Skip to main content

অসমের জাতীয় উৎসব বিহু বিষয়ক গদ্য বসন্তের বন্ধন....


ফাল্গুন চৈত্রের চঞ্চল সমীরণ। কোকিলের মধুর সুরে ও স্বরে বৈশাখের আগমনি গান। ধূলিধূসর শুষ্কতাকে ধুয়ে মুছে নির্মল করে, সবুজ দিগন্তের ইষৎ হরিদ্রাভ বৃক্ষ-পাতায় বসন্ত সংলাপে অঙ্কুরিত ফাল্গুনি মলয় ভেসে আসে দূর দূরান্ত থেকে। ঢোল-পেপা গগনার শব্দে নেচে উঠে মন। সবুজ আঁটসাঁট বক্ষবন্ধনীতে প্ৰকৃতির কী যে এক প্রহসন !

নব উল্লাসে আসে নববৈশাখ - উৎসবের আমেজে অসমিয়া মানুষের মন এভাবেই হয়ে ওঠে আকুল। বসন্ত বলতে অসমিয়ার মন-মগজে অনাবিল আনন্দের ছোঁয়া। ফুলাম গামোছায় সজ্জিত বস্ত্রাদি উপহার দেওয়াও আমাদের এক পরম্পরা।
আসলে বিহুর উৎপত্তি ও বিকাশের বিষয়ে আলোচনা করলে প্ৰথমে অসমের জনগোষ্ঠীসমূহের কথাই বলতে হবে। জনবিন্যাসগত ঐতিহ্য বিচার করলে দেখা যায় যে অসমের জনগোষ্ঠীসমূহ প্রাচীন জনজাতি গোষ্ঠী থেকেই সৃষ্ট। তাই কামরূপকে কিরাতভূমি বলে উল্লেখ করে বড়ো, ডিমাছা, লালুং, গারো, মিচিং, সোনোয়াল, কছারি, রাভা, মিকির, আদি জনজাতিদের মূলত মঙ্গোলয়েড জাতির ভিতরে স্থান দেওয়া হয়েছে। সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে মানুষের প্ৰয়োজনীয় আহার, বাসস্থান, সাজপাড় আদি চিন্তাধারার মাধ্যমে বিশ্বাসের ভিত্তি ও জনসাধারণের জীবনধারণের প্ৰণালীর মাধ্যমে বিশাল জাতীয় সংস্কৃতি গড়ে ওঠা এবং অসমের আদি জনগোষ্ঠীদের জীবনধারা ও অভিব্যক্তির সঙ্গে বহাগ বিহুর নিবিড় সম্পৰ্ক অনুধাবন করা যায়। পৃথিবীর আদিম সমাজ সৃষ্ট ঋতুকালীন এই উৎসব এক প্ৰগতিসূচক উৰ্বরা অনুষ্ঠান। তখন থেকেই বিহুগীত, বিহুনৃত্যের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক পার্বণাদি পালন করা হচ্ছে। এটাই আৰ্যপূৰ্ব বিভিন্ন জনগোষ্ঠীয় কৃষিভিত্তিক উৎসবের পরম্পরা।
সৃষ্টি মানেই উৎপাদন। উৎপাদনের অধিকারী বসুমতী। বসুমতীই সৃষ্টি ও উৎপাদন-শক্তির আধার এবং এই শক্তির মধ্যেই নিহিত হয়ে আছে অসমের জাতীয় সংস্কৃতির বাহক, হৃদয়ের ধন বসন্ত উৎসব। দেখতে গেলে আদিমকালে এই বিহুগীত আধ্যাত্মিক চেতনায় রচিত হুঁচরি গীতের মাধ্যমে প্ৰকৃতি দেবীকে সন্তুষ্ট করার পাশাপাশি তাঁদের মনে কামোন্মত্ততা, কামভাবের উদ্ৰেক করার জন্য নৃত্য-গীত ইত্যাদির মাধ্যমে এক সুরেলা আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। এই পরিবেশ সৃষ্টি করতে গিয়ে রূপ-লাবণ্যে ভরপুর যুবতির প্রতি আধ্যাত্মিক চেতনায় রচিত হুঁচরি গীতের মাধ্যমে তাদের মনে আনন্দের সঞ্চার করার এই পরম্পরাই হচ্ছে প্ৰেম কিংবা যৌনতার শৈল্পিক সম্পর্ক।
বৈশাখ মানে দেহের শিহরণ
বৈশাখ মানে আবেগ-অনুভূতি, ভালোবাসা
সৃষ্টির জোয়ার।
বৈশাখ মানে যোগ্য-ভোগ্য বসুন্ধরা
এটাই সৃষ্টির আদিম পাঠ।
আদিম মানুষের মনস্তত্ত্বে সৃষ্টির ক্ৰিয়াশীলতা।
ক্ৰমে স্বৰ্গদেও রুদ্ৰসিংহের আমল থেকে প্রান্তরের বিহুকে মঞ্চে নিয়ে আসার কাজটি এক ভিন্নতর মর্যাদা লাভ করল। তখন থেকেই বৈশাখের প্ৰথম দিন থেকে সপ্তম দিন অবধি যুবক-যুবতিরা ‘বহাগ বিহু’তে হুঁচরি আদি গানে মগ্ন হয়ে থাকে। এই মোহনীয় নৃত্য গীতের মাধ্যমে যুবক-যুবতির মধ্যে প্ৰেম-প্রীতির উদ্ভব হয় এবং মিলনের পর বিবাহ কাৰ্য সম্পন্ন হয় মন্দমধুর সমীরণে কোকিলের সুমধুর কুহুতান সদৃশ বুলির মিষ্টত্ব আহরণ করে করে !
উল্লেখযোগ্য যে তখন সেখানে কোন অশ্লীলতা ছিল না। মানুষ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিল। তারা নদীর জলে স্নান করত। কেউই লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাত না। তাঁরা শুধু উপভোগ করত ঘাট থেকে জল নিতে আসা যুবতিদের পায়ের আঙুল থেকে শুরু করে পেশির রূপলাবণ্য। লজ্জাবনত যুবতিরা লাজুক চাহনিতে কাপড় দিয়ে শরীর ঢাকত। যুবকরা সতৃষ্ণ নয়ন ভরে সন্তোষ লাভ করত। তারা কারও সঙ্গে অশালীন ব্যবহার না করে শুধু মুখে মুখে গাইত -
‘নকশা পেড়ে চালতা আঁকি হে পটেশ্বরী, জল পেড়ে চালতা আঁকি...
ঠোঁটে দোলনচাঁপা মাখা রাঙাবরণ লাল দুটি গাল
রাতের বেলা স্বপ্ন দেখি’...
এমনধারা গানে কথায় সরল স্বভাবের মানুষরা তাদের সুখ-দু:খের অনুভূতি ও শুদ্ধ প্ৰণয়ভাবেরই প্ৰকাশ করত।
প্ৰাণপ্রাচুর্যে ভরা সকল সৃষ্টির উৎস লোকজীবন -
সৃষ্টিৰ আকর
নিসর্গের নির্জনতা
নিৰ্বিকল্প বৰ্ণমালা...।
বৰ্তমান কংক্ৰিটের শহরে তখনকার সেই নির্ভেজাল গ্রাম্য জীবনের চিত্ৰ ছবির মাধ্যমেই দেখানো হয়ে থাকে যদিও বিহু কতটা শান্তি ব্যাপ্ত করতে পেরেছে ? তবু পুরুষানুক্রমিক এই বিহুর পরম্পরা অসমে আজ অবধি এক বিশেষ স্থান দখল করে আসছে। নদ-নদী, পাহাড়-পৰ্বত, বিশাল প্রান্তর, গোরু মোষের চারণক্ষেত্র, প্ৰকৃতির বুকে বসবাস করা পশু-পক্ষীর সাথে এই নিবিড় সম্পৰ্ক যেন চিরন্তন।
অসমে বসবাসরত বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নিজেদের সাংস্কৃতিক অনুবৰ্তন, সংহতি ও সমাহরণ প্ৰক্ৰিয়ার সংযোগে একীভূত হয়ে এমন বিরল ও অনুপম সংস্কৃতির সৌধ নিৰ্মাণ হতে থাকুক। এই সংমিশ্ৰিত অসমিয়া হিসেবে আখ্যায়িত আমরা সবাই মিলে একতার সূত্রে জাতি, ধৰ্ম, বৰ্ণ নিৰ্বিশেষে এই বিহুকে এক জাতীয় সম্পদ হিসেবে সন্মান করি আসুন।

মূল অসমিয়া গদ্য - মামণি ডেকা (নলবাড়ি)
বাংলা অনুবাদ - বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...