ত্রিপুরার
সমস্থানিক দুটি লিটল ম্যাগাজিন যদিও প্রকাশের ধারাবাহিকতায় একেবারেই ভিন্ন। ২০২৫-এর
শেষ তৃতীয়াংশে প্রকাশিত ‘বহ্নিশিখা’ (শারদ উৎসব সংখ্যা, ৩৫তম বর্ষ) এবং ‘ঐতিহ্য’
(প্রথম সংখ্যা) প্রকাশিত হয়েছে যথাক্রমে উত্তর ত্রিপুরা জেলার ধর্মনগর থেকে নিভা
চৌধুরী এবং ধলাই জেলার কমলপুর থেকে প্রবোধ চন্দ্র দাসের সম্পাদনায়। স্বভাবতই
সম্ভার, উৎকর্ষ ও সম্পাদনায় বৈপরীত্য থাকলেও আলোচনার টেবিলে জায়গা করে নিয়েছে গরজ
ও ভৌগোলিক নৈকট্যের নিরিখে।
বহ্নিশিখা
‘সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাস বিষয়ক ত্রৈমাসিক’ এই
পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যার এক আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রচ্ছদ। ব্যত্যয় ঘটেনি
আলোচ্য সংখ্যায়ও। প্রাসঙ্গিকতায়, চিত্রে, বর্ণে যথারীতি চিত্তাকর্ষক যদিও আলোচ্য সংখ্যায়
প্রচ্ছদকারের নাম অনুল্লেখিত। ১/৪ ক্রাউন সাইজের সাকুল্যে ২৯ পৃষ্ঠার এই সংখ্যাটি আবার সম্ভারে পরিপূর্ণ। কাব্যিক
উৎসর্গ করা হয়েছে অসম তথা উত্তরপূর্বের ‘গণকবি’ বিপুল কুমার দত্তের উদ্দেশে। নি:সন্দেহে এক ব্যতিক্রমী উৎসর্গ। শক্তিপূজা
ও দুর্গোৎসব নিয়ে এক পৃষ্ঠার সম্পাদকীয়র আগে দুই পৃষ্ঠাব্যাপী সূচিপত্রে রয়েছে গদ্য-পদ্যের বাহার যদিও বিন্যস্ত হয়নি বিভাগবিন্যাসে। পটচিত্রের
উপর ড. চিত্তরঞ্জন মাইতির নিবন্ধ অতি সংক্ষেপিত। চার
পৃষ্ঠাব্যাপী নিবন্ধ মন্টু দাস-এর ‘ডরাই বিষহরি
পূজা ও গুরমার নাচ’ এই সংখ্যার সম্পদ। বিচিত্র, সংক্ষিপ্ত ও সুধাময় গদ্য লিখেছেন অহীন্দ্র দাস, অমিত
চট্টোপাধ্যায় ও মিলনকান্তি দত্ত। কল্যাণী
ভট্টাচার্যের ব্যক্তিগত গদ্য অতিসংক্ষিপ্ত। প্রেম
ভালোবাসার আবহে নিরালা প্রকৃতির আঙ্গিনায় দিব্যেন্দু নাথের অণুগল্প ‘প্রতিধ্বনির পাখি’ সুলিখিত।
কবিতা বিভাগ
সততই সমৃদ্ধ এই পত্রিকার। এবারের সংখ্যায়
রয়েছে যাঁদের নানা স্বাদের কবিতা তাঁরা হলেন - সন্তোষ রায়,
বিমলেন্দু চক্রবর্তী, শশাঙ্কশেখর পাল, জহর দেবনাথ, মধুমিতা ভট্টাচার্য, সুনির্মল বিশ্বাস, গোবিন্দ ধর, শক্তি পুরকাইত, মিতা চক্রবর্তী, উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায়, বিভুলাল চক্রবর্তী, নন্দিতা ভট্টাচার্য, সুবীর সেন ঘোষ, সিন্ধু রায়, ডা. শিশির কুমার বিশ্বাস,
চিত্রা দত্ত, নিবারণ নাথ, কামনা দেব, পরিমল কর্মকার, সুচিত্রা
দাস, চন্দন পাল, কিরণকুমার সিংহ,
গোপালচন্দ্র দাস, অসীম সরকার, চিরশ্রী দেবনাথ, হৃষিকেশ নাথ, অসীমা
দেবী, অরূপকুমার ভূঞ্যা, রমেন্দ্র চন্দ্র
নাথ, শাশ্বতী দেব, সত্যজিৎ নাথ,
অসিত চক্রবর্তী, মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম,
হারাধন বৈরাগী, সুবল চক্রবর্তী, সজল চক্রবর্তী, নির্মল দবনাথ, বিদ্যুৎ
চক্রবর্তী, সুজিত দেব, জয়ত্রী চক্রবর্তী,
দীপ্তি চক্রবর্তী, মো: ছাবির
আহমেদ, টিংকুরঞ্জন দাস, রাখাল মজুমদার,
পাপিয়া রায়চৌধুরী, বুল্টি চক্রবর্তী, অমলকান্তি চন্দ, সুস্মিতা দেবনাথ, শ্রীমান দাস, তাপস পাল, প্রতিমা
সরকার, রাণা চক্রবর্তী, মধুমঙ্গল বিশ্বাস
ও ইসলাম উদ্দিন।
দেড় পৃষ্ঠা জোড়া ‘ছোটদের পাতা’য় ছড়া ও কবিতা লিখেছে কচিকাঁচারা। তনুশ্রী
দেব, ইতিকথা ভট্টাচার্য, ঐশানী দাস, মৈথিলী মিত্র, অতনিকা দাস ও শ্রীরাধা দেব। এ এক
ব্যতিক্রমী প্রয়াস ও সংযোজন নিঃসন্দেহে।
কাগজের মান যথাযথ। ছাপা
স্পষ্ট হলেও পৃষ্ঠা ও কবিতা বিন্যাসে ত্রুটি লক্ষ করা গেছে। এসব
কাটিয়ে বলাই যায় প্রায় শুদ্ধ বানানে আলোচ্য সংখ্যা ‘বহ্নিশিখা’য় স্পষ্টতই ফুটে উঠেছে কবিতাকে, সাহিত্যকে ভালোবেসে একরাশ
গরজ ও ভালোবাসা।
মূল্য - ৫০ টাকা
ঐতিহ্য
নর্মাল ১/৪ ট্যাবলয়েড সাইজের পত্রিকা ‘ঐতিহ্য’। পথ চলা
শুরুর সংখ্যাটি সমৃদ্ধ হয়েছে পত্রিকানামটিকে পাখির চোখ করে। রাজ্য
ও দেশের বিশিষ্ট সব ঐতিহ্যময় স্থানের ছবি সংবলিত প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ঐতিহ্যকে
ধরে রাখার এই প্রয়াস নি:সন্দেহে অনন্য। সম্পাদকীয়তেও
স্পষ্ট আভাস ও গরজ প্রতিফলিত হয়েছে - ‘…আমরা এমন এক যুগে
বাস করছি, যেখানে প্রযুক্তির গতি আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয় কিন্তু
হৃদয়ের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বজুড়ে
সংযোগের আলো জ্বলছে অথচ নিজের মাটির গন্ধ, নিজের ভাষার সুর,
ছন্দ, নিজের সংস্কৃতির ছোঁয়া হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে
ধীরে। এই সময়ে ‘ঐতিহ্য’ আমাদের প্রতিজ্ঞা - নিজের
শিকড়ে ফিরে যাওয়ার, নিজের উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের কাছে
পৌঁছে দেওয়ার…।’
পৃষ্ঠাজোড়া বিন্যস্ত
সূচিপত্রের পাঁচটি পর্যায়ে রয়েছে একাধিক কবিতা। এর মাঝে
মাঝে রয়েছে তিনটি প্রবন্ধ, একটি নিবন্ধ ও একটি রম্য রচনা। শুভ্রা
সাহার প্রবন্ধ ‘বাঙালি নারীর পোশাক ও জ্ঞানদানন্দিনী দেবী’
পরিসরের অভাবে সংক্ষিপ্ত হলেও যথেষ্ট তথ্যাদির প্রয়োগে ব্যতিক্রমী এবং
একাধারে সুলিখিত। রয়েছে জহর দেবনাথের
প্রবন্ধ ‘ঐতিহ্যের সংকটে আমাদের সময়’। সংক্ষিপ্ত
হলেও বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আমাদের ঐতিহ্যের অবলুপ্তির বেদনার এক সজীব
অবলোকন। জহরলাল দাসের প্রবন্ধ ‘লোকসংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে ত্রিপুরার বিলুপ্তপ্রায় উপজাতীয় লোকসংস্কৃতি’
অনবদ্য একটি প্রতিবেদনধর্মী রচনা। বিষয়ভিত্তিক
এই রচনা পরিসর অনুযায়ী যথাসম্ভব গোছানো ও সুলিখিত। নিয়তি
রায় বর্মণ-এর ‘রবীন্দ্রনাথ ও ত্রিপুরার শেষ চার মহারাজা’
তথ্যাদির যথাযথ উপস্থাপনে এক ইতিহাসাশ্রিত নিবিড় পাঠের নিবন্ধ। বিভুলাল
চক্রবর্তীর রম্য রচনা বিষয়ে, ভাষায়, উপস্থাপনায়
উপভোগ্য।
কবিতার বিভাগে
রয়েছে একাধিক কবিতার সম্ভার। লিখেছেন - ড. অপর্ণা গাঙ্গুলি, সংগীতা গুপ্ত,
রাখী রানী দাস, রূপসী দাস, দীপ্তি চক্রবর্তী, আরতি ভট্টাচার্য, মনীষা গুপ্ত পাল, স্বর্ণসিন্ধু শীল, নিমাই বারুই, বিউটি শুক্ল দাস, নিশীথরঞ্জন পাল, সমীর দাস, সন্ধ্যা
ভৌমিক, ঝর্ণা সাহা, শিশির অধিকারী,
গোবিন্দ ধর, ঝর্ণা রাণী দাস, অসীমা দেবী, শাশ্বতী দেব, তপতী
সাংমা, কার্তিক দেবনাথ, প্রবীর কুমার বিশ্বাস,
অপর্ণা সিংহ, হেমেন্দ্র মালাকার, জনার্দন বনিক ও প্রবোধ চন্দ্র দাস। অধিকাংশ
কবিতাই বিষয়ভিত্তিক।
কাগজের মান, স্পষ্ট ছাপা ও অক্ষর তথা পঙ্ক্তি বিন্যাস। বানান
ও কবিতা নির্মাণ তথা মানসম্পন্ন কবিতার অধিক সংযোজন বিষয়ে অধিক সচেতনতার সুযোগ রয়েছে। শেষের
পৃষ্ঠার একাধিক বিষয়ভিত্তিক সাদাকালো ছবি ও লেজার গ্রাফিক্সের সৌজন্যে সার্বিক অলংকরণ
পত্রিকাটির এই সংখ্যাকে নান্দনিক করেছে নিশ্চিত। প্রথম
সংখ্যার জড়তা কাটিয়ে এক প্রত্যাশার পত্রিকা - ‘ঐতিহ্য’।
মূল্য - ১৫০ টাকা।
বিদ্যুৎ
চক্রবর্তী

Comments
Post a Comment