Skip to main content

ব্যাপ্তি ও নান্দনিকতায় সমৃদ্ধ একটি শারদীয় সংখ্যা ছোটপত্রিকা


শারদীয় সংখ্যা বলে কোনও উল্লেখ নেই যদিও পত্রিকার দ্বিতীয় পর্যায় দ্বাদশ সংখ্যা ২০২৫-২০২৬ প্রকাশিত হয়েছে সম্পাদকীয় এবং প্রচ্ছদ সূত্রে শারদীয় সংখ্যা হিসেবেই বরাক উপত্যকার শিলচর থেকে প্রকাশিত এই পত্রিকার বিশেষত্ব এই যে বরাক থেকে সচরাচর প্রকাশিত অন্যান্য পত্রিকা থেকে লেখক সুচির সূত্রে কিছুটা ভিন্ন বরাকের বাইরের বহু লেখকের লেখা এখানে সন্নিবিষ্ট হয় আলোচ্য সংখ্যার ক্ষেত্রেও ব্যত্যয় ঘটেনি এই ধারাবাহিকতার। পৃষ্ঠাজোড়া সম্পাদকীয়তে একে একে এসেছে শরৎ, বাঙালির সমস্যা ও দেশ বিদেশের বাস্তব ঘটনাবলির উল্লেখ।
৯৬ পৃষ্ঠার লেটার সাইজের ঢাউস পত্রিকায় স্বভাবতই রয়েছে একগুচ্ছ গদ্যপদ্যের সম্ভার। কাগজের মান, ছাপার স্পষ্টতা, প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদ আদি বিষয়ে সম্পাদকীয় তৎপরতা লক্ষণীয়। তবে বিভাগ বিন্যাসে কিছু ত্রুটি অনুভব করা যায়। অন্যান্য বিভাগের নাম থাকলেও প্রবন্ধ বিভাগের নাম লেখা নেই। এবং ভেতরের পাতায় বিভাগ বিন্যস্ত না করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পত্রিকা জুড়ে। ফলত সরল পঠন ব্যাহত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়ে গেছে।
প্রবন্ধ বিভাগ তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধতর অনুভূত হয়েছে। যথেষ্ট তথ্যের সমাহারে প্রতিটি প্রবন্ধই শিরোনামানুযায়ী বিস্তৃত এবং সুলিখিতএই বিভাগে লিখেছেন উমা ভৌমিক, ড. পরমেশ আচার্য, নিশুতি মজুমদার, আশিসরঞ্জন নাথ, হারাণ দে, সুস্মিতা মজুমদার, অনিতা দে (গুণ), স্বামী হরিচরণানন্দ মহারাজ, স্বাগতা চক্রবর্তী ও অমলেন্দু চক্রবর্তী। আলাদা করে বিশেষোল্লেখ সমীচীন নয়। ভ্রমণ বিভাগে তিনটি লেখা সন্নিবিষ্ট হয়েছে। এর একটিও প্রকৃতার্থে ভ্রমণ কাহিনি নয়, ভ্রমণ বৃত্তান্ত শুধু। স্বপন কুমার পণ্ডার লেখাটি এই বিভাগে কেন বোঝা গেল না। এটাকে প্রবন্ধ বিভাগে স্থান দেওয়াই যুক্তিযুক্ত হতো। আশিষ কুমার দে’র লেখায় অনুবাদজনিত কিছু জটিলতা রয়ে গেছে যদিও একটি ব্যতিক্রমী স্থানের সংক্ষিপ্ত ভ্রমণবৃত্তান্ত। রাজকুমার সরকারের ভ্রমণ বৃত্তান্তও প্রবন্ধ বিভাগে স্থান পাওয়ার যোগ্য।
অণুগল্প বিভাগটিও খুবই দুর্বল। মানবিকতা ও সম্পর্কের বাঁধন নিয়ে সুব্রত বিশ্বাস-এর ‘সম্পর্ক’ আসলে পুরোপুরি একটি অণুনিবন্ধ। সংযুক্তা দাস পুরকায়স্থের ‘শিভালরি’র থিম কিছুটা ব্যতিক্রমী হলেও গল্পের বাঁধন খানিকটা আলগা মনে হয়েছে। শবরী চৌধুরীর ‘জীবনদায়ী ঔষধি পাতা’ গল্পের ছলে আসলে একটি অণুনিবন্ধ। যতিচিহ্ন ও সংলাপবিন্যাস যথাযথ হয়নি 
গল্প বিভাগে সন্নিবিষ্ট হয়েছে সাতটি গল্প। প্রথমেই রয়েছে মিথিলেশ ভট্টাচার্যের গল্প ‘তবু অনন্ত’। ভাষায়, বুনোটে, সংলাপে একটি সম্পূর্ণ গল্প যা আলোচ্য পত্রিকা সংখ্যার অন্যতম সম্পদ। আদিমা মজুমদারের নারীবিষয়ক গল্প ‘সন্দেহ’ একটি সুলিখিত গল্প। সুনন্দা নন্দী পুরকায়স্থের ব্যক্তিগত ধরনের সুচয়িত নিবন্ধ ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’ কী করে যে গল্প বিভাগে স্থান লাভ করল তা বিস্ময়ের। স্মৃতি দত্তের পুনঃপ্রকাশিত গল্প ‘সাইকো’ ভাষায়, বিষয়ে ব্যতিক্রমী হলেও সমাপনে ছোটগল্পের সংজ্ঞা অনুযায়ী গল্পসুলভ হয়েছে কিনা পাঠকের বিচার্য। বরাকপারের প্রান্তজনের দুঃখগাথার গল্প ঝুমুর পাণ্ডের ‘মরিয়ম বিবি’। শৈলীতে তত্ত্বে সুলিখিত। বিধ্বস্ত বাস্তবের প্রেক্ষিতে হিমাশিস ভট্টাচার্যের ক্রাইম ফিকশন ‘একস্ট্রিমিস্ট’ সুপাঠ্য হওয়ার দাবি রাখেগল্পে একটির বাইরে সবকটি ‘কী’ - ‘কি’ হয়ে আছে। কঠিন বাস্তব তথা সংস্কার ও জীবনবোধের উপর একটি চমৎকার গল্প স্নিগ্ধা চট্টোপাধ্যায় বিশ্বাসের ‘ফিরে যাওয়া’।
কবিতার বিভাগে দুই পর্বে ধরা আছে বহু কবিতা। কয়েকটি কবিতা শৈলীতে, শব্দযোজনায় মনোগ্রাহী হয়েছে। সব মিলিয়ে যাঁরা লিখেছেন তাঁরা হলেন - অপর্ণা দেওঘরিয়া, রীনা ভৌমিক, গৌতম মুখোপাধ্যায়, সৌম্যনারায়ণ আচার্য, মঞ্জুশ্রী ঘোষ, রিঙ্কু ব্যানার্জী, সুনীল কুমার দে, সুবর্ণ মুখোপাধ্যায়, ফাল্গুনী চক্রবর্তী, নীলাদ্রি ভট্টাচার্য, চম্পা নাগ, নিধী ঘোষ, ধনঞ্জয় চক্রবর্তী, শিল্পী দত্ত, যূথিকা দাস, সেবিকা বিশারদ, ভাস্কর জ্যোতি দাস, শতদল আচার্য, আলপনা রায় চৌধুরী, শৈলেন দাস, ড. কস্তুরী হোম চৌধুরী, শর্মি দে, দেবযানী ভট্টাচার্য, ড. শ্রাবণী সরকার, বরুণ কুমার মুখোপাধ্যায়, পারমিতা (গুয়াহাটি), অনুপম দাস, সৌরভ ভট্টাচার্য ও সুদীপ্ত বেতাল। (কবিদের নামের বানান অপরিবর্তিত লেখা হল)।
পত্রিকা জুড়ে নান্দনিক চিত্রাদির অলংকরণ বিশেষ মর্যাদা প্রদান করেছে সংখ্যাটিকে। ছোটপত্রিকার দায়বদ্ধতা ও সীমাবদ্ধতার জটিলতা কাটিয়ে বানান ও লেখা চয়নে অতিরিক্ত সচেতনতার প্রয়োজন যদিও সব মিলিয়ে আলোচ্য সংখ্যাটি ব্যাপ্তি ও নান্দনিকতায় সমৃদ্ধ একটি শারদীয় সংখ্যা ছোটপত্রিকা।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

‘উত্তীয়’ - ২য় পর্যায় দ্বাদশ সংখ্যা, ২০২৫-২৬
সম্পাদক - স্নিগ্ধা চট্টোপাধ্যায় বিশ্বাস
মূল্য - ২০০ টাকা 

Comments

Popular posts from this blog

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...