Skip to main content

জগৎ পারাবার পেরিয়ে জানা অজানার সুলুক সন্ধান


একক প্রচেষ্টায় হার্ডবোর্ড বাঁধাই ৫৬৮ পৃষ্ঠার একটি গ্রন্থ প্রকাশ কতটা গরজ ও নিবেদন, কতটা কষ্টসাধ্য ও ব্যয়সাধ্য তা ভাবার বিষয় বটে। তাও আবার নিজের কোন সৃষ্টি নয়, নয় গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ কিংবা ফিচার। সাধারণ জ্ঞানের উপর ত্রিপুরার খোয়াই শহরে বসে লেখা বইটি যে কখন অসাধারণ হয়ে উঠেছে তা হয়তো গ্রন্থকারের নিজেরও উপলব্ধির বাইরে। কিন্তু সমাজে, শৈক্ষিক পরিমণ্ডলে, ছাত্র সমাজের জন্য এ যে এক অনন্য সৃষ্টি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলত সাড়া জাগিয়েছে যথেষ্ট।
গ্রন্থনাম ইংরেজিতে হলেও গ্রন্থটি বাংলায় লেখা। এই পৃথিবীতে কিংবা তারও বাইরের ব্রহ্মাণ্ড বিষয়ে জানার কি আর শেষ আছে ? মনুষ্য হৃদয়ে ভিন্ন ভিন্ন পরিসরে, ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে  জানার অদম্য ইচ্ছা, প্রশ্নের পর প্রশ্ন ঘুরপাক খায় সতত। তবু এক জীবনে তো আর সবকিছু জানার সুযোগ নেই। জীবন ও জগৎ সম্বন্ধে একজন ব্যক্তি যত বড় পণ্ডিতই হোন না কেন আসলে তাঁর জ্ঞানের ভাণ্ডার কিন্তু বিন্দুতে সিন্ধুসম। এ কথা অনস্বীকার্য। তবু যতটা পারা যায় জীব ও জড় জগৎ নিয়ে জানার অনুসন্ধিৎসা সকলের মধ্যেই বিদ্যমান। ভূমিকায় ‘শুরুর আগে দুটো কথা’ শিরোনামে গ্রন্থকারের বক্তব্য জেনে নেওয়া প্রয়োজন। গ্রন্থকার লিখছেন - ‘...আমার চলতি পঞ্চাশোর্ধ্ব বছরে বহু পূর্ণিমা, অমাবস্যা আর বসন্ত সহ ছোট-বড় আর মাঝারি সংগ্রাম অনুধাবন করেছি। আর শেষটায় এসে ঠেকেছি, কিছু একটা দিতে চাইছি হয় আপনাকে নাহয় আপনার সন্তানকে, অথবা এই পৃথিবীকে।
৪২ বছর যাবৎ তিল তিল করে বিশ্বের সব নয়, তথাপি প্রথম কিছু কিছু আবিষ্কার, সৃষ্টি আর ঘটনাকে আমার অতি সূক্ষ্ম কলমের চাবুকে তুলে নিয়ে এসেছি আর তৈরি করেছি এক অজানা পৃথিবীর বর্ণমালাকে। যা তা প্রকাশ হবার আগে কেউ সেই দু:সাহস দেখাতে পারেননি। ... সমাজের প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রী এবং সমাজের প্রতিটি মানুষের চলার পথে, জানার পথে গ্রন্থটি উপকারে আসুক সেটাই আমার কাম্য। বর্তমানে প্রায় ১৪ হাজারের উপর প্রশ্নোত্তর সহ বহু দুষ্প্রাপ্য ছবি রয়েছে এই গ্রন্থে...।’
গ্রন্থে সূচিপত্র অনুযায়ী সুবিন্যস্ত রয়েছে মোট ৯৩টি অধ্যায়। এর মধ্যে ৯২টিই হচ্ছে বিষয়ভিত্তিক এবং শেষ অধ্যায় - বিবিধ অধ্যায়। পরিসরের অভাবে প্রতিটি অধ্যায়ের নাম উল্লেখ করা সম্ভব না হলেও কিছু উল্লেখ করাই যায়। যেমন :- শিক্ষা - বিদ্যালয় মহাবিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা জগৎ, প্রচার মাধ্যম, ব্যক্তি-কৃতিত্ব, ঐতিহাসিক ঘটনা, রাজনীতি তরঙ্গ, ডাকটিকিট, সংগীত জগৎ বাদ্যযন্ত্র, পোশাক পরিচ্ছদ, আগ্নেয়গিরি লাভা, বিজ্ঞানের আবিষ্কার, বিমান হেলিকপ্টার রকেট, রেল-ট্রাম পাতাল রেল, উদ্ভিদ জগৎ, প্রাণী জগৎ, পরমাণু - পাওয়ার লাইটিং, ফুটবল, ক্রিকেট, বাঁশ ও বর্শা, অ্যাথলেটিক্স, পৃথিবী বিষয়ক, দেশ মহাদেশ গ্রাম শহর বন্দর, বিভিন্ন দেশ রাজধানী ও ভাষা, মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি। অর্থায় এক বৃহৎ পরিসরকে গ্রন্থস্থ করেছেন গ্রন্থকার যা বাজারে উপলব্ধ সাধারণ জ্ঞানের বহুবিধ বইপত্রের এক একীকৃত সংকলন হিসেবেই মেনে নেওয়া যায়। তবে গৎ বাঁধা নয়, রয়েছে প্রশ্নের ভিতরে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তরও।
শেষ পর্যায়ে বহু ছবি সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে যা শুধু দুষ্প্রাপ্যই নয় অবাক করার মতো। কিছু উদাহরণ দেওয়া যেতেই পারে - ‘ফিজিতে উদ্রে উদ্রের সমাধি, পাশে নরখাদক স্বয়ং’, ‘অজগর সাপকে দিয়ে বডি ম্যাসাজ’, ’৩২ কি:মি: দূরে বসিয়ে কম্প্যুটারের মাধ্যমে হার্টের সফল অস্ত্রোপচার’, ‘৭ বছরের শিশুর রোজগার ১৭৬ কোটি টাকা’, ’৯৬ বছরের স্কুল ছাত্রী গুয়াদালুপেই’, ‘দীর্ঘতম গোঁফ’, ‘দীর্ঘতম নখ’, ‘এপিক অব গিলগামেস’, ‘দীর্ঘতম জিহ্বার অধিকারী’ ইত্যাদি।
উচ্চারণ সঠিক হওয়ার জন্য ইংরেজি শব্দ ও সংখ্যাকে ইংরেজিতেই লেখা হয়েছে। কিছু সংকেত আছে যা পরিশিষ্টে উল্লেখ করা আছে। ছাপা ও অক্ষর তথা বাক্যবিন্যাস যথাযথ। কিছু সংযোজন হয়তো বিস্তৃত হতে পারত। যেমন ১৯৯টি দেশের রাজধানী ও ভাষার উল্লেখ থাকলেও মুদ্রার উল্লেখ রয়েছে মাত্র ৩৮টি দেশের। বানানের শুদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়েছে যা গ্রন্থকারের সতর্ক মননের পরিচায়ক। প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে দেবজ্যোতি চক্রবর্তী।
সব মিলিয়ে এই মহাবিশ্বের নানা ঘটনাবলির উপর পুঙ্খানুপুঙ্খ জিজ্ঞাসার উত্তর সংবলিত এক মিনি বিশ্বকোষ যা সাধারণ্যে ব্যবহার্য - অন্তত এ অঞ্চলের জনসাধারণের উপযুক্ত। বিশেষত স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রী, প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতার প্রতিযোগী ও চাকুরির সাক্ষাৎকারপ্রার্থীদের জন্য বিশেষ উপযোগী হিসেবে গ্রন্থটি অত্যাবশ্যক বলে ভাবাই যায়।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

M E K World Asset
গ্রন্থকার - অমিতাভ রায়, খোয়াই, ত্রিপুরা
প্রকাশক - আরামবাগ বুক হাউস, কলকাতা
মূল্য - ৭৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৬৪৬৯১৬২ 

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...