তরুণ প্রতিভাবান কবি প্রাঞ্জল পাল। গদ্য ও পদ্য উভয় বিভাগে তাঁর বিচরণ। লেখালেখি করছেন খুব বেশিদিন নয়। স্বভাবলাজুক এই বিনয়ী কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি।
৮০ পৃষ্ঠার পাকা বাঁধাইয়ের গ্রন্থের ৭২ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে সমসংখ্যক কবিতা। অর্থাৎ প্রতিটি পৃষ্ঠায় সুবিন্যস্ত রয়েছে ৭২টি শিরোনামযুক্ত ভাবনাত্মক কবিতা। নানা প্রসঙ্গ, নানা ভাবে আক্ষরিক হয়ে উঠেছে পাতায় পাতায়। অর্থাৎ বিষয়ভিত্তিক নয়, বলা যায় মিক্সড ব্যাগ কাব্যসম্ভার। নানা আঙ্গিকে ধরা রয়েছে প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ-অভিমান, দুঃখব্যথা, প্রকৃতি, ঈশ্বর, আপনজন, ভাষা ও ভাষা-শহিদ, নিজ শহরের ভয়াবহ বন্যা এবং সর্বোপরি এক ঋতুভিত্তিক আলাপন - ঋতুসংলাপ। ভালোবাসার ঋতুসংলাপে ছড়িয়ে রয়েছে বর্ষা, শীত ও বসন্তের ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকের আলাপন।
একে একে এগোলে বলা যায় প্রথম কবিতাতেই এক আশার আলো জাগিয়েছেন কবি তাঁর কাব্যধারা, কাব্যশৈলী ও ভাবনা-জগতের প্রকাশ ভঙ্গিমাতে। কোনও নির্দিষ্ট প্যাটার্ন নয়, ভেঙেছেন, গড়েছেন, পরিচর্যা করেছেন, ছন্দ ও ছন্দহীনতার পরীক্ষা নিরীক্ষায় নিয়ত রয়েছেন সতত -
ছুঁয়ে গেছো সেই কবেই, ঈশ্বর
আমার অন্যসত্তা হয়ে উঠেছে ভাস্বর,
এযাবৎ অন্বয় আর কিছুই নেই
প্রতিটি রাতহীন সকাল জ্যোৎস্না খোঁজে...। (কবিতা - সাম্প্রতিক)।
চার পঙ্ক্তির এই ছোট্ট কবিতায় কবি অনেক কিছুই প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন। ভাবনার বিশালতা, আত্মনিবেদন, বিবর্তন, শব্দের যথাযথ স্থাপন, উপমা এবং সর্বোপরি কাব্যিকতা। পরবর্তী পর্যায়ে কোথাও সামান্য দিকপরিবর্তন হলেও, কিছু অনুষঙ্গের উপস্থাপন অপেক্ষাকৃত দুর্বল হলেও প্রতিটি কবিতায় কবি আঁকতে চেয়েছেন এমনই এক ভাবনাজগৎ, ফুটিয়ে তুলেছেন আকুতি, আর্তি আর যাপনের অসহনীয়তা। উল্লেখনীয় কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে সৃষ্টি-সুখ, মন, বিহঙ্গ-সুখ, অন্বেষণ, বসন্ত সমাগমে, অসমাপ্ত বয়ান, রংহীন ক্যানভাস, ফাঁকি, মায়ের গন্ধ, নীরবতা, বিরহশোক, শব্দ, কাঠ ইত্যাদি। যেহেতু একাধিক কবিতা রয়েছে তাই প্রেম, বিরহকেই গ্রন্থের মূল অনুষঙ্গ ধরে নিয়ে দুটি কবিতার উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না নিশ্চয়ই -
কত কান্না হারিয়ে যায়/ আলোক ভোরে আনমনে। কত হাসি এঁকে রাখি/ ঝুটো কথার গহনে।/ কত প্রেম, প্রেমিক পেলে/ বর্তে যেত কে জানে ?/ আমি নাহয় সুখী মানুষ/ বোকা ঘরে আপন মনে।/ দূরত্ব সব তুলে রাখি/ আকাশ ছুঁয়ে নদী আঁকি/ আমি নাকি কবি হবো/ নিজেকে দিই কেবলই ফাঁকি। (কবিতা - ফাঁকি)।
সন্তর্পণে এড়িয়ে যাই/ ভাঙা হৃদয় আর/ অসংখ্য পুরোনো স্মৃতি,/ শুধু তুলে রেখেছি/ সযত্নে তোমার দেওয়া/ সেই বৃষ্টি ভেজা সকাল,/ আমার আজ আর/ বিরহশোক বলে কিছু নেই...। (কবিতা - বিরহশোক)।
‘বাস্তবতা’ শীর্ষক কবিতায় যেন সব কবিতার সারাংশ এঁকেছেন কবি কিছু পঙ্ক্তি জুড়ে। যেখানে রয়েছে -
তোমার মুখ আর মুখোশের বাস্তবতা
আমার আটপৌরে জীবনের
নিয়ত দীর্ঘশ্বাস...
...নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখি
নদীতটে একাকী নির্জন - নিরালায়।
কবির কবিতায় কাব্যিকতার এক উজ্জ্বল উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করা যায় যা সচরাচর প্রথম কাব্যগ্রন্থে বিরল। তবে মাঝে মাঝে কিছু শব্দের অনুপযুক্ত ব্যবহারে হোঁচট খায় কাব্যিকতা। কিছু অসংলগ্নতা প্রত্যক্ষ করা যায় পঙ্ক্তিবিন্যাসেও। পঙ্ক্তি জুড়ে শব্দস্থাপনের বিন্যাস যথোপযুক্ত না হলে ব্যাহত হয় সরল পঠন। গ্রন্থে আধুনিক বানানের বহু প্রয়োগ লক্ষ করা গেলেও বিপরীতে বিভ্রাটও রয়ে গেছে অনেকটাই। এক্ষেত্রে প্রকাশকের দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়ার নয়। যেমন প্রথম ব্লার্বে গ্রন্থ পরিচিতিও নেই প্রকাশকের তরফে। সেসব শুধরে নিলে সার্বিক অধ্যয়নে কোথাও এক প্রত্যাশার সুর বেজে ওঠে হৃদয়ে। গ্রন্থের কাগজের মান, ছাপা, অক্ষরবিন্যাস যথাযথ। সৌরভ দে’র প্রচ্ছদ অনবদ্য। কবি গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর বাবা ও দিদিমাকে। সব মিলিয়ে নিমগ্ন পাঠের এক ‘প্রথম কাব্যগ্রন্থ’ যেখানে ধরা আছে অনুভবের সোপান বেয়ে উপরে ওঠার ইঙ্গিত আর সৌকর্যের প্রতিশ্রুতি।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘ঋতুসংলাপ’প্রাঞ্জল পাল
প্রকাশক - নির্বাণ বুকস, কলকাতা
মূল্য - ২০০ টাকা
.jpg)
Comments
Post a Comment