এভাবেও চলে যায় জীবন। অন্তর থেকে অন্তরান্তরে...। যে হৃদয়ে কথা নেই
সেখানে কবিতা আছে সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো। মৌনী কবিতা যেদিন লাভা হয়ে
ধেয়ে আসে হৃদয়ের প্রান্তরে, মৌন পাহাড়ের অঙ্গে অঙ্গে সেদিন ফুটে ওঠে লক্ষ লক্ষ নীলকুরিঞ্জি
ফুল, যে ফুলের নীলাভ শোভায় সজ্জিত চরাচর, দিনের কবিতা তারা হয়ে রাতে মৌন চাদর জড়িয়ে
গায়ে ঝরে পড়ে অনর্গল - কথায় কথায়। এমন করেও বয়ে চলে জীবনধারা
পাহাড় পেরিয়ে মোহনার দিকে হাতে হাত ধরে কিংবা আপন আপন পথে চলে যায় কথারা - কবিতারই মতো অন্তরে অন্তরে,
পলাশে মান্দারে।
সেই কবে একদিন কেউ লিখেছিলেন ‘এত
কবি কেন...?’ সেই একটি পঙ্ক্তি এরপর থেকে অনেকের কাছেই তাচ্ছিল্যের হাতিয়ার হয়ে
উঠল। কাদের প্রতি এই তাচ্ছিল্য ? না গুচ্ছ গুচ্ছ কবিদের প্রতি। কেন এই তাচ্ছিল্য ?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যেতে হবে কবিতার গভীরে। এখানে এক ঈর্ষার অনুভব কাজ করে
ভেতরে ভেতরে। কবি যিনি তিনি কবিতা লিখেন কবিতাকে ভালোবেসে। নাহলে কবিতা লেখা এমনও
সহজ কাজ কিছু নয় যে যে কেউ যখন তখন বসে পড়লেই প্রসব করতে পারবেন কবিতা। অনেকেই
আছেন যাঁরা বহু কাঠ খড় পুড়িয়েও দুলাইন মেলাতে পারেন না। কিংবা মিলে গেলেও নিজের
কাছেই বড্ড বেমানান ঠেকে। তাই কবিতা যাঁরা লিখেন তাঁরা যে আর পাঁচজনের চাইতে খানিক
হলেও নামিদামি হয়ে ওঠেন তাতে কোনও সন্দেহ থাকার কথা নয়। এই থেকেই অন্যদের মনে
সৃষ্টি হয় এক ঈর্ষাভাব। আর তখনই তাচ্ছিল্যের শব্দবাণ বেরিয়ে আসে তাঁদের থেকে।
সেদিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে এক বিশিষ্ট
সাহিত্য ব্যক্তিত্ব কবিতা নিয়ে অনেক কথাই বলছিলেন। তিনি নিজে অবশ্য কবিতা লিখেন
না। তবে কবিতা বোঝেন (?) বলে মনে করেন। তাই তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে ব্যক্ত করলেন আজকের
দিনে কবি ও কবিতার নিম্নগামী মান সম্পর্কে তাঁর মতামত। কিছু কবির নাম করলেন যাঁরা
ভালো কবিতা লিখছেন আবার বিপরীতে কিছু অকবির নামও। তাঁর সেদিনের ভাষণ শুনে অধিকাংশ
কবিরা হতবাক হয়ে পড়লেন। যিনি বা যাঁরা ইতিমধ্যে সাহিত্য জগতের বোদ্ধা কবি লেখক
হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন তাঁরা অবাক হয়ে পড়লেন এটা দেখে যে উপর্যুক্ত বক্তা কবি ও
অকবির সংজ্ঞাটাই পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে যে এমন কেন হয় ?
উত্তর বহু গভীরে। আসলে মানুষের চিন্তা ভাবনা, বোধবুদ্ধি সবকিছুই জিনগত। জিন হচ্ছে
যাবতীয় লক্ষণের উপাদান। যেমন সবাই ব্যবসায়ী হতে পারেন না, যেমন সবাই সমান মেধাবী
হতে পারেন না, যেমন কলা-বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা ভিন্ন ভাবধারার ঠিক তেমনি
কবিতাকে বোঝার ক্ষমতাও জিনগত, যেমন কবিতা লিখার ক্ষমতাও জিনগত। তাই কেউ নামি, কেউ
মাঝারি, কেউ নবিশ কবি। তাই সবাই কবিতা লিখতে পারেন না, সবাই কবিতা বুঝতে পারেন না।
আর যাঁরা সেটা পারেন না তাঁদের চোখে যাঁরা পারেন তাঁরা স্বাভাবিক ভাবেই ঈর্ষণীয়
কারণ দ্বিতীয়োক্তরা কবিতা লিখে অ-সাধারণ হয়ে ওঠেন অগণিত মানুষের কাছে। বিশ্বব্যাপী বর্ধিত
জনসংখ্যা অনুপাতে স্বভাবতই শরীরে কবিতার জিন নিয়ে জন্ম নিচ্ছেন অগণিত মানুষ। সেই
সূত্রেই আজ ‘এত কবি’। যেমন বিশিষ্ট ও সাধারণ, যেমন মেধাবী ও মেধাহীন মানুষের
সংখ্যা বেড়েছে ও বাড়ছে তেমনি কবির সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান। এটা কোনও নিন্দাত্মক ঘটনা
নয়। নয় ব্যাঙ্গাত্মক বক্রোক্তির উপযুক্ত ঘটনা। এ এক নিরবচ্ছিন্ন পরিঘটনা।
কবিতা শুধু লেখাই হয় না। যেমন
লিখতে পারার ক্ষমতা দরকার ঠিক তেমনি কবিতা পড়ারও ক্ষমতা থাকা দরকার। তাহলেই বোঝার
ক্ষমতা কিছুটা আয়ত্ত হতে পারে। কবি ও পাঠকের উপযুক্ত যুগলবন্দি একটি কবিতাকে করে
তুলতে পারে অনন্য। শব্দের শেষে, পঙ্ক্তির শেষে বা মধ্যে উপযুক্ত যতিচিহ্নের
ব্যবহার এক্ষেত্রে খুবই প্রয়োজনীয় এক অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে। যতিচিহ্ন অনুযায়ী
পাঠ একটি কবিতাকে করে তোলে অনুপম মোহনীয় যা দুঁদে বাচিক শিল্পীরা করে দেখান
অনায়াসে। আবার সেই বাচিক শিল্পীরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে কবিতা লিখতে পারেন না, যেমন
কবিরা মঞ্চে নিজের কবিতাও শুদ্ধভাবে পড়তে পারেন না অনেক ক্ষেত্রেই। বাচিক শিল্পীরা
যেমন দীর্ঘ সব কবিতা অনায়াসে মুখস্থ আবৃত্তি করে যান বিপরীতে কবিদের অধিকাংশই
এমনকী নিজের কবিতাও না দেখে দুলাইন মুখস্থ বলতে পারেন না। এহ বাহ্য। তাই কবিতা
লেখা, পড়া ও বোঝা সবই জিনগত এবং নির্ভর করে ব্যক্তিবিশেষের উপর।
কাব্যধারার পরিবর্তিত স্বরূপও
এক্ষেত্রে কিছুটা জটিলতার সৃষ্টি করে। কবিতার শরীরে নিত্য নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষার
প্রয়োগে প্রায়শ কবিতার ভাবধারা ও কাব্যিকতে ক্ষুণ্ণ হতে দেখা যায়। যতি চিহ্নের
ব্যবহার না করা কিংবা অপব্যবহার কবিতাকে পাঠকের ও শ্রোতার থেকে দূরে ঠেলে দেয় অনেক
সময়। তাই কবিকে নিরন্তর সতর্কতা অবলম্বন করে হবে সঠিক যতি চিহ্নের ব্যাপারে। ড্যাশ
ও হাইফেন, কমা ও সেমিকোলনের পার্থক্যটা অনুধাবন করতে হয় সঠিক ভাবে। ঠিক তেমনি
পাঠকেরও এই অনুধাবন শক্তি থাকতে হবে। তখনই কবিতা হয়ে উঠবে আকর্ষণীয়। পঙ্ক্তি গঠনও
সমান প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। আধুনিক কালে পঙ্ক্তির যথেচ্ছ কাটাকাটি জটিল করে তোলে
কবিতাকে। একটি পঙ্ক্তিতে ১২ বা তার বেশি শব্দ এবং পরবর্তী পঙ্ক্তিতে দুই বা তিন
- তাও আবার অপ্রয়োজনে - পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি করে।
সঠিক শব্দের পর কোথায় কতখানি থামতে হবে তা কবি ও পাঠক উভয়ের জন্যই বোধগম্য হতে
হবে। বইয়ের পরিসরে এক লাইনে জায়গা হচ্ছে না বলে একটি বা দুটি শব্দকে পরবর্তী পঙ্ক্তিতে
ঠেলে দেওয়া ঠিক নয়। পঙ্ক্তি গঠনে আবার কাব্যিকতার উপস্থিতিও কবিতার গ্রহণযোগ্যতা
বাড়িয়ে দেয় অনেকখানি। শব্দের সঠিক জাগলিং কবিতার পঙ্ক্তিকে করে তোলে কাব্যময়।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ‘দিনের কবিতা তারা হয়ে রাতে মৌন চাদর জড়িয়ে গায়ে ঝরে পড়ে
অনর্গল - কথায় কথায়’ ... এই লাইনটিকে -
দিনের কবিতা তারা হয়ে
রাতে মৌন চাদর জড়িয়ে
গায়ে ঝরে পড়ে অনর্গল - কথায় কথায়
এভাবে
না লিখে -দিনের কবিতা তারা হয়ে রাতে
মৌন চাদর জড়িয়ে গায়ে
ঝরে পড়ে অনর্গল -
কথায় কথায় ...
এভাবে লিখলে একদিকে যেমন
কাব্যময়তা রক্ষা হয় তেমনি পঠনসুখকরও হয়ে ওঠে। কবিতা তাই এতটাই সহজ নয় যে যে কেউ
লিখবেন, পড়বেন, বুঝবেন বা সমালোচনা করবেন। কারণ এই সবকটি গুণই জিনগত। তাই সবকটি
স্বভাব একজনের দেহে মনে নাও থাকতেই পারে। সুতরাং কারও কবিতা ভালো কিংবা খারাপ
হিসেবে আখ্যায়িত করা কথাটিও এত সহজ কথা নয়। কবিতার কথা - এতটাও সহজ কথা নয়।
একদিন যাঁকে সাদরে, এনেছি ঘরে
জেনেছি বহুদিন পরে সে ছিল কবিতা -
এ কেমন রঙ্গ, ওরে !
একদিন তারই হাত ধরে
কবিতার মতো আরো কেউ এল ঘরে।
এ নিয়েই বাঁচা... আর আছে শুধু কবিতা।
অঙ্গে অঙ্গে জড়ানো মায়াবী বিভঙ্গ
ধূলিতে ধূলিতে অনন্ত অনুষঙ্গ
এই নিয়ে জাদুকরি খেলা,
শব্দে শব্দে অমোঘ বর্ণমেলা।
এ নিয়েই চলা... আর আছে শুধু কবিতা।
কুঁড়ি থেকেই ভ্রষ্টপথের যাপন
কবিতার লিগ্যাসি ছিল অধরা।
এবার বৃক্ষ হৃদয়ে দিয়েছে ধরা
এবার দিগ্বিদিকে স্বচ্ছ জলের মতো
বর্ণমালা আর পঙ্ক্তিমালা।
এ নিয়েই জীবন ও যাপন...
আর আছে শুধু কবিতা।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

Comments
Post a Comment