Skip to main content

সুচয়িত সম্ভারে শারদ সংখ্যা - ১৪৩২


একটি পত্রিকা, সে ছোট কিংবা বড়, শারদ সংখ্যা মানেই এক আড়ম্বর - উৎসবমুখরতার আবশ্যক অঙ্গ। উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হয় ছোটপত্রিকা ‘শতদল’। ধারাবাহিকতা মেনে এবারেও অর্থাৎ আশ্বিন ১৪৩২, সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকা শারদ সংখ্যা। প্রকাশক শতদল সাংস্কৃতিক সংস্থা। আকারে কলেবরে বিশালাকায় না হলেও সম্ভারে, বৈচিত্রে সহজেই জায়গা করে নিয়েছে আলোচনার টেবিলে। একট নান্দনিক প্রচ্ছদ সততই একটি পত্রিকার সম্পদ এবং পাঠকের কাছে পত্রিকাটির গ্রহণযোগ্যতার এক মাপকাঠি। সেই সূত্রেই রয়েছে রিত্তিকা দত্তের প্রাসঙ্গিক একটি চিত্রসংবলিত প্রচ্ছদ যা পাঠকের পাঠভাবনাকে জাগ্রত করে।
৪৮ পৃষ্ঠার ছিমছাম পত্রিকায় সন্নিবিষ্ট হয়েছে নিবন্ধ, গল্প, রম্য রচনা এবং একগুচ্ছ কবিতা। এর বাইরেও রয়েছে দুটি গ্রন্থের পাঠ প্রতিক্রিয়া, একটি দীর্ঘ কিন্তু নাতিদীর্ঘ গল্পকবিতা এবং একটি বিশেষ রচনা। সূচিপত্রে এভাবেই পৃষ্ঠাসংখ্যা অনুযায়ী বিন্যস্ত করা রয়েছে বিভাগগুলি যদিও পৃষ্ঠাসংখ্যার উল্লেখ আবশ্যক ছিল না এবং নেইও। ১/৪ ট্যাবলয়েড-এর রেগুলার সাইজের স্যাডল স্টিচ পত্রিকার পৃষ্ঠাজোড়া সম্পাদকীয়তে একে একে ধরা আছে শারদোৎসব, নারী সুরক্ষা, ভাষা সংকট, লিটল ম্যাগ ও নবীন লেখকদের নিয়ে সুসংহত প্রসঙ্গসমূহ।
ভেতরের লেখালেখির অঙ্গ হিসেবে ক্রমান্বয়ে প্রথমেই আসছে মন্টু দাস লিখিত ছয় পৃষ্ঠাজোড়া একটি গবেষণামূলক নিবন্ধ ‘প্রাচীন হরিকেল রাজ্য : ইতিহাসের এক অনন্য বিস্ময়’। একটি তথ্যনিষ্ঠ নিবন্ধ যা পত্রিকার মান বাড়িয়ে দেয় বহুখানি। একটি অবশ্যপাঠ্য নিবন্ধ। মানবিক মূল্যবোধ, চিন্তাচর্চা, চেতনার উন্মেষ ও অবক্ষয় বিষয়ক একটি সুলিখিত নিবন্ধ সঞ্জীব দে’র ‘চিন্তা-চেতনা বিকাশ দ্বন্দ্ব : একটি দর্শন’। তথ্যাদির উল্লেখে রয়েছে অমিত চট্টোপাধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত নিবন্ধ ‘শারদ উৎসব ও রবীন্দ্রনাথ’। গল্প বিভাগে রয়েছে মোট ছয়টি সুচয়িত গল্প। পৃথ্বীশ দত্তের ‘ছায়াময় হৃদয়, বর্ণিল অভিঘাত’ ভাষায়, বুনোটে, সংলাপে ঝরঝরে লিখনশৈলীতে সমৃদ্ধ অসাধারণ একটি বোধ বা বোধোদয়ের গল্প। শুধু সখ্যতা, মৌনতা জাতীয় কয়েকটি শব্দ খানিক বেমানান হয়ে রয়ে গেছে। আয়না নিয়ে বিশ্ব সাহিত্যে বেশ ক’টি বিখ্যাত গল্প রয়েছে। জহর দেবনাথের ‘আয়নার দেশে’ গল্পটিও বিষয়ভাবনায় একটি সুলিখিত সংক্ষিপ্ত গল্প যা আবার নিবন্ধাকারে লেখা। মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম-এর গল্প ‘অশ্বমেধের ঘোড়া’। একটি সময়োপযোগী বিষয় ভাবনার উপর সপাট উচ্চারণে লেখা একটি সাহসী গল্প। কোদালকে কোদাল বলার সাহস অধিকাংশ কবি সাহিত্যিকেরই থাকে না। তাই এমন গল্প বিরল। আদিমা মজুমদারের গল্প ‘স্ত্রীশিক্ষা’ গল্পের নিখাদ মোড়কে সম্পর্কের অবক্ষয়ের এক নিটোল, মর্মস্পর্শী ও সরব চিত্র। শিরোনাম অন্যরকমও হতে পারত। দিব্যেন্দু নাথের ‘নিজেই নিজের গন্তব্য’ প্রেম-ভালোবাসার আবহে সুলিখিত একটি আধুনিক গল্প। অনবদ্য গঠন ও চলন। তবে প্রাকৃতিক পরিবেশে পাহাড়ি জনপদের আবহে যেহেতু তাই প্রকৃতির আরও খানিক রূপবর্ণনা গল্পের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করত। এক টুকরো জীবনগাথার গল্প রতন চন্দের ‘’কথা’। ভাষায়, বুননে, অনবদ্য একটি নিখুঁত ছোটগল্প। বলা যায় এই গল্প বিভাগটি পত্রিকার শ্রেষ্ঠ সম্পদ হয়ে রইল।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নিরিখে বিশেষ রচনা পায়েল চক্রবর্তীর ‘চলার পথে দেখা জীবন : এক নারীর জীবনের লড়াই’। এক সফল নারীর সত্য বাখান। বাস্তব জীবনের অম্লমধুর অনুভবকে প্রতিপাদ্য করে ঝরঝরে শৈলীতে লেখা চলন্ত পথিকের রম্যরচনা নান্দনিক ও উপভোগ্য যদিও শিরোনামে বানানবিভ্রাট। কবিতা বিভাগের প্রথম কবিতা নিবারণ নাথের ‘নন্দাইরামের ঘাট’ একটি দীর্ঘ কবিতা। অনবদ্য ও উপভোগ্য। এছাড়াও রয়েছে আঞ্চলিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে যাঁদের নানা স্বাদের, নানা আঙ্গিকের কবিতা তাঁরা হলেন - গোবিন্দ ধর, মিতালী দে, হৃষিকেশ নাথ, অপাংশু দেবনাথ, সেলিম মুস্তাফা, বিধানচন্দ্র দে, মধুমিতা ভট্টাচার্য, দেবাশীষ দাস, সিদ্ধার্থ নাথ, সুবল চক্রবর্তী, রাণা চক্রবর্তী, অসিত চক্রবর্তী, নারায়ণ মোদক, সুজিত দেব, সাগর শর্মা, অমলকান্তি চন্দ, নিভা চৌধুরী, প্রদীপ চক্রবর্তী, রামকৃষ্ণ দাস, নির্মল শর্মা, সুস্মিতা চন্দ, মাম্পী দাস ও অনামিকা দেব। ছন্দে, বিষয়ে, শৈলীতে, কাব্যিকতায় অনবদ্য সব কবিতা।
শেষ পর্যায়ে রয়েছে বিদ্যুৎ চক্রবর্তী ও মিলনকান্তি দত্তের দুটি পাঠ প্রতিক্রিয়া।
সব মিলিয়ে ক্ষুদ্রের মধ্যে যেন এক বিশাল সম্ভার। সাহিত্য সৌরভে, বৈভবে ভরপুর। কাগজ, ছাপা, বানান সব দিক থেকে এক যথাযথ সম্পাদনা ও নিবিড় নিবেদনের ছাপ, ভবিষ্যতের এক বর্ধিত স্বরূপের ইঙ্গিত।

 বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

‘শতদল’
সম্পাদক - রতন চন্দ
মূল্য - ৬০ টাকা।

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...