Skip to main content

হে নিরুপমা...

জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখছেন নিরুপমা। শেষবর্ষার এক পশলা তুমুল বৃষ্টি যেন পৃথিবীর যাবতীয় মালিন্য ঘুচিয়ে দিয়ে এক স্নিগ্ধ শরতের সূচনায় মেতেছে। একাকী বসে বৃষ্টিকথা শুনছেন নিরুপমা। বৃষ্টি এসে যেন শুনিয়ে যায় জীবনেরই কথা। জীবনের কথা কেউ ভোলে না কখনও বস্তুত বয়স যতই এগোয়, স্মৃতি ততই ধাওয়া করে পিছনপানে এ এক আশ্চর্য বীক্ষণ পিছিয়ে যেতে যেতে পৌঁছে যায় একেবারেই গোড়ার দিকে - -সাত বছরের শৈশব যাপন যেন আয়না হয়ে নিতিদিন দর্শন করায় জীবনছবি বাস্তবে ফিরে যাওয়া কিংবা ফিরে দেখার কোন সম্ভাবনা নেই জেনেও এই অমূল্য দর্শনে মজে যেতে ইচ্ছে করে প্রতিনিয়ত এই যাপনে কোনো দুঃখব্যথার উপস্থিতি নেই শুধুই সুখবাখানের স্ন্যাপশট
নিরুপমার তখন পঁচিশে পা স্পষ্ট মনে আছে, থাকারই কথা। দাদাদের সংসারে বাবাহীন নিরুপমা তখন নিজেকে একটু একটু করে মেলে দিচ্ছে সর্বজনীন করে। বৃদ্ধা, রোগাক্রান্ত মা আর স্নেহময়ী বউদির তত্ত্বাবধানে বৃহৎ জগৎসংসারে নতুন দায়ভার সামলানোর স্বপ্ন এসে ইতিমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে নিরুপমার মনোজগতে। মা অনেকটা সংযত বাক্যে আর বউদি খোলামেলা কথায় সেই ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই পৌঁছে দিয়েছেন নিরুপমার স্নায়ুতন্ত্রে। সেই থেকে নিরুপমা একাধারে সংযত, সংহত এবং অন্যদিকে স্বপ্নরঙিন ভাবনার রাজ্যে নিমজ্জিত। নিজেকে নতুন আঙ্গিকে গড়ে তোলার এই প্রক্রিয়া আসলে শুরু হয়ে গিয়েছিল বছরদুয়েক আগে থেকেই - যখন স্নাতক স্তরের শিক্ষা সমাপ্ত হয়েছে নিরুপমার, যখন প্রেম-ভালোবাসার নিত্য নতুন হাতছানি ধেয়ে আসতে শুরু করেছিল নতুন নতুন আঙ্গিকে ঘরে থাকা একাকী সময়টুকুতে অজান্তেই শুরু হয়েছিল বর্ণিল স্বপ্ন দেখার পালা নতুন সংসার শুরু হতে চলেছে যার হাত ধরে, কেমন হবে সে রাজপুত্তুর ? কেমন হবে সেই নতুন যাত্রাপথ ? মা বলতেন -
– সময় আসছে রে মা। মেয়েদের আসল ঘর হল শ্বশুরবাড়ি। ওটাই তাদের নিজের ঘর। নিজের ঘরকে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে হয়। তোর পাঁচ বছর বয়সেই তোর বাবা পাড়ি দিয়েছিলেন অন্য জগতে। তাই তুই জানিস না কেমন ছিল তাঁর জীবিকাযাপন। বছরের তিনশ দিনই তিনি বাইরে থাকতেন চাকরিসুবাদে। ফলে এই ঘর সংসার যতটুকু গড়ে উঠেছে তার সবটুকুই আমার এই হাত ধরে। জানি না কতটুকু সামলাতে পেরেছি এই দায়িত্ব কিন্তু সংসারের সবটাই গড়ে উঠেছে আমার তত্ত্বাবধানে। এবার সামনে তোর সময়। মেয়েরা কে কোন আবহে নতুন ঘরের কর্ত্রী হবে কেউ তা জানে না। তবে আমার বিশ্বাস, যতটুকু শিক্ষা তোকে দিয়েছি তাতে কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয় তোর। আমি আর ক’দিন। বউদির কথা শুনে এগিয়ে যাস, ঠকবি না কখনও। বিয়ের পরেও মেয়েদের অনেক কিছুই শিখতে হয়। যেমন শিখেছে তোর বউদি। এ বাড়িতে যখন এসেছিল তখন অনেক কিছুই জানত না সেতবে সেই পাঠ বুঝে নিতে কোনও অসুবিধে হয়নি তার। তোরও যে হবে না সে ব্যাপারে আমি নশ্চিত।
আসল ঘর ? কেমন গুলিয়ে যেত সবকিছু। নিরুপমার ভয় ভয় করত এসব শুনে। তবু নিজেকে শক্ত করে নিত। পাশে ছিলেন প্রাণের বউদি - নিরুপমার এক মাভৈ মন্ত্র। বউদি একদিকে যেমন বন্ধুর মতো অবাধ অন্যদিকে আবার অভিভাবকের মতো স্নেহশীল। নিরুপমা ভাবে এই বউদি যদি এই সংসারে না থাকতেন তাহলে নিরুপমার জীবন হয়ত ভিন্ন খাতে গড়ে উঠত। বউদি বলতেন -
– চিন্তা নেই রে নিরু। সব সংসার এক হয় না। তা সে যেমনই হোক, সংস্কার আর মূল্যবোধে অনড় থাকলে সব মেয়েরাই একদিন নিখুঁত গৃহকর্ত্রী হয়ে ওঠে। তবে মনে রাখবি কর্ত্রী মানে এই নয় যে সে-ই সংসারের সর্বেসর্বা। তার কথাই হবে শেষ কথা। জীবন মানেই কিন্তু নমনীয়তা। সহাবস্থান ও সহমর্মিতা। এসব এমনিতেই হয়ে যাবে এ নিয়ে বিশেষ কোনো পাঠ পড়ার প্রয়োজন নেই। নারী মাত্রই ভগবানপ্রদত্ত এক সহনশীলতা ও দৃঢ়তার যুগলবন্দি। নারী মানেই সজাগ ষষ্ঠেন্দ্রিয়যুক্ত এক বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন সত্তা। আর মনে রাখবি - স্নেহ, মমতা আর দায়বদ্ধতার আরেক নাম নারী। এই দায়বদ্ধতা নারীকে সারা জীবন ধরে বয়ে বেড়াতে হয়। কোনও বাধ্যবাধকতা নয়, এ এক স্বয়ংক্রিয় পন্থা। এর বাইরে নারী কোনোদিনই বেরিয়ে আসতে পারেনি আর পারবেও না। এটা হচ্ছে নারীর জিনগত স্বভাব, ভাগ্যগত ভোগদশাবিয়ে হয়ে আসা অবধি দেখেছি এই সংসারের কত পরিবর্তন। একদিন এই সংসারের হাল ধরে রেখেছিলেন শাশুড়ি মা। আর আজ দেখ। ঘর সামলে বাইরের যাবতীয় অনুষঙ্গ আমাকেই সামলাতে হচ্ছে। অথচ আমি কি কোনোদিন ভেবেছিলাম এমন ? তোর সৌভাগ্য যে আমি আছি, এসব কথা বলছি তোকে। আমার তো এমন ছিল না। অথচ কেমন অবলীলায় নিজেরই অজান্তে জড়িয়ে গেছি এই সংসার যাপনে।
সামনে তোর বিয়ে। তাই আপাতত শরীরের একটুখানি খাতিরযত্ন কর যাতে চোখেমুখে ফুটে ওঠে আরও উজ্জ্বলতা। পাত্রপক্ষের পছন্দ হতে হবে তো, নাকি ? - নিরুপমার থুতনি ধরে হাসেন বউদি।
নিরুপমা লজ্জা পায়। জড়িয়ে ধরে বউদির গলাবলতে গেলে এই বউদিই নিরুপমার পথপ্রদর্শক, বন্ধু, অভিভাবকনিরুপমা তাই যতটা ভালোবাসে বউদিকে ততটাই সম্মানও করে দাদা-বউদির ছেলেমেয়েদুটিকে জন্মের পর থেকেই নিজের হাতে আদরযত্ন করে, পড়াশোনায় সাহায্য করে আগলে রেখেছে নিরুপমা মায়েরই মতো। এমনকী ওদের মলমূত্রও সাফ করেছে যখন বউদি অসুস্থ থাকতেন তখন। মা-ই বলেছিলেন -
– ওদের যত্ন করিস বেশি করে। পিসি তো মায়েরই মতো।
মায়ের কথা রেখেছিল নিরুপমা। ফলত বাচ্চাদুটি ছোট থেকেই পিসির ন্যাওটা। কোলে করে আবোলতাবোল গান শুনিয়ে ওদের ঘুম পাড়াতো নিরুপমা। খাইয়ে দিত নিজের হাতে। নিজের পড়শোনার সময় বাঁচিয়ে ওদের নিয়ে বসত পড়াতে। সোহাগে, শাসনে আগলে রেখেছিল প্রতিনিয়ত তাই তো আজও পিসিকে মায়ের আসনেই বসিয়ে রেখেছে ওরা।
###
যথাসময়ে একদিন বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি এল নিরুপমা। বর সৌগতর বাইরে ঘোরাঘুরির চাকরি যদিও দিনশেষে ফিরে আসত আপন ডেরায়বয়স্ক শ্বশুর-শাশুড়ি কখনও নিরুপমার সঙ্গে আবার কখনও তাঁদের অন্য দুই ছেলের বাড়িতেযত্নআত্তির ত্রুটি রাখে না নিরুপমা। তাঁরাও খুশি। বড্ড ঘরোয়া, বড্ড দায়িত্বশীল মেয়েটি। মাঝে মাঝেই আড্ডা বসে তিনজনে, সৌগত ঘরে থাকলে চারজনেতাঁরা স্মৃতিচারণ করেন ফেলে আসা দিনের। সারা দিনের দৌড়ঝাঁপ সেরে গল্প শুনতে শুনতে কখন যেন বুজে আসে ক্লান্ত নিরুপমার দুই চোখের পাতা। কাজ থেকে ফিরতে সৌগতর ঘরে ফিরতে রাত হয়ে যায় কখনও। তবু সে চেষ্টা করে যতটা সম্ভব নিরুপমাকে ঘরের কাজে সহায়তা করতে, যদিও কাজের চাইতে অকাজই করে ফেলত বেশি, অনভ্যাসে
এরই মধ্যে একদিন নিরুপমা জানাল এক মোক্ষম সংবাদ। শ্বশুর-শাশুড়ি তখন তাঁদের বড় ছেলের ওখানে। রাতে বিছানায় শুয়ে সৌগতর কানের কাছে মুখ নিয়ে নিরুপমা বলল -
– জানো, এ মাসে পিরিয়ড হয়নি আমার। বলেই দুহাতে নিজের মুখ ঢাকল নিরুপমা।
সৌগত তড়াক করে উঠে বসল বিছানায়। দুহাতে জড়িয়ে ধরল নিরুপমাকেলজ্জানত নিরুপমা খানিকটা ধমকের সুরে বলল -
– না, একদম না। এসব ধরাধরি চলবে না আপাতত।
– ঠিক আছে বাবা। কর্ত্রীর ইচ্ছায় কর্ম। - বলেই নিরুপমার কপালে গভীর সোহাগে এঁকে দেয় অন্তরঙ্গ চুম্বন। বলে -
– কাল বিকেলেই ডাক্তারের কাছে যাব, কেমন ?
সম্মতি জানায় নিরুপমা।
যথাসময়েই ছোট্ট চুমকির আগমন। ফুটফুটে দেবীপ্রতিমা যেন সন্তানসুখে তখন উথালপাতাল সৌগত-নিরুপমা। কেমন পরিপক্ক মায়ের মমতা দিয়ে চুমকিকে আগলে রাখে সারাক্ষণসৌগত যতটা সম্ভব ঘরে থাকার চেষ্টা করে। প্রসাধন আর খেলনা কিনে কিনে ঘর ভর্তি করে ফেলে। নিরুপমা বাধা দেয় না সৌগতর এই ন্যায্য কর্মকাণ্ডে।
এভাবেই গড়াতে থাকে দিন এত কিছুর মধ্যেও সৌগতর কিছু ব্যবহারে খানিক অবাক হয় নিরুপমা। চুমকি ততদিন কিছুটা স্থির হয়েছে, বসতে শিখেছে চুমকি। একদিন সৌগত দেখতে পেল চুমকি পটি করেছে। নিরুপমাকে ডেকে কথাটা জানাল সৌগত। সেদিন প্রথমবারের মতোই বাসন ধোওয়ার কাজে ব্যাস্ত থাকায় চুমকি বলল -
– তুমি ওকে একটু সাফ করে দাও না। আমি এখনই আসতে পারছি না।  
খানিক বাদে রান্নাঘরের সিংক-এ বাসনগুলো ধুয়ে, হাত মুছে এসে দেখে সৌগত চুমকিকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। কিছুই করেনি। অবাক হয় নিরুপমা। তবে মুখে কিছু বলেনি। চুমকিকে কলতলায় নিয়ে গিয়ে ভালো করে সাফসুতরো করিয়ে এসে যেখানে পটি করেছিল সেই জায়গাটি জল দিয়ে ধুয়ে সাফ করে দেয়।
আরেক দিনের ঘটনা। চুমকি কোনো কারণে বমি করেছিল। যা খেয়েছিল সবটাই বেরিয়ে এসেছিল। ঘরেই ছিল সৌগত। ডাকতেই এঘরে এসে দেখে বমিতে নোংরা হয়ে আছে মেঝে। সৌগত সঙ্গে সঙ্গেই নিরুপমাকে সরিয়ে দিয়ে সবটুকু নোংরা নিজেই সাফ করল। অবাক হয়ে যায় নিরুপমা সৌগত জানত বাকি সবকিছু সহ্য করলেও বমি সাফ করতে পারে না নিরুপমা। বমির গন্ধে ওর দমবন্ধ হয়ে আসে। একদিন বলেছিল নিরুপমা সেই কথা। সৌগতর এই বিপরীতধর্মী আচরণকে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছিল সেসবারই কিছু বিশেষ বিশেষ ব্যাপারে অনীহা, অপারগতা থাকতে পারে।
সৌগতর সেই বিশেষ অপারগতার কারণেই তাই বৃদ্ধা শাশুড়ি যেদিন থেকে ওদের ঘরেই শয্যাশায়ী হলেন সেদিন থেকে তাঁর মলমূত্র সাফ করার দায়িত্ব নিরুপমাকেই সামলাতে হল যতদিন তিনি বেঁচেছিলেন। যদিও পরে সৌগত এ নিয়ে পরোক্ষে নিরুপমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিল বহুবার
নিরুপমা ভাবে মেয়েজীবনে এই এক কৃচ্ছসাধন চালিয়ে যেতেই হয় আজীবন। দাদা-বউদির সেই ছেলে-মেয়ে দুটিকে যেভাবে যত্নে, আদরে বড় করেছিল এখন একদিকে ঠিক সেইভাবেই চুমকি আর অন্যদিকে সৌগতর মায়ের জন্য করে যেতে হচ্ছে। প্রাণপ্রিয় সব মানুষ এরা তবু এক এক সময় অসহ্য লাগে নিরুপমার। কবে যে এসব থেকে মুক্তি মিলবে তা কেউ জানে না।
###
এরপর কেটে গেছে বহু দিন। গত হয়েছেন শ্বশুর-শাশুড়ি। চুমকি বড় হয়েছে, চাকরি পেয়েছে, বিয়েও হয়ে গেছে। এক ফুটফুটে ছেলে ওর। নিরুপমার ভেতরে আনন্দের উছল লহর তৃতীয় প্রজন্মের আগমনে প্রথম প্রজন্মের এক প্রচ্ছন্ন সার্থকতা তাঁদের উদ্বেলিত করে তোলে
এদিকে নাতির জন্মের পর থেকেই ফের যেন আয়া হয়ে গেছেন নিরুপমা - এই বয়সে এসেও। চুমকির বর যেহেতু চাকরিসূত্রে বাইরে থাকে, মাঝে মাঝে ছুটিছাটায় দু-চারদিনের জন্য আসে শুধু, তাই ওরা নিরুপমাকে নিয়ে গেছে ওদের কাছে কিছুদিনের জন্য - অন্তত চুমকির ছেলে যতদিন কিছুটা বড় না হয়ে যায়। বলতে গেলে এ এক নতুন সংসার নিরুপমার। সংসারের কাজকর্ম ফিরে এসেছে ফের স্বমহিমায়। পার্ট টাইম ঠিকে-ঝি থাকলেও সে আর কতটুকু সামলায় ? চুমকি অফিসে বেরিয়ে গেলে নাতিকে দেখাশোনা করার জন্য একটি মেয়ে আসে। দিনটা থেকে চলে যায় সন্ধ্যায়। কিন্তু সেই মেয়ে আর কতটা করতে পারে ? নাতির সঙ্গে খেলাধুলা করে বসে বসে। সঙ্গে নিজেও খেলতে থাকে। নাতির যাবতীয় দেখভাল নিরুপমাকেই করতে হয়। মাঝে মাঝেই অগাধ স্নেহ-মমতাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে শারীরিক অসুস্থতা মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় তাঁর আজকাল উঠতে বসতে কষ্ট হয় নিরুপমার দেহের অস্থিগুলো যেন বিদ্রোহ করতে শুরু করেছে আপনজনের, বিশেষ করে তৃতীয় প্রজন্মের শিশুদের সান্নিধ্য, তাদের যত্ন করতে পারার মতো সুখ আর কোথাও নেই মনে হয় কিন্তু সবকিছুরই হয়তো এক সীমাবদ্ধতা আছে এই বয়সে এসে কতটা ধকল আর নেওয়া যায় ? বিশেষ করে পটি সাফা করার কাজে এখন নিরুপমার বড্ড অনীহা। বমি করলে তো কথাই নেই। একদিন সময়মতো বমি সাফা না করায় অফিসফেরত চুমকি একটু কটুকথাই শোনালো মা’কে। নিরুপমা নীরব কান্নায় ভেসেছিলেন সেদিন - চুমকির অগোচরে। পায়ে, কোমরে ব্যথায় ভুগছেন নিরুপমা বেশ কিছুদিন থেকে। রাতে ঘুম আসে না ঠিকমতো দায়বদ্ধতার দু:স্বপ্নে জেগে ওঠেন বারবার কিন্তু সেসব বলার মতো কেউ নেই কাছে বড্ড অসহায় লাগে নিজেকে একদিকে স্নেহের আবেশ আর অন্যদিকে নিজের অসহায়তা - দুয়ের টানাপোড়েনে বিধ্বস্ত নিরুপমা যেন প্রাণপণে সাঁতরে চলেছেন অথই জলে, অজানার উদ্দেশে চুমকির দিনরাত কাজ আর কাজ কখনও তারই ফাঁকে একবার ছেলের কাছে এসে যেন নিয়মমাফিক আদরে দায় সেরে যায় আর সব দায় নিয়ে একা নিজের ভাগ্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে  চলেছেন নিরুপমা সৌগত তাঁর চাকরি জীবনের শেষ পর্যায়ে রয়েছেন। তাঁর অবসর গ্রহণের পর কী যে হবে সংসারের হাল তা জানেন না নিরুপমা। জীবনভর সামলে আসা এই দায় থেকে কি মুক্তি ঘটবে তাঁর ? নাকি বেড়ে যাবে আরও ? 
মাঝে মাঝেই ভাবেন বসে - এই দায় কি তাঁকে সারা জীবনই বইতে হবে ? আমৃত্যু ? এই কি তবে নারী জীবনের অমোঘ পরিণতি ? স্নেহ-ভালোবাসার দায় কি একা নিরুপমারই ? একা নারীরই ? স্নেহ-ভালোবাসার দায় কি এভাবে কায়িক শ্রমের মাধ্যমেই মেটাতে হয় ?
এরই মধ্যে একদিন নিরুপমাকে চমকে দিয়ে সলাজ হাসি হাসি মুখ করে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে চুমকি জানাল -
– জানো ? আমি আবার মা হতে চলেছি।
নিরুপমা হাসবেন না কাঁদবেন স্থির করে উঠতে পারলেন না। ততক্ষণে ঝলমলে রোদে উদ্ভাসিত হয়েছে একদিক যদিও অমাবস্যার কালো আঁধারে নিমজ্জিত হয়েছে পৃথিবীর এই প্রান্ত  
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...

মহানিষ্ক্ৰমণ

প্রায় চল্লিশ বছর আগে গ্রামের সেই মায়াময় বাড়িটি ছেড়ে আসতে বেজায় কষ্ট পেয়েছিলেন মা ও বাবা। স্পষ্ট মনে আছে অর্ঘ্যর, এক অব্যক্ত অসহায় বেদনার ছাপ ছিল তাঁদের চোখেমুখে। চোখের কোণে টলটল করছিল অশ্রু হয়ে জমে থাকা যাবতীয় সুখ দুঃখের ইতিকথা। জীবনে চলার পথে গড়ে নিতে হয় অনেক কিছু, আবার ছেড়েও যেতে হয় একদিন। এই কঠোর বাস্তব সেদিন প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করতে পেরেছিল অর্ঘ্যও। সিক্ত হয়ে উঠছিল তার চোখও। জন্ম থেকে এখানেই যে তার বেড়ে ওঠা। খেলাধুলা, পড়াশোনা সব তো এখানেই। দাদাদের বাইরে চলে যাওয়ার পর বারান্দাসংলগ্ন বাঁশের বেড়াযুক্ত কোঠাটিও একদিন তার একান্ত ব্যক্তিগত কক্ষ হয়ে উঠেছিল। শেষ কৈশোরে এই কোঠাতে বসেই তার শরীরচর্চা আর দেহজুড়ে বেড়ে-ওঠা লক্ষণের অবাক পর্যবেক্ষণ। আবার এখানে বসেই নিমগ্ন পড়াশোনার ফসল ম্যাট্রিকে এক চোখধাঁধানো ফলাফল। এরপর একদিন পড়াশোনার পাট চুকিয়ে উচ্চ পদে চাকরি পেয়ে দাদাদের মতোই বাইরে বেরিয়ে যায় অর্ঘ্য, স্বাভাবিক নিয়মে। ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে যায় দিদিরও। সন্তানরা যখন বড় হয়ে বাইরে চলে যায় ততদিনে বয়সের ভারে ন্যুব্জ বাবা মায়ের পক্ষে আর ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বহু জল্পনা কল্পনার শেষে ত...