Skip to main content

কাব্যসুধায়, অনুপম গদ্যে ব্যতিক্রমী মা ও ছেলে


দুটি ভিন্ন ধারার গ্রন্থ। উত্তরবঙ্গের মাতা-পুত্র। পুত্র সায়ন্তন ধর ও মা ডরোথী দাশ বিশ্বাস উত্তর পূর্বের সঙ্গে জুড়ে রয়েছেন বহু দিন ধরেই। উত্তরপূর্বের প্রেক্ষিতকে ছুঁয়ে পুত্রের এবং নান্দনিক সাহিত্যধারায় মায়ের এক অন্যতর ব্যতিক্রমী সৃষ্টি। উভয়েই যেভাবে তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে চমক দিলেন গ্রন্থজগৎকে, নিঃসন্দেহে তার জুড়ি মেলা ভার। একে একে তারই কিছু অবলোকন -
ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে (ভাগ ১) - সায়ন্তন ধর
ইংরেজি Travelogue শব্দটির প্রচলিত অর্থ যদিও ভ্রমণ কাহিনি তবে তরুণ লেখক সায়ন্তন ধরের এই গ্রন্থটিকে সেই অর্থে ভ্রমণ কাহিনি না বলে ভ্রমণ ডায়ারি বলাই উপযুক্ত হবে।
অসম-বাংলার (পশ্চিমবঙ্গ), বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের পারস্পরিক সুসম্পর্ক যুগ পুরোনো। ভৌগোলিক সূত্রে এবং ভাষা - বিশেষ করে লিপিগত সামঞ্জস্যের সূত্রে পাশাপাশি অবস্থিত বলে সম্প্রীতি, সহাবস্থান, আত্মীয়তার সম্পর্ক, সমাজ-সংস্কৃতির সাযুজ্য অনস্বীকার্য।
উদ্ভিদবিদ সায়ন্তন কর্মসূত্রে গুয়াহাটিতে কর্মরত হওয়ার ফলে অসমের আলোহাওয়া, জলবায়ুর সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ওতপ্রোতভাবে। অসম রাজ্যের অধিবাসী, তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদনদীর সঙ্গে যেন এক দেহ এক প্রাণ যুক্ত করে দিনযাপনে অভ্যস্ত সায়ন্তন এগিয়ে চলেছেন এই যাপনকে নান্দনিক শব্দের প্রয়োগে লিপিবদ্ধ করে।
সায়ন্তনের সদ্যপ্রকাশিত ‘ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে’ গ্রন্থে তাই যেন মন-প্রাণ নিহিত হয়ে আছে এক একটি অধ্যায়ে। প্রাসঙ্গিক বহু ছবি সহ এই গ্রন্থের বিভিন্ন পর্বে রেলভ্রমণ, প্রকৃতির সাহচর্য ও প্রকৃতিকে উপভোগ করার অনাবিল বর্ণনা সমৃদ্ধ করেছে গ্রন্থটিকে। অপার বিস্ময়ে মোহিত হৃদয় থেকে গদ্যে পদ্যে নি:সৃত হয়েছে তার রূপকল্প - ‘...ব্রহ্মপুত্র বর্ষার ভয়াবহ রূপ ছেড়ে স্নিগ্ধ ভাবে বয়ে চলেছে। সাদা চর জেগেছে তার বুকে। এলোমেলো কাশের বন হলদেটে হয়ে রয়েছে। ... এপার জানে না ওপারের খবর। ...ও পাহাড়ের খাঁজে থাকা হিল ট্রাইবদের কথা বলে, জলের কাছাকাছি মানুষের দু:খে কাঁদায়, ...আহোম অহং ও ঐতিহ্যের গামোচাকে করে তোলে বিশ্বজনীন। ওর জল হাওয়ায় সিক্ত কণ্ঠস্বর গেয়ে ওঠে... ‘আমি এক যাযাবর... মই এটি যাযাবর...’। আর আমাকেই যাযাবর করে তুলল সেই নদী... সে নদ, কিন্তু বাবাও যেমন মায়া মমতায় মায়ের মতো, সেও তেমন... ওই আমার নদ, ওই আমার নদী...।’
চমৎকার প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে গ্রন্থকার নিজে। কিছু বানান বিভ্রাট থাকলেও ছাপা ও অলংকরণ যথাযথ। সব মিলিয়ে ২০টি পর্বে সজ্জিত ৬২ পৃষ্ঠার এক ব্যতিক্রমী সুখপঠনের উদ্যোগ। চলার পথে যাঁরা বাড়িয়েছেন হাত তাঁদেরই লেখক উৎসর্গ করেছেন এই গ্রন্থ।

নদী ও কবিয়াল - ডরোথী দাশ বিশ্বাস
মুক্ত গদ্যের মোট ২৯টি অধ্যায়ে ব্যতিক্রমী ধারায় কিছু কবিতার পঙ্‌ক্তি ও মুক্ত হৃদয়ের কথোপকথন যেন মুক্তোদানার মতো ভাস্বর করে তুলেছে তার আঙ্গিক। প্রতিটি অধ্যায়ের শুরু কিংবা শেষের কাব্যিক উপস্থাপনা প্রতিটি পঠনকে করে তুলেছে গভীর অর্থবহ।
ভূমিকায় কবি, লেখক শমিতা ভট্টাচার্য তাই যথার্থই লিখছেন - ‘...প্রচ্ছদ থেকে শেষ পাতা পাঠককে বহু ভিন্নভাবে বিনির্মাণের সুযোগ করে দিচ্ছে। ...এক জায়গায় প্রতিটি অধ্যায় জুড়ে আছে একই আঙ্গিকে। প্রকৃতি আর মানুষের মেলবন্ধনের মাঝে আর কোনো ভেদাভেদ রইল না। ...কবিতা আর কথা - সেই দুটি মানুষের যাঁরা নিজের কবিমন নিয়ে প্রকৃতি আর গৃহবন্দি পৃথিবীর রোগজর্জরিত সময়ের মধ্যে নিবদ্ধ। ‘নদী ও কবিয়াল’ গ্রন্থের এই একের পর এক কথোপকথন আসলে একই মনের দুই পৃথক সত্তার মেলবন্ধন ...কবিতা, গল্প কিংবা প্রবন্ধ পাঠক পড়ে বিনির্মাণ করেছেন বহুবার কিন্তু কথার অন্তরে গভীর কল্পনার রূপকথা প্রকাশের এই অভিনব প্রয়াস পাঠক মনকে এক সান্ধ্য ভাবনার দিকে ঠেলে দেবে...।’
কিছু অনাবিল গদ্য/পদ্য ছুঁয়ে যায় পাঠকমন। উদাহরণ স্বরূপ কথোপকথন - ৪ এ আছে -
‘...রূপকথা হন্যে হয়ে ঘুরে দুয়ারে দুয়ারে
আমার তোরণ সতত স্বাগত জানায় উহারে।
...আমি যে সুদূরের পিয়াসি। তবে সংগীতকে খুশি করা, কবিতাকে আদর করা আমার দায়িত্ব। ভালোবাসি কথাটা মুখে বলতে নেই। দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে সেটা বোঝা যায়...। পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো একটি শব্দের কবিতা হলো ‘বন্ধু’। বন্ধুত্ব এখন সবচেয়ে মূল্যবান মানবিক ভাষা যা পৃথিবীর এ প্রান্ত আর ও প্রান্তকে যুক্ত করে রেখেছে প্রতিটি পলে...।’
কোনও জটিলতা নয়, সরল গদ্যেও যে এক মোহনীয়তা আছে এই কথোপকথনগুলো যেন তারই প্রমাণ। পঠনে মানসিকতা পৌঁছে যায় এক অতীন্দ্রিয় জগতে। লেখক গদ্য ও পদ্য উভয় আঙ্গিকেই সমান দক্ষতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছেন পুরোমাত্রায়। সুবীর মণ্ডলের প্রচ্ছদ অর্থবহ ও নান্দনিক। সুবিন্যস্ত দুটি ব্লার্বযুক্ত ৬৪ পৃষ্ঠার গ্রন্থে বানান বিভ্রাটের মাত্রা যেন একটু বেশিই অনুভূত হল। ছাপা, কাগজের মান ও অক্ষরবিন্যাস যথাযথ। শেষ কথা - এক ব্যতিক্রমী উৎসর্গ সহ ব্যতিক্রমী আঙ্গিকের বৈচিত্রময় প্রকাশ ‘নদী ও কবিয়াল’।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
উভয় গ্রন্থের প্রকাশক - টেক টাচ টক, কলকাতা
উভয় গ্রন্থের মূল্য - ২৫০ টাকা করে।

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...

মহানিষ্ক্ৰমণ

প্রায় চল্লিশ বছর আগে গ্রামের সেই মায়াময় বাড়িটি ছেড়ে আসতে বেজায় কষ্ট পেয়েছিলেন মা ও বাবা। স্পষ্ট মনে আছে অর্ঘ্যর, এক অব্যক্ত অসহায় বেদনার ছাপ ছিল তাঁদের চোখেমুখে। চোখের কোণে টলটল করছিল অশ্রু হয়ে জমে থাকা যাবতীয় সুখ দুঃখের ইতিকথা। জীবনে চলার পথে গড়ে নিতে হয় অনেক কিছু, আবার ছেড়েও যেতে হয় একদিন। এই কঠোর বাস্তব সেদিন প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করতে পেরেছিল অর্ঘ্যও। সিক্ত হয়ে উঠছিল তার চোখও। জন্ম থেকে এখানেই যে তার বেড়ে ওঠা। খেলাধুলা, পড়াশোনা সব তো এখানেই। দাদাদের বাইরে চলে যাওয়ার পর বারান্দাসংলগ্ন বাঁশের বেড়াযুক্ত কোঠাটিও একদিন তার একান্ত ব্যক্তিগত কক্ষ হয়ে উঠেছিল। শেষ কৈশোরে এই কোঠাতে বসেই তার শরীরচর্চা আর দেহজুড়ে বেড়ে-ওঠা লক্ষণের অবাক পর্যবেক্ষণ। আবার এখানে বসেই নিমগ্ন পড়াশোনার ফসল ম্যাট্রিকে এক চোখধাঁধানো ফলাফল। এরপর একদিন পড়াশোনার পাট চুকিয়ে উচ্চ পদে চাকরি পেয়ে দাদাদের মতোই বাইরে বেরিয়ে যায় অর্ঘ্য, স্বাভাবিক নিয়মে। ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে যায় দিদিরও। সন্তানরা যখন বড় হয়ে বাইরে চলে যায় ততদিনে বয়সের ভারে ন্যুব্জ বাবা মায়ের পক্ষে আর ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বহু জল্পনা কল্পনার শেষে ত...