Skip to main content

‘একজন আলোকিত মানুষ, কবি’র কথা, সাহিত্যজীবন কথা


আরবেলা পাহাড় তলে
মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে শব্দ বের করি
হুম তানা না-না হুম তানা না-নায়
শব্দ জুড়ে জুড়ে ওয়ানগ্লা’র গান
নাঙনি জিকপা দিনটাং
আঙনি জিকপা দিনটাং আর
মাদল বাদনে একমুঠো জঙ্গল-ঘ্রাণ
আমি ভালোবাসা বিলিয়ে দিই
পাহাড়ের আনাচে কানাচে… (কবিতা - ডুরামা নন্দন)।
কবি বিশ্বজিৎ নন্দী। সাকিন মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের তুরা শহর। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, মননে সাহিত্য। নেশায় সৃষ্টি ও সম্পাদনা। চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্ন প্রকাশিত ‘মিলন’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে উত্তরপূর্বে এক বিশেষ স্থানের অধিকারী। সাহিত্য কিংবা সৃষ্টির উন্মাদনায় নিমগ্ন এক সাধকের অঙ্গন স্বভাবতই সীমাহীন। তাই উত্তরপূর্ব ছাড়িয়ে, দুই বাংলা ও দেশের নানা প্রান্ত ছাড়িয়ে তাঁর দ্যুতির প্রকাশ বিশ্বজনীন। সুতরাং তাঁর জীবনকাহিনি হয়, মানুষ তাঁকে নিয়ে নন্দিত, গর্বিত হতেই হয়। আর সেই গর্ব, সেই গরজ থেকেই প্রকাশিত আলোচ্য সম্পাদনা গ্রন্থ - ‘বিশ্বজিৎ নন্দীর সাহিত্যজীবন’। এই প্রয়াসে উদ্যোগী হয়ে কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার এবং মানভূমের মাটিতে ভাষা সংগ্রামী হিসেবে পরিচিত কলমবাজ সম্পাদক রাজকুমার সরকার যে আখেরে এ অঞ্চলের বাংলা ভাষা সাহিত্যের এক স্বরূপই শুধু উদ্‌ঘাটন করলেন তা নয় সার্বিক পরিচয় করিয়ে দিলেন এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে যিনি তাঁর নিরলস সাহিত্য সাধনার ফলে আজ বিশ্ব জুড়ে নন্দিত, বন্দিত, সম্মানিত ও পুরষ্কৃত। বিশ্বজিৎ নন্দীর এই অর্জনে, এই প্রাপ্তিতে স্বভাবতই উচ্ছ্বসিত বিদ্বৎমহল। আর তারই ফলস্বরূপ আলোচ্য গ্রন্থে কলম ধরেছেন নানা অঞ্চলের অপরাপর কবি, সাহিত্যিক, সম্পাদক ও স্বজনবৃন্দ।
তাঁর ৩৭তম সম্পাদনাগ্রন্থে ‘সম্পাদক কথা’ শিরোনামে প্রথমেই রাজকুমার সরকার লিখছেন - ‘...কবি-সম্পাদক, ভাষাপ্রেমী বিশ্বজিৎ নন্দী মহাশয় সেইরকম এক কবি যিনি মেঘালয়ের তুরা শহরে বসে সাহিত্য সাধনা করে চলেছেন। অনেকেই চেনেন তাঁকে। আমি বিশ্বজিৎবাবুদের মতো মানুষদের কর্মকাণ্ড পাঠকসমাজে বা জনসমক্ষে নতুন করে তুলে ধরলাম...।’ উত্তরপূর্বের একজন সাহিত্যযোদ্ধাকে এভাবে তুলে ধরার জন্য রাজকুমার অবশ্যই ধন্যবাদার্হ। ‘আমার কথা’ শীর্ষক ভূমিকায় কবি বিশ্বজিৎ নন্দী লিখছেন - ‘লেখালেখি আমার জীবনের অনেক কাজের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ... শব্দের জগতে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে সাহিত্য আমার আপন ঠিকানা হয়ে উঠেছে... গারো পাহাড়ের মানুষের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে এই অঞ্চলের ভাষাগত বৈচিত্র ও সমৃদ্ধির কথা, গারো পাহাড়ের মিশ্র ভাষা নিয়ে আমার কাজকর্ম বিশ্লেষিত হয়েছে...।’
গ্রন্থ জুড়ে মূলত কবি, লেখক, সম্পাদক বিশ্বজিৎ নন্দীর খানিক ব্যক্তিগত জীবন এবং সম্পূর্ণ সাহিত্য জীবন নিয়েই কলম ধরেছেন অপরাপর কবি, লেখকবৃন্দ। তাই বহু রচনায় একই বিষয়ের, বৃত্তান্তের পুনরাবৃত্তি হয়েছে এবং এটাই স্বাভাবিক। শেষের দিকে বিশ্বজিৎ নন্দীর প্রাপ্ত পুরস্কার ও সম্মাননা যুক্ত হয়ে যে জীবনপঞ্জি সংযুক্ত হয়েছে তাতেই তাঁর কর্ম ও প্রাপ্তির বিশালতা পরিস্ফুট হয়েছে। তাঁকে নিয়ে নানা আঙ্গিকে, তাঁর কর্মরাজির নানা দিক নিয়ে বিশদে যাঁরা কলম ধরেছেন তাঁরা হলেন - বিকাশ সরকার, জগদীশ বর্মন, শিবব্রত দাওয়ানজী, অমল কর, শ্রী বরুণ চক্রবর্তী, কমল সাহা, সুভাষ পাল, সমরেন্দ্র বিশ্বাস, প্রাণজি বসাক, সঞ্জয় সোম, রূপকুমার পাল, বিশ্বজিৎ নাগ, নীতীশ বর্মন, এ টি এম মমতাজুল করিম, মানিক মজুমদার, সোহেল মো. ফখরুদ-দীন, পুলক কান্তি ধর, উত্তম চৌধুরী, সুলেখা সরকার, গোবিন্দ ধর, বিপ্লব কুমার বোস, বাপী চক্রবর্তী, তুষারকান্তি সাহা, কাব্যশ্রী বিপুল কুমার ঘোষ, সুনীল কুমার সাহা, তাপস কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সুজিত দেব, শীতল কুমার সরকার, অরূপ নাগ এবং সম্পাদক রাজকুমার সরকার। এছাড়া রয়েছে ইংরেজিতে লেখা একটি অধ্যায়। লিখেছেন প্রবোধ এম. সাংমা।
লেখাসমূহ এবং জীবনপঞ্জি অনুযায়ী জানা যায় বিশ্বজিৎ নন্দীর এযাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৭। এর মধ্যে একটি গ্রন্থ বাংলা, ইংরেজি ও গারো ভাষায় লেখা। সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা - ১ এবং সম্পাদিত পত্রিকা ‘মিলন’ যা আগেই বলা হয়েছে। যেসব সম্মান ও পুরস্কারে তিনি ভূষিত হয়েছেন তার মধ্যে রয়েছে - উত্তরবঙ্গ নাট্যজগৎ পুরস্কার, বিশ্ববঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি পুরস্কার, বিনয় মজুমদার স্মৃতি পুরস্কার, বিপিন চক্রবর্তী স্মৃতি পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন স্মৃতি পুরস্কার, সমতা সাহিত্য একাডেমী কর্তৃক প্রদত্ত সাহিত্যরত্ন পুরস্কার, রাষ্ট্রীয় সমতা সাহিত্য পুরস্কার, দলিত সাহিত্য একাডেমীর ড. আম্বেদকর এক্সেলেন্সি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, ইন্ডিয়া ইন্টারকন্টিনেন্টাল কালচার্যা ল অ্যাসোসিয়েশন চণ্ডীগড় কর্তৃক প্রদত্ত সাহিত্য শ্রী পুরস্কার, ইস্টার্ন ওয়ার্ল্ড নিউজপেপার, উজবেকিস্তান কর্তৃক প্রদত্ত বেস্ট পোয়েট অব দ্য ইয়ার ২০১৩, ব্যাতিক্রম গ্রুপ, গুয়াহাটি কর্তৃক প্রদত্ত ব্যতিক্রম লিটার্যা রি অ্যাওয়ার্ড ২০১৫, মেঘালয় সরকারের মেঘালয় ডে স্পেশ্যাল লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ২০১৭, অন্নদাশঙ্কর রায় পুরস্কার ২০২৩, ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী অ্যাওয়ার্ড ২০২৪, দার্জিলিং লিটার্যা রি উৎসব ২০২৪-এ দিগ্বিজয় পুরস্কার সহ বহু সম্মাননা ও স্মারক সম্মান।
পরিশেষে ২২ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে প্রাপ্ত সম্মানাদির বিশেষ মুহূর্তের একগুচ্ছ রঙিন ছবি। কাগজের মান, ছাপা, অক্ষরবন্যাস আদি যথাযথ। কমলেশ নন্দ-এর প্রচ্ছদ প্রাসঙ্গিক। শেষ প্রচ্ছদে রয়েছে বিশ্বজিৎ নন্দীকে নিয়ে উদ্ধৃত কয়েকজন গুণী ব্যক্তির উক্তি। গুটিকয়েক পুরোনো বানান ব্যতীত সমগ্র প্রকাশনাই যথাযথ এবং যথোচিত। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে সাহিত্যিক বিশ্বজিৎ নন্দীর বাবা সুবোধ চন্দ্র নন্দী ও মা চারুপ্রভা নন্দীকে। সব মিলিয়ে একটি সুসম্পাদিত জীবনীগ্রন্থ যার পঠনে পাঠকের বিশেষত উত্তরপূর্বের পাঠকের পাঠ-জানালায় উদ্ভাসিত হবে সাহিত্যপথের এক নিমগ্ন যাত্রীর সাহিত্যজীবনের সার্বিক বৃত্তান্ত। 
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘বিশ্বজিৎ নন্দীর সাহিত্য জীবন’
সম্পাদক রাজকুমার সরকার
প্রকাশক - কবিতিকা, খড়গপুর, প:বঙ্গ
মূল্য - ৩০০ টাকা

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...