Skip to main content

ভিন্নতর আঙ্গিক ও বৈচিত্রে প্রকাশিত দুটি সমকালিক ছোটপত্রিকা


ত্রিপুরা রাজ্য উত্তরপূর্বাঞ্চলের বাংলা সাহিত্য চর্চার এক উর্বর চারণভূমি এই রাজ্যে সাহিত্য সৃষ্টির পাশাপাশি পত্রিকা প্রকাশের যে লহর বয়ে চলেছে অবিরাম তার ব্যাপ্তি উত্তর-দক্ষিণ-পশ্চিম জুড়ে সম্প্রতি একই সময়ে প্রকাশিত হয়েছে ধলাই জেলার কুলাই বাজার থেকে রীতা ঘোষ সম্পাদিত ছোটপত্রিকাধলাইএবং আগরতলা থেকে শাশ্বতী দেব সম্পাদিতসমকালপত্রিকা দুটি উল্লেখযোগ্য যে দুই মহিলা সম্পাদক সম্পাদিত এই দুটি পত্রিকার বাইরেও এমন দৃষ্টান্ত সমগ্র রাজ্য জুড়ে একাধিক সাহিত্য সাধনা ও সৃষ্টিতে নারী ও পুরুষ অনাদিকাল থেকেই সমপর্যায়ে নিমগ্ন রয়েছেন আপন প্রতিভা ও বৈভবে সেই ধারা আজও সমানে চলছে ত্রিপুরা তার উৎকৃষ্ট নিদর্শন।
 
ধলাই
পেপারব্যাকে ২৪ পৃষ্ঠার পত্রিকাটি আক্ষরিক অর্থেই ‘ছোট’পত্রিকা যদিও নান্দনিকতা ও গরজে স্থান করে নেয় আলোচনার টেবিলে। ২০২৫-এর শেষার্ধে প্রকাশিত সংখ্যাটি হচ্ছে দ্বিতীয় বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা। অর্থাৎ পত্রিকার পথ চলা এখনও শুরুর পর্যায়েই যদিও কিছু উৎকর্ষ, কিছু ব্যতিক্রমী চিন্তাচর্চার ঝলক অনুধাবন করা যায়। প্রথমত সম্পাদকীয়টিই তার প্রমাণ। কাব্যে সম্পাদকীয় লিখেছেন ‘গোবিন্দ ধর’ যদিও তাঁকে অতিথি সম্পাদক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়নি কোথাও। মানুষে মানুষে শত্রুতা, বন্ধুতা, স্পর্ধা-প্রতিস্পর্ধার বিষয়ে রয়েছে কিছু সপাট, সটান পঙ্‌ক্তি।
পত্রিকা সম্পাদনার খুঁটিনাটি নিয়ে ‘গদ্য’ বিভাগের একমাত্র রচনাটিও (সম্পাদনা বা বিনির্মাণ) লিখেছেন গোবিন্দ ধর - সংক্ষিপ্ত ব্যক্তিগত গদ্যের ধাঁচে। রয়েছে ৪টি অণুগল্প। সম্পাদক রীতা ঘোষের গল্পের শিরোনামেই বানানভুল চোখে লেগেছে। আর্থিক দুর্বলতার নিম্নতম পর্যায়ে বসবাসরত দুই নারীর করুণ জীবনগাথা। জহর দেবনাথের অণুগল্প ‘খুদের ভাত’ পত্রিকাটির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। গল্পের ফর্ম ব্যতিক্রমী। দীনতার চরম বর্ণনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আশার কিরণ। সুখপাঠ্য। প্রকৃতিপ্রেমের নিদর্শন সৌরভ দাসের অণুগল্প ‘শালিক আর অনির্বাণ’। পীযূষ রাউতের অণুগল্পে একটি বার্তা থাকলেও গল্পের বুনোট ঠিক জমেনি। মিলনকান্তি দত্তের গল্পন্যাস ‘কর্কট’ চমৎকার একটি টোট্যাল গল্প। সংখ্যার অন্যতম সম্পদ। তবে ‘গল্পন্যাস’ শব্দটির অর্থ কী হতে পারে তা চর্চার বিষয় বইকী।
কবিতা বিভাগে নানা স্বাদের কবিতা যাঁরা লিখেছেন তাঁরা হলেন নিশীথ রঞ্জন পাল, আশিষ কান্তি সাহা, অমূল্য ভৌমিক, গীতশ্রী ভৌমিক, ভক্ত সিং, বকুল দেব, মাসুদ পথিক ও নিতাইচরণ দেবনাথ।
২৪ পৃষ্ঠায় এতসব সম্ভার নিয়ে নান্দনিকতায় সেজে উঠেছে ‘ধলাই’। স্পষ্ট ছাপা, কাগজের মান ও অক্ষরবিন্যাস যথাযথ। সাদেক মুকুল-এর প্রচ্ছদ পত্রিকার মান বাড়িয়েছে। একটু বানান সচেতনতা, গায়েগতরে আরও একটু সমৃদ্ধ হলে পত্রিকার মান অনেকটাই উচ্চতায় পৌঁছে যাবে নিশ্চিত।
মূল্য - ৩০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৬৭২৭৯৭১
 
সমকাল
পেপারব্যাকে ৪৮ পৃষ্ঠার একটি নিখাদ বহুভাষিক কবিতাপত্র ‘সমকাল’-এর সম্পাদক শাশ্বতী দেব। আলোচ্য সংখ্যাটি পত্রিকার তৃতীয় সংখ্যা। ভাষা-সাহিত্য বিষয়ক এই সংখ্যার সম্পাদকীয়তে আছে - ‘কালের নিরিখে মানুষের মধ্যে আজকাল বিভিন্ন ভাষায় বিরহ, প্রেম, ওঠাপড়া, সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা যায়। এত বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ বিভিন্ন ভাষায় অনবরত সমকালকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে ততপর। ‘সমকাল’ এমন একটি প্রয়াস যা বিভিন্ন ভাষার অস্তিত্বকে মর্যাদা দিয়ে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক রেখে মানুষের সৃষ্টিকে সম্মান দিয়ে যাচ্ছে...।’
সম্পাদকীয় বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা দিয়ে বাংলা ভাষার উপর নেমে আসা দুটি দুর্যোগকে সামনে রেখে আলোচ্য সংখ্যাটিতে সন্নিবিষ্ট হয়েছে একাধিক কবিতা১৯শে মে ও ২১শে ফেব্রুয়ারির স্মৃতিকে বিষয় হিসেবে নিয়ে আছে দশটি ভাষার কবিতার বাইরেও রয়েছে কিছু কবিতার বাংলা অনুবাদ। প্রথমেই রয়েছে শাশ্বতী দাস-এর সংস্কৃত কবিতা ‘একাদশ নক্ষত্র’। ককবরক কবিতা লিখেছেন শ্যামলী দেববর্মা। ছিলোমিলা কবিতা লিখেছেন বিপ্লব ওরাং। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি কবিতা লিখেছেন অপর্ণা সিনহা। বাংলা হরফে ওড়িয়া কবিতা রয়েছে করুণা দেবনাথ-এর। রয়েছে দীপক ভীল-এর ভীল/সাওড়া কবিতা, নাহ্‌নী মগ দেববর্মার মগ কবিতা, শান্তি চিরানের গারো কবিতা। হিন্দি কবিতা লিখেছেন শাশ্বতী দেব, স্বপ্না ভট্টাচার্য, দিয়া সাহা, রাজা দেবনাথ ইংরেজি কবিতা লিখেছেন ড. বীথিকা চৌধুরী, শাশ্বতী দেব, রাজা দেবরায়, সন্ধ্যা ভৌমিক, প্রবোধ চন্দ্র দাস ও সমীর দাস। ভিনভাষার কিছু কবিতার রয়েছে কবিকৃত বাংলা অনুবাদ।  
বাংলা কবিতা যাঁরা লিখেছেন তাঁরা হলেন - সন্ধ্যা ভৌমিক, তীর্থ ঋষি দাস, সংগীতা গুপ্ত, শাশ্বতী দেব, রাখীরাণী দাশ দেব, মনীষা গুপ্ত পাল, হিরণ সেন, মনসা সরকার, সমীর দাস, ঝিমলি আচার্য, প্রবোধ চন্দ্র দাস, বিভুলাল চক্রবর্তী, তপতী সাংমা, নকুল দাস, লীলা চক্রবর্তী, নিয়তি রায় বর্মন, শুভঙ্কর হৃষিদাস, কৃষ্ণকুসুম পাল, অসীমা দেবী, সৌরভ দেব, রুমা গৌতম, জহরলাল দাস, রূপসী দাস, আশিষ কান্তি সাহা, শুভ্রা সাহা, সুরেশ চন্দ্র দাস, সনজিৎ বণিক, দীপ্তি চক্রবর্তী ও ঝর্না বণিক।
কবিতার এই বিশাল আয়োজন ভাষা সংগ্রাম ও ভাষা শহিদদের প্রতি এক বিশাল সম্মাননা সংখ্যা হিসেবে পত্রিকাটিকে উদ্ভাসিত করেছে। প্রচ্ছদ, ছাপার স্পষ্টতা, কাগজের মান সবকিছুই ভালো। বানানবিভ্রাটে আক্রান্ত সংখ্যাটিতে বিষয়ের মর্যাদা কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ণ হয়েছে যেখানে ‘উনিশ’, ‘শহিদ’, ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ ইত্যাদি শব্দে রয়ে গেছে বানান বিভ্রাট। এ নিয়ে পরবর্তীতে অধিক সচেতনতার সুযোগ রয়ে গেছে। এ সবকিছু সত্ত্বেও ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি এক নিবেদনের সুস্পষ্ট ছাপ প্রত্যক্ষ করা যায় পত্রিকা জুড়ে। সাধুবাদ জানাতেই হয় সম্পাদকীয় এই প্রচেষ্টার।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

মূল্য - ১৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৮৭৯৪৪৫৩৯১২

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

বিষয়-মানসে প্রকাশিত ‘স্বরিত’ - সপ্তদশ সংখ্যা

কোনও দ্বিধা কিংবা ভয়কে অবলীলায় উড়িয়ে দিয়ে জলকে জল , মাটিকে মাটি কিংবা দেশকে দেশ ( দ্বেষ , দ্যাশ কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্র নয় ) বলতে পারেন যে ক ’ জন , তাঁদের মধ্যে অন্যতম কবি , লেখক , সম্পাদক নারায়ণ মোদক । বরাক উপত্যকার শ্রীভূমি থেকে ২১ মার্চ বিশ্ব কবিতা দিবসে প্রকাশিত হয়েছে বার্ষিক পত্রিকা ‘ স্বরিত ’- এর সপ্তদশ সংখ্যা । দ্বৈত সম্পাদনায় নারায়ণ মোদক ও গৌতম চৌধুরী। এবারের বিষয় ছিল প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অব্যবস্থা , অত্যাচার , সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নিপীড়ন ইত্যাদি নিয়ে প্রতিবেদন ও সহমর্মিতা ইত্যাদি । স্বভাবতই এর প্রতিবাদ হওয়া উচিত । এই নির্ভীক , বলিষ্ঠ পদক্ষেপের উদ্যোগ কতটা সফল হয়েছে , কতটা সহমর্মিতা বর্ষিত হল , কতটা প্রতিবাদ স্বরিত হল তার এক নির্মোহ বিশ্লেষণ সংখ্যাটির আলোচনার এক অমোঘ অনুষঙ্গ ।   ভূমিকার আধারে ‘এ সংখ্যার বিষয়ে আলোকপাত’ করতে গিয়ে অন্যতম সম্পাদক নারায়ণ মোদক লিখছেন - ‘… আমাদের সমাজে একদল নিজেকে মানবতাবাদী সাজিয়ে নিরাপদ দূরত্বে বসে সমাজ এবং সরকারের সব রকম সুবিধা ভোগ করে বিজ্ঞতার সাথে বলতে থাকেন সারা বিশ্বের যেখানেই সংখ্যালঘু আছে সেখানেই তারা অত্যাচারিত। আমাদ...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...