিত্যকর্মে কীভাবে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া যায় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ মিথিলেশ ভট্টাচার্য। আচমকাই যেন স্তব্ধ হয়ে গেল তাঁর যাবতীয় কর্মকাণ্ড। প্রকাশিতব্য নতুন গল্পের বই, তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘পরম্পরা’, সদ্যপ্রয়াত জনশিল্পী জুবিন গার্গকে নিয়ে প্রস্তাবিত সংখ্যা - সবকিছুকে ছেড়ে নীরবে পাড়ি দিলেন পরপারে। কিন্তু একজন সাধকের তো মৃত্যু হয় না। কথাকার, সাধক সাহিত্যিক মিথিলেশও তাই হারিয়ে যেতে পারেন না। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমেই। উত্তর পূর্ব তথা বাংলা সাহিত্যের গল্পবিশ্বে যে অবদান তিনি রেখে গিয়েছেন তার রেশ থেকে যাবে কাল থেকে কালান্তরে।
গল্প নির্মাণ ও গল্পভাবনায় মিথিলেশ ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। তাঁর একাকী জীবনে আপনজনের মতো যেন গল্পেরা নিজে থেকে এসে ধরা দিত তাঁকে পূর্ণতায় ভরিয়ে দিতে। কেউ কোনোদিন তাঁর কাছে গল্প চেয়ে নিরাশ হননি। তাঁর ঝোলার ভেতর যেন মুঠো মুঠো গল্প উন্মুখ হয়ে থাকত পাঠকের দরবারে পৌঁছে যাবার জন্য। ১৯৬৭ সালে প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘এখন সাগর’-এর পর আর থেমে থাকেননি এই নিমগ্ন গল্পকার। প্রকাশিত হয়েছে একের পর এক গ্রন্থ - ‘কক্ষপথ’, ‘চৈত্রপবনে’, ‘আত্মকথা’ ইত্যাদি। ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ ও ‘পঁচিশটি গল্প’ গ্রন্থে তাঁর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত একের পর এক সেরা গল্পগুলো যেন অশ্বমেধের ঘোড়ার মতো দিগ্‌বিদিক ছুটে বেড়িয়েছে, দাপিয়ে বেড়িয়েছে আপন বৈভবে, অনিবার গতিতে। কী নেই তাঁর গল্পে ? জন্ম-মৃত্যু, প্রেম-ভালোবাসা, প্রকৃতির সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর নির্যাস, জীবনের বিচিত্র গতিপথ সবকিছুকে ধরে রেখেছেন ভিন্নতর আঙ্গিকে, শৈলীতে। আর সবথেকে বেশি যে বিষয় উঠে এসেছে মিথিলেশের গল্পে তা হল দেশভাগ ও আটপৌরে দিনমজুরের রোজনামচা, আর্থিক বৈষম্যের শিকার হওয়া মানুষের জীবনগাথা, তাদের বিচিত্র জীবিকার বাখান, তথাকথিত নিম্ন শ্রেণির মানুষের সামাজিক অবস্থান এবং তাদের সমাজের জীবন্ত চালচিত্র। দেশভাগের গল্প যখন আজ সহজলভ্য দু:খ দুর্দশার একঘেয়ে একপেশে বয়ানে তখন মিথিলেশ তাঁর কলমকে তরবারি হিসেবে ব্যবহার করেছেন সাহসী প্রতিবাদের মাধ্যমে।
তাঁর আদর্শ ছিলেন মূলত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। পরবর্তীতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন তিন বন্দ্যোপাধ্য্যয় - বিভূতিভূষণ, তারাশংকর ও মানিক-এর নিমগ্ন পাঠে। অথচ প্রথম থেকেই নিজস্ব পরিচিতিতে পরিচিত হওয়া মিথিলেশের গল্প পাঠককে বেঁধে রাখে গল্পের বুনোট ও প্রাঞ্জল গল্পময়তায়। গল্পের অবয়বের মধ্যে হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না বিশাল কোনও ঘটনাপ্রবাহ, পাওয়া যাবে না কোনও ঘটনার ঘনঘটা, চাপান উতোর, বিশাল কোনও চমক কিংবা এক দম বন্ধ করা ক্লাইম্যাক্স, তবু পাঠককে পড়ে শেষ করতেই হবে গল্প। এবং পাঠান্তে পাঠক চিত্তে অবধারিত হয়ে ফুটে উঠবে গল্পের রেশ। সার্থক ছোটগল্পের সংজ্ঞায়িত সমাপ্তির একশো ভাগ নিয়ম মেনে বা না মেনে শেষ হওয়া প্রতিটি ছোটগল্পের বিষয় এবং সমস্যার সমাধানকল্পে গল্পকারের দাওয়াই নিয়ে ভাবতে হবে নিরালায় বসে। প্রতিটি অনিয়ম, প্রতিটি সমস্যাকে গল্পের মোড়কে এমন অনায়াসলব্ধ নৈপুণ্যে সাজিয়ে উপস্থাপন করা হয় যেন পাঠক চলেন গল্পের সাথে সাথে আটপৌরে জীবনপথে। কিন্তু পাঠান্তে ভেসে উঠবে গল্পের বিষয়বস্তু এবং মনে হবে কত চেনা সব দৃশ্যপট যেন পুনর্বার উন্মোচিত হল চোখের সামনে। তাঁর প্রতিটি গল্পের মধ্যে যেন মিশে রয়েছে আলাদা রকমের এক স্বকীয়তা যা পাঠকের পঠনসুখকে নিরন্তর বজায় রেখে যায়। এক গল্প থেকে আরেক গল্পে চলে যেতে উদ্‌বুদ্ধ করে নিরন্তর। খেটে খাওয়া গরিবগুর্বোদের থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত সমাজের টানাপোড়েনে আবদ্ধ চরিত্ররাই প্রাধান্য পেয়েছে মিথিলেশের গল্পগুলিতে। তাদের যে পাহাড়প্রমাণ সমস্যা সেইসব সমস্যার গভীরে প্রোথিত যে মনস্তাত্ত্বিক পশ্চাৎপট তারই কাঁটাছেড়া বিশ্লেষণে প্রোথিত হয়েছে গল্পসমূহের গভীরতা। সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে বিদ্বজন অবধি তাই এই গল্পসমূহের সমান গ্রহণযোগ্যতা।
প্রকৃতি নিরন্তর টানত গল্পকারকে। নানা গল্পে তার আভাস। কল্পনার কোনও অতিপ্রাকৃত ক্যানভাস নয়, মিথিলেশের প্রকৃতিবন্দনা আপন পরিসরকে নিয়েই। পাঁচজন আটপৌরে মানুষের চোখ আর গল্পকারের দেখার চোখের এই ফারাক মূর্ত হয়ে ওঠে গল্পে গল্পে। আমাদের অতি আপন পটভূমিও যে একটি সার্থক ছোটগল্পের প্রেক্ষাপট হয়ে উঠতে পারে তা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন গল্পকার তাঁর একের পর এক গল্পে। আর সেসবই জীবন্ত হয়ে ওঠে তাঁর লেখার অনবদ্য ছন্দে। যেন গল্পবনানীর শাখায় শাখায় লেগে থাকা গল্পগুলো অনায়াসলব্ধ দক্ষতায় পেড়ে আনেন তিনি। এই পরিপ্রেক্ষিতে একটুখানি অনুধাবন করার চেষ্টা করা যেতে পারে গল্পের শৈলী বা বুনোটকে ছুঁয়ে যাওয়ার -
‘লালমাটি বিছানো গলিপথের কিছু জায়গা গিরিনবাবুদের নারকেল গাছের কুচি কুচি ছড়ানো হলুদ ফুলে ছেয়ে আছে। বেশ লাগছে দেখতে। পথের ডান পাশে বিনয়দের বেঁটে মাপের দেয়াল ডিঙিয়ে বিশাল আকৃতির দুটি মানকচু পাতা বাইরের দিকে চলে এসেছে। কী গাঢ় সবুজ রঙের পাতা। ছেলেবেলা কত বৃষ্টিঝরা দিনে একখানা ছাতার অভাবে মানকচু পাতা মাথায় দিয়ে অসিতবরণ ও তার সঙ্গীসাথিরা স্কুলে পড়তে গেছে। ঝিমলিদের স্থলপদ্ম গাছের ডালে একদল চড়ুই কিচিরমিচির শব্দে ঝগড়া বাঁধিয়েছে। কয়েকটি শাদা ও হলদে রঙের প্রজাপতি আচমকা উড়ে গেল তাদের সামনে দিয়ে। একটি খয়েরি রঙের ফড়িং এসে উড়ে বসল ঝিমলিদের দেয়ালে...।’ (গল্প - দেখার চোখ’।) আহা ! পাহাড় কিংবা সমুদ্র নয় এ একেবারেই একান্ত আপন পরিমণ্ডলের চেনা আবহ, এখানেও যে প্রকৃতি উপস্থিত আছে তার সাজানো সম্ভার নিয়ে কতজন সেই সন্ধানে ব্রতী হয়েছেন ? এখানেই মিথিলেশের বাহাদুরি। তাঁর অন্যতম বিখ্যাত গল্প ‘কেশবলালের ভূমিকা’য় সামান্য একটি ঘাস কাটার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকৃতির অসামান্য দীর্ঘ বর্ণনা আলাদা করে দাগ কাটে পাঠক মনে।
ঠিক তেমনি জড়কে জীবন্ত করে তোলাতেও জুড়ি নেই তাঁর। ‘প্রণতি বুক স্টল’ গল্পে বই পড়ার যুগ শেষে একটি বুক স্টলের বর্ণনাও এভাবেই ভাবনার সৃষ্টি করে পাঠক হৃদয়ে - “...দুপুরবেলার হইচইমুখর, জমজমাট শহরে সকলে কেমন নিজ নিজ পসার সাজিয়ে চুটিয়ে ব্যবসা করছে, আর প্রণতি বুক স্টল স্তব্ধ বোবা, অসাড় হয়ে পড়ে আছে এক কোণে। মৌচাক ঘিরে মৌমাছির অহর্নিশ ব্যস্ততার মতো পথের দু’পাশে অসম্ভব চঞ্চল এক ব্যস্ততা। কাপড়-জুতোজামা, ওষুধপত্র, মনোহারি জিনিস, ঘড়ি-মোবাইল-সাইবার কাফে, পার্লার-মিষ্টি-ফলপাকুড়, জাঙ্কফুড-শপিংমল-বিগবাজার, হোটেল-রেস্তোঁরা, রমরমা ব্যবসা, হাঁকডাক বেচাকেনা - শুধু ক্রেতাহীন হাঁকডাকশূন্য পড়ে আছে ভীষণ একেলা বোবায় ধরা প্রণতি বুক স্টল।’
ভাষার অনবদ্য প্রয়োগে প্রকৃতি আর ভালোবাসা, দুঃখগাথা আর জড়ের ব্যক্তিকরণের মতো জটিল বিষয়কে অনবদ্য মুনশিয়ানায় লিপিবদ্ধ করেন লেখক - “একটি বাড়ির গভীর কালো দীর্ঘ ছায়া যখন অন্য আরেক সিঁদুর মাখানো বাড়িকে পূর্ণগ্রাসে উদ্যত, রক্তে তখন ‘জলকে চল্‌’ চাঞ্চল্য। কত বৃথা এই চঞ্চলতা... চূর্ণ আঁধার যখন চিলের ডানার মতো চুপে গভীর নীলকে কালচে সীসাবর্ণ করে দেয়; বুকে তখন তিরবেঁধা পাখির আর্ত আকুলতা...।” (গল্প - সৌরকলঙ্কে তার ছায়া)। কিংবা - “ঘরের মেঝেতে নেমে অভ্যস্ত পায়ে হেঁটে লীলা দরজার কাছে গিয়ে জীর্ণ পাল্লা দু’টো শব্দ তুলে হাট করে খুলে দেয়। খুলে দিতেই দরজার গায়ে ওৎ পেতে বসা একফালি শাদা জোছনা বেড়ালছানার মতো নধর শরীরে ঘরের উঁচু-নিচু, অসরল মেঝেতে লাফ মারে। ঘরের ভিতরকার দমচাপা জমাট অন্ধকার সামান্য ফিকে হয়ে আসে তাতে।” (গল্প - ছারপোকা)।
গল্পে রূপক, ব্যঞ্জনা, পরাবাস্তববাদ এমন এক অনুষঙ্গ যা উপাদেয় করে তোলে পরিবেশনা। মিথিলেশের গল্পে আকছার পাওয়া যায় এইসব অনুষঙ্গ - ‘...নির্জন নদীপারে অস্পষ্ট কুয়াশায় চারজন লোক এসে দাঁড়ায়। একজনের হাতে ধরা ধোঁয়াটে লণ্ঠন। তাদের কাঁধে অনেক দূর থেকে বাহিত হয়ে এসেছে একটি শবদেহ। কাঁধ থেকে নামিয়ে নদীপারে রাখে তারা। এরপর নীরবে চিতা সাজায়। অদূরে দাঁড়িয়ে মৃগাঙ্ক অপলক চোখে দেখে যায় চিতা সাজানো। একসময় দুজন লোক শবদেহের আচ্ছাদন খুলে ধরে। মৃগাঙ্ক চমকে ওঠে ঘোর বিস্ময়ে। কী দেখল সে ? এ যে তারই মৃতদেহ ! আকাশের দিকে মুখ করে টানটান হয়ে নিথর শুয়ে আছে সে। চোখের কোনায় টলমল করছে দু’ফোঁটা অশ্রুবিন্দু। এই ছবি সে ছেলেবেলা থেকেই ঘুরে ঘুরে দেখে আসছে। চিতায় শায়িত তার শবদেহ। একজন অস্পষ্ট চেহারার লোক মৃতদেহের প্রদক্ষিণ শেষ করে তার মুখে আগুন দিচ্ছে। দাউ দাউ করে জ্বলছে তার দেহ। আগুনের তাণ্ডবে দূর অনেক দূর হয়ে যাচ্ছে পৃথিবী, মানুষ, গাছপালা...। মৃগাঙ্ক চুপিচুপি এসে চিতায় শায়িত মৃতদেহের কাছে দাঁড়ায়...।’ (গল্প - আট বছর আগের একদিন।)
নানা বিষয় নিয়ে নিটোল গল্পের এক আপন বিশ্ব গড়ে তুলেছেন মিথিলেশ। তাঁর গল্পে দেশভাগের ছায়া থাকবে না এ অসম্ভব। নিঃসহায় মানুষের জীবনযুদ্ধের শেষ পরিণতিও যে সব সময় সুখকর হয় না তার অপূর্ব চিত্রায়ন ফুটে ওঠে তাঁর গল্পে - ‘...ধীর পায়ে হেঁটে শ্রাদ্ধবাসরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় বারীন। ...ধুপ পোড়ার গন্ধ। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারপাশ। উচ্চকিত সুরের মন্ত্রপাঠ। মৃদুকণ্ঠে আত্মীয় পরিজনের গালগল্প। কচিকাঁচাদের হই-হুল্লোড়। ওসব কিছুর আড়ালে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছেন নিবারণকাকা। নিতান্ত আটপৌরে, সাদামাটা, অকিঞ্চিৎকর এক ব্যক্তি। দূর থেকে দূরে - সকল পার্থিব যোগসূত্র আজ ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে। কোথায় যেন বিঁধছিল বারীনের। এক অব্যক্ত বেদনা বোধ করছিল সে। আবছা হতে হতে দূরে - বহু দূরে মুছে যাচ্ছে যেন একটি বিশাল অধ্যায়, একটি স্থির প্রত্যয়, একটি দেশ...।’ মিথিলেশের গল্পে হৃদয়ের কথা উচ্চারিত হয় ছত্রে ছত্রে।
বেশ কিছু গল্পে প্রেম, ভালোবাসার অসাধারণ এক একটি চিত্র অঙ্কিত হয়েছে অসামান্য দক্ষতায় যেখানে হৃদয়ের আকুলতা এবং শরীরী ভাষার সহাবস্থান যেন স্বচ্ছ জলের মতো পরিস্ফুট হয়ে আছে। এমন প্রতিটি কোলাজ যেন এসেছে গল্পেরই খাতিরে। কোথাও অশ্লীলতা কিংবা যৌনধর্মী বর্ণনার দেখা পাওয়া যায় না। জীবনের এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবেই পরিমিতিবোধের নমুনা রেখেছেন গল্পকার সব জায়গাতেই।
সহজাত দক্ষতায় রূপক, ব্যাঞ্জনা, বর্ণনায় সমৃদ্ধ মিথিলেশের একাধিক গল্প - যেমন ‘গোপাল যখন বিচারক’, ‘দৌড় ৪০’, ‘জন্মভূমি, পুনশ্চ’, ‘অজগরটি আসছে তেড়ে’, ‘জগৎ পারাবারের তীরে’, ‘অথ মহাসেন কথা’ ইত্যাদি। ভিন্ন প্রেক্ষাপট, ভিন্ন আঙ্গিক তবু বর্ণনার ঘনঘটায় সবগুলি গল্প সরস এবং সার্থক। ‘একটি অবাস্তব ঘটনার খসড়া চিত্র’ দাঙ্গাবিরোধী একটি অনবদ্য গল্প লিখেছেন তিনি যেখানে শুধু সমস্যার গভীরেই আলোকপাত করে থেমে থাকেননি গল্পকার, সমাধানের পথও দেখিয়েছেন। এখানেই মিথিলেশের স্বাতন্ত্র্য।
‘জন্মভূমি পুনশ্চ’ গল্পটি গল্পকার মিথিলেশ তাঁর নিজস্ব পছন্দের জায়গার উপর লিখেছেন বলে দেশভাগের উপর আর পাঁচজন গল্পকারের নিছক কান্নাকাটির গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে সোজাসাপটা ভাষায় প্রতিবাদের সাহস দেখিয়েছেন। কঠোর বাস্তবকে সাহিত্যে রূপান্তর করা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। এ কাজটিই তিনি করেছেন সাবলীল লেখনীর সহায়তায়। বস্তুত এক বিশাল পরিসর মিথিলেশ ভট্টাচার্যের গল্পভুবনে। যে ভুবন সাবলীল ছন্দে ঋদ্ধ করে যাচ্ছিল অগণিত পাঠকের তৃষিত হৃদয়। আজ হঠাৎ করেই যেন নিস্তব্ধ অন্তরালে পড়ে রইল আস্ত এক গল্পভুবন। আবার যদি কেউ উঠে আসেন গল্পের এমনতরো নির্যাস, এমনতরো সম্ভার নিয়ে তাহলে হয়তো কিছুটা স্তিমিত হবে পাঠক-তৃষ্ণা। তবু সেই আসন থেকেই যাবে আপন মর্যাদায় উদ্ভাসিত, যে আসনে বসার অধিকার একজনেরই - অপ্রতিদ্বন্দ্বী মিথিলেশ, গল্পভুবনের একচ্ছত্র সম্রাট - এক এবং অদ্বিতীয় মিথিলেশ ভট্টাচার্য।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

মহানিষ্ক্ৰমণ

প্রায় চল্লিশ বছর আগে গ্রামের সেই মায়াময় বাড়িটি ছেড়ে আসতে বেজায় কষ্ট পেয়েছিলেন মা ও বাবা। স্পষ্ট মনে আছে অর্ঘ্যর, এক অব্যক্ত অসহায় বেদনার ছাপ ছিল তাঁদের চোখেমুখে। চোখের কোণে টলটল করছিল অশ্রু হয়ে জমে থাকা যাবতীয় সুখ দুঃখের ইতিকথা। জীবনে চলার পথে গড়ে নিতে হয় অনেক কিছু, আবার ছেড়েও যেতে হয় একদিন। এই কঠোর বাস্তব সেদিন প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করতে পেরেছিল অর্ঘ্যও। সিক্ত হয়ে উঠছিল তার চোখও। জন্ম থেকে এখানেই যে তার বেড়ে ওঠা। খেলাধুলা, পড়াশোনা সব তো এখানেই। দাদাদের বাইরে চলে যাওয়ার পর বারান্দাসংলগ্ন বাঁশের বেড়াযুক্ত কোঠাটিও একদিন তার একান্ত ব্যক্তিগত কক্ষ হয়ে উঠেছিল। শেষ কৈশোরে এই কোঠাতে বসেই তার শরীরচর্চা আর দেহজুড়ে বেড়ে-ওঠা লক্ষণের অবাক পর্যবেক্ষণ। আবার এখানে বসেই নিমগ্ন পড়াশোনার ফসল ম্যাট্রিকে এক চোখধাঁধানো ফলাফল। এরপর একদিন পড়াশোনার পাট চুকিয়ে উচ্চ পদে চাকরি পেয়ে দাদাদের মতোই বাইরে বেরিয়ে যায় অর্ঘ্য, স্বাভাবিক নিয়মে। ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে যায় দিদিরও। সন্তানরা যখন বড় হয়ে বাইরে চলে যায় ততদিনে বয়সের ভারে ন্যুব্জ বাবা মায়ের পক্ষে আর ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বহু জল্পনা কল্পনার শেষে ত...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...