Skip to main content

‘আমি হাঁটু গেঁড়ে বসি আমার একমুঠো স্বাধীনতার পায়ে...‘ খেয়ালি কবিতায় উৎকর্ষের খোঁজ


পিদিম শব্দটির বহু প্রতিশব্দ খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন কুপি, ডিবা, লম্ফ, টেমি ইত্যাদি। তবে এ অঞ্চলে কুপি কিংবা লম্ফ (ল্যাম্প) শব্দটিই সতত প্রচারিত। তা শব্দ যেমনই হোক না কেন শব্দার্থ হচ্ছে ইন্ধনে টিমটিম জ্বলতে থাকা শিখার আধার। সেই অর্থে পিদিমের শিখা বলতে বোঝানো হয়েছে প্রচারের আলো থেকে দূরে, প্রাচুর্যের যাপন থেকে সরে এক কষ্টকর যাপনের বাখান। সেই টিমটিমে আলোর দৈন্যজীবনের কথাই কবি বলতে চেয়েছেন আলোচ্য কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতায়।
কবি ছন্দা দাম মূলত এমন ধারার কবিতাতেই সচরাচর স্বচ্ছন্দ। ইতিপূর্বে প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থাবলিতেও সন্নিবিষ্ট হয়েছে এমন ধারারই কবিতা - সাথে এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের জোরালো নিনাদ। আলোচ্য গ্রন্থে মূল ভাবধারা একইরকম ভাবে বজায় থাকলেও কোথাও রচনাশৈলীতে, শব্দ ও পঙ্ক্তির বিন্যাসে এক ভিন্ন আবহ, ভিন্ন আঙ্গিকের সন্ধান পাওয়া যায়। ছন্দকবিতার বহুল ব্যবহার হয়েছে প্রথমবারের মতো। পূর্বপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থসমূহে দু’একটি থাকলেও এবার একাধিক ছন্দকবিতার সমাহার এক অন্য মর্যাদা দিয়েছে আলোচ্য গ্রন্থটিকে। একটির বাইরে সব কবিতা এক পৃষ্ঠায় সংযত। এটাও অন্যতম ব্যতিক্রম ছন্দার কবিতার ক্ষেত্রে। এসব মিলিয়ে কিছু অনবদ্য পঙ্‌ক্তি -
...এই যে আমার শিশুর মতো হৃদ উচাটন
নিংড়ে নিয়ে হৃদয় ক্ষত দুফোঁটা জল,
দারুচিনি রং মাতালগন্ধা এক মুহূর্ত
পরশ তোমার মেখে যে যায় সুরমা কাজল...। (কবিতা - বসতবাটি)
কিংবা -
আজ শ্রাবণ রাতি ম্লান, ভেজা দরদালান
নি:শব্দ পথ চেয়ে কাটে না রা,
ইস্তেহার সাঁটা দেয়ালে, কীজানি বেখেয়ালে
বিবাগী হাওয়ারা ভাসিয়ে ফেরে গা। (কবিতা - পথহারা)
আরও একটু সতর্ক হলে, স্বর-মাত্রার হিসেবটুকু মিলিয়ে নিলে অধিকতর ছন্দময় হতো যদিও এটুকুই বা কম কীসে ? এভাবেই একাধিক কবিতায় ছন্দের প্রয়োগ, বলা ভালো ছন্দের উপর পরীক্ষা নিরীক্ষায় ব্রতী হয়েছেন ছন্দা। তবে কবিতার যে আরেকটি দিক রয়েছে, বলা ভালো মুখ্য দিক তা হচ্ছে কবিতায় কাব্যিকতা - অর্থাৎ শব্দ, পঙ্‌ক্তির মধ্যে বিদ্যমান কাব্যময় অনুভূতি। সেদিকটি বিচার করলে এই গ্রন্থ হয়তো কবির শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ নয়। কোথাও এক তাগিদের খাতিরে যেন আনমনে লেখা হয়েছে কবিতাগুলো। আবার এই প্রেক্ষিতেও যে এমন অজস্র আবেগিক ও নিখাদ অনুভূতিসম্পন্ন পঙ্‌ক্তি উচ্চারিত হতে পারে হৃদয় থেকে সেও এক অনন্য নজির বটে। কবির হৃদয় ও লেখনী যেন এক স্বতঃস্ফুর্ত প্রবাহধারায় ছুটে চলে সৃষ্টির পথে। উৎকর্ষের এমন উদাহরণ রয়ে গেছে বহু কবিতায়। যেমন - ‘যাব তো নিশ্চয়ই’, ‘আমি কি পাথর হয়ে যাচ্ছি ?’, ‘পথহারা’, বৃষ্টিভেজা’, ‘যুগান্তরের প্রহসন’ ইত্যাদি। কিছু ব্যতিক্রমী ভিনভাষার শব্দের ব্যবহার আধুনিক যুগের পাঠককে বিমোহিত করে নিশ্চিত। যেমন চাহত্‌, বন্দিশ, বারিশ, ঝুটা, তালাশ... ইত্যাদি। এই ধারা কবির সহজাত এবং পূর্বেও লক্ষ করা গেছে।
সূচিপত্রহীন, ভূমিকাহীন গ্রন্থ আর যাই হোক এক দায়সারা দায়বদ্ধতার দোষে দুষ্ট থাকে। ৩২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাকে মোট সন্নিবিষ্ট ২৭টি কবিতা যেন এক লালনহীন সম্ভার। আলোচ্য গ্রন্থে ডটের প্রয়োগ কমে এসেছে অনেকটাই। বানান অনেকগুলোই আধুনিক রূপে এসেছে যদিও রয়ে গেছে আরও অনেক। যেমন কাচ, বন্দি, মুহূর্ত, রং, দেরি, কলোনি, থইথই, মহিরুহ, সোনালি, বোষ্টমি ইত্যাদি আরও বেশ কিছু। কারক-বিভক্তি, যতিচিহ্নের প্রয়োগেও যত্নবান হওয়ার পরিসর আছে বইকী। কবিতায় ব্যবহৃত ফন্ট পঠনবান্ধব না হলেও কাগজ, ছাপার শুদ্ধতা, অক্ষর বিন্যাস যথাযথ।
সেসব আপাতত সরিয়ে কবিতার অনবদ্য বহু পঙ্‌ক্তি যে পাঠকের হৃদয়ে অনুরণন তুলতে সক্ষম সে কথা বলা যায় হলফ করে - ‘...গরাদ ভেঙে ঠিকরে পড়া নেশাগ্রস্ত চাঁদের আলোয়/ অসুখটা চাগাড় দেয় রন্ধ্রে রন্ধ্রে/আমি আঁধারের চিকের আড়ালে ঢেকে রাখি/ মরুভূমির জলহীন ক্যাকটাসের পিয়াস...’ (কবিতা - মৃতসঞ্জীবনী)। গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন তাঁর ‘পূজনীয় গুরুদেবকে’।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘পিদিম শিখার আলো’
ছন্দা দাম
প্রচ্ছদ ও প্রকাশক - রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ, দৈনিক বজ্রকণ্ঠ, আগরতলা
মূল্য - ১১০ টাকা।

Comments

Popular posts from this blog

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...