Skip to main content

জীবন্ত কিংবদন্তির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য - ‘অপার সুকুমার’


শ্রী সুকুমার বাগচি। উত্তরপূর্বের সাহিত্য, সংস্কৃতির জগতে সুকুমারবৃত্তির এক অন্য নাম। সুনির্দিষ্ট এক সময়কালে এই অঞ্চলে সুগন্ধী সমীরণের মতো তাঁর আগমন এবং অবস্থান শেষে উত্তরসূরিদের জন্য এক চিরস্থায়ী ছাপ রেখে তিনি বর্তমানে মুম্বাইয়ের বাসিন্দা। ছাপ এতটাই প্রকট যে এক স্পষ্ট ব্যতিক্রম হিসেবে সম্প্রতি তাঁকে নিয়েই প্রকাশিত হয়েছে গুয়াহাটি থেকে সাহিত্যিক, সম্পাদক তুষারকান্তি সাহার সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘মজলিশ সংলাপ’ পত্রিকার ১৫৮তম সংখ্যা - ‘অপার সুকুমার’, যে সংখ্যাটির আমন্ত্রিত সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন বিশিষ্ট লেখক, রম্যরচনাকার মদনগোপাল গোস্বামী।
‘শেষের পাতা’য় সম্পাদক লিখছেন - ‘…উত্তর-পূর্বাঞ্চলে শুদ্ধভাবে বাংলাভাষা চর্চা ও বানান-উচ্চারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী ও লেখক শিল্পী মহলে যে ব্যাপক সচেতনতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে তার নেপথ্যে তৎকালীন দুটি বাংলা দৈনিকের দায়িত্ববান সম্পাদক সুকুমার বাগচির অবদানকে কোনোমতেই অস্বীকার করা যাবে না। …এমন একজন মানুষ যখন জীবনের উপান্তে পৌঁছেও নিজভূমি থেকে দূর-প্রবাসে অবস্থান করে শুধুমাত্র মাতৃভাষার সার্বিক শুদ্ধতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে সাধনার পর্যায়ে কর্মে ব্রতী থাকেন তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর প্রতি আমাদের ঋণ স্বীকার ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের দায়িত্ব থেকেই যায়। এ-কারণেই ‘মজলিশ সংলাপ’ পরিবারের পক্ষ থেকে এই বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের উদ্যোগ…।’
আবার সম্পাদকীয়স্বরূপ ‘প্রথম পাতা’য় আমন্ত্রিত সম্পাদক লিখছেন - ‘…উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি বহুচর্চিত এবং জনপ্রিয় নাম সুকুমার বাগচি। বিশেষ করে দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন, এক্ষেত্রে তিনি নিঃসন্দেহে পথিকৃৎ। …রচিত হয় সুকুমার ইতিহাস। সে ইতিহাস উঠে এসেছে এই পত্রিকার পাতায় পাতায়…।’
আসলেই এক ইতিহাস রচিত হয়েছে সেই সময়কালে এবং আলোচ্য এই সংখ্যাটিতে। দুই সম্পাদক ছাড়াও এখানে কলম ধরেছেন হাল আমলের একগুচ্ছ লেখক-সাংবাদিক যাঁরা কোনোভাবে সংস্পর্শে এসেছেন সুকুমার বাগচি মহোদয়ের। নানা আঙ্গিকে বর্ণিত হয়েছে তাঁদের সান্নিধ্যস্মৃতি, অন্তরের শ্রদ্ধা ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। প্রতিটি প্রতিবেদন এতটাই আন্তরিক যে পড়া শুরু করলে থেমে থাকার জো নেই। সুকুমার-সান্নিধ্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণে উঠে এসেছে নানা তথ্য, অনেকের সম্বোধনে বাগচি স্যারের সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি একাগ্রতা, বিশেষ করে বানান ও উচ্চারণ বিষয়ক অনলস দায়বদ্ধতা, অগাধ গরজ ও পাণ্ডিত্যের কথা। বলা যেতে পারে একাধারে এক নিমগ্ন সাধক এবং ভবিষ্যৎস্রষ্টাও। তাই তো নিজে হাতে কলমে শিখিয়েছেন সাহিত্যসৃষ্টি ও সাংবাদিকতার পাঠ। যাঁদের মধ্যেই দেখেছেন সামান্যতম সম্ভাবনা তাঁদেরই ডেকে নিয়েছেন আপন করে, ঘষে মেজে জায়গা করে দিয়েছেন চলার পথের সফল পথিক হিসেবে। এই পথে কদাচিৎ বিরূপ সমালোচনা কিংবা কটু বিরোধিতার সম্মুখীন হলেও নিজের কাজে অবিচল থেকে, স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য এবং অন্তরের উজাড় করা ভালোবাসার মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন এক নান্দনিক ভবিষ্যৎ। আলোচ্য সংখ্যার প্রত্যেক লেখকই তাই অকুণ্ঠ চিত্তে স্বীকার করেছেন সেইসব দিনের কথা। স্বীকার করেছেন বাগচি মহাশয়ের অসামান্য অবদানের কথা। এই সংখ্যায় যাঁরা কলম ধরেছেন তাঁরা সবাই আজ প্রতিষ্ঠিত লেখক-সাংবাদিক। স্বভাবত প্রতিটি লেখাতেই যেন নতুন করে খুঁজে পাওয়া যায় এই জীবন্ত কিংবদন্তিকে। 
মানুষ সুকুমার, তাঁর সাহিত্যকৃতি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, নির্ভীক সাংবাদিকতা, কবি লেখক সুকুমার, তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছা, দিনযাপন সব কিছুই উঠে এসেছে আজকের লেখকবৃন্দের কথায়। ১৬০ পৃষ্ঠার মধ্যে সন্নিবিষ্ট ৪৩টি রচনা/অধ্যায়ের উপর আলাদা মন্তব্য করার পরিসর নেই। প্রতিটি লেখাই যেখানে স্বকীয়তায় সমৃদ্ধ তাই বিশেষভাবে তুলে ধরাও সহজ নয়। শ্রদ্ধা ভালোবাসায় সুকুমার বাগচির সান্নিধ্য ও তাঁর কর্মকুশলতা নিয়ে যাঁরা কলম ধরেছেন এই সংখ্যায় তাঁরা হলেন - পি সি সরকার জুনিয়র, উষারঞ্জন ভট্টাচার্য, অমলেন্দু চক্রবর্তী, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় (বাংলাদেশ), পান্নালাল গোস্বামী, নন্দিতা ভট্টাচার্য গোস্বামী, শ্যামলকান্তি দাস, মানিক দাস, মাহমুদ কামাল (বাংলাদেশ), শংকর চক্রবর্তী, শৈলেন সাহা, সঞ্জীব দেবলস্কর, প্রদ্যোত চক্রবর্তী, পীযূষপটল দাশগুপ্ত, কমলেশ দাশগুপ্ত (বাংলাদেশ), সঞ্জয় চক্রবর্তী, শ্যামাশিস ভট্টাচার্য, শংকরকুমার দাস, গৌতম ভট্টাচার্য, প্রণব আচার্য, দীপক সেনগুপ্ত, মনোজ দেব, অরিজৎ আদিত্য, পার্থ ভট্টাচার্য, হিমাশিস ভট্টাচার্য, বাসব রায়, সৌমিত্রকুমার চ্যাটার্জি, সঞ্জয় গুপ্ত, দীপিকা বিশ্বাস, শেখ আব্দুল মান্নান, জ্যোতির্ময় সেনগুপ্ত, পরিতোষ তালুকদার, শান্তনু সরকার, প্রসূন বর্মন, পলাক্ষী দাস, বেদবতী গোস্বামী, মৈথিলী গোস্বামী, মদনগোপাল গোস্বামী এবং সুকুমার বাগচি মহাশয়ের অগ্রজ ভ্রাতা সদ্যপ্রয়াত সুবোধ বাগচি, ছোটবোন সুলতা বাগচি ও আত্মজা শ্বেতপর্ণা ভট্টাচার্য।
প্রচ্ছদের অসামান্য স্কেচ এবং সার্বিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে যথাক্রমে প্রদ্যোত চক্রবর্তী ও উদয়ন বিশ্বাস। বর্ণবিন্যাসে সুলতা বাগচি। ছাপার স্পষ্টতা, কাগজের মান, অক্ষর-শব্দ-বাক্য বিন্যাস যথাযথ। একটি পত্রিকা সংখ্যা কিংবা গ্রন্থে বানান, যতিচিহ্ন কিংবা ছাপার একশ ভাগ শুদ্ধতা বড়ই বিরল। আলোচ্য সংখ্যায়ও ব্যত্যয় ঘটেনি তার। দুই দুইজন সম্পাদকের শ্যেনচক্ষু এড়িয়ে রয়ে গেছে তাই বেশ কিছু, এমনকী অধ্যায়ের শিরোনামেও। তবু এমন উদ্যোগ, এমন মহার্ঘ একটি সংখ্যা যে ভবিষ্যতের জন্য এক মূল্যবান দলিল হয়ে রইল এটাই মূল কথা এবং যোগ্যজনে যোগ্য সম্মান দিতে পারাটাই শেষ কথা।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
প্রকাশক - মজলিশ বইঘরের পক্ষে সোনালি গুপ্ত।
মূল্য - ২০০ টাকা

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

বিষয়-মানসে প্রকাশিত ‘স্বরিত’ - সপ্তদশ সংখ্যা

কোনও দ্বিধা কিংবা ভয়কে অবলীলায় উড়িয়ে দিয়ে জলকে জল , মাটিকে মাটি কিংবা দেশকে দেশ ( দ্বেষ , দ্যাশ কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্র নয় ) বলতে পারেন যে ক ’ জন , তাঁদের মধ্যে অন্যতম কবি , লেখক , সম্পাদক নারায়ণ মোদক । বরাক উপত্যকার শ্রীভূমি থেকে ২১ মার্চ বিশ্ব কবিতা দিবসে প্রকাশিত হয়েছে বার্ষিক পত্রিকা ‘ স্বরিত ’- এর সপ্তদশ সংখ্যা । দ্বৈত সম্পাদনায় নারায়ণ মোদক ও গৌতম চৌধুরী। এবারের বিষয় ছিল প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অব্যবস্থা , অত্যাচার , সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নিপীড়ন ইত্যাদি নিয়ে প্রতিবেদন ও সহমর্মিতা ইত্যাদি । স্বভাবতই এর প্রতিবাদ হওয়া উচিত । এই নির্ভীক , বলিষ্ঠ পদক্ষেপের উদ্যোগ কতটা সফল হয়েছে , কতটা সহমর্মিতা বর্ষিত হল , কতটা প্রতিবাদ স্বরিত হল তার এক নির্মোহ বিশ্লেষণ সংখ্যাটির আলোচনার এক অমোঘ অনুষঙ্গ ।   ভূমিকার আধারে ‘এ সংখ্যার বিষয়ে আলোকপাত’ করতে গিয়ে অন্যতম সম্পাদক নারায়ণ মোদক লিখছেন - ‘… আমাদের সমাজে একদল নিজেকে মানবতাবাদী সাজিয়ে নিরাপদ দূরত্বে বসে সমাজ এবং সরকারের সব রকম সুবিধা ভোগ করে বিজ্ঞতার সাথে বলতে থাকেন সারা বিশ্বের যেখানেই সংখ্যালঘু আছে সেখানেই তারা অত্যাচারিত। আমাদ...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...