সাহিত্য-সংস্কৃতির অনন্য ক্ষেত্র ত্রিপুরার সঙ্গে যবে থেকে ওতপ্রোত সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে তখন থেকেই একের পর এক বিস্ময়দরোজা খুলে যাচ্ছে চোখের সামনে থেকে। উত্তর থেকে দক্ষিণে একের পর এক পাহাড়ের অনবদ্য সৌন্দর্য এবং তারই মাঝে স্থলভূমি ও মালভূমি অঞ্চলসমূহে ছড়িয়ে থাকা জনপদে সংস্কৃতি ও স্থাপত্যবিষয়ক বহু দর্শনীয় স্থান ও সম্পদ আমার মন ও দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিচ্ছে প্রতিনিয়ত।
গোটা উত্তরপূর্বই যেখানে পাহাড় পর্বতের আবহে অবস্থিত সেখানে এই অঞ্চলটিতে পাহাড়প্রিয় ভ্রমণপিপাসু মানুষেরই গন্তব্য হওয়াটা স্বাভাবিক। এখন যদি বলা যায় ত্রিপুরা থেকে সাগর অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরের দূরত্ব মাত্র ত্রিশ কিলোমিটার তা কি বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে ? অনেকের কাছেই এই তথ্যটি চমকে দেওয়ার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু মানচিত্র খুললেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। বস্তুত গোটা উত্তরপূর্বাঞ্চল থেকে সাগরের ন্যূনতম দূরত্ব এটাই। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের একটি উপজেলার নাম সীতাকুণ্ড। কথিত আছে রামায়নখ্যাত মাতা সীতা এই কুণ্ডে স্নান করেছিলেন অজ্ঞাতবাসের সময়। সীতাকুণ্ড বঙ্গোপসাগরের পাড়ঘেঁষা একটি স্থান। পূর্বদিকে সীতাকুণ্ড পাহাড়শ্রেণি। আর এই পাহাড়শ্রেণির উত্তরে হচ্ছে ভারতের ত্রিপুরা নামের রাজ্যটির অবস্থান। এই পাহাড়শ্রেণি এবং রাষ্ট্রসীমানার জন্যই ত্রিপুরার সঙ্গে সাগর অভিমুখে যাতায়াতযোগ্য কোন পথ নেই। অন্যথা মাত্র ত্রিশ কিলোমিটার দূরত্ব এমন কিছুই নয়।
ত্রিপুরা উত্তরপূর্বের একটি পাহাড়ি রাজ্য যা মূলত উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত। উত্তর-উত্তরপূর্বে অসমের সঙ্গে নাতিদীর্ঘ এবং পূর্বে মিজোরামের সঙ্গে দীর্ঘ সীমানার বাইরে রাজ্যটির তিন চতুর্থাংশ সীমানাই প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে। ত্রিপুরা ভ্রমণের কথা উঠলেই উঠে আসে জম্পুই পাহাড় থেকে শুরু করে রাজবাড়ি, নীরমহল, সিপাহিজলা আদি দ্রষ্টব্য স্থানসমূহের। ত্রিপুরার প্রকৃতি ও সংস্কৃতির রয়েছে এক বিশাল ইতিহাস যা একদিকে যেমন অধ্যয়নযোগ্য তেমনি আজও বহু কিছুই অনাবিষ্কৃত। সাগরের কাছে দক্ষিণ ত্রিপুরার অবস্থান দেখে বহুদিন আগেই দক্ষিণ ত্রিপুরা ভ্রমণের ইচ্ছা জেগেছিল মনে। আর এর পর থেকেই দক্ষিণ ত্রিপুরার একের পর এক দর্শনীয় স্থানসমূহের কথা জেনে ও পড়ে এই ইচ্ছা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে আসছিল। শেষমেশ সুযোগ এসে গেল বেরিয়ে পড়ার।
ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় একটি গ্রন্থ প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ এসেছিল ২০২৬ এর জানুয়ারি মাসে। উত্তর ত্রিপুরার পানিসাগরে বসবাসরত আমার এক অন্তরঙ্গ সহপাঠী বন্ধু দেবাশিস আগেই জানিয়ে রেখেছিল দক্ষিণে গেলে ওকে সঙ্গে নিয়ে যাবার কথা। এবার আগে থেকেই যেহেতু আগরতলার অনুষ্ঠান শেষে দক্ষিণ ত্রিপুরা ভ্রমণের মানসে বেরোই তখনই বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করি। ওদিকে দক্ষিণ ত্রিপুরার বাসিন্দা কবিবন্ধু চন্দন পাল বহুদিন থেকেই অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন। তাই সব কিছু পরিকল্পনা করে গুয়াহাটি থেকে ট্রেনে ধর্মনগর অবধি গিয়ে পূর্বনির্ধারিত একটি সমাজসাহিত্যমূলক অনুষ্ঠানে যোগদান করে সন্ধে নাগাদ পৌঁছে যাই পানিসাগরে বন্ধুর বাড়ি। ওখানে রাত্রিযাপন করে পরদিন সকালে ধর্মনগর-আগরতলা প্যাসেঞ্জারে রওয়ানা হই আগরতলার উদ্দেশে। আগরতলায় রাত কাটিয়ে পরদিন সকালে বাসে করে দুজনে এক ঝটিতি সফরে চলে যাই পশ্চিমের খোয়াই জেলার সদর শহর - ছবির মতো সাজানো, মোহময় সৌন্দর্যমণ্ডিত খোয়াই শহরে। এই যাত্রা নিয়ে একটি আলাদা ভ্রমণ বৃত্তান্ত লিখতে হবে পরবর্তীতে। যাইহোক বিকেলে ফের আগরতলায় ফিরে গ্রন্থপ্রকাশ অনুষ্ঠানে যোগদান করে আগরতলায় রাত্রি যাপন করি।
পরদিন সকালে শুরু হয় আমাদের দক্ষিণ ত্রিপুরা ভ্রমণ। শীতের কুয়াশামাখা সকালে দুটিতে নাগেরজলা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে জানা গেল সেদিন যেহেতু রবিবার তাই বিলোনিয়া অভিমুখী বাস ছাড়বে দেরিতে। অগত্যা চেপে বসলাম দক্ষিণের শেষবিন্দু সাব্রুমের বাসে। এর গতিপথ কিছু ভিন্ন। বিলোনিয়া হচ্ছে দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার সদর শহর। সেখানেই অপেক্ষায় বন্ধুবর চন্দনবাবু। জানালার পাশে চোখ নিরন্তর খোলা রেখে এগোচ্ছি যাত্রীবোঝাই বাসে। দুপাশে গভীর বনানী। বাঁয়ে তাপানিয়া ইকো পার্ক রেখে এগোতে এগোতে একে একে পেরিয়ে গেলাম বিশালগড়, চড়িলাম, বিশ্রামগঞ্জ, উদয়পুর, গর্জি, বীরচন্দ্রমনু ইত্যাদি অভিনব নামের জায়গাসমূহ। ত্রিপুরার স্থাননাম আমার কাছে আকর্ষণের বিষয় তখন থেকেই যখন প্রায় পঁচিশ বছর আগে চাকরিসূত্রে তিন বছর অবস্থান করেছিলাম উত্তরের ধর্মনগর শহরে। কুয়াশা কেটে সূর্যালোকের দেখা নেই তখনও। বহু কসরত করেও মোবাইল ক্যামেরায় ধরা গেল না এই মায়াবী যাত্রাপথের কোনও দৃশ্যপট। লাজুক প্রকৃতি হয়তো ধরা দিতে চাইছিল না। এবার বীরচন্দ্রমনু থেকে অটো করে বিলোনিয়া। চন্দনবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ চলছে নিরন্তর। সকাল নটার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম বিলোনিয়া। কুয়াশা কাটেনি তখনও। বিলোনিয়ায় থাকার মতো হোটেল আছে যদিও এই দুঃসাহস আমরা করিনি। কারণ অটো থেকে নামতেই সামনে মূর্তিমান চন্দনবাবু।
শুরু হল কবি চন্দন পাল-এর বন্ধুকৃত্য। তাঁর সহধর্মিণী আরও এক কাঠি উপরে। সকাল সকালই ভুরিভোজন খাওয়াদাওয়ার আয়োজন। এসব আন্তরিকতা ও অত্যাচার সামলে আগেই বন্ধুর বলে রাখা গাড়িতে করে বেরিয়ে পড়লাম আমরা তিনজন সারা দিনের ঘোরাঘুরিতে - যার সূচনা হলো ছবির মতো সাজানো, শহরের যোগমায়া কালীমন্দির থেকে। কুয়াশা কেটে গিয়ে এতক্ষণে ঠিকরে পড়ছে শীতের মিঠে রোদ।
কালীমাকে প্রণাম জানিয়ে মাভৈ বলে শুরু হল যাত্রা। প্রথমেই শহরেরই এক পাশে থাকা মুহুরি চেক পোস্টে গিয়ে দাঁড়ালাম। একেবারেই সামনে বাংলাদেশের রাস্তা। লোকজন ঘোরাঘুরি করছে। অদৃশ্য সীমারেখা কেমন যেন এক প্রহসন বলে মনে হল। সামনে উর্দি পরা রক্ষী ওখানে বেশিক্ষণ থাকতে দিতে নারাজ। অগত্যা সেখান থেকে পায়ে হেঁটেই চলে এলাম কাছেই অবস্থিত রামঠাকুর মন্দিরে। উপাসনাস্থল ও গুরুদেবের সংরক্ষিত শয়নকক্ষ দেখে শিহরিত হলাম মানসচক্ষে তাঁর জীবৎকালের ছবি দর্শন করে। প্রণাম করে বেরিয়ে এসে শহর পেরিয়ে এবার গন্তব্য প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান পিলাক। বিলোনিয়া শহরের একটি রাস্তার পাশে দৈর্ঘে এক বিশাল অংশ বাংলাদেশ। কাঁটাতারের ওপারে কৃষিকাজে ব্যস্ত ওপারের কৃষক বন্ধুরা। এমন দৃশ্য বিরল তো বটেই। কেমন যেন এক অদেখা কাহিনির নস্টালজিয়াও।
ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম পিলাক। দুধারে ধানখেত আর অগভীর বনানী। পিলাকের দুটি স্থান ঠাকুরানিটিলা ও শ্যামসুন্দরে অবস্থিত আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা ও খোলা জায়গায় সযত্নে রক্ষিত প্রস্তরমূর্তিসমূহ পরিদর্শন করলাম। ঠাকুরানিটিলা স্থলে ১০ম থেকে ১৩শ শতাব্দীর প্রাচীন ঢিবি, ইটপাথরের ভাস্কর্য সংবলিত মন্দির, সূর্য, অবলোকিতেশ্বর ও নরসিংহের পাথরের মূর্তি ও পোড়ামাটির ফলক উল্লেখযোগ্য যা হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির মেলবন্ধন তুলে ধরে। বহু শতাব্দী পুরোনো এসব কীর্তি দেখলে এক অনাবিল অনুভবের জন্ম হয় মনন জুড়ে। সংগৃহীত প্রত্নপ্রস্তরগুলি এই অঞ্চলেই আবিষ্কৃত হয়েছিল বলে উল্লেখ আছে। এতে এক স্পষ্ট ধারণা জন্মায় যে এই অঞ্চল এক সময় নবজাগরণের সাক্ষী হয়েছিল। পিলাকের স্থাপত্যশৈলী বাংলাদেশের ময়নামতী ও পাহাড়পুরের সভ্যতার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা পালযুগের শিল্পকলা নির্দেশ করে বলে সূত্রে প্রকাশ। গাছগাছালিতে সুসজ্জিত শ্যামসুন্দর স্থলে আমার সঙ্গে এ যাত্রার সফরসঙ্গী বন্ধু দেবাশীষ বেশ কিছু পোজে ছবিটবি উঠল। তবে ছবি ওঠার নানারকম পোজ বিষয়ে উদ্দীপ্ত কবি চন্দনবাবু যে বিশেষ পারদর্শী তা বোঝা গেল বেশ।
পরবর্তী গন্তব্য মনুবনকুল প্যাগোডা। তবে এখানে আসার পথে নামা হল দুজায়গায়। শাকবাড়িতে অবস্থিত শহিদ ধনঞ্জয় ত্রিপুরা স্মৃতি পার্ক ও কলাছড়া কালাপানিয়া ন্যাশনাল ইকো পার্ক। পার্কে আসা লোকজনের ভিড় ছিল যদিও ভেতরে ঢোকা হয়নি দুটিতেই। কারণ তা অনেকটাই সময়সাপেক্ষ। একদিনের সফরে এতটা সময় থাকে না হাতে। তবে সকালের চা-স্ন্যাকস সারা হল শেষোক্ত পার্কেই। মনুবনকুল প্যাগোডা এক অতি মনোরম বৌদ্ধধর্মীয় উপাসনাস্থল যার নয়নাভিরাম সৌন্দর্য অবর্ণনীয়। সেখানে আছে আবার রাস্তার দুধারে সারি সারি রয়্যাল পাম গাছগুলো। ফলত জায়গাটি হাল ফ্যাশনের আনুকূল্যে পর্যবসিত হয়েছে সেলফি পয়েন্টে। ডাব ও ভুট্টা নিয়ে বসে আছেন লোকজন। সব মিলিয়ে তাই অনেকটা সময় অতিবাহিত হল সেখানে। বৌদ্ধধর্মীয় মন্দির, গম্বুজ ইত্যাদির এক অনবদ্য ল্যান্ডস্কেপ। কথা হল প্যাগোডার পুরোহিতের সঙ্গে। ওখান থেকে সোজা সাব্রুম এসে দুপুরের অনাড়ম্বর ভোজনপর্ব সমাধা হল। এই সাব্রুমেই বিশিষ্ট গবেষক, লেখক অশোকানন্দ রায় বর্ধন সহ একাধিক কবি সাহিত্যিকের বাস যদিও আগরতলা বইমেলা চলছিল বলে প্রায় সবাই রাজ্য রাজধানীতেই অবস্থান করছিলেন।
সাব্রুম মৈত্রী সেতু এক সময় একটি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান ছিল। বেশি দিন আগের কথা নয়। সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া এই সেতু দুই দেশের মানুষের কাছে এক আবেগের। অথচ সেদিন বিকেলে দেখলাম গোটা পাঁচেক মানুষ ছবিটবি উঠছেন। আসলে মৈত্রী ব্যাপারটাই এখন এক প্রশ্নচিহ্নের মুখে। তাই জনসমাগম কম। সীমান্তরক্ষী জওয়ানরা আছেন প্রহরারত আর সেতুর নীচ দিয়ে দেখা গেল প্রবহমান ফেনী নদী। যে দুটি নদী এবার আমার দেখার লিস্টে ছিল তার একটি। দূর থেকে দেখা গেল তার যাত্রাপথের স্বল্প কিছু অংশ। এত দিনের দর্শনাভিলাস। আপ্লুত হলাম দেখে। যেন কোন জনমের সখ্য।
কুলুকুলু ফেনী নদী চলে আহা রে।
'দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে'....
সন্ধে হবার উপক্ৰম। এবার ফিরতে হবে। হরিণা বাজারে লেখক বন্ধু বিজন বোসের বইবিপণি। গাড়ি থামিয়ে দর্শনাভিলাসে পা বাড়ালাম যদিও বইমেলার জন্য তাঁর অনুপস্থিতিতে বিমর্ষ হতে হল। ওদিকে রাস্তার ধারে কেউ অপেক্ষারত। মনুবাজার এলাকায় দাঁড়িয়ে ত্রিপুরার তরুণ কবি ও লোকসংগীত গায়ক সঞ্জয় দত্ত। আমাকে উপহার দিল ওর সদ্যপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। পথের ধারে গ্রামীণ আবহে মাটির ছেলে সঞ্জয় পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। এর কতটুকু যোগ্য আমি তা জানি না তবে এসব কাণ্ড দেখে উপলব্ধি হয় পৃথিবী থেকে এখনও হারিয়ে যায়নি সংস্কার। গর্ব বোধ হয় ওদের জন্য। গাড়ি এসে থামল বাইখোড়া। কবি, লেখক তারাপ্রসাদ বণিকের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে আমাদের আগমনবার্তা পেয়ে উপস্থিত সজ্জন ও সুজন কবি, অষ্টচরণ কবিতার সাধক অর্ধেন্দু ভৌমিক মহাশয়। উপহার দিলেন তাঁর একটি বই। তারাপ্রসাদের আতিথেয়তায় সবার সঙ্গে ক্রমে ক্রমে, আড্ডা যখন উঠল জমে - রাত্রি তখন অনেকটাই। অতএব এগোতে হল।
তবু শেষ হয়েও হইল না শেষ। বিলোনিয়া পৌঁছে চন্দনবাবু আমাদের নিয়ে গেলেন এক বর্ষীয়ান তথা নীরব সাহিত্য সাধক হরিনারায়ণ সেনগুপ্ত মহোদয়ের ঘরে। অনেকটা সময় ধরে হল আলাপচারিতা। মনে হল বিছানার উপর একবুক অভিমান নিয়ে বসে থাকা একলা একা মানুষটি আমাদের উপস্থিতিতে প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে ক্রমে ক্রমে হয়ে উঠলেন প্রাণোচ্ছল। এ আমাদের এক অনুপম প্রাপ্তি। আমাদের হাতে তিনি তুলে দিলেন তাঁর প্রকাশিত একমাত্র কাব্যগ্রন্থটি। বেরিয়ে এলাম ওখান থেকে। কাছেই গোলাকার পৃথিবী ভ্রমণ শেষে দেখি ফের এসে দাঁড়িয়েছি যোগমায়া কালীবাড়ির সামনে। কিমাশ্চর্যম্ !! ডেরায় ফেরা হল। রাত তখন প্রায় দশটা।
পরদিন সকালে আমাদের ফেরত যাত্রা। আগের দিন সেই যে সকালেই স্কুটি নিয়ে এগিয়ে এসে আমাদের আপ্যায়ন করেছিলেন চন্দনবাবু, এবার পরদিন সকালে ফের আমাদের ই-রিকশার আগে আগে স্কুটি করে এসে বিদায় জানালেন পাহাড়ের পাদদেশে নৈসর্গিক আবহে অবস্থিত বিলোনিয়া রেল স্টেশনে। এক সার্বিক আতিথেয়তার পরাকাষ্ঠা। স্ত্রীরত্নটি তাঁর ঈষৎ অসুস্থতা উপেক্ষা করেও যেভাবে সুস্বাদু খাদ্যসম্ভারে ভরিয়ে দিলেন খাবার টেবিল তা ভোলার নয় কখনও। সকালের সাব্রুম-আগরতলা প্যাসেঞ্জার ট্রেনে চলে এলাম আগরতলা। পথে এক ঝলক দর্শন পেলাম অন্যতম নদী 'মুহুরি'র। ফেনী ও মুহুরি দক্ষিণ ত্রিপুরার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুই নদী। কেউই ধরা দিল না অবারিত হয়ে। কীজানি ফের কবে হবে দেখা। বাকি থেকে গেল অনেক কিছুই। একদিনে কি আর এত সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় ? ‘আবার হবে তো দেখা, এই দেখা শেষ দেখা নয়...।’
নির্ধারিত সময়েই পৌঁছে গেলাম আগরতলা। বন্ধু দেবাশীষ ওখান থেকেই পরবর্তী ট্রেনে চলে গেল ওর ঘর পানিসাগরে। আমি হোটেল অভিমুখে - যেখানে রেখে গিয়েছিলাম আমার ট্রলিব্যাগ আর প্রাপ্ত সব বইপত্তর। সাথে এক বাক্স 'এ সোনার মাটি' - দুদিন আগে আগরতলায় উন্মোচিত আমার গল্প সংকলন। বিকেলের ট্রেনেই ফেরার টিকেট উত্তরপূর্বের প্রবেশদ্বার গুয়াহাটি অবধি।
গোটা উত্তরপূর্বই যেখানে পাহাড় পর্বতের আবহে অবস্থিত সেখানে এই অঞ্চলটিতে পাহাড়প্রিয় ভ্রমণপিপাসু মানুষেরই গন্তব্য হওয়াটা স্বাভাবিক। এখন যদি বলা যায় ত্রিপুরা থেকে সাগর অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরের দূরত্ব মাত্র ত্রিশ কিলোমিটার তা কি বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে ? অনেকের কাছেই এই তথ্যটি চমকে দেওয়ার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু মানচিত্র খুললেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। বস্তুত গোটা উত্তরপূর্বাঞ্চল থেকে সাগরের ন্যূনতম দূরত্ব এটাই। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের একটি উপজেলার নাম সীতাকুণ্ড। কথিত আছে রামায়নখ্যাত মাতা সীতা এই কুণ্ডে স্নান করেছিলেন অজ্ঞাতবাসের সময়। সীতাকুণ্ড বঙ্গোপসাগরের পাড়ঘেঁষা একটি স্থান। পূর্বদিকে সীতাকুণ্ড পাহাড়শ্রেণি। আর এই পাহাড়শ্রেণির উত্তরে হচ্ছে ভারতের ত্রিপুরা নামের রাজ্যটির অবস্থান। এই পাহাড়শ্রেণি এবং রাষ্ট্রসীমানার জন্যই ত্রিপুরার সঙ্গে সাগর অভিমুখে যাতায়াতযোগ্য কোন পথ নেই। অন্যথা মাত্র ত্রিশ কিলোমিটার দূরত্ব এমন কিছুই নয়।
ত্রিপুরা উত্তরপূর্বের একটি পাহাড়ি রাজ্য যা মূলত উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত। উত্তর-উত্তরপূর্বে অসমের সঙ্গে নাতিদীর্ঘ এবং পূর্বে মিজোরামের সঙ্গে দীর্ঘ সীমানার বাইরে রাজ্যটির তিন চতুর্থাংশ সীমানাই প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে। ত্রিপুরা ভ্রমণের কথা উঠলেই উঠে আসে জম্পুই পাহাড় থেকে শুরু করে রাজবাড়ি, নীরমহল, সিপাহিজলা আদি দ্রষ্টব্য স্থানসমূহের। ত্রিপুরার প্রকৃতি ও সংস্কৃতির রয়েছে এক বিশাল ইতিহাস যা একদিকে যেমন অধ্যয়নযোগ্য তেমনি আজও বহু কিছুই অনাবিষ্কৃত। সাগরের কাছে দক্ষিণ ত্রিপুরার অবস্থান দেখে বহুদিন আগেই দক্ষিণ ত্রিপুরা ভ্রমণের ইচ্ছা জেগেছিল মনে। আর এর পর থেকেই দক্ষিণ ত্রিপুরার একের পর এক দর্শনীয় স্থানসমূহের কথা জেনে ও পড়ে এই ইচ্ছা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে আসছিল। শেষমেশ সুযোগ এসে গেল বেরিয়ে পড়ার।
ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় একটি গ্রন্থ প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ এসেছিল ২০২৬ এর জানুয়ারি মাসে। উত্তর ত্রিপুরার পানিসাগরে বসবাসরত আমার এক অন্তরঙ্গ সহপাঠী বন্ধু দেবাশিস আগেই জানিয়ে রেখেছিল দক্ষিণে গেলে ওকে সঙ্গে নিয়ে যাবার কথা। এবার আগে থেকেই যেহেতু আগরতলার অনুষ্ঠান শেষে দক্ষিণ ত্রিপুরা ভ্রমণের মানসে বেরোই তখনই বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করি। ওদিকে দক্ষিণ ত্রিপুরার বাসিন্দা কবিবন্ধু চন্দন পাল বহুদিন থেকেই অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন। তাই সব কিছু পরিকল্পনা করে গুয়াহাটি থেকে ট্রেনে ধর্মনগর অবধি গিয়ে পূর্বনির্ধারিত একটি সমাজসাহিত্যমূলক অনুষ্ঠানে যোগদান করে সন্ধে নাগাদ পৌঁছে যাই পানিসাগরে বন্ধুর বাড়ি। ওখানে রাত্রিযাপন করে পরদিন সকালে ধর্মনগর-আগরতলা প্যাসেঞ্জারে রওয়ানা হই আগরতলার উদ্দেশে। আগরতলায় রাত কাটিয়ে পরদিন সকালে বাসে করে দুজনে এক ঝটিতি সফরে চলে যাই পশ্চিমের খোয়াই জেলার সদর শহর - ছবির মতো সাজানো, মোহময় সৌন্দর্যমণ্ডিত খোয়াই শহরে। এই যাত্রা নিয়ে একটি আলাদা ভ্রমণ বৃত্তান্ত লিখতে হবে পরবর্তীতে। যাইহোক বিকেলে ফের আগরতলায় ফিরে গ্রন্থপ্রকাশ অনুষ্ঠানে যোগদান করে আগরতলায় রাত্রি যাপন করি।
পরদিন সকালে শুরু হয় আমাদের দক্ষিণ ত্রিপুরা ভ্রমণ। শীতের কুয়াশামাখা সকালে দুটিতে নাগেরজলা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে জানা গেল সেদিন যেহেতু রবিবার তাই বিলোনিয়া অভিমুখী বাস ছাড়বে দেরিতে। অগত্যা চেপে বসলাম দক্ষিণের শেষবিন্দু সাব্রুমের বাসে। এর গতিপথ কিছু ভিন্ন। বিলোনিয়া হচ্ছে দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার সদর শহর। সেখানেই অপেক্ষায় বন্ধুবর চন্দনবাবু। জানালার পাশে চোখ নিরন্তর খোলা রেখে এগোচ্ছি যাত্রীবোঝাই বাসে। দুপাশে গভীর বনানী। বাঁয়ে তাপানিয়া ইকো পার্ক রেখে এগোতে এগোতে একে একে পেরিয়ে গেলাম বিশালগড়, চড়িলাম, বিশ্রামগঞ্জ, উদয়পুর, গর্জি, বীরচন্দ্রমনু ইত্যাদি অভিনব নামের জায়গাসমূহ। ত্রিপুরার স্থাননাম আমার কাছে আকর্ষণের বিষয় তখন থেকেই যখন প্রায় পঁচিশ বছর আগে চাকরিসূত্রে তিন বছর অবস্থান করেছিলাম উত্তরের ধর্মনগর শহরে। কুয়াশা কেটে সূর্যালোকের দেখা নেই তখনও। বহু কসরত করেও মোবাইল ক্যামেরায় ধরা গেল না এই মায়াবী যাত্রাপথের কোনও দৃশ্যপট। লাজুক প্রকৃতি হয়তো ধরা দিতে চাইছিল না। এবার বীরচন্দ্রমনু থেকে অটো করে বিলোনিয়া। চন্দনবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ চলছে নিরন্তর। সকাল নটার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম বিলোনিয়া। কুয়াশা কাটেনি তখনও। বিলোনিয়ায় থাকার মতো হোটেল আছে যদিও এই দুঃসাহস আমরা করিনি। কারণ অটো থেকে নামতেই সামনে মূর্তিমান চন্দনবাবু।
শুরু হল কবি চন্দন পাল-এর বন্ধুকৃত্য। তাঁর সহধর্মিণী আরও এক কাঠি উপরে। সকাল সকালই ভুরিভোজন খাওয়াদাওয়ার আয়োজন। এসব আন্তরিকতা ও অত্যাচার সামলে আগেই বন্ধুর বলে রাখা গাড়িতে করে বেরিয়ে পড়লাম আমরা তিনজন সারা দিনের ঘোরাঘুরিতে - যার সূচনা হলো ছবির মতো সাজানো, শহরের যোগমায়া কালীমন্দির থেকে। কুয়াশা কেটে গিয়ে এতক্ষণে ঠিকরে পড়ছে শীতের মিঠে রোদ।
কালীমাকে প্রণাম জানিয়ে মাভৈ বলে শুরু হল যাত্রা। প্রথমেই শহরেরই এক পাশে থাকা মুহুরি চেক পোস্টে গিয়ে দাঁড়ালাম। একেবারেই সামনে বাংলাদেশের রাস্তা। লোকজন ঘোরাঘুরি করছে। অদৃশ্য সীমারেখা কেমন যেন এক প্রহসন বলে মনে হল। সামনে উর্দি পরা রক্ষী ওখানে বেশিক্ষণ থাকতে দিতে নারাজ। অগত্যা সেখান থেকে পায়ে হেঁটেই চলে এলাম কাছেই অবস্থিত রামঠাকুর মন্দিরে। উপাসনাস্থল ও গুরুদেবের সংরক্ষিত শয়নকক্ষ দেখে শিহরিত হলাম মানসচক্ষে তাঁর জীবৎকালের ছবি দর্শন করে। প্রণাম করে বেরিয়ে এসে শহর পেরিয়ে এবার গন্তব্য প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান পিলাক। বিলোনিয়া শহরের একটি রাস্তার পাশে দৈর্ঘে এক বিশাল অংশ বাংলাদেশ। কাঁটাতারের ওপারে কৃষিকাজে ব্যস্ত ওপারের কৃষক বন্ধুরা। এমন দৃশ্য বিরল তো বটেই। কেমন যেন এক অদেখা কাহিনির নস্টালজিয়াও।
ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম পিলাক। দুধারে ধানখেত আর অগভীর বনানী। পিলাকের দুটি স্থান ঠাকুরানিটিলা ও শ্যামসুন্দরে অবস্থিত আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা ও খোলা জায়গায় সযত্নে রক্ষিত প্রস্তরমূর্তিসমূহ পরিদর্শন করলাম। ঠাকুরানিটিলা স্থলে ১০ম থেকে ১৩শ শতাব্দীর প্রাচীন ঢিবি, ইটপাথরের ভাস্কর্য সংবলিত মন্দির, সূর্য, অবলোকিতেশ্বর ও নরসিংহের পাথরের মূর্তি ও পোড়ামাটির ফলক উল্লেখযোগ্য যা হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির মেলবন্ধন তুলে ধরে। বহু শতাব্দী পুরোনো এসব কীর্তি দেখলে এক অনাবিল অনুভবের জন্ম হয় মনন জুড়ে। সংগৃহীত প্রত্নপ্রস্তরগুলি এই অঞ্চলেই আবিষ্কৃত হয়েছিল বলে উল্লেখ আছে। এতে এক স্পষ্ট ধারণা জন্মায় যে এই অঞ্চল এক সময় নবজাগরণের সাক্ষী হয়েছিল। পিলাকের স্থাপত্যশৈলী বাংলাদেশের ময়নামতী ও পাহাড়পুরের সভ্যতার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা পালযুগের শিল্পকলা নির্দেশ করে বলে সূত্রে প্রকাশ। গাছগাছালিতে সুসজ্জিত শ্যামসুন্দর স্থলে আমার সঙ্গে এ যাত্রার সফরসঙ্গী বন্ধু দেবাশীষ বেশ কিছু পোজে ছবিটবি উঠল। তবে ছবি ওঠার নানারকম পোজ বিষয়ে উদ্দীপ্ত কবি চন্দনবাবু যে বিশেষ পারদর্শী তা বোঝা গেল বেশ।
পরবর্তী গন্তব্য মনুবনকুল প্যাগোডা। তবে এখানে আসার পথে নামা হল দুজায়গায়। শাকবাড়িতে অবস্থিত শহিদ ধনঞ্জয় ত্রিপুরা স্মৃতি পার্ক ও কলাছড়া কালাপানিয়া ন্যাশনাল ইকো পার্ক। পার্কে আসা লোকজনের ভিড় ছিল যদিও ভেতরে ঢোকা হয়নি দুটিতেই। কারণ তা অনেকটাই সময়সাপেক্ষ। একদিনের সফরে এতটা সময় থাকে না হাতে। তবে সকালের চা-স্ন্যাকস সারা হল শেষোক্ত পার্কেই। মনুবনকুল প্যাগোডা এক অতি মনোরম বৌদ্ধধর্মীয় উপাসনাস্থল যার নয়নাভিরাম সৌন্দর্য অবর্ণনীয়। সেখানে আছে আবার রাস্তার দুধারে সারি সারি রয়্যাল পাম গাছগুলো। ফলত জায়গাটি হাল ফ্যাশনের আনুকূল্যে পর্যবসিত হয়েছে সেলফি পয়েন্টে। ডাব ও ভুট্টা নিয়ে বসে আছেন লোকজন। সব মিলিয়ে তাই অনেকটা সময় অতিবাহিত হল সেখানে। বৌদ্ধধর্মীয় মন্দির, গম্বুজ ইত্যাদির এক অনবদ্য ল্যান্ডস্কেপ। কথা হল প্যাগোডার পুরোহিতের সঙ্গে। ওখান থেকে সোজা সাব্রুম এসে দুপুরের অনাড়ম্বর ভোজনপর্ব সমাধা হল। এই সাব্রুমেই বিশিষ্ট গবেষক, লেখক অশোকানন্দ রায় বর্ধন সহ একাধিক কবি সাহিত্যিকের বাস যদিও আগরতলা বইমেলা চলছিল বলে প্রায় সবাই রাজ্য রাজধানীতেই অবস্থান করছিলেন।
সাব্রুম মৈত্রী সেতু এক সময় একটি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান ছিল। বেশি দিন আগের কথা নয়। সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া এই সেতু দুই দেশের মানুষের কাছে এক আবেগের। অথচ সেদিন বিকেলে দেখলাম গোটা পাঁচেক মানুষ ছবিটবি উঠছেন। আসলে মৈত্রী ব্যাপারটাই এখন এক প্রশ্নচিহ্নের মুখে। তাই জনসমাগম কম। সীমান্তরক্ষী জওয়ানরা আছেন প্রহরারত আর সেতুর নীচ দিয়ে দেখা গেল প্রবহমান ফেনী নদী। যে দুটি নদী এবার আমার দেখার লিস্টে ছিল তার একটি। দূর থেকে দেখা গেল তার যাত্রাপথের স্বল্প কিছু অংশ। এত দিনের দর্শনাভিলাস। আপ্লুত হলাম দেখে। যেন কোন জনমের সখ্য।
কুলুকুলু ফেনী নদী চলে আহা রে।
'দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে'....
সন্ধে হবার উপক্ৰম। এবার ফিরতে হবে। হরিণা বাজারে লেখক বন্ধু বিজন বোসের বইবিপণি। গাড়ি থামিয়ে দর্শনাভিলাসে পা বাড়ালাম যদিও বইমেলার জন্য তাঁর অনুপস্থিতিতে বিমর্ষ হতে হল। ওদিকে রাস্তার ধারে কেউ অপেক্ষারত। মনুবাজার এলাকায় দাঁড়িয়ে ত্রিপুরার তরুণ কবি ও লোকসংগীত গায়ক সঞ্জয় দত্ত। আমাকে উপহার দিল ওর সদ্যপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। পথের ধারে গ্রামীণ আবহে মাটির ছেলে সঞ্জয় পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। এর কতটুকু যোগ্য আমি তা জানি না তবে এসব কাণ্ড দেখে উপলব্ধি হয় পৃথিবী থেকে এখনও হারিয়ে যায়নি সংস্কার। গর্ব বোধ হয় ওদের জন্য। গাড়ি এসে থামল বাইখোড়া। কবি, লেখক তারাপ্রসাদ বণিকের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে আমাদের আগমনবার্তা পেয়ে উপস্থিত সজ্জন ও সুজন কবি, অষ্টচরণ কবিতার সাধক অর্ধেন্দু ভৌমিক মহাশয়। উপহার দিলেন তাঁর একটি বই। তারাপ্রসাদের আতিথেয়তায় সবার সঙ্গে ক্রমে ক্রমে, আড্ডা যখন উঠল জমে - রাত্রি তখন অনেকটাই। অতএব এগোতে হল।
তবু শেষ হয়েও হইল না শেষ। বিলোনিয়া পৌঁছে চন্দনবাবু আমাদের নিয়ে গেলেন এক বর্ষীয়ান তথা নীরব সাহিত্য সাধক হরিনারায়ণ সেনগুপ্ত মহোদয়ের ঘরে। অনেকটা সময় ধরে হল আলাপচারিতা। মনে হল বিছানার উপর একবুক অভিমান নিয়ে বসে থাকা একলা একা মানুষটি আমাদের উপস্থিতিতে প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে ক্রমে ক্রমে হয়ে উঠলেন প্রাণোচ্ছল। এ আমাদের এক অনুপম প্রাপ্তি। আমাদের হাতে তিনি তুলে দিলেন তাঁর প্রকাশিত একমাত্র কাব্যগ্রন্থটি। বেরিয়ে এলাম ওখান থেকে। কাছেই গোলাকার পৃথিবী ভ্রমণ শেষে দেখি ফের এসে দাঁড়িয়েছি যোগমায়া কালীবাড়ির সামনে। কিমাশ্চর্যম্ !! ডেরায় ফেরা হল। রাত তখন প্রায় দশটা।
পরদিন সকালে আমাদের ফেরত যাত্রা। আগের দিন সেই যে সকালেই স্কুটি নিয়ে এগিয়ে এসে আমাদের আপ্যায়ন করেছিলেন চন্দনবাবু, এবার পরদিন সকালে ফের আমাদের ই-রিকশার আগে আগে স্কুটি করে এসে বিদায় জানালেন পাহাড়ের পাদদেশে নৈসর্গিক আবহে অবস্থিত বিলোনিয়া রেল স্টেশনে। এক সার্বিক আতিথেয়তার পরাকাষ্ঠা। স্ত্রীরত্নটি তাঁর ঈষৎ অসুস্থতা উপেক্ষা করেও যেভাবে সুস্বাদু খাদ্যসম্ভারে ভরিয়ে দিলেন খাবার টেবিল তা ভোলার নয় কখনও। সকালের সাব্রুম-আগরতলা প্যাসেঞ্জার ট্রেনে চলে এলাম আগরতলা। পথে এক ঝলক দর্শন পেলাম অন্যতম নদী 'মুহুরি'র। ফেনী ও মুহুরি দক্ষিণ ত্রিপুরার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুই নদী। কেউই ধরা দিল না অবারিত হয়ে। কীজানি ফের কবে হবে দেখা। বাকি থেকে গেল অনেক কিছুই। একদিনে কি আর এত সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় ? ‘আবার হবে তো দেখা, এই দেখা শেষ দেখা নয়...।’
নির্ধারিত সময়েই পৌঁছে গেলাম আগরতলা। বন্ধু দেবাশীষ ওখান থেকেই পরবর্তী ট্রেনে চলে গেল ওর ঘর পানিসাগরে। আমি হোটেল অভিমুখে - যেখানে রেখে গিয়েছিলাম আমার ট্রলিব্যাগ আর প্রাপ্ত সব বইপত্তর। সাথে এক বাক্স 'এ সোনার মাটি' - দুদিন আগে আগরতলায় উন্মোচিত আমার গল্প সংকলন। বিকেলের ট্রেনেই ফেরার টিকেট উত্তরপূর্বের প্রবেশদ্বার গুয়াহাটি অবধি।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

Comments
Post a Comment