Skip to main content

উৎকর্ষে ভরপুর সম-আঙ্গিকের দুটি সমকালিক কাব্যগ্রন্থ


অনেকগুলো সমতার সূত্রে আলোচনায় একযোগে উঠে এল দুটি কাব্যগ্রন্থ উভয় কাব্যগ্রন্থের প্রকাশক ও প্রচ্ছদশিল্পী - রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ, দৈনিক বজ্রকণ্ঠ, আগরতলা উভয় গ্রন্থই দুই ফর্মার পেপারব্যাকে জ্যামিতিক অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টের প্রচ্ছদযুক্ত এবং উভয় গ্রন্থই প্রকাশিত হয়েছে ডিসেম্বর ২০২৫- এছাড়াও যেসম সমতা রয়েছে সেগুলো এরকম - উভয়ের - মূল্য ১১৫ টাকা করে, শেষ প্রচ্ছদে রয়েছে সচিত্র কবি-পরিচিতি এবং ভেতরের ফন্ট একই   
 
অন্ধকার রাত্রির মিনার
নবীনকিশোর রায়
(জন অরণ্য ছেড়ে যাবো বহুদূর/ নির্জন অরণ্যের সন্ধানে…)
কবি নবীনকিশোর রায় ত্রিপুরার সমকালীন বাংলা সাহিত্যে কবিতার শৈলী ও আঙ্গিকে ছাপ রেখে আসছেন বহুদিন ধরে। মূলত কবি হিসেবেই তিনি অধিক পরিচিত এবং অধিক স্বচ্ছন্দ। তাঁর কবিতায় যে অ্যাবস্ট্রাক্ট তিনি অঙ্কন করেন তা বস্তুতই এক ভিন্নতর মাত্রায় উতরে যায় কাব্যগুণে। সূচিপত্রহীন আলোচ্য গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট ২৮টি কবিতায়ও সেই অ্যাবস্ট্রাক্ট ধরা দেয় আপন সৌকর্যে -
অন্ধকার রাত্রির মিনার থেকে
আকাশ কুসুম উদ্ভট ভাবনা
খসে পড়লে, জ্বলন্ত সিগারেট
পুড়িয়ে দেয়, দুই আঙুলে চেপে ধরা শেষ সীমানা।...
(কবিতা - অন্ধকার রাত্রির মিনার)
প্রকৃতি, স্বভূমি - স্বজনপ্রেম, আর ক্ষয়িষ্ণু দিনের অনিয়মের বিরুদ্ধে আর্তনাদ, শ্লেষ ও প্রতিবাদ কবির কবিতায় ফুটে উঠেছে এক ভিন্নতর আঙ্গিকে যা কবির মেধা ও মননসঞ্জাত - ...একটা যুদ্ধ শেষ হলে/ জন্ম নেয় আরেকটা যুদ্ধ,/ প্রস্তুতি নেয়/ আরেকটা যুদ্ধের !/ ধ্বংসস্তূপে মৃত্যু আর বিভীষিকা/ চাপা পড়ে থাকে...। (কবিতা - যুদ্ধ প্রতিদিন) নদীর কাছে হাঁটু গেড়ে বসি/ তীরে যতবার বাঁধি ঘর,/ কালে অকালে ভেসে গেছে বসতি/ ভেসে চলে আজও অকূলে/ উদ্বাস্তু জীবনস্রোত (কবিতা - উদ্বাস্তু)
কবি তাঁর এই নবম গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁরসহধর্মিণী শ্রীমতী দেবীকে
 
‘অন্য রকম গল্প’
নিবারণ নাথ
(মেঘের চিৎকারে শূন্যতা ভরে/ নামে বৃষ্টির মিছিল…)
ত্রিপুরার সমকালিক সাহিত্যবিশ্বে নিবারণ নাথ এক বহুযুদ্ধের ঘোড়া। শুধু কবি হিসেবে তাঁকে অভিহিত করা সংগত নয়। একাধারে তিনি কবি, গদ্যকার, নাট্যকার ও সম্পাদক। দীর্ঘদিনের এই সম্পৃক্তি স্বভাবতই তাঁকে পরিণত করেছে সাহিত্যের এক স্থিতধী, সৃষ্টিমগ্ন পথের অনায়াস যাত্রীরূপে এবং তারই প্রতিফলনও সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে আলোচ্য গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট ২৬টি কবিতার পঙ্ক্তি জুড়ে অন্যরকম গল্প হিসেবে অনুভব আর অনুভূতি বিষাদময়তার কোলাজে প্রতিভাত হয়েছে কবিতার শরীরে -
কোথাও এতটুকু ছায়া নেই
এখন জম্পুইয়ের পাদদেশে
অসহায় বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে আছি
দেখি, কেবল আমিই আমার ছায়া
(কবিতা - ছায়া    
এক নি:সঙ্গতা যেন কবিকে ছায়ার মতো অনুসরণ করে আর কবিতার পঙ্ক্তি জুড়ে তাই ভাসে উৎকর্ষের প্রতিচ্ছবি হয়ে - আমার কবিতা এখন বিষণ্ণ নারী…/ কবিতা তোমার বিষণ্ণতাই/ আজকের স্বরলিপি (কবিতা স্বরলিপি) আমার শরীর জুড়ে শীত ও কুয়াশা…/ বুকের ভিতর অনন্ত দীর্ঘশ্বাস…/ আমার চারপাশে কেবল/ শীত পোড়া উত্তাপ (কবিতা - কালো দাগ) এমনই মায়াময় শূন্যতার পঙ্ক্তিমিছিল
কবি নিবারণ নাথ এই গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন ‘…বরিষ্ঠ আইনজীবী শ্রদ্ধেয় সুখময় দেকে 
 
কাগজের মান, ছাপার স্পষ্টতা, অক্ষর/শব্দ/পঙ্ক্তিবিন্যাস উভয় ক্ষেত্রেই যথাযথ তবে কিছু বানানবিভ্রাট রয়েছে কবিতাসমূহে ব্যবহৃত ফন্ট অশোভন না হলেও পঠনবান্ধব কিনা তা বিবেচ্য সব মিলিয়ে সমকালীন কাব্যধারার এক উজ্জ্বল প্রকাশ উভয় কাব্যগ্রন্থ   

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

বিষয়-মানসে প্রকাশিত ‘স্বরিত’ - সপ্তদশ সংখ্যা

কোনও দ্বিধা কিংবা ভয়কে অবলীলায় উড়িয়ে দিয়ে জলকে জল , মাটিকে মাটি কিংবা দেশকে দেশ ( দ্বেষ , দ্যাশ কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্র নয় ) বলতে পারেন যে ক ’ জন , তাঁদের মধ্যে অন্যতম কবি , লেখক , সম্পাদক নারায়ণ মোদক । বরাক উপত্যকার শ্রীভূমি থেকে ২১ মার্চ বিশ্ব কবিতা দিবসে প্রকাশিত হয়েছে বার্ষিক পত্রিকা ‘ স্বরিত ’- এর সপ্তদশ সংখ্যা । দ্বৈত সম্পাদনায় নারায়ণ মোদক ও গৌতম চৌধুরী। এবারের বিষয় ছিল প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অব্যবস্থা , অত্যাচার , সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নিপীড়ন ইত্যাদি নিয়ে প্রতিবেদন ও সহমর্মিতা ইত্যাদি । স্বভাবতই এর প্রতিবাদ হওয়া উচিত । এই নির্ভীক , বলিষ্ঠ পদক্ষেপের উদ্যোগ কতটা সফল হয়েছে , কতটা সহমর্মিতা বর্ষিত হল , কতটা প্রতিবাদ স্বরিত হল তার এক নির্মোহ বিশ্লেষণ সংখ্যাটির আলোচনার এক অমোঘ অনুষঙ্গ ।   ভূমিকার আধারে ‘এ সংখ্যার বিষয়ে আলোকপাত’ করতে গিয়ে অন্যতম সম্পাদক নারায়ণ মোদক লিখছেন - ‘… আমাদের সমাজে একদল নিজেকে মানবতাবাদী সাজিয়ে নিরাপদ দূরত্বে বসে সমাজ এবং সরকারের সব রকম সুবিধা ভোগ করে বিজ্ঞতার সাথে বলতে থাকেন সারা বিশ্বের যেখানেই সংখ্যালঘু আছে সেখানেই তারা অত্যাচারিত। আমাদ...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...