Skip to main content

স্বপ্নপুরাণ


স্বপ্ন দেখার কি কোনও ছন্দ থাকে ? কিংবা কোনও ধরাবাঁধা ছক ? আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় - না, একেবারেই না। স্বপ্নের গোরু শুধু গাছেই চড়ে না, পাখনা মেলে ঘুরে বেড়ায় আকাশেও। যেমন ওই পক্ষীরাজ ঘোড়া ঠিক তেমনি পক্ষীসম্রাট গোরু। তবে বিজ্ঞান বলে স্বপ্ন নাকি অতৃপ্ত মনের ইচ্ছেপূরণের সোপান। সিগমুণ্ড ফ্রয়েড-এর মতে স্বপ্ন হচ্ছে manifestations of one's deepest desires and anxieties, often relating to repressed childhood memories or obsessions.
হতেও পারে। তবে স্বপ্ন দেখার সেই যে শুরু পৃথিবীতে জন্ম নিয়েই - 'আধেক ঘুমে নয়ন চুমে স্বপন দিয়ে যায়।' সেই তো শুরু। কত দিন কত যে উদ্ভট স্বপ্ন দেখেছি তার ইয়ত্তা নেই। কোনও ইচ্ছেপূরণের সূত্রই মেলানো যায় না। সবারই এক অনুভব। তবে স্বপ্ন দেখার বাহুল্য ছিল কিশোর বেলা অবধি। গড়িয়ে পড়েছি কত পাহাড় চূড়া থেকে। তবুও বিশেষ ক্ষতি কিছু হয়নি। শুধু ভাঁজ করে রাখা খাড়া দুই হাঁটু দড়াম করে বিছানায় পড়ে পা দুটি সোজা হয়ে গেছে এই যা। কিংবা বিপদে পড়ে যখন মুখ দিয়ে কথা বা চিৎকারের বদলে অদ্ভুত কিছু অষ্ফুট শব্দ বেরোচ্ছিল তখন ঘুমের সহচরের ঠেলায় স্বপ্নের সাথে ঘুমও গেছে টুটে।
তবে এই স্বপ্নের দৌলতেই আমার ছোটবেলাতেই ঘোরা হয়ে গিয়েছিল দেশ বিদেশ। খরচপাতি কিংবা পাসপোর্ট ভিসার ঝামেলা ছাড়াই মন্দ ছিল না এই ভ্রমণসুখ। সেই সব স্বপ্নের দিনগুলোই ছিল আলাদা।
এর পর একটা বয়স যখন এল, তখন থেকেই আবার শুরু হল এক ভিন্নতর স্বপ্ন দেখার পালা। জীবন গড়ার স্বপ্ন। প্রতিযোগিতাময় এই বিশ্ব সংসারে টিকে থাকার স্বপ্ন। সবার সে স্বপ্ন সার্থক হয় না পুরোদস্তুর। এক যাত্রায় পৃথক ফলও হয়। কোনও রকমে সেই সর্বশক্তিমানের প্রচ্ছন্ন মদতে যখন টিকে থাকার স্বপ্ন আমার সাকার হল তখন থেকেই চলছে 'আমার বেলা যে যায় সাঁঝ বেলাতে, তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে।' অর্থাৎ দুয়ে দুয়ে যেই চার হাত হয়েছি সেই থেকে রাতের স্বপ্ন হয়েছে উধাও। দিবাস্বপ্নই সার হল এবার। যাই দেখি তাই হারিয়ে যায় নিমেষে। এমনি করে করে একদিন যেন হারিয়েই গেল স্বপ্ন দেখার পালা। শুধু বাস্তব নিয়েই ঘর সংসার খেলা। 
বয়েস যত বাড়ে ততই মানুষের ফিরে দেখার প্রবণতা বাড়ে। বাড়তে বাড়তে এখন যখন কমবেশি তিনকুড়ি তখন আবার এক ভিন্ন আবহ। দিনভর ফুরসত পেলেই চোখ বুজি আর স্বপ্ন দেখি ফের। আর রাতের বিছানায় সেইসব স্বপ্ন, সেইসব হারিয়ে যাওয়া দিনের দুঃখসুখের গাথা বিচিত্র অনুষঙ্গ নিয়ে হাজির হয় মুদিত নয়নের ক্যানভাসে। বিচিত্র সব ঘটনা কী করে যে একসূত্রে গ্রথিত হয়ে আসে স্বপ্নমননে তা ভাবলেও অবাক হতে হয় বইকী। কে যে সেই কল্পলোকের অকল্পনীয় শিল্পী যিনি যাবতীয় ছন্নছাড়া স্মৃতিকে এক নিপুণ মালীর মতো সুনিপুণ সুতোয় গেঁথে উপস্থাপন করেন চবির মতো করে। স্থান-কাল-পাত্রের যোগসূত্রহীন কল্পকথাকে গল্পকথায় পর্যবসিত করে উপস্থাপন করেন চলচ্চিত্রের আদলে। ছায়া আর ছবির সমন্বয়ে গড়ে তোলেন ভয় ও নির্ভয়ের অনবদ্য ককটেল ছায়াছবি। 
এই সমন্বয়ই যদি না থাকে তাহলে জুড়ে থাকা যায় না জীবনপ্রবাহে। বরাক থেকে ব্রহ্মপুত্র, বড়াইল থেকে পাটকাই জুড়ে এই সমন্বয়ের সূত্র ধরে রোজ রাতে জীবনছবির কল্পদর্শনই এখন আমার নিত্যরাতের কালযাপন। ফ্রয়েড সাহেব মাঝে মাঝেই ডাহা ফেল মেরে যান আমার এই বিচিত্র স্বপ্নরঙিন উড্ডয়নে। মন্দ লাগে না এই ছন্দময় স্বপ্নযাপন। শুধু স্বপ্নশেষে বুকের মাঝে বাজে যে বিষাদের সুর, যাপিত জীবনের যাবতীয় অধ্যায় ফিরে দেখার পর একটাই প্রশ্ন জাগে মনে - আর কি ফিরিবে না সেই দিন ? আরেক রাতের স্বপ্নদেখা ক্ষণের পূর্বমুহূর্ত অবধি ব্যথায় ব্যথায় মনে পড়ে কবিগুরুর গানের কলি -   
‘স্বপ্নমদির নেশায় মেশা এ উন্মত্ততা
জাগায় দেহে মনে এ কী বিপুল ব্যথা…।’
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

Comments

Popular posts from this blog

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...