Skip to main content

নিবেদনে, সম্ভারে অনবদ্য দুটি শারদীয় সংখ্যা


শরৎ মানেই শুধু শিশির কিংবা দুর্গোৎসব অথবা শিউলির ঝরে পড়ার সময় নয়, শরৎ মানে দিকে দিকে শারদীয় সংখ্যাসমূহের প্রকাশিত হওয়ার বেলা। লেখক-সম্পাদকের ফুরসত নেই চেয়ার-টেবিল থেকে দূরে থাকার। পরিসর যদিও অনুমতি দেয় না বিশদে যেতে তবু আলোচনার টেবিলে স্থান করে নিতে পেরেছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত সমকালিক দুটি শারদীয়া/উৎসব সংখ্যা - ১৪৩২। নান্দনিকতার সূত্রে গরজ ও দায়বদ্ধতা ফুটে উঠেছে স্পষ্ট হয়ে। সুচয়িত সম্ভারে সন্নিবিষ্ট হয়েছে সংখ্যাদ্বয়।

বকলম
সঞ্জয় কুমার নাগ - স্বেচ্ছা সম্পাদক। শরতের আবহে ‘ক্ষুধা’ নামক অসুখটি নিয়ে আধপৃষ্ঠার এক অনবদ্য সম্পাদকীয় সংখ্যাটির অন্যতম সম্পদ। সম্ভার এতটাই যে শুধু সূচিপত্রেই (বিজ্ঞাপন সহ) ব্যয়িত হয়েছে ছয়টি পৃষ্ঠা। ২৪১ পৃষ্ঠার পত্রিকা সংখ্যাটির ৪৯ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও বিশেষ বিশেষ বিষয় নিয়ে সুলিখিত ৮টি প্রবন্ধ। সংখ্যাটির মুখ্য মূলধন ১৩৮ পৃষ্ঠা জুড়ে থাকা ২৮টি সুচয়িত গল্প। এর মধ্যে রয়েছে রাখী কর্মকারের লেখা ‘জাগুয়ার আর হরিণের গল্প’ (মধ্য আমেরিকার মায়া আমেরিকান ইন্ডিয়ান উপকথা) এবং মনামী সরকার, বিপুল আচার্য, মনিমা মজুমদার, হরিপদ রায়, নীলেশ নন্দী ও সায়ন তালুকদার-এর লেখা ছয়টি অণুগল্প। বিচিত্র সব বিষয় ও চিন্তা-ভাবনার অপূর্ব প্রতিফলন। অধিকাংশ গল্পই সুচয়িত ও সুখানুভবের আকর। রয়েছে মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য ও জয়ন্ত চক্রবর্তীর দুটি ফিচার এবং ৪৩ পৃষ্ঠা জুড়ে ৪৪ জন কবির কবিতা। এই বিশাল সম্ভারে রয়েছে এক আকাশ অনুষঙ্গ, রয়েছে সুবিশাল বৈচিত্র। রয়েছে দীর্ঘ কবিতা, গদ্য কবিতা, কারও বা একাধিক কবিতা। 
সব মিলিয়ে এক পরিপূর্ণ সম্ভার। রবীন্দ্রনাথ সাহার প্রচ্ছদ ও রাকেশ দেবনাথের অলংকরণ নান্দনিক। অক্ষরবিন্যাস যথাযথ হলেও কাগজের মানজনিত কারণেই হয়তো বা ছাপার স্পষ্টতা বিঘ্নিত হয়েছে মাঝে মাঝে। সতর্ক সম্পাদনার ফাঁক গলে সংখ্যায় নিতান্তই স্বল্প হলেও রয়ে গেছে কিছু যতিচিহ্নের বিন্যাস, কিছু বানানজনিত বিভ্রাট। এহ অনিবার্য। কোচবিহারের দিনহাটা থেকে প্রকাশিত ‘বকলম’ নান্দনিকতায়, বৈচিত্রে নিঃসন্দেহে জায়গা করে নেয় উৎকৃষ্ট শারদীয় সংখ্যার সম্ভারে।
মূল্য - ২৫০ টাকা।

কেতকী
বিকাশ সরকারের প্রচ্ছদ প্রথমেই নজর কেড়ে নেওয়ার মতো। পুরুলিয়ার শিয়ালডাঙা থেকে বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় ও নীলোৎপল গঙ্গোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় সেজে উঠেছে উৎসব সংখ্যা ‘কেতকী’। ১৬৭ পৃষ্ঠার সংখ্যাটির প্রথমেই বিপ্লবের সম্পাদকীয় এবং নীলোৎপলের বিশেষ সম্পাদকীয়তে ধরা আছে কিছু প্রত্যয়ের কথা, কিছু প্রতিবাদের কথা।
বলা যায় মূলত কবিতাকে মূলধন করেই সেজে উঠেছে কাব্যময় এই সংখ্যাটি। কবি আশিস সান্যালের একটি অপ্রকাশিত কবিতা দিয়ে শুরু হয়েছে লেখালেখির সম্ভার। সাহিত্য - বিশেষত কবিতা বিষয়ে বিস্তৃতি ও বিশেষত্বের সন্নিবেশে একগুচ্ছ প্রবন্ধ লিখেছেন ছয়জন প্রাবন্ধিক। ওড়িআ ভাষার কবি ফনী মহান্তির সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি ও অনুবাদক শ্যামলী সেনগুপ্ত। রয়েছে ‘এই সংখ্যার কবি’ অন্তরা দাঁ-এর কাব্যপ্রতিভা ও কবিতার উপর একটি প্রতিবেদন। এই সচিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কবির পরিচিত, সাথে কছু কবিতাও। রয়েছে চারজন করে কবির অনুবাদ কবিতা এবং সমসংখ্যক ছড়া। বিতস্তা ঘোষালের কাব্যগ্রন্থ ‘হিরণ্ময় পুরুষ তোমাকে’-এর উপর বিস্তৃত পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখেছেন সৈয়দ কওসর জামাল। কবিতা নিয়ে এই বৈচিত্রের পাশাপাশি রয়েছে ৭৮ জন কবির এক বা একাধিক কবিতা। অধিকাংশ কবিতায় ধরা আছে প্রতিবাদী সুর - পত্রিকার মান মেনে। 
কাগজের মান, ‘প্রায়’ নির্ভুল ছাপা, অক্ষরবিন্যাস সবকিছুই যথাযথ। কিছু বেয়াড়া বানানের উল্লেখ না করাই শ্রেয়। সব মিলিয়ে বিশিষ্টতার প্রতীক হিসেবে এক অনন্য শারদীয় কাব্যসংখ্যা হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে ‘কেতকী’।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
মূল্য - ২০০ টাকা

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...

মহানিষ্ক্ৰমণ

প্রায় চল্লিশ বছর আগে গ্রামের সেই মায়াময় বাড়িটি ছেড়ে আসতে বেজায় কষ্ট পেয়েছিলেন মা ও বাবা। স্পষ্ট মনে আছে অর্ঘ্যর, এক অব্যক্ত অসহায় বেদনার ছাপ ছিল তাঁদের চোখেমুখে। চোখের কোণে টলটল করছিল অশ্রু হয়ে জমে থাকা যাবতীয় সুখ দুঃখের ইতিকথা। জীবনে চলার পথে গড়ে নিতে হয় অনেক কিছু, আবার ছেড়েও যেতে হয় একদিন। এই কঠোর বাস্তব সেদিন প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করতে পেরেছিল অর্ঘ্যও। সিক্ত হয়ে উঠছিল তার চোখও। জন্ম থেকে এখানেই যে তার বেড়ে ওঠা। খেলাধুলা, পড়াশোনা সব তো এখানেই। দাদাদের বাইরে চলে যাওয়ার পর বারান্দাসংলগ্ন বাঁশের বেড়াযুক্ত কোঠাটিও একদিন তার একান্ত ব্যক্তিগত কক্ষ হয়ে উঠেছিল। শেষ কৈশোরে এই কোঠাতে বসেই তার শরীরচর্চা আর দেহজুড়ে বেড়ে-ওঠা লক্ষণের অবাক পর্যবেক্ষণ। আবার এখানে বসেই নিমগ্ন পড়াশোনার ফসল ম্যাট্রিকে এক চোখধাঁধানো ফলাফল। এরপর একদিন পড়াশোনার পাট চুকিয়ে উচ্চ পদে চাকরি পেয়ে দাদাদের মতোই বাইরে বেরিয়ে যায় অর্ঘ্য, স্বাভাবিক নিয়মে। ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে যায় দিদিরও। সন্তানরা যখন বড় হয়ে বাইরে চলে যায় ততদিনে বয়সের ভারে ন্যুব্জ বাবা মায়ের পক্ষে আর ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বহু জল্পনা কল্পনার শেষে ত...