তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সে কি মোর অপরাধ?
চাঁদেরে হেরিয়া কাঁদে চকোরিণী বলে না তো কিছু চাঁদ।।
চেয়ে’ চেয়ে’ দেখি ফোটে যবে ফুল
ফুল বলে না তো সে আমার ভুল
মেঘ হেরি’ ঝুরে’ চাতকিনী, মেঘ করে না তো প্রতিবাদ।।
জানে সূর্যেরে পাবে না তবু অবুঝ সূর্যমুখী
চেয়ে’ চেয়ে’ দেখে তার দেবতারে দেখিয়াই সে যে সুখী।
হেরিতে তোমার রূপ–মনোহর
পেয়েছি এ আঁখি, ওগো সুন্দর।
মিটিতে দাও হে প্রিয়তম মোর নয়নের সেই সাধ।
কৈশোরোত্তীর্ণ কালে অ্যাভারেজ পুরুষের প্রিয় গানগুলির তালিকায় এই নজরুলগীতিটিও এক অবধারিত অন্তর্ভুক্তি। স্বভাবতই সুকান্তবাবুও অন্যথা নন। যতবার শুনতেন ততবারই অভিভূত হয়ে পড়তেন। এত বাস্তব, অন্তর নিংড়ে নেওয়া এতখানি সত্যকথন নিয়ে সুরে সুরে এক অসামান্য গান নজরুলের। প্রকৃতার্থেই এক নিখাদ প্রেমের কবি নজরুল। রবীন্দ্রনাথকে বোঝে ওঠার বয়স তখনও হয়নি সুকান্তবাবুর। নজরুল তাই তাঁর হৃদয়ের বেশিটুকু নিয়ে বসত করেন নিতিদিন।
###
‘গণেশ নগর - লতাকাটা…, গণেশ নগর - লতাকাটা…’ বলে চেঁচিয়ে না হলেও মোটামুটি উচ্চৈ:স্বরে হাঁক পাড়ছিল ড্রাইভার। সকাল আর দুপুরের মাঝখানে এক রিক্ত প্রহরের সৃষ্টি হয় প্রতিদিন। লোকজনের কর্মচঞ্চলতা যে কিছু সময়ের জন্য থমকে থাকে। এটা লক্ষ করেছেন সুকান্তবাবু। যানবাহনগুলো যাত্রী খুঁজে পায় না, দোকানে দোকানে মালিক-কর্মচারী দরজার দিকে তাকিয়ে খরিদ্দারের জন্য হাপিত্যেশ করে।
‘হয়ে গেছে?’
এমন কালবেলায় পাশ দিয়ে পরিচিত সুকান্তবাবুকে এগিয়ে আসতে দেখেই একটু স্বস্তির হাসি হেসে ড্রাইভার বলল - ‘হ্যাঁ স্যার, বসে পড়ুন।’
পেছনের মুখোমুখি দুটি সিটে চারজনের বসার জায়গা। সেই হিসেবে চারজন যাত্ৰী হলেই ছেড়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু ছাড়ছিল না, ছাড়ে না ই-রিকশা। অষ্টোত্তর শতনাম না হলেও অন্তত ‘অষ্ট’টি নাম তো রয়েছেই তার। তবে এখানে, এই শহরতলি এলাকায় এ টোটো নামেই পরিচিত। সারা দিন টো-টো করে ঘুরে বেড়ায় বলেই হয়তো এমন নাম পড়েছে। তবে তার ঘুরে বেড়ানো যথেচ্ছ নয়। নির্দিষ্ট রুট আছে। এখানে নতুন বাজার থেকে লতাকাটা হয়ে গণেশনগর ও ফিরে আসা ফের নতুন বাজার। সামনে ড্রাইভারের পাশে কখনও একজন আবার সুযোগ পেলে দুজন বসিয়ে অতিরিক্ত লাভের আশা করাটা আজকের দিনে কোনও অপরাধের পর্যায়ে হয়তো পড়ে না।
সুকান্তবাবু এখন প্রৌঢ়ত্বের শেষ পর্যায়ে। আর কিছুদিনের মধ্যেই সিনিয়র সিটিজেনের দলে নাম লেখাবেন। এ নিয়ে বিশেষ চিন্তিত নন সুকান্তবাবু। তবে খারাপ লাগে এটা ভেবেই যে সেই পাঁচ বছর আগে কোভিডের বাহানায় ভারতীয় রেল সিনিয়র সিটিজেনদের টিকিটের ক্ষেত্রে দেওয়া ছাড় যে উঠিয়ে নিয়েছিল সেটা আর পুনর্বহাল করছে না। বীতশ্ৰদ্ধ সুকান্তবাবু ভাবছেন এ নিয়ে শীঘ্রই অভিযোগ দায়ের করবেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।
রোজ না হলেও সপ্তাহে অন্তত চার পাঁচ দিন সন্ধের পর অফিস ফেরত সুকান্তবাবু এটা ওটা কেনার বাহানায় কিংবা কখনও নেহাত প্রয়োজনেই একবার নতুন বাজার যান। আবার বন্ধ দিনে সকালের জলখাবার খেয়ে একটু না বেরোলেও উশখুশ করতে থাকে মন। তাই বেরোন। কাজে বা অকাজে হলেও। কাজও হল আর খানিক আড্ডা, একটু ব্যতিক্রমী সময় কাটানো। বাজারে মাছগুলো, তাজা সবুজ সবজিগুলো থরে থরে সাজানো দেখেও এক পরিতৃপ্তি। প্রসাদ রেস্টুরেন্টের এক কাপ সতেজ চা, মহেশ পান ভাণ্ডারের একখিলি পান কিংবা মাঝে মাঝে নেভি কাট-এ কয়েকদফার সুখটান। এসব মন্দ লাগে না রোজকার একঘেয়েমি এড়াতে। দুই এবং চার চাকার গাড়ি থাকলেও মাঝে মাঝে হেঁটে কিংবা টোটো করেই যেতে আসতে তাঁর পছন্দ। এতে একটুখানি হাঁটাহাঁটি ব্যায়াম হয়ে যায়। আবার এক সামাজিক বোধও অনুভূত হয়। নিজের জন্মস্থান কিংবা যৌবনের লীলাভূমি ছেড়ে এসে নতুন জায়গায়, নতুন পরিবেশে থিতু হয়েছেন কয়েক বছর হল। এই বয়সে নতুন করে বন্ধুতা কিংবা সামাজিক হয়ে ওঠা দুষ্কর।
###
বাজার শেষ করে গণেশ নগরের টোটো স্ট্যান্ডে এসে সুকান্তবাবু দেখলেন পেছনে চারজন যাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। সামনে ড্রাইভারের পাশে একজন অতিরিক্ত যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছে তরুণ টোটো ড্রাইভার। বাজারের থলে হাতে সুকান্তবাবুকে দেখেই ড্রাইভার তাই পেছনে বসা এক যুবক যাত্রীকে অনুরোধ জানালো সামনে চলে আসার জন্য। যুবকও বিনা বাক্যব্যয়ে নেমে সামনে চলে গেল। সবার পারস্পরিক বোঝাপড়ায় জটিল সমস্যাও যেখানে সহজে সমাধান হয়ে যায় সেখানে এ আর এমন কী ?
উঠে বসলেন সুকান্তবাবু। হাতের ছোট্ট ব্যাগটি দুপায়ের মাঝে টোটোর মেঝেতে রেখে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন সহযাত্রীদের দিকে। আর এটা করতে গিয়েই তাঁর সামনে মুখোমুখি বসা মেয়েটির দিকে যেন স্থির হয়ে রইল তাঁর দৃষ্টি। এক লহমায় তিনি যা দেখলেন তা মোটামুটি এরকম - বয়স পনেরো থেকে কুড়ি, গায়ের রং ঈষৎ চাপা, চোখ দুটি যেন সদ্য প্রস্ফুটিত কুসুমকলি, মুখের গড়ন অর্ধগোলাকার, দুচারগাছা অবাধ্য চুল চোখ বেয়ে কপাল থেকে কপোল সর্বত্র দোলায়িত হচ্ছে। বাকিটা পরিপাটি করে বাঁধা আছে পনিটেল করে।
আসলে এ সবকিছুই এক মুহূর্তের অবলোকন। সুকান্তবাবু এক নিমেষেই এসব দেখলেন। তিনভাগের একভাগ বয়সের মেয়েটির দিকে এই এক নিমেষের তাকানোটাই যেন কাল হল সুকান্তবাবুর। এর পর দশ মিনিটের এই যাত্রায় নিদেনপক্ষে আরও দশবার তাঁকে তাকাতেই হল হাঁটুর বয়সী মেয়েটির দিকে। প্রতিবারই সহযাত্রীদের চোখে নিজেকে ছোট না করে এক পলকের জন্য শুধু দেখা। চোখ যেন ফেরাতেই পারছেন না তিনি। ভেতরে একটা তোলপাড় ভাবনা অনুভব করছেন বারবার। তবু সামলে রাখতে পারছেন না নিজেকে। কিছু ভাবনা, কিছু বিরক্তির উদ্রেক হচ্ছে নিজেরই উপর। কী ভাববে এই একরত্তি মেয়েটা ? বুড়ো বয়সের ভীমরতি ? নাকি হ্যাংলামো ? নিজেকে বড্ড ছোট মনে হতে লাগল তাঁর। তবু কেমন এক অসহায় অবস্থায় পড়েছেন যেন। কিছুক্ষণ পর পরই মন আর চোখ নিজে থেকেই গিয়ে আবদ্ধ হচ্ছে সেই এক জায়গায়। বারদুয়েক চোখাচোখিও হল। সুকান্তবাবু ঝটিতি সরিয়ে নিয়েছেন তাঁর চোখ। কিন্তু সে আর কতক্ষণের জন্য ?
এবার নিজের উপর সত্যিকারের একটা ঘেন্না, একটা অসহায় ভাব উৎপন্ন হল তাঁর। ভাবতে থাকলেন কেন এমন হচ্ছে ? আর এটা যে এই প্রথম হচ্ছে তাও নয়। এর আগেও বহুবার এমন হয়েছে। তবে কি সত্যিই তিনি হ্যাংলা ?
##
ঘরে ফিরে নিজেরই উপর বিরক্ত সুকান্তবাবু এ নিয়ে ভাবতে বসলেন গভীর ভাবে। ভেবে ভেবে একসময় স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন সুকান্তবাবু। আসলে মানুষ নিয়তই সুন্দরের পূজারি। সে নারী হোক কিংবা পুরুষ, প্রকৃতি হোক কিংবা নন্দনতত্ত্ব। আজকের মুখোমুখি বসা মেয়েটির মুখাবয়ব ছিল নিছকই সৌন্দর্যের একটি প্রতীক। সুন্দরের দিকে বারবার দৃষ্টি ধাবিত হওয়াটা এক স্বতঃস্ফুর্ত প্রক্রিয়া। এতে সুকান্তবাবুর বয়স কিংবা লিঙ্গ বা সামাজিক অবস্থান এসবের কোনো যোগাযোগ নেই। বোধ সম্পন্ন মানুষের এ এক অন্তর্নিহিত উপাদান। সুকান্তবাবুর মনে হল আজকের সমাজ এবং বিশেষ করে মহিলারা পুরুষের বিরুদ্ধে প্রয়োজনের থেকে একটু বেশিই রুষ্ট নাকি ? কিছু বিচ্ছিন্ন অপরাধীর বাইরে প্রায় একশো শতাংশ পুরুষ যে নিজেদের কোষের মধ্যে জৈবিক তাড়নার উপস্থিতি সত্ত্বেও নিজেদের সংযত করে রাখে, নারীকে তার উপযুক্ত সম্মানটুকু অন্তরের তাগিদ থেকেই করে তার কোনো মূল্য দেয় না কেউ। পুরুষের দৃষ্টি মাত্রই যে লোলুপ নয় তা বুঝতেই চায় না অনেকে। অথচ নজরুলই তো লিখে গেছেন -
বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। …
এ বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল ফলিয়াছে যত ফল
নারী দিল তাহে রূপ-রস-মধু-গন্ধ সুনির্মল। …
শস্যক্ষেত্র উর্বর হল, পুরুষ চালাল হল
নারী সে মাঠে শস্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল…।
টোটো যাত্রার রেশ থেকে যাবে কিছুক্ষণ, হয়তো কিছু দিনও। জানেন সুকান্তবাবু - সে মেয়েটি তাকে যাই ভাবুক না কেন। তবে নিঃসন্তান সুকান্তবাবু ভাবছেন তাঁর কুড়ি বছরের বিবাহিত জীবনে এই মেয়েটির অন্তত অর্ধেক রূপলাবণ্য নিয়েও যদি একটি কন্যা সন্তান তাঁর ঘর আলোকিত করে আসত তাহলে তাঁদের জীবনটাই আজ অন্যরকম হতো।
চাঁদেরে হেরিয়া কাঁদে চকোরিণী বলে না তো কিছু চাঁদ।।
চেয়ে’ চেয়ে’ দেখি ফোটে যবে ফুল
ফুল বলে না তো সে আমার ভুল
মেঘ হেরি’ ঝুরে’ চাতকিনী, মেঘ করে না তো প্রতিবাদ।।
জানে সূর্যেরে পাবে না তবু অবুঝ সূর্যমুখী
চেয়ে’ চেয়ে’ দেখে তার দেবতারে দেখিয়াই সে যে সুখী।
হেরিতে তোমার রূপ–মনোহর
পেয়েছি এ আঁখি, ওগো সুন্দর।
মিটিতে দাও হে প্রিয়তম মোর নয়নের সেই সাধ।
কৈশোরোত্তীর্ণ কালে অ্যাভারেজ পুরুষের প্রিয় গানগুলির তালিকায় এই নজরুলগীতিটিও এক অবধারিত অন্তর্ভুক্তি। স্বভাবতই সুকান্তবাবুও অন্যথা নন। যতবার শুনতেন ততবারই অভিভূত হয়ে পড়তেন। এত বাস্তব, অন্তর নিংড়ে নেওয়া এতখানি সত্যকথন নিয়ে সুরে সুরে এক অসামান্য গান নজরুলের। প্রকৃতার্থেই এক নিখাদ প্রেমের কবি নজরুল। রবীন্দ্রনাথকে বোঝে ওঠার বয়স তখনও হয়নি সুকান্তবাবুর। নজরুল তাই তাঁর হৃদয়ের বেশিটুকু নিয়ে বসত করেন নিতিদিন।
###
‘গণেশ নগর - লতাকাটা…, গণেশ নগর - লতাকাটা…’ বলে চেঁচিয়ে না হলেও মোটামুটি উচ্চৈ:স্বরে হাঁক পাড়ছিল ড্রাইভার। সকাল আর দুপুরের মাঝখানে এক রিক্ত প্রহরের সৃষ্টি হয় প্রতিদিন। লোকজনের কর্মচঞ্চলতা যে কিছু সময়ের জন্য থমকে থাকে। এটা লক্ষ করেছেন সুকান্তবাবু। যানবাহনগুলো যাত্রী খুঁজে পায় না, দোকানে দোকানে মালিক-কর্মচারী দরজার দিকে তাকিয়ে খরিদ্দারের জন্য হাপিত্যেশ করে।
‘হয়ে গেছে?’
এমন কালবেলায় পাশ দিয়ে পরিচিত সুকান্তবাবুকে এগিয়ে আসতে দেখেই একটু স্বস্তির হাসি হেসে ড্রাইভার বলল - ‘হ্যাঁ স্যার, বসে পড়ুন।’
পেছনের মুখোমুখি দুটি সিটে চারজনের বসার জায়গা। সেই হিসেবে চারজন যাত্ৰী হলেই ছেড়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু ছাড়ছিল না, ছাড়ে না ই-রিকশা। অষ্টোত্তর শতনাম না হলেও অন্তত ‘অষ্ট’টি নাম তো রয়েছেই তার। তবে এখানে, এই শহরতলি এলাকায় এ টোটো নামেই পরিচিত। সারা দিন টো-টো করে ঘুরে বেড়ায় বলেই হয়তো এমন নাম পড়েছে। তবে তার ঘুরে বেড়ানো যথেচ্ছ নয়। নির্দিষ্ট রুট আছে। এখানে নতুন বাজার থেকে লতাকাটা হয়ে গণেশনগর ও ফিরে আসা ফের নতুন বাজার। সামনে ড্রাইভারের পাশে কখনও একজন আবার সুযোগ পেলে দুজন বসিয়ে অতিরিক্ত লাভের আশা করাটা আজকের দিনে কোনও অপরাধের পর্যায়ে হয়তো পড়ে না।
সুকান্তবাবু এখন প্রৌঢ়ত্বের শেষ পর্যায়ে। আর কিছুদিনের মধ্যেই সিনিয়র সিটিজেনের দলে নাম লেখাবেন। এ নিয়ে বিশেষ চিন্তিত নন সুকান্তবাবু। তবে খারাপ লাগে এটা ভেবেই যে সেই পাঁচ বছর আগে কোভিডের বাহানায় ভারতীয় রেল সিনিয়র সিটিজেনদের টিকিটের ক্ষেত্রে দেওয়া ছাড় যে উঠিয়ে নিয়েছিল সেটা আর পুনর্বহাল করছে না। বীতশ্ৰদ্ধ সুকান্তবাবু ভাবছেন এ নিয়ে শীঘ্রই অভিযোগ দায়ের করবেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।
রোজ না হলেও সপ্তাহে অন্তত চার পাঁচ দিন সন্ধের পর অফিস ফেরত সুকান্তবাবু এটা ওটা কেনার বাহানায় কিংবা কখনও নেহাত প্রয়োজনেই একবার নতুন বাজার যান। আবার বন্ধ দিনে সকালের জলখাবার খেয়ে একটু না বেরোলেও উশখুশ করতে থাকে মন। তাই বেরোন। কাজে বা অকাজে হলেও। কাজও হল আর খানিক আড্ডা, একটু ব্যতিক্রমী সময় কাটানো। বাজারে মাছগুলো, তাজা সবুজ সবজিগুলো থরে থরে সাজানো দেখেও এক পরিতৃপ্তি। প্রসাদ রেস্টুরেন্টের এক কাপ সতেজ চা, মহেশ পান ভাণ্ডারের একখিলি পান কিংবা মাঝে মাঝে নেভি কাট-এ কয়েকদফার সুখটান। এসব মন্দ লাগে না রোজকার একঘেয়েমি এড়াতে। দুই এবং চার চাকার গাড়ি থাকলেও মাঝে মাঝে হেঁটে কিংবা টোটো করেই যেতে আসতে তাঁর পছন্দ। এতে একটুখানি হাঁটাহাঁটি ব্যায়াম হয়ে যায়। আবার এক সামাজিক বোধও অনুভূত হয়। নিজের জন্মস্থান কিংবা যৌবনের লীলাভূমি ছেড়ে এসে নতুন জায়গায়, নতুন পরিবেশে থিতু হয়েছেন কয়েক বছর হল। এই বয়সে নতুন করে বন্ধুতা কিংবা সামাজিক হয়ে ওঠা দুষ্কর।
###
বাজার শেষ করে গণেশ নগরের টোটো স্ট্যান্ডে এসে সুকান্তবাবু দেখলেন পেছনে চারজন যাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। সামনে ড্রাইভারের পাশে একজন অতিরিক্ত যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছে তরুণ টোটো ড্রাইভার। বাজারের থলে হাতে সুকান্তবাবুকে দেখেই ড্রাইভার তাই পেছনে বসা এক যুবক যাত্রীকে অনুরোধ জানালো সামনে চলে আসার জন্য। যুবকও বিনা বাক্যব্যয়ে নেমে সামনে চলে গেল। সবার পারস্পরিক বোঝাপড়ায় জটিল সমস্যাও যেখানে সহজে সমাধান হয়ে যায় সেখানে এ আর এমন কী ?
উঠে বসলেন সুকান্তবাবু। হাতের ছোট্ট ব্যাগটি দুপায়ের মাঝে টোটোর মেঝেতে রেখে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন সহযাত্রীদের দিকে। আর এটা করতে গিয়েই তাঁর সামনে মুখোমুখি বসা মেয়েটির দিকে যেন স্থির হয়ে রইল তাঁর দৃষ্টি। এক লহমায় তিনি যা দেখলেন তা মোটামুটি এরকম - বয়স পনেরো থেকে কুড়ি, গায়ের রং ঈষৎ চাপা, চোখ দুটি যেন সদ্য প্রস্ফুটিত কুসুমকলি, মুখের গড়ন অর্ধগোলাকার, দুচারগাছা অবাধ্য চুল চোখ বেয়ে কপাল থেকে কপোল সর্বত্র দোলায়িত হচ্ছে। বাকিটা পরিপাটি করে বাঁধা আছে পনিটেল করে।
আসলে এ সবকিছুই এক মুহূর্তের অবলোকন। সুকান্তবাবু এক নিমেষেই এসব দেখলেন। তিনভাগের একভাগ বয়সের মেয়েটির দিকে এই এক নিমেষের তাকানোটাই যেন কাল হল সুকান্তবাবুর। এর পর দশ মিনিটের এই যাত্রায় নিদেনপক্ষে আরও দশবার তাঁকে তাকাতেই হল হাঁটুর বয়সী মেয়েটির দিকে। প্রতিবারই সহযাত্রীদের চোখে নিজেকে ছোট না করে এক পলকের জন্য শুধু দেখা। চোখ যেন ফেরাতেই পারছেন না তিনি। ভেতরে একটা তোলপাড় ভাবনা অনুভব করছেন বারবার। তবু সামলে রাখতে পারছেন না নিজেকে। কিছু ভাবনা, কিছু বিরক্তির উদ্রেক হচ্ছে নিজেরই উপর। কী ভাববে এই একরত্তি মেয়েটা ? বুড়ো বয়সের ভীমরতি ? নাকি হ্যাংলামো ? নিজেকে বড্ড ছোট মনে হতে লাগল তাঁর। তবু কেমন এক অসহায় অবস্থায় পড়েছেন যেন। কিছুক্ষণ পর পরই মন আর চোখ নিজে থেকেই গিয়ে আবদ্ধ হচ্ছে সেই এক জায়গায়। বারদুয়েক চোখাচোখিও হল। সুকান্তবাবু ঝটিতি সরিয়ে নিয়েছেন তাঁর চোখ। কিন্তু সে আর কতক্ষণের জন্য ?
এবার নিজের উপর সত্যিকারের একটা ঘেন্না, একটা অসহায় ভাব উৎপন্ন হল তাঁর। ভাবতে থাকলেন কেন এমন হচ্ছে ? আর এটা যে এই প্রথম হচ্ছে তাও নয়। এর আগেও বহুবার এমন হয়েছে। তবে কি সত্যিই তিনি হ্যাংলা ?
##
ঘরে ফিরে নিজেরই উপর বিরক্ত সুকান্তবাবু এ নিয়ে ভাবতে বসলেন গভীর ভাবে। ভেবে ভেবে একসময় স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন সুকান্তবাবু। আসলে মানুষ নিয়তই সুন্দরের পূজারি। সে নারী হোক কিংবা পুরুষ, প্রকৃতি হোক কিংবা নন্দনতত্ত্ব। আজকের মুখোমুখি বসা মেয়েটির মুখাবয়ব ছিল নিছকই সৌন্দর্যের একটি প্রতীক। সুন্দরের দিকে বারবার দৃষ্টি ধাবিত হওয়াটা এক স্বতঃস্ফুর্ত প্রক্রিয়া। এতে সুকান্তবাবুর বয়স কিংবা লিঙ্গ বা সামাজিক অবস্থান এসবের কোনো যোগাযোগ নেই। বোধ সম্পন্ন মানুষের এ এক অন্তর্নিহিত উপাদান। সুকান্তবাবুর মনে হল আজকের সমাজ এবং বিশেষ করে মহিলারা পুরুষের বিরুদ্ধে প্রয়োজনের থেকে একটু বেশিই রুষ্ট নাকি ? কিছু বিচ্ছিন্ন অপরাধীর বাইরে প্রায় একশো শতাংশ পুরুষ যে নিজেদের কোষের মধ্যে জৈবিক তাড়নার উপস্থিতি সত্ত্বেও নিজেদের সংযত করে রাখে, নারীকে তার উপযুক্ত সম্মানটুকু অন্তরের তাগিদ থেকেই করে তার কোনো মূল্য দেয় না কেউ। পুরুষের দৃষ্টি মাত্রই যে লোলুপ নয় তা বুঝতেই চায় না অনেকে। অথচ নজরুলই তো লিখে গেছেন -
বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। …
এ বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল ফলিয়াছে যত ফল
নারী দিল তাহে রূপ-রস-মধু-গন্ধ সুনির্মল। …
শস্যক্ষেত্র উর্বর হল, পুরুষ চালাল হল
নারী সে মাঠে শস্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল…।
টোটো যাত্রার রেশ থেকে যাবে কিছুক্ষণ, হয়তো কিছু দিনও। জানেন সুকান্তবাবু - সে মেয়েটি তাকে যাই ভাবুক না কেন। তবে নিঃসন্তান সুকান্তবাবু ভাবছেন তাঁর কুড়ি বছরের বিবাহিত জীবনে এই মেয়েটির অন্তত অর্ধেক রূপলাবণ্য নিয়েও যদি একটি কন্যা সন্তান তাঁর ঘর আলোকিত করে আসত তাহলে তাঁদের জীবনটাই আজ অন্যরকম হতো।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

.jpg)
Comments
Post a Comment