Skip to main content

বিশেষ মর্যাদায় প্রকাশিত ‘মনু থেকে ফেনী’র ‘ড. রঞ্জিত দে সংখ্যা’


দেশের অঙ্গরাজ্য ত্রিপুরা মূলত উত্তর-দক্ষিণে অধিক বিস্তৃত। উত্তরে মনু ও দক্ষিণে ফেনী। এই দুটি নদীর নামেই একটি প্রকাশনা সংস্থা, একটি পত্রিকা - ‘মনু থেকে ফেনী’ - অর্থাৎ পুরো ত্রিপুরা রাজ্য। সুচিন্তিত পত্রিকানাম। উত্তরপূর্বের একটি পত্রিকা সংখ্যা, যদিও তা বিশেষ সংখ্যা - এতটা সুসজ্জিত সচরাচর চোখে পড়ে না। পত্রিকাজাতীয় কোনও অবয়ব নেই এখানে, হার্ড বোর্ড বাঁধাইয়ে ডাবল জ্যাকেটে মোড়া আস্ত একটি গ্রন্থ। নান্দনিক, স্পষ্টতায় ভরপুর অরুণকুমার দত্তের প্রচ্ছদ, কাগজের মান, ছাপা, অক্ষরবিন্যাস, উৎকৃষ্ট অলংকরণ সব মিলিয়ে ত্রিপুরার ‘মনু থেকে ফেনী’ পত্রিকার সপ্তম বর্ষ সপ্তম সংখ্যাটি এক ব্যতিক্রমী সংখ্যা হিসেবে চিহ্নায়িত হবেই। লেখক, কবি বিজন বোস-এর সম্পাদনায় আলোচ্য সংখ্যাটি আত্মপ্রকাশ করেছে ‘ড. রঞ্জিত দে সংখ্যা’ হিসেবে।
সব মিলিয়ে ১২৮ পৃষ্ঠার এই সংখ্যায় ত্রিপুরার বিশিষ্ট লোকসাহিত্যিক তথা লোকসংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ ড. রঞ্জিত দে’কে নিয়ে কলম ধরেছেন একগুচ্ছ লেখক। রয়েছে বিষয়ভিত্তিক একগুচ্ছ কবিতাও। সংক্ষিপ্ত সম্পাদকীয়তে আছে - ‘...এক নিভৃত সাহিত্য সাধক ফেনী চরের বাসিন্দা ড. রঞ্জিত দে। ড. দে ত্রিপুরার লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির গবেষণায় পথিকৃৎ, যিনি প্রখর চেতনার এক নির্বিকল্প সাহিত্য সাধক। লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণার জন্য মণিমুক্তো খুঁজতে গিয়ে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন ত্রিপুরার গ্রাম পাহাড়ে। আজীবন চেষ্টা করেছেন মানুষে মানুষে যাতে মিত্রতার বন্ধন সুদৃঢ় হয়...।’
ড. দে’র লেখালেখি ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক গ্রন্থাদির আলোচনা তথা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বিষয়ে লিখেছেন বর্তমান সময়ে ত্রিপুরার সাহিত্য জগতের একাধিক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তত্ত্ব ও তথ্যের যথেষ্ট উল্লেখ সহ মূলত তাঁর লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক বিশাল কর্মকাণ্ডের উপর লিখছেন ড. রবীন্দ্রকুমার দত্ত, জহর দেবনাথ, ড. নির্মল দাশ, পূর্বিতা গুপ্ত, মাধুরী লোধ ও রূপন মজুমদার। প্রতিটি রচনাই নিবিড় পাঠযোগ্য। ড. বীথিকা চৌধুরীর রচনা ‘প্রবহমান সমাজ-সংস্কৃতির নিপুণ রূপকার ড. রঞ্জিত দে’ একটি ভিন্নধর্মী লেখা যেখানে ব্যক্তি রঞ্জিতও ধরা পড়েছেন লেখকের কলমে। এমনই আরেকটি রচনা দীপক দাসের ‘ড. রঞ্জিত দে একটি মাইলস্টোন’। দিলীপ দেবনাথের লেখা ‘কবি ও লোক গবেষক : ড. রঞ্জিত দে’ও সমমানের একটি ভিন্নধর্মী লেখা।
কবিতায় রয়েছেন দেবাশ্রিতা চৌধুরী, মনীষা গুপ্ত পাল, সুদর্শন সদাগর, রূপন সূত্রধর, হিরণ সেন, বিনয় শীল ও সোমেন চক্রবর্তী। ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে বিষয়ভিত্তিক অণুগদ্য লিখেছেন জয় দেবনাথ, তিমরবরণ চাকমা, তপন রায় ও রাজীব দাস। ড. রঞ্জিত দে রচিত গ্রন্থবিষয়ক আলোচনা রয়েছে একাধিক। ‘বাংলা ছড়া ও লোকসাহিত্য’ গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন মিলনকান্তি দত্ত। ‘মনু থেকে ফেনী এবং বিবিধ প্রসঙ্গ’ এবং ‘ত্রিপুরার লোকসংস্কৃতির উৎস সন্ধানে’ গ্রন্থদুটির আলাদা করে আলোচনা করেছেন জহর দেবনাথ। দীর্ঘ উনিশ পৃষ্ঠা জুড়ে ড. রঞ্জিত দে’র একটি মূল্যবান সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদক বিজন বোস যেখানে একটি জীবনচিত্র সুনিপূণ আবহে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে পাঠকমননে।
শেষ পর্বে বর্তমানে বহি:রাজ্যে বসবাসরত ড. রঞ্জিত দে বিষয়ক রয়েছে কিছু ‘বিশেষ মুহূর্ত’-এর সাদাকালো ছবি - কিছু শিরোনামযুক্ত, কিছু শিরোনামবিহীন। রয়েছে ড. রঞ্জিত দে লিখিত চৌদ্দটি গ্রন্থের সাদাকালো প্রচ্ছদচিত্রও। সব মিলিয়ে জীবিতকালেই এক সার্বিক জীবনীসংখ্যা। তবু বলাই যায় - যে অভাব অনুভূত হয়েছে তা হলো এ যাবৎ প্রকাশিত তাঁর যাবতীয় লেখালেখির সম্ভার, জীবনপঞ্জির একটি তালিকা। বিভিন্ন রচনা পাঠের মাধ্যমে যদিও অধিকাংশেরই সন্ধান পাওয়া গেছে তবু একত্রে তা সন্নিবিষ্ট হলে এক নজরে দৃষ্টিগোচর হতো পাঠকের। প্রায় একশো ভাগ নির্ভুল বানান সংখ্যাটির অন্যতম সম্পদ। এবং যে সম্পদের কথা উল্লেখ না করলেই নয় তা হল অসামান্য অলংকরণ। তবে টাইটেল ভার্সো পেজে প্রকাশকের নাম ও অলংকরণের সৌজন্য অনুল্লেখিত - প্রকাশক যদিও অবিসংবাদিতভাবেই একমেবাদ্বিতীয়ম ‘মনু থেকে ফেনী’।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
মূল্য - ২৮০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৮৬২২৯৯৯৬৫

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

মহানিষ্ক্ৰমণ

প্রায় চল্লিশ বছর আগে গ্রামের সেই মায়াময় বাড়িটি ছেড়ে আসতে বেজায় কষ্ট পেয়েছিলেন মা ও বাবা। স্পষ্ট মনে আছে অর্ঘ্যর, এক অব্যক্ত অসহায় বেদনার ছাপ ছিল তাঁদের চোখেমুখে। চোখের কোণে টলটল করছিল অশ্রু হয়ে জমে থাকা যাবতীয় সুখ দুঃখের ইতিকথা। জীবনে চলার পথে গড়ে নিতে হয় অনেক কিছু, আবার ছেড়েও যেতে হয় একদিন। এই কঠোর বাস্তব সেদিন প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করতে পেরেছিল অর্ঘ্যও। সিক্ত হয়ে উঠছিল তার চোখও। জন্ম থেকে এখানেই যে তার বেড়ে ওঠা। খেলাধুলা, পড়াশোনা সব তো এখানেই। দাদাদের বাইরে চলে যাওয়ার পর বারান্দাসংলগ্ন বাঁশের বেড়াযুক্ত কোঠাটিও একদিন তার একান্ত ব্যক্তিগত কক্ষ হয়ে উঠেছিল। শেষ কৈশোরে এই কোঠাতে বসেই তার শরীরচর্চা আর দেহজুড়ে বেড়ে-ওঠা লক্ষণের অবাক পর্যবেক্ষণ। আবার এখানে বসেই নিমগ্ন পড়াশোনার ফসল ম্যাট্রিকে এক চোখধাঁধানো ফলাফল। এরপর একদিন পড়াশোনার পাট চুকিয়ে উচ্চ পদে চাকরি পেয়ে দাদাদের মতোই বাইরে বেরিয়ে যায় অর্ঘ্য, স্বাভাবিক নিয়মে। ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে যায় দিদিরও। সন্তানরা যখন বড় হয়ে বাইরে চলে যায় ততদিনে বয়সের ভারে ন্যুব্জ বাবা মায়ের পক্ষে আর ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বহু জল্পনা কল্পনার শেষে ত...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...