Skip to main content

রজত জয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত একটি নান্দনিক শারদ সংখ্যা


বরাক উপত্যকা থেকে প্রকাশিত শারদীয় ছোটপত্রিকা সংখ্যাগুলোর মধ্যেকস্তুরীবহুদিন ধরেই এক উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছেসম্ভারে, নিবেদনে, সম্পাদকীয় কর্মকুশলতায়ধারা অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টায় প্রকাশিত হয়েছেশারদ সংখ্যা ১৪৩২ বঙ্গাব্দযা কিনা আবার ঘটনাচক্রে রজত জয়ন্তী বর্ষ সংখ্যাও বটে
লেটার সাইজের পত্রিকাগুলো সচরাচর তার আকারের জন্য পঠনবান্ধব হয় না যদিও শারদ সংখ্যার ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেওয়া যেতেই পারে৯০ পৃষ্ঠার আলোচ্য সংখ্যাটি নানা গুণে গুণান্বিত যদিও একথাও স্মরণে রাখা উচিত যে প্রতিটি ছোটপত্রিকারই কিছু বাধ্যবাধকতা থাকেসেসব কথা মাথায় রেখেই এগোনো যেতে পারে প্রথম পৃষ্ঠা থেকে। প্রথমেই বলে নেওয়া ভাবো যে একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ কিন্তু পাঠকের কাছে জাগিয়ে তুলতে পারে ‘প্রথম দর্শনেই প্রেম’। এবং এখানেও এমনটাই ঘটেছে। ‘ডুডল ভাই’-এর একটি থ্রি ডাইমেনশনাল ম্যুরাল চিত্রকে প্রাসঙ্গিক অলংকরণে ফুটিয়ে তুলেছেন প্রচ্ছদ শিল্পী চন্দ্রশেখর রায়। আবার ভেতরের পাতায় রেখাচিত্রের চমৎকার অলংকরণ পুরো সংখ্যাটিকেই করে তুলেছে নয়নশোভন। পৃষ্ঠাজোড়া সম্পাদকীয়তে মানস কান্তি চক্রবর্তী একে একে উল্লেখ করেছেন শরৎ, নারীসম্মান ও ‘কস্তুরী’র পঁচিশ বছরের পথ চলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ। সূচিপত্রে বিভাগ বিন্যাস বিন্যস্ত হলেও ভেতরের পাতায় বিন্যাস ভেঙে স্বাদ বদলের চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে।
লেখালেখির শুরুতেই ব্যতিক্রমী আঙ্গিকে রয়েছে ‘তোমার হল শুরু’ শীর্ষক কচিকাঁচাদের বিভাগ। এই পর্বে গদ্যে পদ্যে সন্নিবিষ্ট হয়েছে পাঁচটি লেখা, কবি/লেখক - মধুপর্ণা চক্রবর্তী, ময়ূরাক্ষী চক্রবর্তী, বর্ণশ্রী দে, অনুসূয়া দাস ও অপ্সরা বর্মণ। কে জানে ভবিষ্যতে কোন স্ফুলিঙ্গ উজ্জ্বলিত হবে এদের মধ্য থেকে। সম্পাদকের ‘বিশেষ প্রতিবেদন’-এ পঁচিশের বিস্তৃত বর্ণনা নিশ্চিতই প্রাসঙ্গিক। একটি পত্রিকার দীর্ঘ পথ চলায় যাঁদের অবদান অনি:শেষ তাঁদের কথা না লিখলে অকৃতজ্ঞতায় দুষ্ট হতে হয় বইকী। নানা বিষয়, ভিন্নতর বিস্তৃতি নিয়ে সন্নিবিষ্ট প্রবন্ধ/নিবন্ধসমূহের প্রতিটিই সুলিখিত ও অবশ্যপাঠ্য। লিখেছেন অতীন দাশ, তপোধীর ভট্টাচার্য, বিশ্বতোষ চৌধুরী, কিরণ শঙ্কর রায়, আশিসরঞ্জন নাথ, শান্তশ্রী সোম, প্রণবানন্দ দাশ, ধর্মানন্দ দেব, জয়ন্তী নাথ, টিংকু রায়, রাজেশ কোঁয়র, প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস, ড. তনুশ্রী ঘোষ, দেবলীনা রায় ও শমীন্দ্র রায়। ‘নামেন পরিচয়তে’। পরিসর আলাদা করে বয়ান লিপিবদ্ধ করার অনুমতি দেয় না। কল্যাণ দেশমুখ্যের সংক্ষিপ্ত রম্যরচনা সুলিখিত।
গল্প বিভাগে আছে নানা দৈর্ঘ্যের মোট ৯টি গল্প। দেশভাগ, প্রেম-ভালোবাসা, নস্টালজিয়া আর জীবনের নানা আঙ্গিক যথাযথভাবে ফুটে উঠেছে অনিন্দিতা চক্রবর্তী মেদহীন স্বল্পদৈর্ঘ্যের গল্প ‘ক্ষত’তে। খানিকটা পরিপার্শ্ব, খানিক সাহিত্যরসের সংযোজনে বহুগুণ বৃদ্ধি পেত গল্পের সার্বিক মান। মনস্তত্ত্ব, বিশেষ করে সিজোফ্রেনিয়ার উপর সোমা মজুমদারের গোছানো নিমগ্ন পাঠের ছোটগল্প ‘গল্প রঙের জীবন’ ভাষায়, সাহিত্যগুণে সমৃদ্ধ। ‘আলোর উৎসব’ লিখেছেন সুশান্ত মোহন চট্টোপাধ্যায়। একটি সহজ, সরল সিদ্ধান্তকে সুচয়িত আঙ্গিকে গল্পের মোড়কে উপস্থাপিত করতে সক্ষম হয়েছেন গল্পকার। মণিমালা ভট্টাচার্য রুদ্রের আবেগিক ছোট্ট গল্পটির চলন দ্রুত হলেও অপ্রত্যাশিত শিরোনাম তথা কিছু টেকনিক্যাল ধোঁয়াশায় আবৃত। বন্দনা বিশ্বাসের পত্রগল্প ‘সুধার চিঠি’ একটি আবেগিক অণুগল্প। ‘জীবন সংগ্রাম’ গল্পটি লিখেছেন চিরঞ্জীব দত্ত। প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা বাস্তব প্রেক্ষাপটের এই গল্পটি আসলে একসাথে একগুচ্ছ সিদ্ধান্তের সমাহার। সুপাঠ্য। গল্প বিভাগের শ্রেষ্ঠ সম্পদ মিথিলেশ ভট্টাচার্যের ‘চৈতালি’। একলা ভ্রমণের গল্প। এই গল্পকারের গল্পে গল্প না থাকলেও চলে। থেকে যায় জীবনের গল্প - প্রতি লাইনে, প্রতিটি সংকাপে। এক অনাবিল পাঠপ্রশান্তি। অযাচিত ভাবেই গল্পের ভাগগুলো ছাপার বিভ্রাটে এলোমেলো হয়ে গেছে যদিও এতে পাঠধারা সেভাবে ব্যাহত হয় না। বি. বিজয় সিনহার গল্প ‘সম্পর্ক’। বাৎসল্য প্রেমের একটি চমৎকার গল্প। জম্পেশ একটি গল্প যদিও প্রথম দিকে একগুচ্ছ বানান ও ব্যাকরণগত ভুল সরল পঠনকে কিছুটা ব্যাহত করেছে। এই বিভাগে রয়েছে প্রদীপ্ত পুরকায়স্থের একটি পরমাণু গল্পও।                           
কবিতা বিভাগে রয়েছে কিছু উৎকৃষ্ট, কিছু কাব্যিক গুণসম্পন্ন কবিতা যদিও এই বিভাগেই প্রত্যক্ষ করা যায় ছোটপত্রিকার দায়বদ্ধতার পরিচয়। সব মিলিয়ে কবিতা ও ছড়া যাঁরা লিখেছেন তঁরা হলেন - শিখা দাশগুপ্ত, রূপক শর্মাচার্য, তরুণ কুমার মালাকার, নবেন্দু নাথ, হাসনা আরা শেলী, শুভেন্দু পালিত, সুখেন দাস, ডা. কনকদীপ শর্মা, মাতাজী তারানাথ অঘোরপীর, শমিতা ভট্টাচার্য, পূজা তালুকদার, জয়ন্তী চৌধুরী, কবীর হুসাইন বড়ভুইয়া, অখিল চন্দ্র পাল, চন্দ্রিমা দত্ত, অর্চনা বিষ্ণু, রমলা চক্রবর্তী, প্রণবকান্তি দাস, সীমা দাস, মধুমিতা মণ্ডল, সুমন দাস, সুস্মিতা ভট্টাচার্য, সুব্রত দেব (শেখর) ও জয়নাল আবেদিন বড়ভূঁইয়া (কবিনামের বানান অপরিবর্তিত রইল)।  শেষ পাতায় জীবনের মৌলিক একক ‘কোষ’ নিয়ে রয়েছে সঞ্চারী রায় চৌধুরীর  ‘বিজ্ঞান বিষয়ক’ একটি পরমাণু প্রতিবেদন।
এই নিয়ে সম্ভার। কাগজের মান, ছাপার স্পষ্টতা, সালাম হেমন্ত সিংহের অক্ষরবিন্যাস আদি যথাযথ। এই আলোচনার ট্যাগলাইন এসেছে আশিসরঞ্জন নাথ-এর নিবন্ধ ‘পুরনো শিলচরের দুর্গাপুজো’ থেকে। এই ট্যাগলাইনের মতোই বরাকভূমের শারদীয় সংখ্যা পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রটিও যে ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী মানসম্পন্ন, আলোচ্য সংখ্যাটি তারই নিদর্শন। বানান সচেতনতার বৃদ্ধি তথা উৎকৃষ্টতর লেখালেখির অধিকতর সংযোজন এই পথে নিশ্চিতই সৃষ্টি করবে অধিকতর উৎকর্ষ ও গুণগত মান। সংখ্যাটি উৎসর্গ করা হয়েছে সদ্যপ্রয়াত সংগীতশিল্পী জুবিন গর্গকে। সব মিলিয়ে গভীর অধ্যবসায় ও সাহিত্যপ্রীতির এক নিদর্শন আলোচ্য পত্রিয়াসংখ্যা।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

‘কস্তুরী’
সম্পাদক - মানস কান্তি চক্রবর্তী
মূল্য - ৫০ টাকা। 

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...