শিশু ‘দমান্তী’
ঠাকুমার বড় আদরের। দমান্তী ? এ আবার কেমন নাম বলে কেউ জিজ্ঞেস করতেই পারে, তাই না
? আসলে ছোট্ট এই মেয়েটির নাম দময়ন্তী। অশীতিপর ঠাকুমার মুখে ‘দময়ন্তী’ নামটি
ঠিকঠাক উচ্চারিত হয় না। তাই তাঁর মুখে পড়ে ‘দময়ন্তী’ হল গিয়ে ‘দমান্তী’। সঙ্গীসাথিদের
সামনে বললে ওর লজ্জা লাগে। প্রিয় ঠাম্মার উপরও খুব রাগ ওঠে, অভিমান হয়।
‘ঠাম্মা, আমাদের ঘরে অতিথি এলে বা আমার সঙ্গের কেউ এলে আমাকে কিন্তু দমান্তী বলে ডাকবে না’ - ঠাকুমাকে বলে।
‘তাহলে কী বলে ডাকব গো ঠাকরুন দিদি ?’ - ঠাকুমাও সস্নেহে জিজ্ঞেস করেন।
‘ঠিক মতো যদি ডাকতে না পারো তাহলে ‘ময়না’ বলে ডেকো। মামণি, সোনামণি - কত নামই তো আছে। তার যেকোন একটি নাম ধরে ডাকলেই হল।’ - বলেই ঠাম্মাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে ঝুলতে থাকে দময়ন্তী। ঠাকুমার ফোকলা মুখে সন্তোষের হাসি।
ঠাকুমার সঙ্গে দময়ন্তীর এত যে ভাব তার কারণ হল ওর মা-বাবা দুজনই চাকুরে। তাই দিনের বেশির ভাগ সময় ওকে ঠাকুমার সঙ্গেই কাটাতে হয়। ঠাকুমা রূপকথার গল্প শোনান। মা-বাবা ওর উপর রাগ করলে ঠাকুমা বাধা দিয়ে বলেন - ওর জন্য তোদের সময় কোথায়? আদর করার সময় না থাকলে বকাঝকা করার জন্য আর সময় বের করতে হবে না।’ আসলে ঠাকুমা ওকে মিথ্যে ছলনায় উত্যক্ত করতে চান না। স্নেহের ছলে তিনি শাসন করতে জানেন। ওর সমবয়েসি ছেলেমেয়েদের তুলনায় দময়ন্তী অনেক বুদ্ধিমতী। ঠাকুমা ছেলে-ভুলানো গল্পের ছলে ওকে নীতিশিক্ষামূলক বহু কাহিনি শোনাতে থাকেন। তারপর সেইসব বিষয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানা প্রশ্ন করেন। দময়ন্তী যেসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না সেসব ঠাকুমা সবিস্তারে সুন্দর করে বুঝিয়ে দেন।
দময়ন্তী প্রতিদিন সন্ধেবেলা ঠাকুমার সঙ্গে ঠাকুরঘরে প্রার্থনা জানায়। নামঘরে যায়। বেশ ক’টি প্রার্থনা মন্ত্র ওর মুখস্থ হয়ে গেছে। স্কুল যেদিন বন্ধ থাকে সেদিন কীসের বন্ধ বলে কেউ জিজ্ঞেস করলে সে সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয়। আগের দিনই ঠাকুমা সেসব ভালো করে বুঝিয়ে দেন। মা-বাবা তা নিয়ে গর্বও করেন। সেসবের জন্য পুরো কৃতিত্ব সে ঠাম্মাকেই দেয়।
মাঝে মাঝে ঠাম্মার জন্য দময়ন্তীর খুব কষ্ট হয়। ঠাম্মার দাঁতগুলো পড়ে পড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। দিন দিন তিনি তাঁর প্রিয় কিছু খাদ্য খেতে না পারা হয়ে পড়ছেন। ঠাকুরের প্রসাদ - মটর জাতীয় বস্তুও তিনি খেতে পারছেন না। কখনও শুধু কলা খান। নামঘরে কীর্তনাদিতে সোৎসাহে গেলেও মাদুরে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারেন না। চলাফেরাও আজকাল ভারসাম্যহীন। একদিন সে মা-বাবার সঙ্গে একটি বাড়িতে ঘুরতে গিয়ে ছোট একটি কাঠের হামানদিস্তা দেখতে পেল।
‘এটা দিয়ে কী করা হয় মা?’
মা বললেন - ‘পান তাম্বুল থ্যাঁতলে খাওয়া হয়।’
‘কেন?’ - অবাক হয়ে সাগ্রহে জিজ্ঞেস করল দময়ন্তী।
‘দাঁত না থাকা দাদু, ঠাম্মারা চিবোতে পারেন না যে, তাই হামানদিস্তায় পিষে খান।’ - বাবা হামানদিস্তাটি হাতে নিয়ে তাকে ভালো করে বুঝিয়ে বললেন। হামানদিস্তা, তাম্বুল পেষা, দাঁত না থাকা ইত্যাদি সব কথা সে সে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনল। মৃদুস্বরে বাবাকে জিজ্ঞেস করল - ‘বাবা, এতে ঠাকুমা মটর-প্রসাদ, তাম্বুল-পান, চিবোতে না পারা ফল - আপেল, পেয়ারা এসব পিষে খেতে পারবেন, তাই না?’
‘এতে শুধু তাম্বুল-পানই পিষে খাওয়া হয়। তাই এর নাম তাম্বুলের হামানদিস্তা।
‘কিছু হবে না বাবা। আমাদের ঘরের জন্য একটি হামলদিস্তা তুমি আনবে তো।’
‘হামলদিস্তা নয় রে মা, হামানদিস্তা।’
দময়ন্তী ওখানেই আটকে আছে। বাবা বুঝিয়ে দিলেন হামানদিস্তা কাঠমিস্ত্রির হাত দিয়ে তৈরি করিয়ে আনতে হবে।
‘ঠাকুমা, আজ খুব সুন্দর একটি জিনিস দেখেছি।’
‘কী জিনিস? নামটি বল তো। জানিই হয়তো বা।’
ঘরে এসে ঠাকুমার বুকের মধ্যে বসে আদুরে গলায় সে বলল - ‘এ তুমি দেখোইনি। জানবে কোথা থেকে? আমাদের জন্যও একটি আনতে বলেছি বাবাকে। তুমি খেতে না পারা সবকিছু ওতে পিষে খেতে পারবে।’
‘সত্যি নাকি? কিন্তু আমাদের তো মিক্সি আছেই। ঠিক না? আবার কী?’
‘এহ্। বলেছি না তুমি জানো না। জানো নাই তো। ওটা মিক্সি নয়। কাঠের একটি ছোট ডান্ডা দিয়ে (হাত দিয়ে দেখিয়ে) এভাবে আঘাত করে করে পেষা হয়।’
‘ও। খলের কথা বলছিস? হামানদিস্তা দেখেছিস, না?’
‘ও, দেখেছো তুমি?’
‘হামানদিস্তা না দেখেই বুড়ি হয়েছি নাকি?’ - বলে খিকখিক করে হাসতে লাগলেন ঠাকুমা। কিছুদিন পরেই দময়ন্তীর দশ বছরের জন্মদিন। প্রতি বছর জন্মদিন এলেই সে ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করে - ‘ঠাকুমা, তোমার জন্মদিন কবে?’ বছর দুয়েক আগে একবার ভেবেছিল - কবে আসবে ঠাম্মার জন্মদিন? এত দেরি নাকি যে আসেই না? সবারই জন্মদিন আসে, ঠাম্মার জন্মদিন কেন আসে না? ঠাম্মা কখনও বলেন - ‘তোর, আমার এক মাসেই জন্ম।’
কিন্তু সে ঠাম্মার জন্মদিন কখনও পালিত হতে দেখেনি। ওর জনদিনে নামঘরে নৈবেদ্য নিবেদন ঠাম্মার নিয়ম। বুঝতে পারা বয়স থেকেই সে দেখে আসছে। শুধু ওরই নয়, মা-বাবার জন্মদিনেও ঠাম্মা এমনই নিয়ম করেন। চা-মিষ্টি খাওয়ান।
‘বলো তো এবার জন্মদিনে তোমার কী উপহার চাই?’ - রাতের খাওয়ার সময় মা-বাবা তাকে জিজ্ঞেস করলেন।
‘হামানদিস্তা।’ - সে তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল। যেন অন্যান্য বছরের মতো এবারও জিজ্ঞেস করলেই এই উত্তর দেবে বলে ভেবেই রেখেছিল।
‘হামানদিস্তা!’ - বিস্মিত মা-বাবা একযোগে চেঁচিয়ে উঠলেন।
‘হ্যাঁ, হামানদিস্তা। আর এবার ঠাম্মারও জন্মদিন পালন করতে হবে। ঠাম্মার জন্মদিনে নামঘরে নৈবেদ্য দিতে হবে। চা-মিষ্টি খাওয়াতে হবে। আমাদের ঘরে সবার জন্মদিন পালন করা হয়, কেক কাটা হয়। ঠাম্মার জন্মদিনে কিছুই করো না কেন?’
দমান্তীর কথায় হতবাক মা-বাবা। উভয়ে উভয়ের চোখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন। এরপর যেন কিছু কথাও বললেন।
হ্যাঁ। বড়রা না ভাবা কিছু কথা ছোটরাও ভাবতে পারে। এবার ঠাম্মার আশিতম জন্মদিন ধুমধাম সহকারে পালন করা হবে। ঠাম্মার আদরের দমান্তীর ইচ্ছের কথা জানার পর থেকে ঠাম্মাও যেন ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের মতো আনন্দিত হয়ে পড়েছেন। আদরের দমান্তীকে আঁকড়ে ধরে জিজ্ঞেস করেন - ‘তুই কেন আবার আমার জন্মদিনের কথা ভাবতে গেলি? লজ্জা লাগবে না আমার? অবশ্য কিছুটা হলেও ভালোই লাগছে।’
‘বলো তো ঠাম্মা, তোমার কী উপহার লাগবে? আর কী কেক লাগবে?’
এতদিন দমান্তীর জন্মদিনে ঠাম্মা উপহার দিয়ে এসেছেন ভালো ভালো রূপকথার বই। তাকে জিজ্ঞেস করার মতোই সেও একদিন সুযোগ বুঝে প্রশ্ন রাখল ঠাম্মার কাছে।
‘যা:! আমার জন্মদিন পালন করতে আসা আমার ঠাকুমা একেবারে! কেক-টেক আনতে হবে না বলে দিলাম।’
‘তুমি বললেই হবে নাকি? বাবা আনবে বলেছে। তুমি নাকি চকোলেট খেতে ভালোবাসো? তাই মা তোমার জন্য ঘরেই একটি চকোলেট বানাবেন বলে বলেছেন। হবে তো?
একদিন সেই বিশেষ দিনটি এল। ‘হ্যাপি বার্থডে ঠাম্মা’ - ঠাম্মাকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেল দমান্তী। ঠাম্মাও তাকে জড়িয়ে ধরে দুই গালে দুটি চুমু খেয়ে বুকে টেনে নিলেন। চুলে, মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে বললেন - ‘জন্মদিনে তোকেও অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানালাম দিদিভাই। তুই যাতে পৃথিবী জয় করতে পারিস।’
ঠাম্মার জন্মদিনে সে রঙিন চকচকে কাগজের প্যাকেটে মোড়া সুন্দর একটি উপহার দিল। ঠাম্মা সাগ্রহে মোড়কটি খুললেন, দেখলেন কাঠের একটি ছোট্ট হামানদিস্তা। ঠাম্মাও তাকে একটি উপহারের পুঁটলি দিলেন। কিছু ছোট, বড় রূপকথার বই। আনন্দে, আহ্লাদে সে ঠাম্মাকে জড়িয়ে ধরল।
‘ঠাম্মা, আমাদের ঘরে অতিথি এলে বা আমার সঙ্গের কেউ এলে আমাকে কিন্তু দমান্তী বলে ডাকবে না’ - ঠাকুমাকে বলে।
‘তাহলে কী বলে ডাকব গো ঠাকরুন দিদি ?’ - ঠাকুমাও সস্নেহে জিজ্ঞেস করেন।
‘ঠিক মতো যদি ডাকতে না পারো তাহলে ‘ময়না’ বলে ডেকো। মামণি, সোনামণি - কত নামই তো আছে। তার যেকোন একটি নাম ধরে ডাকলেই হল।’ - বলেই ঠাম্মাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে ঝুলতে থাকে দময়ন্তী। ঠাকুমার ফোকলা মুখে সন্তোষের হাসি।
ঠাকুমার সঙ্গে দময়ন্তীর এত যে ভাব তার কারণ হল ওর মা-বাবা দুজনই চাকুরে। তাই দিনের বেশির ভাগ সময় ওকে ঠাকুমার সঙ্গেই কাটাতে হয়। ঠাকুমা রূপকথার গল্প শোনান। মা-বাবা ওর উপর রাগ করলে ঠাকুমা বাধা দিয়ে বলেন - ওর জন্য তোদের সময় কোথায়? আদর করার সময় না থাকলে বকাঝকা করার জন্য আর সময় বের করতে হবে না।’ আসলে ঠাকুমা ওকে মিথ্যে ছলনায় উত্যক্ত করতে চান না। স্নেহের ছলে তিনি শাসন করতে জানেন। ওর সমবয়েসি ছেলেমেয়েদের তুলনায় দময়ন্তী অনেক বুদ্ধিমতী। ঠাকুমা ছেলে-ভুলানো গল্পের ছলে ওকে নীতিশিক্ষামূলক বহু কাহিনি শোনাতে থাকেন। তারপর সেইসব বিষয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানা প্রশ্ন করেন। দময়ন্তী যেসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না সেসব ঠাকুমা সবিস্তারে সুন্দর করে বুঝিয়ে দেন।
দময়ন্তী প্রতিদিন সন্ধেবেলা ঠাকুমার সঙ্গে ঠাকুরঘরে প্রার্থনা জানায়। নামঘরে যায়। বেশ ক’টি প্রার্থনা মন্ত্র ওর মুখস্থ হয়ে গেছে। স্কুল যেদিন বন্ধ থাকে সেদিন কীসের বন্ধ বলে কেউ জিজ্ঞেস করলে সে সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয়। আগের দিনই ঠাকুমা সেসব ভালো করে বুঝিয়ে দেন। মা-বাবা তা নিয়ে গর্বও করেন। সেসবের জন্য পুরো কৃতিত্ব সে ঠাম্মাকেই দেয়।
মাঝে মাঝে ঠাম্মার জন্য দময়ন্তীর খুব কষ্ট হয়। ঠাম্মার দাঁতগুলো পড়ে পড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। দিন দিন তিনি তাঁর প্রিয় কিছু খাদ্য খেতে না পারা হয়ে পড়ছেন। ঠাকুরের প্রসাদ - মটর জাতীয় বস্তুও তিনি খেতে পারছেন না। কখনও শুধু কলা খান। নামঘরে কীর্তনাদিতে সোৎসাহে গেলেও মাদুরে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারেন না। চলাফেরাও আজকাল ভারসাম্যহীন। একদিন সে মা-বাবার সঙ্গে একটি বাড়িতে ঘুরতে গিয়ে ছোট একটি কাঠের হামানদিস্তা দেখতে পেল।
‘এটা দিয়ে কী করা হয় মা?’
মা বললেন - ‘পান তাম্বুল থ্যাঁতলে খাওয়া হয়।’
‘কেন?’ - অবাক হয়ে সাগ্রহে জিজ্ঞেস করল দময়ন্তী।
‘দাঁত না থাকা দাদু, ঠাম্মারা চিবোতে পারেন না যে, তাই হামানদিস্তায় পিষে খান।’ - বাবা হামানদিস্তাটি হাতে নিয়ে তাকে ভালো করে বুঝিয়ে বললেন। হামানদিস্তা, তাম্বুল পেষা, দাঁত না থাকা ইত্যাদি সব কথা সে সে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনল। মৃদুস্বরে বাবাকে জিজ্ঞেস করল - ‘বাবা, এতে ঠাকুমা মটর-প্রসাদ, তাম্বুল-পান, চিবোতে না পারা ফল - আপেল, পেয়ারা এসব পিষে খেতে পারবেন, তাই না?’
‘এতে শুধু তাম্বুল-পানই পিষে খাওয়া হয়। তাই এর নাম তাম্বুলের হামানদিস্তা।
‘কিছু হবে না বাবা। আমাদের ঘরের জন্য একটি হামলদিস্তা তুমি আনবে তো।’
‘হামলদিস্তা নয় রে মা, হামানদিস্তা।’
দময়ন্তী ওখানেই আটকে আছে। বাবা বুঝিয়ে দিলেন হামানদিস্তা কাঠমিস্ত্রির হাত দিয়ে তৈরি করিয়ে আনতে হবে।
‘ঠাকুমা, আজ খুব সুন্দর একটি জিনিস দেখেছি।’
‘কী জিনিস? নামটি বল তো। জানিই হয়তো বা।’
ঘরে এসে ঠাকুমার বুকের মধ্যে বসে আদুরে গলায় সে বলল - ‘এ তুমি দেখোইনি। জানবে কোথা থেকে? আমাদের জন্যও একটি আনতে বলেছি বাবাকে। তুমি খেতে না পারা সবকিছু ওতে পিষে খেতে পারবে।’
‘সত্যি নাকি? কিন্তু আমাদের তো মিক্সি আছেই। ঠিক না? আবার কী?’
‘এহ্। বলেছি না তুমি জানো না। জানো নাই তো। ওটা মিক্সি নয়। কাঠের একটি ছোট ডান্ডা দিয়ে (হাত দিয়ে দেখিয়ে) এভাবে আঘাত করে করে পেষা হয়।’
‘ও। খলের কথা বলছিস? হামানদিস্তা দেখেছিস, না?’
‘ও, দেখেছো তুমি?’
‘হামানদিস্তা না দেখেই বুড়ি হয়েছি নাকি?’ - বলে খিকখিক করে হাসতে লাগলেন ঠাকুমা। কিছুদিন পরেই দময়ন্তীর দশ বছরের জন্মদিন। প্রতি বছর জন্মদিন এলেই সে ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করে - ‘ঠাকুমা, তোমার জন্মদিন কবে?’ বছর দুয়েক আগে একবার ভেবেছিল - কবে আসবে ঠাম্মার জন্মদিন? এত দেরি নাকি যে আসেই না? সবারই জন্মদিন আসে, ঠাম্মার জন্মদিন কেন আসে না? ঠাম্মা কখনও বলেন - ‘তোর, আমার এক মাসেই জন্ম।’
কিন্তু সে ঠাম্মার জন্মদিন কখনও পালিত হতে দেখেনি। ওর জনদিনে নামঘরে নৈবেদ্য নিবেদন ঠাম্মার নিয়ম। বুঝতে পারা বয়স থেকেই সে দেখে আসছে। শুধু ওরই নয়, মা-বাবার জন্মদিনেও ঠাম্মা এমনই নিয়ম করেন। চা-মিষ্টি খাওয়ান।
‘বলো তো এবার জন্মদিনে তোমার কী উপহার চাই?’ - রাতের খাওয়ার সময় মা-বাবা তাকে জিজ্ঞেস করলেন।
‘হামানদিস্তা।’ - সে তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল। যেন অন্যান্য বছরের মতো এবারও জিজ্ঞেস করলেই এই উত্তর দেবে বলে ভেবেই রেখেছিল।
‘হামানদিস্তা!’ - বিস্মিত মা-বাবা একযোগে চেঁচিয়ে উঠলেন।
‘হ্যাঁ, হামানদিস্তা। আর এবার ঠাম্মারও জন্মদিন পালন করতে হবে। ঠাম্মার জন্মদিনে নামঘরে নৈবেদ্য দিতে হবে। চা-মিষ্টি খাওয়াতে হবে। আমাদের ঘরে সবার জন্মদিন পালন করা হয়, কেক কাটা হয়। ঠাম্মার জন্মদিনে কিছুই করো না কেন?’
দমান্তীর কথায় হতবাক মা-বাবা। উভয়ে উভয়ের চোখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন। এরপর যেন কিছু কথাও বললেন।
হ্যাঁ। বড়রা না ভাবা কিছু কথা ছোটরাও ভাবতে পারে। এবার ঠাম্মার আশিতম জন্মদিন ধুমধাম সহকারে পালন করা হবে। ঠাম্মার আদরের দমান্তীর ইচ্ছের কথা জানার পর থেকে ঠাম্মাও যেন ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের মতো আনন্দিত হয়ে পড়েছেন। আদরের দমান্তীকে আঁকড়ে ধরে জিজ্ঞেস করেন - ‘তুই কেন আবার আমার জন্মদিনের কথা ভাবতে গেলি? লজ্জা লাগবে না আমার? অবশ্য কিছুটা হলেও ভালোই লাগছে।’
‘বলো তো ঠাম্মা, তোমার কী উপহার লাগবে? আর কী কেক লাগবে?’
এতদিন দমান্তীর জন্মদিনে ঠাম্মা উপহার দিয়ে এসেছেন ভালো ভালো রূপকথার বই। তাকে জিজ্ঞেস করার মতোই সেও একদিন সুযোগ বুঝে প্রশ্ন রাখল ঠাম্মার কাছে।
‘যা:! আমার জন্মদিন পালন করতে আসা আমার ঠাকুমা একেবারে! কেক-টেক আনতে হবে না বলে দিলাম।’
‘তুমি বললেই হবে নাকি? বাবা আনবে বলেছে। তুমি নাকি চকোলেট খেতে ভালোবাসো? তাই মা তোমার জন্য ঘরেই একটি চকোলেট বানাবেন বলে বলেছেন। হবে তো?
একদিন সেই বিশেষ দিনটি এল। ‘হ্যাপি বার্থডে ঠাম্মা’ - ঠাম্মাকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেল দমান্তী। ঠাম্মাও তাকে জড়িয়ে ধরে দুই গালে দুটি চুমু খেয়ে বুকে টেনে নিলেন। চুলে, মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে বললেন - ‘জন্মদিনে তোকেও অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানালাম দিদিভাই। তুই যাতে পৃথিবী জয় করতে পারিস।’
ঠাম্মার জন্মদিনে সে রঙিন চকচকে কাগজের প্যাকেটে মোড়া সুন্দর একটি উপহার দিল। ঠাম্মা সাগ্রহে মোড়কটি খুললেন, দেখলেন কাঠের একটি ছোট্ট হামানদিস্তা। ঠাম্মাও তাকে একটি উপহারের পুঁটলি দিলেন। কিছু ছোট, বড় রূপকথার বই। আনন্দে, আহ্লাদে সে ঠাম্মাকে জড়িয়ে ধরল।
মূল অসমিয়া গল্প - দমান্তী আরু
খুন্দনাটো, রাধিকা দাস কলিতা
বাংলা
অনুবাদ - বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

Comments
Post a Comment