Skip to main content

নান্দনিকতার আবহে মধ্য অসমের পূজাবার্ষিকী


‘দুপুরের গনগনে সূর্য ঢলে পড়ল অনন্ত অতলে
ঠিক অসময়ে
উত্তাল ঢেউয়ে কেঁপে উঠল মহাসমুদ্র,
কেঁপে উঠল আকাশ-বাতাস,
অপ্রত্যাশিত দু:সংবাদে
বুক ভরা কান্না নিয়ে সমদলে গেয়ে উঠল লক্ষ জনতা
প্রিয়জন বিয়োগে
কেঁপে উঠে চারিধার সেই মায়াবিনী রাতে
অন্ত হল একটি যুগ, অন্ত হল এক মহাজীবনের
মধ্য অসমের লংকা থেকে প্রকাশিতশতরূপাপত্রিকার শারদ সংখ্যা ১৪৩২-এর প্রথম পাতায় শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে মোট ২৭ লাইনের একটি কবিতা উৎসর্গ করা হয়েছে সদ্যপ্রয়াত, অকালপ্রয়াত জনকণ্ঠ জুবিন গার্গের উদ্দেশে রচনাকার সম্পাদক মনোজকান্তি ধর
পত্রিকার এই পঞ্চদশ সংখ্যাটিতে লেখালেখির এক ভারসাম্যতা লক্ষ করা যায়। ৫টি প্রবন্ধ, ২টি ভ্রমণ কাহিনি, ১টি রূপকথার গল্প, ৪টি ছোটগল্প, ১টি অণুগল্প ও ১৫জন কবির কবিতায় সেজে উঠেছে পেপারব্যাক প্রচ্ছদে ১/৪ ক্রাউন সাইজের এবারের ৬৪ পৃষ্ঠার শারদ সংখ্যা।
শারদীয় উৎসবের সঙ্গে প্রকৃতির যে অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক রয়েছে তারই প্রেক্ষিতে প্রকৃতি ধ্বংস ও শরতের হারানো মাধুর্য নিয়ে এক চিন্তাশীল সম্পাদকীয়তে সমৃদ্ধ হয়েছে পত্রিকা সংখ্যাটি। নৃপেন্দ্রলাল দাস-এর ‘শাবরোৎসব’ দিয়ে শুরু হয়েছে প্রবন্ধ বিভাগ। অপেক্ষাকৃত স্বল্পশ্রুত একটি বিষয়ের উপর সংক্ষিপ্ত হলেও উপযোগী নিবন্ধ। ড. অজিত কুমার সিংহের ‘যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা’ দুর্গা ও দুর্গোৎসব বিষয়ক একটি গোছানো নিবন্ধ যাকে শারদীয় সংখ্যার পঠনপাঠনের এক মঙ্গলাচরণ হিসেবে অভিহিত করা যায়। নিত্যানন্দ দাস (অনুরাগ)-এর ‘শ্রীহট্টীয় জনমানসে আগমনি ও বিজয়ার গান’ ও নিরঞ্জন দে-র নিবন্ধ ‘প্রাচীন শ্রীহট্ট : সনাতন ধর্মের এক আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক পীঠস্থান’ যথেষ্ট তথ্যসমৃদ্ধ যদিও বিষয়ের বিশালতা সাপেক্ষে হয়তো অধিক বিস্তৃতির সুযোগ ছিল - পরিসরের অভাব হয়তো এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে‘মুরারীচাঁদ মহাবিদ্যালয় : অনন্য স্থাপত্য শৈলীর এক অনিন্দ্য বাতিঘর’ লিখেছেন শেখর ভট্টাচার্য। বিশয়ে, উপস্থাপনায় নিঃসন্দেহে এক ব্যতিক্রমী রচনা। বৈদেশিক ও দেশীয় ভ্রমণের দুই সুস্পষ্ট আঙ্গিকের সন্নিবেশে ভ্রমণ বিভাগটি সেজে উঠেছে পত্রিকার পাতায়। অভিজিৎ দাস-এর ‘যুক্তরাষ্ট্রের মেরীল্যান্ডের আশেপাশে, এখানে ওখানে’ ও মৃদুল চক্রবর্তীর ‘ডুব দে রে মন কালী বলে’ ভ্রমণ কাহিনি দুটি ভিন্ন আঙ্গিক ও আবহে দুটি সুলিখিত রচনা। অবশ্যপাঠ্যও। প্রাণকৃষ্ণ করের রূপকথার গল্প ‘কমল ও ফুলেশ্বরী’ সুখপাঠ্য কিন্তু অতি সংক্ষেপিত।
‘শতরূপা’র গল্প বিভাগ বরাবরই সমৃদ্ধ। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি এবং বরাবরেরই মতো শ্রেষ্ঠ গল্পের শিরোপা উঠেছে গল্পকার সুব্রত দত্তের মাথায় তাঁর ‘প্রায়শ্চিত্ত’ শিরোনামাঙ্কিত চমৎকার বুনোটের গল্পটির জন্যভাষায়, সংলাপে একটি অনবদ্য ছোটগল্প। সমরবিজয় চক্রবর্তীর গল্প ‘মতিবিবি’ কিছু কারিগরি ত্রুটি ও অকারণ প্যারা নির্মাণে বিঘ্নিত হয়েছে। শব্দচয়ন প্রশংসার্হ। শংকর দেব-এর অণুগল্প ‘শেষ বলে কিছু নেই’ আধুনিক গল্পের তকমাভুক্ত হলেও সাধারণ পাঠকের কাছে কিছু কঠিন বলে অনুভূত হতে পারে। সুলিখিত গল্প। ‘ইচ্ছাপূরণ’ গল্পটি লিখেছেন রামমোহন বাগচি। যথেষ্ট বিস্তৃত একটি ঘটনাবহুল পুরোনো ধাঁচের গল্প। দুঃখজীবনের এক সুখপাঠ্য গল্প - বলা ভালো একটি যথার্থ উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত রূপমনোজকান্তি ধরের ‘দরবেশ’ হৃদয়স্পর্শী বৃত্তান্তে ঋদ্ধ, গল্পের আদলে লেখা এক প্রতিবেদনধর্মী আখ্যান।
কবিতা বিভাগে নানা স্বাদের কবিতা যাঁরা লিখেছেন তাঁরা হলেন শ্যামাপ্রসাদ লোধ, তুষারকান্তি সাহা, রতীশ দাস, বিধানেন্দু পুরকাইত, বিশ্বজিৎ দেব, অপূর্ব দেব, ফারহানা ইলিয়াস তুলি, ফকির ইলিয়াস, সজল রায়চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, বিশাখা চক্রবর্তী, কমলেশ চৌধুরী, সুনন্দা সিংহ, মোহিত চন্দ ও দুলাল মজুমদার।
পত্রিকার কাগজের মান, প্রচ্ছদ ও অলংকরণ যথাযথ। বেশ কিছু বানান ও ছাপার অস্পষ্টতা অনুভূত হয়েছে। অক্ষরবিন্যাস যথাযথ। সব মিলিয়ে এক গভীর নিবেদন ও নান্দনিক ভাবনাচিন্তার স্পষ্ট আভাস ফুটে উঠেছে সম্পাদকীয় প্রচেষ্টার গুণে।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

‘শতরূপা’
মূল্য - ৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৮৮২২৪৬৪৬২৩

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...

মহানিষ্ক্ৰমণ

প্রায় চল্লিশ বছর আগে গ্রামের সেই মায়াময় বাড়িটি ছেড়ে আসতে বেজায় কষ্ট পেয়েছিলেন মা ও বাবা। স্পষ্ট মনে আছে অর্ঘ্যর, এক অব্যক্ত অসহায় বেদনার ছাপ ছিল তাঁদের চোখেমুখে। চোখের কোণে টলটল করছিল অশ্রু হয়ে জমে থাকা যাবতীয় সুখ দুঃখের ইতিকথা। জীবনে চলার পথে গড়ে নিতে হয় অনেক কিছু, আবার ছেড়েও যেতে হয় একদিন। এই কঠোর বাস্তব সেদিন প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করতে পেরেছিল অর্ঘ্যও। সিক্ত হয়ে উঠছিল তার চোখও। জন্ম থেকে এখানেই যে তার বেড়ে ওঠা। খেলাধুলা, পড়াশোনা সব তো এখানেই। দাদাদের বাইরে চলে যাওয়ার পর বারান্দাসংলগ্ন বাঁশের বেড়াযুক্ত কোঠাটিও একদিন তার একান্ত ব্যক্তিগত কক্ষ হয়ে উঠেছিল। শেষ কৈশোরে এই কোঠাতে বসেই তার শরীরচর্চা আর দেহজুড়ে বেড়ে-ওঠা লক্ষণের অবাক পর্যবেক্ষণ। আবার এখানে বসেই নিমগ্ন পড়াশোনার ফসল ম্যাট্রিকে এক চোখধাঁধানো ফলাফল। এরপর একদিন পড়াশোনার পাট চুকিয়ে উচ্চ পদে চাকরি পেয়ে দাদাদের মতোই বাইরে বেরিয়ে যায় অর্ঘ্য, স্বাভাবিক নিয়মে। ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে যায় দিদিরও। সন্তানরা যখন বড় হয়ে বাইরে চলে যায় ততদিনে বয়সের ভারে ন্যুব্জ বাবা মায়ের পক্ষে আর ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বহু জল্পনা কল্পনার শেষে ত...