Skip to main content

সপাট, সটান এক মিশ্র অনুভূতির কাব্যগ্রন্থ


ঢাক বাদ্যিতে ভাসান শেষ হলে
নিস্তব্ধ মণ্ডপে পড়ে থাকা শূন্যতার
পাড়ে দীপ জ্বেলে রাখি নীরবে
মৃদু আলোয় দেখি
উচ্ছিষ্ট কুড়িয়ে নিতে নিতে
হেঁটে আসছেন তিনি…
পুনর্জন্ম হচ্ছে ঈশ্বরের - (পৃষ্ঠা - ৪৮)
এমনই সব সাহসী উচ্চারণ, এমনই সব অনন্য অনুভবকে সম্বল করে নানা আঙ্গিক, নানা বিষয়ের উপর লেখা আনুমানিক ৬০টি কবিতার সন্নিবেশে প্রকাশিত হয়েছে কবি রত্নদীপ দেব-এর কাব্যগ্রন্থ ‘ঈশ্বরের পুনর্জন্ম’। আনুমানিক লেখা হল এই অর্থে যে যেহেতু কবিতাগুলো শিরোনামবিহীন তাই পরবর্তী পৃষ্ঠার কয়েক পঙ্‌ক্তির কবিতা আসলে পূর্বর্তী পৃষ্ঠাজোড়া কবিতার সম্প্রসারণ কিনা তা সঠিক অনুমান করা দুষ্কর। তাই পাঠকের কাছে শিরোনামযুক্ত কবিতাই অধিকতর গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
রত্নদীপের প্রতিবাদী কবিতা বরাবরই স্পষ্ট উচ্চারণে নির্ঘোষিত। আলোচ্য গ্রন্থটিও ব্যত্যয় নয়। তবু এক মিশ্র অনুভবের কাব্যগ্রন্থ হিসেবে একে আখ্যায়িত করা যায় যেহেতু এখানে রয়েছে জীবনের কথা, যাপনের কথা, প্রেম-ভালোবাসার কথা। রয়েছে স্বীয় ধারণার বশবর্তী দেশভাবনার কথা, রয়েছে অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে শ্লেষ ও গর্জন। বরাকের কবি হওয়ার সূত্রে জি সি কলেজের শতাব্দী প্রাচীন বটবৃক্ষের ভূ-পতিত হওয়ার শোকজনিত উচ্চারণ দিয়েই আলোচ্য গ্রন্থের কবিতার সূত্রপাত।
একের পর এক কবিতায় মিশ্রিত আঙ্গিকে নিজেকে উদ্ভাসিত করেছেন কবি -
শাসকের তর্জনীর ইশারায় ইশারায়
প্রতিদিন একটা গাঢ় সুড়ঙ্গ পথে
হেঁটে চলেছে বোবা-বধিররা,
অন্ধ নয় তারা, একচোখা...
হয়তো একবিন্দু আলো
দাউ দাউ আগুন হবে একদিন। (পৃষ্ঠা - ৫১)
দেশ, শাসনব্যবস্থার উপর কবির এতটাই অস্বস্তি, এতটাই ক্ষোভ, বাস্তুহারাদের দুঃখে এতটাই উদ্‌বেলিত কবি-হৃদয় যে কবি লিখেন -
তারপর এভাবেই এক মধ্যরাতে
পালটে যাবে দেশটাও,
যেভাবে বদলে গিয়েছিল
নোট বন্দি ঘোষণার পর,
যেভাবে থমকে গিয়েছিল
লকডাউন ঘোষণার পর -
রাজপথ দখল করবে তখন জেন-জি
মিছিলে মিছিলে পা মেলাবে জেন এক্স-ওয়াই
আর, পৃথিবীর মানচিত্র শরীরে জড়িয়ে
দেশ থেকে দেশান্তরে হেঁটে বেড়াবে
বাস্তুহারা লোকেরা
কাঁটাতার ছিন্ন করে গজিয়ে উঠবে
একের পর এক বৃক্ষ। (পৃষ্ঠা - ৩৯)।
বিষয়ান্তরে কবির অন্তরে সযতনে সঞ্চিত করে রাখা একদিকে ঘৃণা ও অন্যদিকে প্রেম-ভালোবাসার ব্যক্তিগত অনুভবও ঝরে পড়ে পঙ্‌ক্তি বেয়ে -
যারা কথায় কথায় দেশপ্রেমের কথা শোনান/ তাদের আমি ঘৃণা করি।/ যারা কবিতা-গানে/ দেশ-বিদেশ বোঝেন,/ জাত-ধর্ম দেখেন/ তাদের জন্য আমার করুণা হয়।/ দেশটা আসলে তাদের কাছে ভোটবাক্সে/ জাত-ধর্মের হিসেব-নিকেশ, গান-কবিতা কোন ছাই। আবার -
কলেজের পুরোনো দেওয়ালের কাছে/ একটি বুনো ফুলগাছ গজিয়ে উঠেছে/ কোনও এক বসন্তে,/ হৃদয়ে তির গেঁথে জুনিয়র ক্লাসের ছেলেটির নাম/ দেয়ালে খোদাই করে রেখেছিল মেয়েটি।
আসলে গোটা গ্রন্থ জুড়ে প্রতিটি বিষয়ের উপর রয়েছে একাধিক কবিতা, একাধিক অমোঘ পঙ্‌ক্তি, পরিসরের অভাবে যার সবটুকু তুলে ধরা যায় না। মনে হয় যেন একের মধ্যে বহু সিরিজ ধরে রেখেছেন কবি। সদ্যপ্রয়াত সংগীতশিল্পী জুবিন গর্গের উপরও রয়েছে দুটি কবিতা - প্রাসঙ্গিক ও কাব্যিক। এসব নিয়েই আলোচ্য গ্রন্থ - একজন কবি যেখানে আলোচনা করেছেন অপরাপর কবিমনে লুকিয়ে থাকা ভিন্ন ভিন্ন আবেশের চিন্তাধারাও। কবিতা শিরোনামবিহীন হওয়ায় ধরিয়ে দেওয়া যায় না সেইসব কবিতার খেই।
কাগজ, ছাপার মান যথাযথ হলেও বেশ কিছু বানান ও পঙ্‌ক্তি বিন্যাসে অধিকতর সতর্কতার পরিসর রয়ে গেছে। এইসব এলোমেলো কর্মকাণ্ডের জেরে কবির পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি আলোচ্য গ্রন্থটি। পরবর্তীতে বিষয়ভিত্তিক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পূর্ণ সম্ভার রয়েছে কবির হেফাজতে। সেই পথে হাঁটা যেতেই পারে। সৌরভ দে’র প্রচ্ছদ প্রাসঙ্গিক। আলোচ্য গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন তাঁর পাঁচজন প্রিয় বন্ধুদেরকে।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘ঈশ্বরের পুনর্জন্ম’
রত্নদীপ দেব
প্রকাশক - নির্বাণ বুকস, কলকাতা
মূল্য - ১৭০ টাকা

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...