Skip to main content

প্রেক্ষিত চা বাগান - দ্বৈতজীবন ও দ্বৈতযাপনের কাহিনি


মানুষ আসলেই এক দ্বৈত জীবন হয়তো যাপন করে। এক বিবাহ পূর্ববর্তী এবং অন্যটি বিবাহোত্তর। জীবন নির্বাহের যা কিছু ঘটনাপ্রবাহ তা এই দুই পর্যায়ে পুরোটাই প্রবাহিত হয় এক ভিন্নতর ছন্দে। আলপনা নাথ-এর উপন্যাস ‘ভৈরবী’তে ঠিক এমনই এক কাহিনি আবর্তিত হয়েছে ভৈরবী নামের এক কাল্পনিক চা বাগানকে পশ্চাদপট হিসেবে ব্যবহার করে। চা-বাগানকে কেন্দ্র করে ইতিপূর্বে বহু সফল উপন্যাস রচিত হয়েছে। উত্তরপূর্বও এর ব্যতিক্রম নয়। মূলত বাগান অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রেম-ভালোবাসা, চা-শ্রমিকদের দুঃখদুর্দশা ও মাদকসেবনের মাধ্যমে একাধারে দুর্দশা ভুলে থাকা আর অধ:পতনের কাহিনিই সেসবের মুখ্য উপজীব্য। আলোচ্য উপন্যাসটিও একই ধারার হলেও এক ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় কাহিনির মধ্যে লুকিয়ে থাকা সংস্কারবোধ, উত্তরণের পথে উন্নত ভাবনাচিন্তার প্রকাশে। অধিকাংশ চরিত্রের মধ্যেই এই উত্তরণের চিন্তাভাবনা পরিলক্ষিত হয়েছে।  
কাহিনির নায়ক গোবিন্দ প্রথমবারের মতো স্ত্রী-পুত্র সহ বহু বছর পর ফের জন্মস্থান ভৈরবীতে ফিরছে। তার বাল্যকাল, কৈশোর, যৌবনের বাসভূমি। ২৯টি পর্বযুক্ত উপন্যাসের প্রথম পর্বে রয়েছে মূলত ভৈরবীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা। বস্তুত এই বর্ণনা নানা পর্বেই সমৃদ্ধ করেছে কাহিনির প্রেক্ষাপট। গোবিন্দের বর্তমান ও অতীতের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। এই প্রথম পর্বেই শুরু হয় স্মৃতিচারণ অর্থাৎ ফিরে দেখার বর্ণনা - যা প্রসারিত হয় প্রায় একশ পৃষ্ঠা জুড়ে, ২১তম পর্ব অবধি যেখানে একের পর এক চরিত্ররা এসেছে নানা রূপে, নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়ে। ভৈরবী চা বাগানের অধিবাসী চা মজদুর ও শোষণকারী মালিকপক্ষকে নিয়ে অধিবাসীদের দুঃখযাপনের বর্ণনার সমান্তরালে এগিয়ে চলে গোবিন্দ-কমলি, ভুবন-লছমি, কালা-সাবিত্রী, শংকর-উষা, মুঞ্জু-মুকুন্দদের যাপনকথা, বিষাদমুখর বর্ণনায়। এক পর্যায়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় দুই নিবিড় প্রেমিক-প্রেমিকা গোবিন্দ ও কমলি। গোবিন্দ নানা কর্মকাণ্ডে চা বাগানের দুঃখী মানুষদের ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। 
সে ছিল গোবিন্দের জীবনের একটি পর্যায়। এক দীর্ঘ ঘটনাবহুল জীবনযাপন। উপন্যাসের পরবর্তী পর্যায়ে উন্মোচিত হয় নবরূপে গোবিন্দের স্বভূমে ফিরে আসার বিস্তৃত গল্প। গোবিন্দ ফিরে আসে স্ত্রী প্রতিমা ও একমাত্র পুত্র প্রীতমকে সঙ্গে নিয়ে। কিছুদিন চা বাগানে কাটায়, একে একে উন্মোচিত হয় রহস্যের জাল। 
লেখক এই বিশাল সংখ্যক চরিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে তাদের সুখদুঃখময় জীবনগাথা লিপিবদ্ধ করেছেন যথাসম্ভব সংক্ষেপেই যদিও এতেই প্রায় একশ পৃষ্ঠা ব্যয়িত হয়েছে। মূল কাহিনি থেকে সরে এসে এক দীর্ঘ বর্ণনায় ধৈর্য সহকারে আবিষ্ট থাকতে হবে পাঠককে অন্যথা পাঠস্পৃহা স্তিমিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। সেক্ষেত্রে এক নির্দিষ্ট পর্বান্তরে একবার স্বল্পকথায় খেই উল্লেখ করলে মূল কাহিনিতে জুড়ে থাকার সুযোগ ঘটে পাঠকের এবং পাঠস্পৃহাও বজায় থাকে - আলোচ্য উপন্যাসে যা দীর্ঘায়িত হয়েছে। এক্ষেত্রে খেই হিসেবে প্রতিমা ও প্রীতমের কাছে কমলির গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিকেই ধরে নেওয়া যেতে পারে। ওরা কি আপনজনের এই অজানা জীবনকাহিনিকে মেনে নিতে পারবে ? উপন্যাসের ক্ষেত্রে এই খেই-এর অপরিহার্যতা চিরন্তন। একে কেন্দ্র করেই এগোয় কাহিনি, এগোয় উপন্যাস। আলোচ্য উপন্যাসে লেখকের কলমে এক ব্যতিক্রমী তথা সুচিন্তিত ঘটনাপ্রবাহের উল্লেখে শেষ পঞ্চাশ পৃষ্ঠায় সুদৃঢ় হয়ে ধরা রয়েছে খেই। কী সেই ঘটনাপ্রবাহ, গোবিন্দ-কমলি-প্রতিমার এই ত্রিকোণ জীবনের যাপনে যা হয়ে উঠেছে এই উপন্যাসের কাহিনি তা ধীরে ধীরে নান্দনিকতার পথে হয়েছে উন্মোচিত - যার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে নানা উত্থানপতন, ভাঙাগড়ার আবহ। রয়েছে নায়ক গোবিন্দের নায়কোচিত কীর্তিকলাপ ও মনোভাবের প্রতিফলন।  
পাকা বাঁধাইয়ে ১৫১ পৃষ্ঠার এই উপন্যাস সম্বন্ধে ‘প্রবেশক’ ও ‘মুখবন্ধ’ শিরোনামে ভূমিকাসদৃশ বক্তব্য রয়েছে লেখক বিধানচন্দ্র দে ও মহুয়া চৌধুরীর। কাগজের মান, ছাপার স্পষ্টতা যথাযথ। ধীমান পাল-এর প্রচ্ছদ নান্দনিক। কিছু বানান, কিছু ছাপাবিভ্রাট রয়ে গেছে যা প্রায় অনিবার্য। সার্বিক বুনোট, সংলাপ যথাযথ রক্ষিত হয়েছে। সবকিছু মিলে এক সুলিখিত সার্বিক পঠনসুখের উপন্যাস।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘ভৈরবী’ - আলপনা নাথ
প্রকাশক - ‘রা’ প্রকাশন
মূল্য - ২৪৯ টাকা।
যোগাযোগ - ৭০০৫০২২০৩৯ 

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

মহানিষ্ক্ৰমণ

প্রায় চল্লিশ বছর আগে গ্রামের সেই মায়াময় বাড়িটি ছেড়ে আসতে বেজায় কষ্ট পেয়েছিলেন মা ও বাবা। স্পষ্ট মনে আছে অর্ঘ্যর, এক অব্যক্ত অসহায় বেদনার ছাপ ছিল তাঁদের চোখেমুখে। চোখের কোণে টলটল করছিল অশ্রু হয়ে জমে থাকা যাবতীয় সুখ দুঃখের ইতিকথা। জীবনে চলার পথে গড়ে নিতে হয় অনেক কিছু, আবার ছেড়েও যেতে হয় একদিন। এই কঠোর বাস্তব সেদিন প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করতে পেরেছিল অর্ঘ্যও। সিক্ত হয়ে উঠছিল তার চোখও। জন্ম থেকে এখানেই যে তার বেড়ে ওঠা। খেলাধুলা, পড়াশোনা সব তো এখানেই। দাদাদের বাইরে চলে যাওয়ার পর বারান্দাসংলগ্ন বাঁশের বেড়াযুক্ত কোঠাটিও একদিন তার একান্ত ব্যক্তিগত কক্ষ হয়ে উঠেছিল। শেষ কৈশোরে এই কোঠাতে বসেই তার শরীরচর্চা আর দেহজুড়ে বেড়ে-ওঠা লক্ষণের অবাক পর্যবেক্ষণ। আবার এখানে বসেই নিমগ্ন পড়াশোনার ফসল ম্যাট্রিকে এক চোখধাঁধানো ফলাফল। এরপর একদিন পড়াশোনার পাট চুকিয়ে উচ্চ পদে চাকরি পেয়ে দাদাদের মতোই বাইরে বেরিয়ে যায় অর্ঘ্য, স্বাভাবিক নিয়মে। ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে যায় দিদিরও। সন্তানরা যখন বড় হয়ে বাইরে চলে যায় ততদিনে বয়সের ভারে ন্যুব্জ বাবা মায়ের পক্ষে আর ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়ে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বহু জল্পনা কল্পনার শেষে ত...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...