Skip to main content

ধারে ও ভারে সমৃদ্ধ জীবনানন্দ দাশ বিশেষ সংখ্যা - ‘পরম্পরা’


পরম্পরা শব্দটি বহু ক্ষেত্রে ঐতিহ্য শব্দটির পাশেই ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। উভয়ে মিলে যে অর্থপূর্ণ ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করে তা দেশ কাল পাত্র সমাজ সংস্কৃতির এক প্রবহমান ধারাকেই সূচিত করে। কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলা ও বাংলা কবিতার সেই ধারা, সেই ঐতিহ্য। সেই সূত্র ধরেই সম্প্রতি শিলচর থেকে কথাকার মিথিলেশ ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘পরম্পরা’ পত্রিকার ষষ্ঠ সংখ্যা -  ‘১২৫ বছর পূর্তি জীবনানন্দ দাশ বিশেষ সংখ্যা’।
একটি ছোটপত্রিকা-সংখ্যা কতটা সমৃদ্ধ হতে পারে, কতটা গরজের ছাপ লুকিয়ে থাকতে পারে তার পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় এ যেন তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সুচিন্তিত বিভাগবিন্যাস, সুচয়িত রচনাসমূহ এই সংখ্যাটিকে প্রদান করেছে এক অনন্য মর্যাদা। পেপারব্যাকে ১৩৪ পৃষ্ঠার এই পত্রিকার সম্পাদকীয় থেকে কিছু লাইন এখানে উদ্ধৃত করাই যায় - ‘…বাংলা সাহিত্যের এক বিস্ময়কর প্রতিভা জীবনানন্দ দাশ। যাঁর কবিতা পাঠককে মুহূর্তে সম্মোহিত করে চেতনা বিবশ করে দেয়। কবির জাদুকরি মুক্ত ছন্দ, শব্দ চয়ন, দৃশ্যকল্প লহমায় পাঠকের মন আচ্ছন্ন করে দেয়। জীবনানন্দের কবিতায় দৈনন্দিন জীবনের বহু অকাব্যিক শব্দ, দৃশ্য, বাক্য এমন অভাবিত সুর ও ছন্দে বেজে ওঠে যে বিমোহিত পাঠকের অন্তরাত্মা পর্যন্ত শিহরিত হয়ে ওঠে। ….এই বিস্ময়কর কবিপ্রতিভাকে তাঁর ১২৫তম জন্মদিনের প্রেক্ষিতে নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করার সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা ও ঐকান্তিক মনোবাসনার নিবৃত্তিই বর্তমান সংখ্যা ‘পরম্পরা’র অপরিহার্য প্রকাশ।
সূচিপত্র ধরে এগোলে প্রথমেই রয়েছে জীবনানন্দ দাশের ১০টি প্রকাশিত কবিতা। এই পর্বে কবির বহুচর্চিত ও বহুনন্দিত কবিতাগুলিকেই রাখা হয়েছে। যেমন ‘আবার আসিব ফিরে’, ‘বনলতা সেন’, ‘সুচেতনা’ ইত্যাদি। আজকের দিনেও পুন:পাঠে যেন নতুন বোধে আক্রান্ত হতে হয় পাঠককে। এরপরই রয়েছে লেখক, সাহিত্যিক তপোধীর ভট্টাচার্যের নিবন্ধ - ‘গল্পবীক্ষায় জীবনানন্দ’। জীবনানন্দের বিভিন্ন গল্প ও গল্পকৃতির নির্মোহ বিশ্লেষণাত্মক রচনা। রয়েছে জীবনানন্দের কবিতা ও গল্পের এক তুলনাত্মক বিশ্লেষণ। তাঁর কথায় ‘…কবিতায় যিনি বারবার অজস্রবার চেনা ছক বিনির্মাণ করে গেছেন, ছোটগল্প লিখতে গিয়ে তিনি ঠিক তার বিপরীত প্রবণতার প্রমাণ দিয়েছেন চেনা ছক অনুসরণ করে…।’ পনেরো পৃষ্ঠাব্যাপী এক গভীর প্রজ্ঞাসঞ্জিত রচনা যা নি:সন্দেহে পত্রিকাটির এক অন্যতম সম্পদ। এরপর রয়েছে জীবনানন্দ দাশের ১০টি অপ্রকাশিত কবিতা। অসামান্য দশটি শিরোনামহীন, মন পাগল করা কবিতা। এর মধ্যে আছে একটি দীর্ঘ কবিতাও।
সুলেখক মৃন্ময় রায় কবি জীবনানন্দ ও তাঁর কবিসত্তাকে নিবিড় ভালোবেসে এবং কবির কবিতাকে বুকে ধরে রাখার প্রেক্ষাপটকে উদ্ভাসিত করে লিখেছেন বারো পৃষ্ঠাজোড়া এক নান্দনিক নিবন্ধ ‘পাসওয়ার্ড’ যেখানে নির্বাচিত কবিতার এক একটি লাইন ধরে ধরে উন্মোচিত হয়েছে ভাব ও বোধের প্রকাশ। কবি দীপক চক্রবর্তী লিখেছেন নিবন্ধ ‘আমার কবিতাযাত্রা ও জীবনানন্দ দাশ’। এক অনাবিল জীবনানন্দ-যাত্রা। অদেখা কবির ছত্রছায়ায় নিজের কাব্যময় যাত্রাপথের নির্মোহ উপস্থাপনা। কবি-লেখক অমিতাভ সেনগুপ্ত তাঁর দীর্ঘ নিবন্ধে কবি জীবনানন্দের বহু কবিতার একাধিক স্তবককে উদ্দেশ করে প্রাঞ্জল বোধসম্পন্নতায় উপস্থাপন করেছেন ‘জীবনানন্দ : রূপছায়া আনন্দ ও মায়ায়’ শিরোনামে। কিন্তু একটিমাত্র নিবন্ধে কি আর সবটুকু ‘জীবনানন্দ’ পাওয়া যায় ? পরিসর বিস্তৃত হলে নিশ্চিতই বৃদ্ধি পেত এই রচনার কলেবর। এর পরেই রয়েছে জীবনানন্দ দাশের ১০টি অগ্রন্থিত কবিতা। এই পর্বে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত শিরোনামযুক্ত (কিছু হয়তো স্বকৃত, কিছু বা পরকৃত) ১০টি কবিতা সন্নিবিষ্ট হয়েছে। উল্লেখ রয়েছে সেই সব পত্রিকার নাম ও প্রকাশকালও। প্রেম ভালোবাসার সোচ্চার পঙ্ক্তিতে ঋদ্ধ অধিকাংশ কবিতা সহ সব কবিতাই নতুন করে বোধগম্যতার দ্বার উদ্ঘাটন করে দেয় পাঠকের।
পরবর্তী নিবন্ধ লেখক কিরণশংকর রায়ের ‘জীবনানন্দের কবিতায় নাট্যধর্ম’। একটি অসামান্য রচনা। নিবন্ধকার লিখছেন - ‘ঝরা পালক’ থেকে ‘মহাপৃথিবী’ পৌঁছবার অবকাশে ‘আমরা অনুসরণ করে যেতে পারি কবিতার পর কবিতায় বিরোধ-বৈপরীত্যগঠনের বৈচিত্র ও নানাস্তরীয় সমাবেশ, ভাবদ্বন্দ্বের জটিলতা ও বিস্তার এবং নাট্যগত উপাদানসমূহের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে প্রকৃত অর্থময়তা সঞ্চারের নানা নিদর্শন…।’ জীবনানন্দের একাধিক কবিতায় নাট্যধর্মিতার প্রকাশকে আত্মোপলব্ধিসঞ্জাত মুনশিয়ানায় বিশ্লেষণ করেছেন নিবন্ধকার। এই রচনাটিও পত্রিকার অন্যতম সম্পদ নি:সন্দেহে। স্বপ্না ভট্টাচার্যের ‘অনুভবে জীবনানন্দ’ কবির কবিতায় যাপিত অনুভবের এক নান্দনিক উপস্থাপন। কবিতার এক একটি পঙ্ক্তি যেন লেখকের মনোজগতে এসে মূর্ত হয়ে ওঠে নানা প্রেক্ষাপটে, প্রসঙ্গে-অনুষঙ্গে। খোলা চিঠির আদলে এক ভিন্নধর্মী গদ্য লিখেছেন প্রাবন্ধিক সঞ্জীব দেবলস্কর। ব্যতিক্রমী শিরোনাম ‘প্রিয় জীবনানন্দ দাশ - রূপসি বাংলার রাষ্ট্রপতি সমীপেষু’। বাংলার রূপ-রস-গন্ধের আবহে জীবনানন্দের সৃষ্টির সঙ্গে অতীত ও ঘোর বর্তমানের নিরিখে এক সরল, সপাট রচনা।
এর পর একে একে রয়েছে জীবনানন্দ দাশের একটি গল্প ‘অশ্বত্থের ডালে’ এবং গল্পকার রণবীর পুরকায়স্থের নিবন্ধ ‘ট্যাকটেকে বউয়ের গল্প’ - জীবনানন্দের গল্পসমূহের একটি সরস আলোচনা। আলোচক লিখছেন - ‘…লেখক যেখানে জীবনানন্দ সেখানে শুধু বাক্য নয়, শব্দমধ্যবর্তী কোলাহলও নীরবতায় আচ্ছন্ন থাকে। তার প্রতিটি কথায় একটা এজেন্ডা থাকে সাধারণের মাপে মেলালে চলবে কেন ...?’ সংখ্যাটির শেষ রচনা সম্পাদক, গল্পকার মিথিলেশ ভট্টাচার্যের ‘বেবিলন থেকে শিলচর’। কল্পনা ও বাস্তবের আবহে নিদারুণ নান্দনিকতায় ভরপুর একটি রচনা। নিজের জীবনে ও লেখালেখিতে জীবনানন্দের অমোঘ প্রভাবের কথা উঠে এসেছে তাঁর আশ্চর্য লেখনীতে।
সব মিলিয়ে যেন জীবনানন্দের এক সম্পূর্ণ জীবনগাথা, সাহিত্যগাথা এই সংখ্যাটি। স্বল্পসংখ্যক কিছু বানান, কিছু ছাপার বিভ্রাটের বাইরে জীবনানন্দ বিষয়ক এক নির্ভেজাল দলিল। নামলিপি সহ প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদ, কাগজের মান, ছাপার স্পষ্টতা যথাযথ। ক্যাপশন অনুযায়ী সত্যিকার অর্থেই ‘এক ভিন্ন স্বাদের গদ্যপত্রিকা’ হয়ে উঠেছে ‘পরম্পরা’।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
মূল্য - ২০০ টাকা
ওগাযোগ - ৯৮৫৯৯৫১২৩৩

Comments

Popular posts from this blog

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...