Skip to main content

এক কবিদম্পতির যৌথ কাব্যগ্রন্থ


সময়কে ধরে রাখার বুকভরা আকুলতা, আবেগ অনুভূতির সংমিশ্রণে লেখা কবিতাগুচ্ছের সংকলন ‘অনাবৃত বক্ষের আঘ্রাণ’। জুলাই ২০২৫-এ প্রকাশিত হল গ্রন্থের দ্বিতীয় পরিমার্জিত সংকলন। কবিদম্পতি পরিমল ও জয়ন্তী কর্মকারের এই যৌথ কাব্যগ্রন্থটি কিছুটা হলেও যে ব্যতিক্রমী তা অস্বীকার করা যায় না।
৫২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাকে ধরে রাখা আছে পরিমল কর্মকারের ৩০টি ও জয়ন্তীর ১০টি কবিতা। কবিতায় প্রবেশ করার আগে গ্রন্থসজ্জায় মনোনিবেশ করলে দেখা যায় পিতা-পুত্র পরিমল ও প্রীতমের একটি অতীব নান্দনিক প্রচ্ছদ পরিকল্পনা ও অলংকরণ যা এক নজরেই পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম। ‘পাঠকের উদ্দেশে’ কবিদম্পতি লিখছেন - ‘...প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততার জীবনে প্রশান্তির আলো এনে দেয় কবিতার ভাবনা... কবিতা বুননের ভাবনা মন মন্দিরের চাষ করতে করতে উর্বর হয়ে একের পর জন্ম নিচ্ছে কবিতা। আর সেই সৃষ্টির ফসল পাঠকের ভাবনার আন্তরিকতায় এগিয়ে যাচ্ছে মন মন্দিরের সাধনা...।’ আবার পশ্চিমবঙ্গ থেকে কবি, লেখক ড. অমিত চট্টোপাধ্যায় ‘শুভেচ্ছা বার্তা’য় লিখছেন - ‘...পরিমলবাবু ও জয়ন্তী কর্মকার কবিতার প্রতি নিবেদিত প্রাণ। তাঁদের কবিতার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে জীবনের কথা, মানুষের আবেগ ভালোবাসার কথা। উচ্চারিত হয় অব্যক্ত যন্ত্রণার কথা। মানুষের অস্থিরতার মাঝে তাঁরা হয়ে ওঠেন উদাহরণ স্বরূপ। কবিতার রস-সাগর মানুষের মনকে করে আকৃষ্ট। খুলে যায় তাদের চিন্তার জানলাগুলো। ভাসিয়ে নিয়ে যায় তাদের স্বপ্নাবিষ্ট জগতে। কবি এখানেই সফল, পাঠককুলকে মায়ার বাঁধনে বাঁধতে তাঁরা সমর্থ হয়েছেন...।’
মূলত নানা আঙ্গিকের প্রেম-ভালোবাসার আবহেই পরিমলের অধিকাংশ কবিতা। বুক উজাড় করে ব্যক্ত হয়েছে কবিতার একের পর এক পঙ্‌ক্তি জুড়ে। আবার কিছু কবিতায় প্রেমের অবধারিত অনুষঙ্গ - হারানোর বেদনা হয়ে উঠেছে স্পষ্ট -
...এক আকাশ স্বপ্ন আর এক বুক ভালোবাসা
নিয়ে তোমাকে ভালোবেসেছি।
…তোমার ভালোবাসায় শোভিত প্রতিটি ঋতুর
সৌন্দর্য আস্বাদন করেছি।
বসন্তের বিষণ্ণতায় যখন
ভালোবাসার গভীরতা খুঁজে বেড়াচ্ছি...
অজানা এক মুহূর্তে গভীর সম্পর্কের আঘ্রাণ
কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
 
তুমি আমাকে কিছু না জানিয়ে
না ফেরার পথে বহু দূরে চলে গেলে।
আহত বিহঙ্গের মতো মুচড়ে নিথর হয়ে
পড়ে রইল আমার স্বপ্ন, আমার ভালোবাসা..।
(পরিমল কর্মকারের কবিতা - এক আকাশ স্বপ্ন)
কবিদম্পতির কবিতার বিশ্লেষণে ভূমিকায় আছে - ‘...কবিতার গুণগত উৎকর্ষ কিংবা ছন্দের ক্যালকুলাস নয়, ভাব ও বিষয়ের প্রাবল্য উভয়েরই কবিতার প্রথম ও শেষ প্রতিপাদ্য। অকপটতাই কবিযুগলের মূলধন। ...’অনাবৃত বক্ষের আঘ্রাণ’ এমনই একটি কাব্যগ্রন্থ যেখানে দুজন মিলেই লিখেছেন একগুচ্ছ সরল প্রতিশ্রুতির কবিতা। এই সারল্য, কবিতায় এর প্রয়োগশৈলী অবধারিতভাবেই ছুঁয়ে যায় সরল পাঠকহৃদয়। একই গ্রন্থে দ্বৈতকবির এমন উপস্থাপন সচরাচর বিরল (অন্তত এই ভৌগোলিক আবহে)। মানুষ, প্রকৃতি ও কবিতার প্রতি গভীর প্রেম, ভালোবাসার অনুষঙ্গ যেমন পরিমলের কবিতার আকর তেমনি বাস্তব ও সময়ের ঘনঘোর বিশ্লেষণ তথা প্রতিবাদ উঠে এসেছে জয়ন্তীর কবিতায়। তবু কোথাও যেন এক সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় উভয়ের বয়ানে, আখরে। যেমন -
…আমি নই প্রেমিক প্রেমিকার অন্তরের
মধুময় শব্দের বুনন।
আমি নই কোনো প্রেমিক প্রেমিকার বুক ভরা
ভালোবাসার ফুটন্ত গোলাপের কানন।
আমি নই কোনো কবি সাহিত্যিক -
আমি হলাম শব্দের মায়াজালে জড়ানো
ছন্দজালের প্রেমিক…।
(জয়ন্তী কর্মকারের কবিতা - ছন্দজালের প্রেমিক)
কবিতায় কাব্যিকতার অভাব, আধুনিক কবিতার রূপক, ব্যঞ্জনা ও প্রাসঙ্গিক শব্দচয়নের অনটন আংশিক অনুভূত হলেও প্রেম, ভালোবাসার নানা রূপে রসে এভাবেই কবিকল্পনার সপাট বয়ানে এগিয়েছে কবিদম্পতির কবিতা। গ্রন্থান্তর্গত কাগজের মান, ছাপার স্পষ্টতা যথাযথ যদিও অক্ষর ও পঙ্‌ক্তিবিন্যাসে কিছু বিভ্রাট থেকে গেছে - যদিও তা সংখ্যায় নগণ্য। ব্যতিক্রমী আঙ্গিকে বানানের শুদ্ধতা গ্রন্থের অন্যতম সম্পদ। সব মিলিয়ে স্বল্পকালীন পঠনের উপযুক্ত, কল্পনার মোড়কে বাস্তবকে অনুধাবন করার উপযুক্ত একটি স্বপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘অনাবৃত বক্ষের আঘ্রাণ’।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

‘অনাবৃত বক্ষের আঘ্রাণ’
মূল্য - ১৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৭০০২৫২৭৪৬০

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...