Skip to main content

প্রথম কাব্যগ্রন্থে প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিত


এটা এক অনিচ্ছাকৃত প্রবণতা যে একজন গ্রন্থকারের প্রথম গ্রন্থের নাম আকছার ট্র্যাজিক বা বিয়োগাত্মক হয়ে থাকে। এক আশ্চর্য তথ্য। দিনমানের উল্লেখ থাকলে তা সন্ধ্যা হবে, প্রকৃতির উল্লেখ থাকলে তা বন্ধ্যা হবে। এমনই, আকাশ হলে তা মেঘলা হবে। কবি সুমিতা ভট্টাচার্যও তার ব্যতিক্রম নন। সুতরাং - ‘মেঘলা আকাশ’কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ। কেন এই গ্রন্থ প্রকাশ ? কেন এই ‘মেঘলা আকাশ’ ? কবির কথায় - ‘জীবনে যেমন গল্প কবিতা থাকে, অনুরূপ কবিতার মাঝেও কিছু জীবনের গল্প থাকে। চাপা অনুভূতিগুলোকে নিয়েই আমাদের দিবারাত্রি পার করা। সেই অবক্ষয়ের কিছুটা অনুভূতিকে আমার কলমের নিব দিয়ে অক্ষরের চাষ করার প্রয়াস। তারই বাস্তব রূপ ‘মেঘলা আকাশ’।
না বিষয়ভিত্তিক কোন কাব্যগ্রন্থ নয় এটি। কবিমনের মিশ্র অনুভূতির একগুচ্ছ প্রকাশ। হার্ডবোর্ড বাঁধাইয়ে ৮২ পৃষ্ঠার গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট হয়েছে ৫৫টি কবিতা। বাবা, কবিগুরু, জীবনের সমীকরণ, আত্মোপলব্ধি, প্রকৃতি, নারী, ফাগুন, বসন্ত, প্রেম, বাস্তব, কল্পনা, কবিতা, সম্পর্কের কাটাছেঁড়া - নানা অনুষঙ্গ এসেছে কবিতায় তবে সবচেয়ে বেশি এসেছে মেঘের অনুষঙ্গ বোধ করি কবি মেঘকেই করেছেন তাঁর কবিতার সঙ্গী -
নিঝুম রাত আর বৃষ্টি কাছাকাছি
গুরু গুরু গর্জনে আঁধার দিল পাড়ি
রঙিন আকাশ আবার মেঘলা হল,
দুপায়ে ছড়াই জল ছপছপিয়ে চলো
কবিতা নিয়ে বেশ কিছু কাটাকুটি, কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষার পথে হেঁটেছেন কবি তাই প্রতিটি কবিতায় লক্ষ করা যায় কোথাও অন্ত্যমিলের চেষ্টা তো কোথাও গদ্য কবিতা, সংলাপ কবিতা ইত্যাদি প্রথম কাব্যগ্রন্থে যে জড়তা সাধারণত প্রত্যক্ষ করা যায় তা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা বলা যাবে না, কবি বেরিয়ে এসেছেন তুরগছন্দে অন্যদিকে প্রত্যক্ষ করা গেছে যথাসম্ভব অন্ত্যমিল ধরে রাখার এক প্রবণতা ফলত কিছু কিছু ক্ষেত্রে কবিতার সাবলীল চলন কিছুটা হলেও ব্যাহত হওয়া অনুভূত হয়েছে বস্তুত অন্ত্যমিল নয়, অনুপ্রাস জাতীয় শব্দাবলির প্রয়োগেই অন্তর্নিহিত ছন্দ ফুটে ওঠে পাঠকালে নিজের কথায় কবি সেই কথাটিও স্বীকার করে নিয়েছেন সপাটে - ‘…এই কাব্য সংকলন করতে বলা যায় আমি কুণ্ঠিত ছিলাম কারণ আমি কবিতা লেখার সেরকম কোন ব্যাকরণ জানি না’ না, কোনও ব্যাকরণ মেনে কবিতা লেখা চলে না, এটাও যেমন সত্য তেমনি কবিতা মানেই ছন্দের কথা, শব্দব্রহ্মকে আন্তরিক করে তোলার কথা। তবু এই কুণ্ঠাবোধকে অতিক্রম করে কিছু অগ্রজ মানুষের অভিলাষকে মর্যাদা দিয়ে এই যে প্রকাশিত হল প্রথম কবিতা সংকলন এটাই হয়ে রইল কবিতার পথে কবির নিজেকে উত্তরণের এক সোপান পরবর্তীতে কবিতা রচনা ও সংকলন প্রকাশের কুণ্ঠিত পথ এবার উন্মুক্ত হল বলা যায় এবং আলোচ্য গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট কবিতাগুলির ভেতরে যে সেই ইঙ্গিত সুস্পষ্ট তা বলাই বাহুল্য কবিতার প্রতি ভালোবাসাই কবিকে করে তোলে কবিতামুখী, কবিতাপথের নিমগ্ন যাত্রী কবিতাকে উদ্দেশ করে কবি তাই লিখেন -
আর কেউ জানুক বা না জানুক
তুমি তো জানো
তোমার পরশে আমার ওষ্ঠে হাসি ঝরে
ঝরা কান্নাগুলো
একদম পাপড়ির মতোই খসে পড়ে
বাঁচতে ইচ্ছে হয়, তখনই
আমার যে শুধু তোমাকেই চাই
চাই অভিমানে, অপমানে, দিগন্ত বিস্তৃত সমীরণে
সমীরণে দ্বিগুণ সুখের গন্ধ ভাসে
যখন দেখি
কবিতা তুমি দাঁড়িয়ে আছো,
আমার একগুণ দুঃখের বিপরীতে
(কবিতা - একাত্মতা)
কিছু শব্দের সঠিক কাব্যরূপ, কিছু কাব্যময়তা, পঙ্ক্তিবিন্যাসের প্রতি অধিকতর যত্নবান হুওয়া, ডটের আধিক্য পরিহার করার পরিসর রয়ে গেছে যা পরবর্তীতে যে যথাযথ আঙ্গিকে পরিস্ফুট হবে তাতে সন্দেহ থাকার কথা নয়
মোটা কাগজে নান্দনিক অলংকরণ সহ সঠিক অক্ষর বিন্যাস, যথাযথ বাঁধাই গ্রন্থকে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে গৌতম চক্রবর্তীর প্রচ্ছদ প্রাসঙ্গিক প্রারম্ভে কবি এই গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর প্রয়াত পিতৃদেবকে যাঁর উদ্দেশে নিবেদিত হয়েছে গ্রন্থের প্রথম কবিতাদৈবাদেশ’, একটি হৃদয়স্পর্শী কবিতা রয়েছে কবির মায়ের আশীর্বাণী এবং কবি, লেখক গৌতম চৌধুরীর একটি চমৎকার ভূমিকা এবং শেষ প্রচ্ছদে কবি পরিচিতি স্বরূপ অপর এক কবি বনানী চৌধুরীর একটি মূল্যায়ন সব মিলিয়ে প্রথম কাব্যগ্রন্থটি হয়ে উঠলপ্রথম প্রতিশ্রুতিস্বরূপ একটি নান্দনিক কাব্যগ্রন্থ

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

মেঘলা আকাশ’ - সুমিতা গোস্বামী
প্রকাশক - স্কলার পাবলিকেশনস্‌, শ্রীভূমি
মূল্য - ১৫০ টাকা

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

বিষয়-মানসে প্রকাশিত ‘স্বরিত’ - সপ্তদশ সংখ্যা

কোনও দ্বিধা কিংবা ভয়কে অবলীলায় উড়িয়ে দিয়ে জলকে জল , মাটিকে মাটি কিংবা দেশকে দেশ ( দ্বেষ , দ্যাশ কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্র নয় ) বলতে পারেন যে ক ’ জন , তাঁদের মধ্যে অন্যতম কবি , লেখক , সম্পাদক নারায়ণ মোদক । বরাক উপত্যকার শ্রীভূমি থেকে ২১ মার্চ বিশ্ব কবিতা দিবসে প্রকাশিত হয়েছে বার্ষিক পত্রিকা ‘ স্বরিত ’- এর সপ্তদশ সংখ্যা । দ্বৈত সম্পাদনায় নারায়ণ মোদক ও গৌতম চৌধুরী। এবারের বিষয় ছিল প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অব্যবস্থা , অত্যাচার , সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নিপীড়ন ইত্যাদি নিয়ে প্রতিবেদন ও সহমর্মিতা ইত্যাদি । স্বভাবতই এর প্রতিবাদ হওয়া উচিত । এই নির্ভীক , বলিষ্ঠ পদক্ষেপের উদ্যোগ কতটা সফল হয়েছে , কতটা সহমর্মিতা বর্ষিত হল , কতটা প্রতিবাদ স্বরিত হল তার এক নির্মোহ বিশ্লেষণ সংখ্যাটির আলোচনার এক অমোঘ অনুষঙ্গ ।   ভূমিকার আধারে ‘এ সংখ্যার বিষয়ে আলোকপাত’ করতে গিয়ে অন্যতম সম্পাদক নারায়ণ মোদক লিখছেন - ‘… আমাদের সমাজে একদল নিজেকে মানবতাবাদী সাজিয়ে নিরাপদ দূরত্বে বসে সমাজ এবং সরকারের সব রকম সুবিধা ভোগ করে বিজ্ঞতার সাথে বলতে থাকেন সারা বিশ্বের যেখানেই সংখ্যালঘু আছে সেখানেই তারা অত্যাচারিত। আমাদ...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...