Skip to main content

ত্রয়ী কাব্যপুস্তিকায় উন্মোচিত কাব্যোৎকর্ষ


কবিতার গ্রহণযোগ্যতা মূলত নির্ভর করে সুধাময় ছন্দের উপর - সে আক্ষরিক হোক কিংবা স্বর, মাত্রাভিত্তিক অথবা অন্তর্নিহিত কাব্যসুষমা বিহীন কবিতার গ্রহণযোগ্যতা সরল গদ্যেরও কাছাকাছি পৌঁছোতে পারে না জানুয়ারি ২০২৫-এ একযোগে প্রকাশিত হয়েছে কবি গোবিন্দ ধরের তিনটি একক কাব্যপুস্তিকা এক ফর্মার পেপারব্যাকে মাত্রই ১২টি করে কবিতা হয়েছে সন্নিবিষ্ট তবু আলোচনার টেবিলে জায়গা করে নেয় কাব্যোৎকর্ষ ও সৃজনশীলতায় উত্তরপূর্বের লেখালেখি, বিশেষ করে কবিতার ক্ষেত্রটিকে যাঁরা খাটো ভাবেন কিংবা খাটো করে দেখাতে সচেষ্ট - অন্যভাবে বলতে হলে যাঁরা উদাসীন, তাঁদের সামনে এই তিনটি বইয়ের কবিতা এক সপাট চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট খুলে দেয় এক বিস্ময়ের জানালা। ভাবনাকে কবিতায় প্রকাশ করার যে এক নান্দনিক বোধ সেই বোধ, সেই আলোড়ন যেন গেঁথে দেওয়া হয়েছে আখরে, শব্দে - পরম যতনে
প্রতিটি বইয়ে আরও যেসব সামঞ্জস্য রয়েছে তা হল - /৪ ক্রাউনে স্যাডল স্টিচের ১৬ পৃষ্ঠার পুস্তিকাত্রয়ে দুএকটির বাইরে শুদ্ধ বানান, ভূমিকাবিহীন এবং কবিতাসমূহের অনিয়ন্ত্রিত কিংবা বলা ভালো অবাধ পঙ্ক্তি-উড়ান প্রকাশক দৌড় প্রকাশনা, কলকাতা মূল্য ৭০ টাকা এক এক করে এগোলে -
 
ইরিধান
ইরেজারে মুহে দিই গোপন ধুলোস্তোত্র
 
এক বিশেষ প্রজাতির ধানের নামাঙ্কিত গ্রন্থনামকে সার্থক করে ধুলো, মাটি, ফসলের গন্ধমাখা কবিতার এই বইয়ের কবিতায় উদ্ভাসিত হয়েছে প্রেম, প্রকৃতি, দেশভাগ, আত্মানুসন্ধান, আত্মপরিচিতি ও শ্লেষ-বিদ্রুপ - কিছু বিশেষ বার্তা
আমাদের দুটো দেশ হল
আমাদের মানচিত্র জুড়ে ঘাতকের রক্ত লেগে রইল
ভাগ হইনি শামসুল সাজ্জাদী আর রতিরামের উত্তরপুরুষ
এই আমি চৈতন্য ফকির
(কবিতা - পূর্বপুরুষের পায়ের চিহ্ন আঁকা কুলাউড়া জংশন)
এভাবেই চেতনায় লেখা রইল বহু কথা, বহু যুগের আত্মকথা নান্দনিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে সায়ন্না দাশ দত্ত বইটি কবি উৎসর্গ করেছেনফোকলোরবিদ ড. তপন বাগচী মহাশয়কে
 
কৃষ্ণতরল
নেশাতুর গোবিন্দকে আচ্ছন্ন রাখি অবুঝবালকের মতো
 
দেশমাটির স্মৃতিবিহ্বলতা, জন্মমাটির হার্দিক টান - হাকালুকি, দেওনদী, রাধারমণ, জুমখেত, নীরমহল আর তারই সূত্র ধরে আত্মবিশ্লেষণ, আত্মোন্মোচন আলোচ্য বইটির পাতায় পাতায় ধরে রাখা আছে শুধুই এক নস্টালজিয়া, এক নেশাতুর যাপনকথা। প্রস্ফুটিত হয়েছে অনন্য সব পঙ্ক্তি -
তিনি বেজে উঠলেই কৃষ্ণতরল
রাধারমণ নাম শুনলেই আমার বুকের ভেতরঘরে কেউ জলের গান শুনিয়ে যায়
তিনিই আমার কাঁকাল বাঁকানো ধামাইল
(কবিতা - রাধারমণ)
এইউষ্ণকাতর সম্পর্কথাকা সময়কে এভাবেই ধরে রাখা হয়েছে কবিতায় সাংকেতিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে বাসুদেব মণ্ডল বইটি উৎসর্গিত হয়েছেকথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন-এর প্রতি
 
বর্গছকের বাইরের কবিতা
জলের কাছে মুহূর্তের আলোয় নতজানু হই
 
কবির কবিতা সততই বর্গছকের বাইরে হয়তো তারই থেকে কিংবা নবউচ্ছ্বাসে উদ্ভাসিত কিছু কবিতার সন্নিবেশ আলোচ্য বইটি জল ও জলোচ্ছ্বাসের কবিতা, জল-ভালোবাসা, জলজীবনের রহস্য উন্মোচনের ঘোরলাগা সব শিরোনামবিহীন কবিতা
জলজীবনের হাসিকান্নায় মিশে থাকে
জীবনের গভীর অন্ধকার আলো
জলের নিকট নতজানু হয়ে লিখি
গত জীবনের সোনালিচিলের যত কালো
(কবিতা সংখ্যা - )
জীবন তো আসলে জলেই শুরু, জলেই সমাপন - গর্ভজল থেকে চিতাজলের এই অসামান্য, ব্যতিক্রমী ও বর্গছকের বাইরের সফরকেই পাখির চোখ করেছেন কবি তাঁর কবিতায় বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছেন বাসুদেব মণ্ডল উৎসর্গ করা হয়েছে ‘…কবি মধুমঙ্গল বিশ্বাসকে
সব মিলিয়ে ত্রয়ী সিরিজের এই কবিতাগুচ্ছ কবির আত্মস্থ এক গভীর মননশীলতা ও আত্মমগ্নতার প্রতীক জীবনকে এক ভিন্ন আঙ্গিকে আবিষ্কার, লালন ও মন্থনের সমাহার
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...