‘উপাখ্যান’ অর্থাৎ উপ-আখ্যান মানে যদিও কাহিনিরই সমার্থক তবে তা সচরাচর ছোটগল্পের চাইতে বড় এবং উপন্যাসিকা সমার্থক বলে ধরে নেওয়া হয়। অথচ বাংলা সাহিত্যে একাধিক উপন্যাসও কিন্তু রয়েছে যেগুলোর শিরনামে ‘উপাখ্যান’ শব্দটি রয়েছে। যেমন - প্রচেত গুপ্ত-র ‘সোনাইগঞ্জের উপাখ্যান’, আব্দুল গফফর চৌধুরীর ‘চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান’, হাসান আজিজুল হক-এর ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’, বরেন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বনবিবির উপাখ্যান’ ইত্যাদি।
এবং সেখান থেকে এক এক করে সম্প্রতি সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় রচিত হল ‘কাঁঠল বিচির উপাখ্যান’। আখ্যানকার সিলেটি ভাষার সুপরিচিত রসিক লেখক রামময় ভট্টাচার্য্য। এমনিতে সিলেটিতে বানান ভুল বলে কিছু হয় না। যে যেমন উচ্চারণ করেন সেটাই সঠিক। তবে সিলেটিরা কোনোদিনই চন্দ্রবিন্দুর ধার ধারেননি। সেই সূত্রে গ্রন্থনামে ‘কাঁঠল’-এর স্থানে ‘কাঠল’ই উপযুক্ত বলে ভাবার সঙ্গত কারণ রয়েছে। আবার সিলেটিরা যেখানে ‘র’ ও ‘ড়’-এর উচ্চারণগত স্পষ্টতায় নিখাদ, সেখানে বেরিয়ে যাওয়া অর্থে ‘বাড়ৈ গেছইন’ জাতীয় বানানের ব্যবহার খানিক অসামঞ্জস্য হয়েছে যদিও সাকুল্যে ওই দুটিই। এর বাইরে রামময়ও নিখাদ।
আখ্যান, উপাখ্যান কিংবা উপন্যাস যাই হোক না কেন জমজমাট বুনোটে ঋদ্ধ একটি দীর্ঘ কাহিনিই কিন্তু তার প্রথম এবং সবচাইতে মোক্ষম শর্ত। এই জায়গাটিতে রামময় একশোভাগ সফল। দীর্ঘ একটি কাহিনির মধ্যে তিনি ক্রমান্বয়ে সংযোজন করেছেন সিলেটি সাহিত্য, সংস্কৃতি, ভাষার অলংকার যেমন ডিটান ইত্যাদি, প্রেম-ভালোবাসা, সংস্কার, সম্পর্ক ও গ্রাম-শহর নির্বিশেষে এক অতি পরিচিত পরিবেশে বসবাসরত মানুষজনের পারস্পরিক বাঁধনের এক নান্দনিক চিত্র। কাহিনি ডালপালা মেলেছে যথারীতি তবু খেই হারাতে দেননি উপন্যাসকার। উপন্যাস নাকি উপন্যাসিকা এই ডামাডোলে অনেকেই দ্বিধাগ্রস্ত যদিও আচরণে, কাহিনির বিস্তৃতিতে একে অনায়াসে উপন্যাস হিসেবে মেনে নিতে কোন সংশয় থাকার কথা নেই বলেই মনে হয়। এসব নিয়ে এবং চরিত্রের সংযোজন নিয়ে গ্রন্থের শুরুতেই রয়েছে লেখক নিশুতি মজুমদারের মুখবন্ধ, বিশিষ্ট সাহিত্যিক উষারঞ্জন ভট্টাচার্যের একটি ‘বার্তা’ - ‘রামময় বনাম রসময়’, গ্রন্থকারের ভূমিকা এবং ‘সিলেটি সম্মেলন, গুয়াহাটি’র সাধারণ সম্পাদক গীতেশ দাসের শুভেচ্ছা বাণী।
সিলেটি কথাকে লিখিত আকারে রূপ দেওয়া বড় সহজ কথা নয়। উচ্চারণের তারতম্য এক্ষেত্রে একটি জটিল সমস্যার সৃষ্টি করে। প্রত্যেক আঞ্চলিক ভাষার লেখকদেরই এটা জানা। এ নিয়ে রামময় তাঁর ভূমিকায় লিখছেন - ‘…সিলেটি কথ্য ভাষার উপর নির্ভর করে মান্য বাংলা হরফে লেখা গল্প প্রকাশ করার ইচ্ছে নিয়ে যথেষ্ট দোনামনায় ছিলাম…।’ গ্রন্থকার লিখেছেন যে করোনা কালেই এই উপন্যাসের জন্ম। উপন্যাসে একাধিক কেন্দ্রীয় চরিত্রের উপস্থিতি। মনোরমা ও হরিহর - কন্যা সীমা, অনন্তবাবু ও বাসন্তী দেবী - কন্যা অলি, আত্মীয় গোবিন্দকে কেন্দ্র করেই তরতরিয়ে এগিয়েছে কাহিনি যদিও পরবর্তীতে অসংখ্য ডালপালা মেলে স্ফীত হয়েছে উপন্যাস। তবু কোথাও লক্ষ্যচ্যুত হয়নি ধারাবাহিকতা। অন্যান্য চরিত্ররা এসেছে কাহিনির সাথে যুক্ত হয়েই। যেমন - গণেশ গালামাল, যোগমায়া, পরেশ, স্বপ্না, মদন, কানুদা, হরেন্দ্র, সত্যবতী, হারু, সমীর, উদয় - সব চরিত্রই চিত্তাকর্ষক। কোনো চরিত্রকেই সীমিত রাখেননি উপন্যাসকার। ডালপালা থাকতেই হয় উপন্যাস জমাট হতে হলে। কাহিনির পাশাপাশি অন্য কাহিনি, কাহিনির ভিতরেই অন্য কাহিনি - এসবই গজিয়েছে স্বাভাবিক ছন্দে। তবে কাহিনির বাহুল্যে রাশ টেনে ধরেছেন যথাসময়ে। এক্ষেত্রে যথেষ্ট সহায় হয়েছে অধ্যায়ের সংখ্যায়নে। ১২৭ পৃষ্ঠার গ্রন্থের ১১৫ পৃষ্ঠা জুড়ে লিখিত উপন্যাসটি সমাপ্ত হয়েছে মোট ৪৭টি সুনির্দিষ্ট অধ্যায়ে। ফলত পাঠকের পঠনসুখ বজায় থেকেছে আদ্যোপান্ত। তবে গণেশ গালামাল ও যোগমায়ার কাহিনির এতটা বিস্তৃতি না হলেও হয়তো কিছু ত্রুটি হতো না। আবার থাকাতেও সমস্যা কিছুই হয়নি শুধু স্বল্প সময়ের জন্য খেই হারাবার একটা শঙ্কা হয়তো সৃষ্টি হতে পারত - এই যা।
এদিকে গ্রন্থনামে যদিও কাঁঠাল বিচির সগর্ব উপস্থিতি কিন্তু আসলে কাঁঠাল বিচি পর্ব কিন্তু সমাপ্ত হয়ে যায় প্রথম চার-পাঁচটি অধ্যায়েই। এরপর বিশাল কোনও সমস্যার সমাধানের জন্য পাঠককে হাপিত্যেশ করতে হয়নি। ভালোবাসা ও ফলস্বরূপ পরিণয়, প্রেমের আবর্ভাব এবং একটি হারিয়ে যাওয়া পরিবারের পুনর্মিলনই কাহিনির মূল নির্যাস যা রসেবশে পরিবেশিত হয়েছে আদ্যন্ত। ফলত পাঠকের পাঠবিরতির সুযোগ ছিল খুবই কম। আর এখানেই লেখকের সাফল্য যা পুরোদস্তুর লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন লেখক রামময়। ধর্মকর্মে পুরোহিত ‘রাম ভট’-এর নিদান, বিয়ের নিয়মকানুন, রীতিনীতি, উদ্যম-উদ্যাপন ইত্যাদির বর্ণনায় সিলেটি সংস্কারের এক অনবদ্য সংযোজন - ‘…সইন্দা-উন্দা বাটিয়া চাইরোবায় কাম আটাইয়া বিছনাত উঠতে উঠতে বাড়ির হক্কলর ওউ রাইত দেরি অই গেছিল… হিবায় বিয়ার কুঞ্জ বানানি অইছে। পাড়ার পুয়াইন্তর লগে মিলিয়া গবি আর হারু নিজর হাতে কুঞ্জ বানাইছে। কলা গাছর খোল কাটিয়া ওলা সাজাইছে, যেইন ওউ একবার দেখবা, চউখ হরাইতা পারতা নায়। হরু হরু পুয়াইন্তর অত কাম দেখিয়া হরিহর বেজান খুশি অইছইন…।’
গ্রন্থনাম ভিন্নও হতে পারত - অন্তত কাহিনির সঙ্গে অধিক মানানসই, জুতসই কিছু। কাগজ, বাঁধাই, ছাপার স্পষ্টতা যথাযথ। কাহিনির বুনোট, সংলাপের জমাট ধারা সব কিছু মিলে এক সুখপাঠ্য ও সব বয়সের পাঠকের উপযুক্ত একটি সুপাঠ্য উপন্যাস হিসেবে রামময় ভট্টাচার্যের এই প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ সিলেটি সমাজে যে জনপ্রিয়তা অর্জনে ষোলো আনা সার্থক হবে এতে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। সেই সূত্রে এক ব্যতিক্রমী প্রকাশ - ‘কাঁঠল বিচির উপাখ্যান’।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
প্রকাশক - পান্থজন, শিলচরমূল্য - ২৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৭০০২১১৩৮০৪

Comments
Post a Comment