Skip to main content

বরাক মাটির সুবাসিত নিবেদনময় শারদীয় সম্ভার


পত্রিকা-নামের সঙ্গে মানানসই একটি শারদীয় সাহিত্যপত্রিকা। বছরে একটিই সংখ্যা যেহেতু তাই নিবেদিতপ্রাণ লেখক-সম্পাদকের নিরলস নিবেদনে প্রতি বছরেই প্রকাশিত হয় শারদীয় সাহিত্যের একটি সম্ভার। এ বছর পত্রিকাটির রজত জয়ন্তী বর্ষ। এ এক অনাবিল প্রাপ্তি। ‘সাহিত্য সম্ভার’ পত্রিকার ‘শারদীয়া ১৪৩২’-এর সংখ্যাটি হাতে এসেছে সম্প্রতি। ১২৯ পৃষ্ঠা জুড়ে হাফ ট্যাবলয়েড বা ১/৪ ডিমাই সাইজের ঢাউস পত্রিকায় প্রকৃতার্থেই ধরে রাখা আছে বিচিত্র এক সম্ভার। অধিকাংশ রচনাই স্থানীয় কবি লেখকদের থেকে নেওয়া যেহেতু বরাক মাটির এক পুজো পুজো আঘ্রাণ স্পষ্ট অনুভব করা যায় পৃষ্টায় পৃষ্ঠায়। এক পৃষ্ঠার সমৃদ্ধ সম্পাদকীয়তে একে একে উঠে এসেছে অকাল বোধন, পত্রিকার রজত জয়ন্তী বর্ষ, দুর্গা পূজা ও দুর্গোৎসব, শরৎ, ধর্মীয় সদ্ভাবনা ও সহনশীলতার প্রসঙ্গ।
সম্ভারে রয়েছে ১৩টি প্রবন্ধ-নিবন্ধ। ইতিহাস, সাহিত্যের পাতা থেকে আহরিত নানা বিষয়ে লিখেছেন যে বিদগ্ধ লেখকবৃন্দ তাঁরা হলেন - শিলচর ভারত সেবাশ্রম সংঘের ব্র: গুণসিন্ধু, পবিত্র সরকার, তপোধীর ভট্টাচার্য, অমলেন্দু ভট্টাচার্য, উষারঞ্জন ভট্টাচার্য, ড. কস্তুরী হোমচৌধুরী, (সদ্যপ্রয়াত) মিথিলেশ ভট্টাচার্য, ড. রমজান আলি, মানচিত্র পাল, দীপক সেনগুপ্ত, আদিমা মজুমদার, দেবলীনা রায় ও সত্যজিৎ নাথ। প্রতিটি নিবন্ধই তত্ত্ব ও তথ্যভিত্তিক ধ্যান ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। শারদীয় বিশেষত্বের বাইরেও কবিগুরু, নজরুল, জীবনানন্দের উপর নির্দিষ্ট প্রবন্ধগুলি নান্দনিকতায় সমৃদ্ধ। আলাদা করে বিশেষোল্লেখের সুযোগ নেই। শুধু বলা যায় আদিমা মজুমদারের একই গল্প/প্রবন্ধ একাধিক পত্রিকায় দেখতে পাওয়া যায়। মিথিলেশের এক পৃষ্ঠার নিবন্ধটি সংগৃহীত আবার মিথিলেশের ‘দেশভাগের গল্প’ সংকলনটিতে সন্নিবিষ্ট দশটি গল্প নিয়ে সত্যজিতের নিবন্ধটি একটি সময়োচিত রচনা। এই গল্পকারের আকস্মিক চলে যাওয়ায় বরাকবঙ্গের সাহিত্য পরিসরে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে।
রয়েছে দুটি অনুবাদ গল্প। অনুবাদক - শ্যামলী কর ভাওয়াল ও রণবীর পুরকায়স্থ। উভয় ক্ষেত্রেই মূল ভাষার উল্লেখ দেখা গেল না। পাঠক জ্ঞাত থাকলেও উল্লেখ প্রয়োজন বইকী। গল্প বিভাগটি সমৃদ্ধ হয়েছে একাধিক সাড়া জাগানো গল্পকারদের গল্পে। প্রথমেই রয়েছে নলিনী বেরার গল্প ‘যুধিষ্ঠির, দী গ্রেট’। কল্পকথায় জমে উঠেছে রম্যগল্পটি। মিথিলেশ ভট্টাচার্যের ‘আরশি নগর’ এক অনবদ্য ‘পথের পাঁচালি’ - এরই মধ্যে লুকিয়ে জীবনের পাঁচালি। গল্পের ভাষা, বাঁধন, সংলাপ গল্পকারের জাত চিনিয়ে দেয় স্পষ্ট করে। দেবব্রত দাশ-এর ‘বৃষ্টিতে ধারাস্নান’-এ রয়েছে রূপোলি জগতের মোহজালের পিছনে লুকিয়ে থাকা নিগূঢ় বাস্তবের উদ্‌ঘাটন। ঠাসা বুনোটের গল্প। অমিতাভ সেনগুপ্তের বড়গল্প ‘জাদুকর’ একটি মনস্তত্ত্বের গল্প। পুরো গল্প জুড়ে ‘চোখ’ শব্দটির ব্যবহার সর্বাধিক যদিও প্রতিটি ‘চোখ’-এর উপরে চন্দ্রবিন্দুর অবস্থান চোখে লেগেছে। ঝুমুর পান্ডের ‘মায়া নৌকা’ গল্পের আদলে সংলাপবিহীন একটি স্মৃতিচারণমূলক প্রতিবেদন। শর্মিলী দেব কানুনগোর ‘তারামণি’, দোলনচাঁপা দাসপাল-এর ‘বন্ধন’ এবং প্রাঞ্জল পালের ‘ভোর’ সম্পর্কের অনাবিল, মধুর রসায়ন নিয়ে তিনটি গোছানো আবেগিক গল্প। ‘একটি গাছ ও অন্তরমহল’ - লিখেছেন মঞ্জরী হীরামণি রায়। দুর্দান্ত সাংকেতিক সমাপ্তিযুক্ত একটি চমৎকার গল্প। উন্মোচিত হয়েছে বিশ্বাস ও বাস্তবের গুঢ় রসায়ন। শ্রীমধ্যম চট্টোপাধ্যায়ের ‘মুক্তি’কে কেন গল্প বিভাগে রাখা হল বোঝা গেল না। এটি আসলে একটি নিখাদ ভ্রমণ কাহিনি এবং মধুপুর-দেওঘর-গিরিডি-শিমূলতলা ভ্রমণের এই ইতিকথাকে অনায়াসে ভ্রমণ বিভাগে রাখা যেত। তেমনি মৃন্ময় রায়ের একগুচ্ছ দারুণ ছড়াকেও সূচিপত্রে ছোটগল্প বিভাগেই রাখা হয়েছে। ছড়ায় নিজের জাত চিনিয়েছেন মৃন্ময়। গল্প বিভাগে এর বাইরেও রয়েছে বিশিষ্ট লেখক মহুয়া চৌধুরী ও বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর দুটি গল্প।
ভ্রমণ বিভাগে সন্নিবিষ্ট বিভূতিভূষণ গোস্বামীর ‘জোখাওথারের পথে : এক রূপকথার দেশে’ ভ্রমণ কাহিনি হিসেবে নয়, এক সংক্ষিপ্ত সাংস্কৃতিক প্রতিবেদন হিসেবে উজ্জ্বল অন্তর্ভুক্তি। শেষপর্বে দ্বিজেন্দ্রলাল দাস-এর ‘ইতিহাসের আলোকে ইন্ডিয়া ক্লাব’ সংযুক্ত হয়েছে ‘খেলা’ বিভাগে। শিলচরের ঐতিহ্যবাহী ইন্ডিয়া ক্লাবের বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভিত্তিক ক্রীড়াবিষয়ক নিবন্ধ।
কাগজের মান, ছাপার স্পষ্টতা, অক্ষরবিন্যাস ‘প্রায়’ যথাযথ হলেও বানানবিভ্রাটের আধিক্য পরিলক্ষিত হয়েছে বেশ কিছু রচনায়। এ বিষয়ে অধিকতর মনোযোগী হওয়ার অবকাশ তথা প্রয়োজন রয়েছে। ব্যতিক্রমী গ্রন্থমূল্য, অলংকরণ ও প্রাসঙ্গিক ছবির সংযুক্তি সংখ্যাটিকে মর্যাদা প্রদান করেছে। ছিমছাম, নান্দনিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে কুহেলী দেবরায়। সব মিলিয়ে শ্রমে, নিবেদনে পরিবেশিত শারদীয় সাহিত্যের এক উল্লেখযোগ্য পত্রিকাসম্ভার আলোচ্য সংখ্যাটি।

‘সাহিত্য সম্ভার’
সম্পাদক - প্রণবকান্তি দাস।
প্রকাশক - পঞ্চদীপ দাস।
মূল্য - ‘ভালোবেসে যা কিছু’
যোগাযোগ - ৯৭০৭৯৩৭৪৬৪
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...

বিষয়-মানসে প্রকাশিত ‘স্বরিত’ - সপ্তদশ সংখ্যা

কোনও দ্বিধা কিংবা ভয়কে অবলীলায় উড়িয়ে দিয়ে জলকে জল , মাটিকে মাটি কিংবা দেশকে দেশ ( দ্বেষ , দ্যাশ কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্র নয় ) বলতে পারেন যে ক ’ জন , তাঁদের মধ্যে অন্যতম কবি , লেখক , সম্পাদক নারায়ণ মোদক । বরাক উপত্যকার শ্রীভূমি থেকে ২১ মার্চ বিশ্ব কবিতা দিবসে প্রকাশিত হয়েছে বার্ষিক পত্রিকা ‘ স্বরিত ’- এর সপ্তদশ সংখ্যা । দ্বৈত সম্পাদনায় নারায়ণ মোদক ও গৌতম চৌধুরী। এবারের বিষয় ছিল প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অব্যবস্থা , অত্যাচার , সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নিপীড়ন ইত্যাদি নিয়ে প্রতিবেদন ও সহমর্মিতা ইত্যাদি । স্বভাবতই এর প্রতিবাদ হওয়া উচিত । এই নির্ভীক , বলিষ্ঠ পদক্ষেপের উদ্যোগ কতটা সফল হয়েছে , কতটা সহমর্মিতা বর্ষিত হল , কতটা প্রতিবাদ স্বরিত হল তার এক নির্মোহ বিশ্লেষণ সংখ্যাটির আলোচনার এক অমোঘ অনুষঙ্গ ।   ভূমিকার আধারে ‘এ সংখ্যার বিষয়ে আলোকপাত’ করতে গিয়ে অন্যতম সম্পাদক নারায়ণ মোদক লিখছেন - ‘… আমাদের সমাজে একদল নিজেকে মানবতাবাদী সাজিয়ে নিরাপদ দূরত্বে বসে সমাজ এবং সরকারের সব রকম সুবিধা ভোগ করে বিজ্ঞতার সাথে বলতে থাকেন সারা বিশ্বের যেখানেই সংখ্যালঘু আছে সেখানেই তারা অত্যাচারিত। আমাদ...