Skip to main content

অক্ষর ও ভাষার গরজে প্রকাশিত দুই প্রতিবেশী পত্রিকা


উত্তরপূর্বের ত্রিপুরা রাজ্যে বিভিন্ন ভাষার পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয়ে থাকে নিরন্তর এর মধ্যে বাংলা পত্রপত্রিকার সংখ্যাই বেশি অবয়ব কিংবা সম্ভারের আধিক্য নয়, প্রকাশের গরজ, সৃষ্টির মাদকতা ও নান্দনিকতা তথা অক্ষর ও ভাষার প্রতি ভালোবাসাই এখানে বেশি উপজীব্য, শেষ কথা একদিকে রাজ্যজোড়া পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে জুম চাষ, ফসল সৃষ্টি আর অন্যদিকে অক্ষর ও ভাষার কর্ষণে আকর্ষিত একঝাঁক কবি, লেখকের মুকুটে আকছার শোভা পায় ছোটপত্রিকার সম্পাদকের শিরোপাসাহিত্য সৃষ্টির সোপান।
তেমনই দুটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি শারদীয় আবহে, এক মাসের ব্যবধানে রাজ্যের উত্তরে অবস্থিত কৈলাশহর থেকে অসীমা দেবী সম্পাদিতঅক্ষরযাত্রাএবং পশ্চিমের খোয়াই থেকে দীপেন নাথশর্মা সম্পাদিতআজকের ভাষা
 
অক্ষরযাত্রা
ছিমছাম নান্দনিকতায় ৩২ পৃষ্ঠার পত্রিকা ‘অক্ষরযাত্রা’। নজরকাড়া প্রচ্ছদের সৌজন্যে ত্রিপুরার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও চিত্রকল্পক মিলনকান্তি দত্ত। দ্বিতীয় বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যাটিতে রয়েছে তীব্র সাহিত্যসাধনার গরজে কিছু কথা - সংক্ষিপ্ত সম্পাদকীয়তে ‘...সাহিত্য হচ্ছে প্রকৃতি ও মানব জীবনের এক স্বচ্ছ আয়না। ...অক্ষরযাত্রা লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনায় উদ্‌বুদ্ধ হওয়ার মূল কারণ হল অক্ষরশিল্পীদের অক্ষরগুলো এই আয়নার মধ্যে একত্রে তুলে আনা...।’
সীমিত পরিসরেই সম্পাদক একত্রে গেঁথে নিয়েছেন একগুচ্ছ সৃষ্টিকে। পৃষ্ঠাজোড়া সূচিপত্রে চোখ রাখলে দেখা যায় নেই নেই করেও সন্নিবিষ্ট হয়েছে ৩টি গল্প এবং ১২ জন কবির ১৮টি কবিতা। একেবারেই ব্যতিক্রমী একটি প্লটে সজ্জিত অসাধারণ ছোটগল্প পৃথ্বীশ দত্তের ‘চরিত্রায়ন’। স্বীকারোক্তি ধরনের গল্প সুমিতা সেন-এর ‘মামার বাড়ি’। কিছু তৎসম শব্দ, ‘উনি’, ‘উনার’ জাতীয় শব্দ পরিহার করলে ভালো হতো। পলাশ ধরের গল্প ‘শিবানীর সংসার’ উত্তরণের বার্তা নিয়ে এসেছে। ‘নারিজা’ ও ‘সারান’ শব্দদুটি সম্ভবত ভিনভাষার শব্দ। সেক্ষেত্রে গল্পের শেষে টীকা হিসেবে তার বাংলা অর্থ দিলে ভালো হতো।
কবিতায় রয়েছেন নামিদামি কবিদের সঙ্গে নবীনরাও। দুটি করে কবিতা লিখেছেন মিলনকান্তি দত্ত, গোবিন্দ ধর, অমলকান্তি চন্দ, বিধাত্রী দাম, মোসুমী ভট্টাচার্য ও সম্পাদক অসীমা দেবী। একটি করে কবিতা রয়েছে নিয়তি রায়বর্মণ, মধুচন্দ্রিমা দাস, সুতপা রায়, শাশ্বতী দেব, অনুষ্কা চৌধুরী ও পলাশ ধর। কাগজ, ছাপা, অক্ষরবিন্যাস স্পষ্ট। স্বল্পসংখ্যক বানানে বিভ্রাট রয়ে গেছে যদিও ভেতরের পৃষ্ঠার অলংকরণ ও ছবি সহ একটি সার্বিক নান্দনিকতার পত্রিকা ‘অক্ষরযাত্রা’।
প্রকাশক - অক্ষরযাত্রা, মূল্য - ১০০ টাকা।
 
আজকের ভাষা
রেল যোগাযোগবিচ্ছিন্ন ছোট্ট শহর ‘খোয়াই’। সেখান থেকেই প্রকাশিত হয় সাহিত্যের অদম্য পথিক দীপেন নাথশর্মা সম্পাদিত এবং সম্ভারে ক্ষীণতণু পত্রিকা ‘আজকের ভাষা’। আলোচ্য সংখ্যাটি হচ্ছে শারদ সংখ্যা ২০২৫, ১১তম সংখ্যা (২৪তম বর্ষ)। সোহম রায়ের প্রচ্ছদ নান্দনিক। ভেতরের পাতায় রয়েছে একটি অণুগল্প, একটি কবিতা, একটি প্রবন্ধ এবং একগুচ্ছ অণুকবিতা। ১৬ পৃষ্ঠার পত্রিকাটি এভাবেই গরজের দায় মেটালেও তা দায়সারা নয় মোটেও।
রয়েছে পৃষ্ঠাজোড়া একটি প্রত্যয় ও স্পষ্ট সম্পাদকীয়। কিছু কথা শারদীয় উৎসব নিয়ে, কিছু ‘আজকের ভাষা’ নিয়ে - ‘…’আজকের ভাষা’ কেবল একটি ম্যাগাজিন নয়। এটি একটি নিরন্তর চর্চার ক্ষেত্র যেখানে ভাষা সংস্কৃতি ও চিন্তার বিকাশ ঘটে যুগপৎভাবে। আমরা বিশ্বাস করি সাহিত্যের শক্তি সমাজের বিবেক জাগ্রত করতে পারে, আমাদের মননশীলতা ও মানবিকতাবোধকে প্রসারিত করতে পারে…।’
৩ থেকে ৯ লাইনের অণুকবিতায় উঠে এসেছে তারই প্রতিফলন। জীবন ও জীবনবোধের নানা অনুষঙ্গ। লিখেছেন মনোরঞ্জন গোপ, প্রণব চৌধুরী, প্রিয়তোষ ঘোষ, সুবীর সেনঘোষ, সুব্রত আচার্য, রাজীব ঘোষ, সুদীপ পাল, করুণা দেবনাথ, সুমিতা রায়, সুনির্মল বিশ্বাস, দীপাঞ্জন ভট্টাচার্য, প্রতিমা দেববর্মা, আশুতোষ দেব, সুব্রত দেব, দীপঙ্কর চক্রবর্তী, সৌরপ্রতিম শর্মা ও দীপেন নাথশর্মা।
মন্টু দাস-এর অণুগল্প অসম্পূর্ণ ছাপা হল কি ? গোবিন্দ ধর-এর কবিতা ‘যৌথখামারের গল্প’ সম্পর্ক ও বিশ্বাস নিয়ে। অনিলকুমার নাথ-এর কবিতা ‘ওরা জানে না ওরা কী বলছে’। বিধ্বস্ত বাস্তবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। শেষপাতে রয়েছে সম্পাদক দীপেনের একটি নিবন্ধ - ‘ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে কবি-সাহিত্যিকদের ভূমিকা’। বিষয়ের বিশালতা অপার হলেও এখানে স্বভাবতই সংক্ষিপ্ত আকারে তা লিপিবদ্ধ হয়েছে। তবু গবেষণাপত্রের ধাঁচে ভূমিকা ও উপসংহারের বাইরেও রয়েছে সাতটি সুস্পষ্ট শিরোনামযুক্ত প্যারাগ্রাফ।
সব মিলিয়ে ‘তেঁতুল পাতায় ন’জন’-এর মতোই এক সুজন সমাবেশ - ‘আজকের ভাষা’ পত্রিকার আলোচ্য সংখ্যা। কাগজ, ছাপা ইত্যাদি যথাযথ হলেও কয়েকটি বানান রয়ে গেছে বিভ্রাটযুক্ত। ভবিষ্যতে কলেবরবৃদ্ধির প্রত্যাশা করা যেতেই পারে… বিশেষত পূজা সংখ্যা - অন্তত দুই ফর্মার।
প্রকাশক - আজকের ভাষা প্রকাশনী, মূল্য - ০ টাকা।    
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

বিষয়-মানসে প্রকাশিত ‘স্বরিত’ - সপ্তদশ সংখ্যা

কোনও দ্বিধা কিংবা ভয়কে অবলীলায় উড়িয়ে দিয়ে জলকে জল , মাটিকে মাটি কিংবা দেশকে দেশ ( দ্বেষ , দ্যাশ কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্র নয় ) বলতে পারেন যে ক ’ জন , তাঁদের মধ্যে অন্যতম কবি , লেখক , সম্পাদক নারায়ণ মোদক । বরাক উপত্যকার শ্রীভূমি থেকে ২১ মার্চ বিশ্ব কবিতা দিবসে প্রকাশিত হয়েছে বার্ষিক পত্রিকা ‘ স্বরিত ’- এর সপ্তদশ সংখ্যা । দ্বৈত সম্পাদনায় নারায়ণ মোদক ও গৌতম চৌধুরী। এবারের বিষয় ছিল প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অব্যবস্থা , অত্যাচার , সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নিপীড়ন ইত্যাদি নিয়ে প্রতিবেদন ও সহমর্মিতা ইত্যাদি । স্বভাবতই এর প্রতিবাদ হওয়া উচিত । এই নির্ভীক , বলিষ্ঠ পদক্ষেপের উদ্যোগ কতটা সফল হয়েছে , কতটা সহমর্মিতা বর্ষিত হল , কতটা প্রতিবাদ স্বরিত হল তার এক নির্মোহ বিশ্লেষণ সংখ্যাটির আলোচনার এক অমোঘ অনুষঙ্গ ।   ভূমিকার আধারে ‘এ সংখ্যার বিষয়ে আলোকপাত’ করতে গিয়ে অন্যতম সম্পাদক নারায়ণ মোদক লিখছেন - ‘… আমাদের সমাজে একদল নিজেকে মানবতাবাদী সাজিয়ে নিরাপদ দূরত্বে বসে সমাজ এবং সরকারের সব রকম সুবিধা ভোগ করে বিজ্ঞতার সাথে বলতে থাকেন সারা বিশ্বের যেখানেই সংখ্যালঘু আছে সেখানেই তারা অত্যাচারিত। আমাদ...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...